I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.
বৃষ্টি নিয়ে আমার ফ্যাসিনেশনের শেষ নেই। অবশ্য ফ্যাসিনেশন শব্দটা ব্যবহার করে বৃষ্টির প্রতি আমার দুর্বলতাকে খানিকটা অপমানই করা হচ্ছে। ফ্যাসিনেশন সাধারণত এমন সব জিনিসের প্রতি হয়, যাদের সঙ্গে আমাদের জীবনের বিশেষ কোনও সম্পর্ক নেই। যেমন, কেউ ডাইনোসর নিয়ে মুগ্ধ, কেউ ব্ল্যাক হোল নিয়ে, কেউ আবার এমন এক অভিনেত্রীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন, যিনি তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আমার সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্কটা একটু গোলমেলে। আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোয় বৃষ্টি এমন নিয়মিত হাজিরা দিয়েছে যে, মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, প্রকৃতি আমার ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনাপঞ্জি সংগ্রহ করে রাখে। তারপর ক্যালেন্ডার দেখে যথাসময়ে আকাশের কল খুলে দেয়।
আমার একমাত্র ছেলের জন্মের সময় বৃষ্টি হয়েছিল। প্রথম প্রেমের সময় বৃষ্টি। প্রথম বন্ধুত্বের সময় বৃষ্টি। প্রথম ঝগড়ার সময়েও বৃষ্টি। এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন বৃষ্টি। এমনকি জীবনের প্রথম পরীক্ষার দিনেও বৃষ্টি।
ব্যাপারটা লক্ষ করুন। একটা মানুষের জীবনে প্রেম, বন্ধুত্ব, পরীক্ষা, পরীক্ষার ফলাফল, ঝগড়া, সন্তানের জন্ম, এই ঘটনাগুলোর মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে কোনও মিল নেই। একটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বুক ধড়ফড় করা উত্তেজনা, আরেকটার সঙ্গে অনিশ্চয়তা, কোনওটায় আনন্দ, কোনওটায় অভিমান, কোনওটায় আবার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞাতকুলশীল আতঙ্ক। অথচ প্রতিটি ঘটনার সময় আকাশের আচরণ মোটামুটি একই। মেঘ জমেছে। বৃষ্টি নেমেছে। পৃথিবী ভিজেছে।
প্রকৃতির এই একঘেয়েমি আমাকে মুগ্ধ করে।
প্রথম পরীক্ষার দিনটির কথা ভাবুন। একটি শিশু জীবনে প্রথমবার আবিষ্কার করছে, পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা তার সামনে প্রশ্নপত্র রেখে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উত্তর দাবি করেন। এত দিন যে শিশুটির যাবতীয় অপরাধের বিচার হতো বাড়ির আদালতে, সে হঠাৎ আবিষ্কার করল, পৃথিবীতে পরীক্ষক নামক এক আশ্চর্য প্রজাতির অস্তিত্ব রয়েছে। তাঁরা আপনার নামের পাশে নম্বর বসিয়ে আপনার মেধা সম্পর্কে একটি প্রাথমিক সরকারি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবেন। আর বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।
এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনও সেই বৃষ্টি। তত দিনে অবশ্য নম্বরের সামাজিক তাৎপর্য সম্পর্কে খানিকটা জ্ঞান জন্মেছে। কে কত পেল, কার ছেলে কাকে টপকাল, কোন আত্মীয়ের মুখে হাসি ফুটল, কোন প্রতিবেশী সহানুভূতির ছদ্মবেশে ফলাফল জানতে চাইলেন, এই সমস্ত জটিল সমাজতাত্ত্বিক প্রশ্নের মাঝখানে বৃষ্টি নেমেছিল। সেদিন আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের যতখানি উদ্বেগ ছিল, আকাশের সম্ভবত তার বিন্দুমাত্র ছিল না। সে নিজের কাজ করে যাচ্ছিল।
এই যে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের মহাগুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর প্রতি প্রকৃতির সম্পূর্ণ উদাসীনতা, এর মধ্যেও একটা অদ্ভুত সান্ত্বনা আছে। পৃথিবীর কাছে আমার পরীক্ষার ফলাফল এবং পাশের বাড়ির টিনের চালে জমে থাকা ধুলো, দুটোই সমান মনোযোগ পেয়েছিল। দুটোই ভিজেছিল।
বন্ধুত্বের সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্কটা বেশ মজার। বন্ধুত্ব সাধারণত তৈরি হয় কিছু অর্থহীন কথাবার্তা, কিছু অকারণ হাসাহাসি এবং পরস্পরের সম্পর্কে এমন সব তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে, যেগুলো অন্য কোনও মানুষের কাছে সম্পূর্ণ মূল্যহীন। দুজন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলছে। কী নিয়ে? কিছুই না। অথচ সেই কিছুই না নিয়ে কথা বলতে বলতেই তারা একসময় পরস্পরের জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠছে।
বৃষ্টি এই ব্যাপারটায় চমৎকার সাহায্য করে। হঠাৎ বৃষ্টি নামলে মানুষকে কোথাও একটা আশ্রয় নিতে হয়। দোকানের চালের নিচে, স্কুলের বারান্দায়, রাস্তার ধারের কোনও ছাউনিতে। যে দুজন মানুষের হয়তো পরস্পরের সঙ্গে আরও পাঁচ মিনিট কথা বলার কোনও যুক্তিসংগত কারণ ছিল না, বৃষ্টি তাদের আরও আধঘণ্টা পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে রাখে।
ভাবুন, পৃথিবীর কত বন্ধুত্ব, কত প্রেম, কত বিচ্ছেদ হয়তো নির্ভর করেছে স্থানীয় আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসের ব্যর্থতার ওপর!
আমার প্রথম প্রেমের সময়েও বৃষ্টি হয়েছিল। প্রথম প্রেম এমনিতেই মানুষের বিচারবুদ্ধির পক্ষে একটি বিপজ্জনক ঘটনা। তখন একটি মানুষের সামান্য হাসিকে আপনি দস্তয়েভস্কির উপন্যাসের চেয়েও গভীর বলে মনে করতে পারেন। তার মুখ থেকে উচ্চারিত একটি সাধারণ বাক্যের মধ্যে এমন সব দার্শনিক তাৎপর্য আবিষ্কার করেন, যা নিয়ে হাইডেগার বেঁচে থাকলে অন্তত তিনখানা প্রবন্ধ লিখতেন। প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার একটি চিঠি, একটি স্পর্শ, একটি সামান্য অপেক্ষা, সবকিছুই তখন মহাজাগতিক গুরুত্ব অর্জন করে।
এর মধ্যে বৃষ্টি নামলে আর রক্ষা নেই। রবীন্দ্রনাথ থেকে সত্যজিৎ, বাংলা গান থেকে বাংলা সিনেমা, সকলেই মিলে আমাদের এমন একটা সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন যে বৃষ্টি দেখলেই প্রেমের কথা মনে পড়া প্রায় নাগরিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেমিক-প্রেমিকা ভিজবেন, জানলার কাচে জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়বে, দূরে কোথাও রবীন্দ্রসংগীত বাজবে। বাস্তবে অবশ্য বৃষ্টির মধ্যে প্রেম করতে গেলে জামাকাপড় ভিজে যায়, জুতোর মধ্যে জল ঢোকে, চশমার কাচ ঝাপসা হয় এবং বাড়ি ফিরে সর্দি লাগার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু প্রেমের প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষের মস্তিষ্ক এসব তুচ্ছ শারীরবৃত্তীয় সমস্যাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না।
আমার ক্ষেত্রেও সম্ভবত তাই হয়েছিল। সেই প্রথম প্রেমের সমস্ত কথাবার্তা আজ আর মনে নেই। ঠিক কী বলেছিলাম, কী উত্তর পেয়েছিলাম, কোন কথায় হেসেছিলাম, সেসব স্মৃতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঝাপসা হয়েছে। অথচ বৃষ্টিটা রয়ে গেছে। মানুষের স্মৃতির এই স্বেচ্ছাচারিতা বিস্ময়কর। যে ঘটনাটাকে মনে রাখার জন্য আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করি, তার অনেক কিছুই ভুলে যাই। অথচ সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা গন্ধ, একটা শব্দ, একটা বিকেলের আলো, কয়েক দশক পরেও হঠাৎ আমাদের সামনে হাজির হয়।
ফরাসি সাহিত্যিক মার্সেল প্রুস্ত তাঁর In Search of Lost Time-এ চায়ে ডোবানো মাদলেন কেকের স্বাদের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া অতীতকে ফিরে পেয়েছিলেন। আমার জীবনে সেই মাদলেন কেকের দায়িত্ব সম্ভবত বৃষ্টি নিয়েছে।
বৃষ্টি নামলেই স্মৃতির আলমারি থেকে পুরোনো কিছু বিকেল বেরিয়ে পড়ে। তাদের গায়ে সময়ের ধুলো জমেছে, কয়েকটির নাম ভুলে গেছি, কয়েকটির সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষেরাও জীবনের অন্য কোনও ভূগোলে চলে গেছেন। কিন্তু আশ্চর্য, বৃষ্টির শব্দটা শুনলেই মনে হয়, এই তো সেদিনের ঘটনা।
প্রেমের সময় বৃষ্টি হলে আমরা তাকে রোমান্টিক বলি। ঝগড়ার সময় বৃষ্টি হলে ব্যাপারটা খানিকটা জটিল হয়ে দাঁড়ায়। একই বৃষ্টি, একই জল, একই আকাশ। অথচ মনের অবস্থা বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির অর্থও পালটে যাচ্ছে।
প্রেমের সময় যে বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে মনে হয়েছিল স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনও অদৃশ্য কবির প্রেমপত্র, ঝগড়ার সময় সেই ফোঁটাগুলোই জানলার কাচে বিরক্তিকর টোকা মারছে। একটু আগে যে মেঘকে অপূর্ব সুন্দর মনে হচ্ছিল, এখন সেই মেঘের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, পৃথিবীতে এত কালো জিনিসের প্রয়োজনটা কী?
অথচ বৃষ্টির কোনও দোষ নেই। সে প্রেমের পক্ষ নেয়নি, ঝগড়ার পক্ষেও দাঁড়ায়নি। সে জানেই না, পৃথিবীর কোনও এক কোণে দুজন মানুষ পরস্পরের কথায় আহত হয়ে বসে আছে। আমরাই তাকে নিজেদের আবেগের দোভাষী বানিয়ে ফেলেছি।
এখানেই বৃষ্টির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা আমার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। আমরা প্রকৃতিকে দেখতে দেখতে নিজেদেরই দেখতে শিখি। আনন্দের সময় বৃষ্টি আমাদের কাছে উৎসব। বিষাদের সময় সেই একই বৃষ্টি যেন কোনও প্রাচীন শোকসংগীত। প্রেমের সময় বৃষ্টির মধ্যে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি শুনতে পাই। বিচ্ছেদের সময় অতীতের দীর্ঘশ্বাস।
একই পৃথিবী। অথচ কতগুলো পৃথিবী!
আর তারপর আমার ছেলের জন্মের সময় বৃষ্টি। এই বৃষ্টির অভিজ্ঞতা আগের সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। কারণ, সন্তানের জন্মের মুহূর্তে মানুষ হঠাৎ সময় সম্পর্কে নিজের যাবতীয় ধারণা নতুন করে সাজাতে বাধ্য হয়।
এত দিন আমার জীবনের ঘটনাগুলোর কেন্দ্রে আমিই ছিলাম। আমার পরীক্ষা, আমার প্রেম, আমার বন্ধুত্ব, আমার সাফল্য, আমার ব্যর্থতা। পৃথিবীকে দেখার সমস্ত জানলা যেন আমার নিজের ঘরের দেওয়ালে বসানো ছিল। তারপর একটি শিশু জন্মাল। মুহূর্তের মধ্যে আবিষ্কার করলাম, পৃথিবীতে এমন একজন মানুষ এসেছে, যার সামান্য অসুবিধাও আমার সমস্ত ব্যক্তিগত সুখদুঃখের হিসাব ওলটপালট করে দিতে পারে।
আর সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল।
হাসপাতালের বাইরে পৃথিবী তার স্বাভাবিক নিয়মে চলছিল। মানুষ কাজে যাচ্ছিল, গাড়ি চলছিল, কোথাও হয়তো কেউ প্রেমে পড়ছিল, কেউ পরীক্ষায় ফেল করছিল, কেউ চাকরি হারাচ্ছিল। আর আমার কাছে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর ইতিহাসে একটি সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।
পিতৃত্বের একটা আশ্চর্য ঔদ্ধত্য আছে। পৃথিবীতে প্রতিদিন অসংখ্য শিশুর জন্ম হয়। অথচ নিজের সন্তানকে প্রথমবার দেখার মুহূর্তে মনে হয়, মানবসভ্যতা এত দিন ধরে সম্ভবত এই একটি ঘটনার প্রস্তুতিই নিচ্ছিল।
সেদিনের বৃষ্টিটা তাই আমার কাছে আলাদা।
আমার জীবনে এর আগেও অসংখ্যবার বৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু সেই দিনের বৃষ্টির সঙ্গে পৃথিবীতে একটি নতুন মানুষের আগমনের স্মৃতি চিরকালের জন্য জুড়ে গেছে। আমার জীবনের সঙ্গে আরেকটি জীবনের সম্পর্ক শুরু হয়েছিল। সেই সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা আছে, দায়িত্ব আছে, আনন্দ আছে, ভয় আছে এবং এমন এক ধরনের অসহায়তা আছে, যার সঙ্গে আগে আমার পরিচয় ছিল না।
বাইরে তখন বৃষ্টি।
মাঝে মাঝে ভাবি, আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে সত্যিই কি এত বেশি বৃষ্টি হয়েছে? নাকি আমার স্মৃতি বৃষ্টিকে একটু বাড়তি সুবিধা দিয়েছে?
মনোবিজ্ঞানে একটা ব্যাপার আছে, যাকে বলা হয় reconstructive memory। আমরা অতীতের ঘটনাগুলোকে হুবহু সংরক্ষণ করে রাখি না। মনে করার সময় সেগুলোকে আবার নির্মাণ করি। কিছু ঘটনা স্পষ্ট থাকে, কিছু ঝাপসা হয়ে যায়, কিছু অনুষঙ্গ নতুন গুরুত্ব পায়। আমাদের বর্তমান আবেগও সেই পুনর্নির্মাণে অংশগ্রহণ করে।
হতে পারে, আমার জীবনের আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ দিনে আকাশ একেবারে পরিষ্কার ছিল। চড়া রোদ উঠেছিল। গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছিল। কিন্তু আমার স্মৃতির সম্পাদকমশাই সেই দিনগুলোর আবহাওয়া সংক্রান্ত বিবরণ বাদ দিয়ে দিয়েছেন। বৃষ্টির দিনগুলোকে যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছেন প্রথম পাতায়।
তাতে আমার বিশেষ আপত্তি নেই।
কারণ, মানুষের জীবনের একটা বড় অংশই তার নিজের সম্পর্কে তৈরি করা গল্প। আমরা সেই গল্পের মধ্যে বাস করি। অতীতের ঘটনাগুলোকে অর্থ দিই। বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক খুঁজি। জীবনের বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটা ব্যক্তিগত বিন্যাস তৈরি করি।
আমার সেই বিন্যাসের মধ্যে বৃষ্টি বারবার ফিরে এসেছে।
সবচেয়ে গাঢ় রোমান্টিক বৃষ্টিটার কথা অবশ্য আলাদা করে বলতে হয়।
কিছু কিছু বৃষ্টির সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনও ঘটনার সম্পর্ক থাকে। আবার কিছু বৃষ্টি নিজেরাই একটা সম্পূর্ণ ঘটনা হয়ে ওঠে। তখন কোথাও পৌঁছোনোর তাড়া থাকে না। কোনও পরীক্ষার ফলাফল জানার অপেক্ষা থাকে না। কারও সঙ্গে ঝগড়া মেটানোর দায় থাকে না। আপনি শুধু বৃষ্টি দেখছেন। হয়তো পাশে আপনার প্রিয় মানুষটি বসে আছেন। দুজনের মধ্যে তেমন কোনও কথাবার্তাও হচ্ছে না। কথা হবে কি করে? ঠোঁটে ঠোঁট আটকে আছে। কথা না বলেও যে একজন মানুষের সঙ্গে এতখানি সময় কাটানো যায়, এই আবিষ্কারটা প্রেমের এক বিশেষ পর্যায়ে ঘটে।
বৃষ্টি হচ্ছে। আমার চশমার কাচে ফোঁটাগুলো গড়িয়ে পড়ছে, যার ফলে চারপাশের পরিচিত দৃশ্যপট এক নিমেষে ধোঁয়াটে আর রহস্যময় হয়ে উঠেছে। দূরের বাড়িগুলো অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যেন তারা এই বাস্তব পৃথিবী ছেড়ে ধীরে ধীরে ছায়ার দেশে মিলিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার আলো জলে প্রতিফলিত হয়ে কাঁপছে, ঠিক যেন জলের নিচে কোনো রূপকথার শহর জেগে উঠেছে। কোথাও একটা গাছের পাতা ক্রমাগত ভিজে চলেছে, নিঃশব্দে সহ্য করে চলেছে প্রকৃতির এই অকৃপণ বর্ষণকে। দুজন মানুষ পাশাপাশি বসে আছেন। ভিজছেন। চারপাশের এই অবিরাম ধারাপাতের মধ্যে তাঁদের নীরবতাই যেন সবচেয়ে গাঢ় ভাষা হয়ে উঠেছে। তাঁদের কারও কাছেই এই মুহূর্তে পৃথিবীকে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই, নেই নিজেদের অনুভূতিগুলোকে শব্দের বাঁধনে বাঁধার কোনো তাগিদ। দু’জোড়া ঠোঁটই যথেষ্ট। এই নীরবতা, এই ভিজতে থাকা, আর প্রকৃতির এই নিজস্ব ছন্দ—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব পূর্ণতায় ভরে উঠছে সময়।
এমন সময় মনে হয়, মানুষের সমস্ত দার্শনিক অনুসন্ধান, সমস্ত সাহিত্যচর্চা, সমস্ত সংগীতের সাধনা সম্ভবত এই ধরনের কয়েকটি মুহূর্তকে একটু দীর্ঘায়িত করারই চেষ্টা।
অবশ্য এই কথাটা কোনও দর্শন বিভাগের সেমিনারে বললে অধ্যাপকরা যথেষ্ট বিরক্ত হতে পারেন। বিশেষত কান্টের Critique of Pure Reason পড়ে যাঁরা কয়েক দশক কাটিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের সামনে বৃষ্টিভেজা জানলার দোহাই দিয়ে মানবজীবনের চূড়ান্ত তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার চেষ্টা যথেষ্ট বিপজ্জনক।
কিন্তু বৃষ্টির সময় আমার এসব তাত্ত্বিক আপত্তি মনে থাকে না।
বৃষ্টি সম্পর্কে আমার আরেকটা প্রিয় পর্যবেক্ষণ আছে। বৃষ্টি নামার পর পৃথিবীর গন্ধ বদলে যায়। শুকনো মাটিতে প্রথম কয়েক ফোঁটা জল পড়লে যে গন্ধ বেরোয়, তার একটা নামও আছে, petrichor। বিজ্ঞানীরা এর রাসায়নিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মাটিতে থাকা কিছু পদার্থ, উদ্ভিদজাত তেল এবং অণুজীবের তৈরি জিওসমিনের মতো যৌগ এই গন্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিজ্ঞানের ব্যাখ্যাটা চমৎকার। তবু সেই গন্ধ পেলেই আমার প্রথমে রাসায়নিক যৌগের কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে শৈশবের কথা। পুরোনো রাস্তার কথা। কোনও এক বিকেলে হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যাওয়া আকাশের কথা।
মনে হয়, ধুলোবালি মাখা পৃথিবীটা যেন নিজের বহু পুরোনো পরিচয় ফিরে পেল। এই অনুভূতিটাকে ইংরেজিতে কয়েকটি লাইনে ধরার চেষ্টা করলে হয়তো এমন দাঁড়াবে:
Rain writes silver letters on the sleeping street,
Each drop a small bell rung in the dark.
The thirsty leaves lift up their green faces,
Roofs hum softly beneath the sky’s old song.
For a moment, dust remembers it was earth,
And every window holds a piece of cloud.
(এই প্রবন্ধের লেখক ইংরেজিতে কবিতা লিখে নোবাল প্রাইজ পাইতে চান)
ঘুমন্ত রাস্তার গায়ে বৃষ্টি রুপোলি অক্ষরে কিছু লিখে যাচ্ছে। প্রতিটি ফোঁটা অন্ধকারের মধ্যে বাজিয়ে দিচ্ছে ছোট্ট একটি ঘণ্টা। তৃষ্ণার্ত পাতারা তাদের সবুজ মুখ তুলে ধরেছে আকাশের দিকে। বাড়ির ছাদগুলো আকাশের বহু পুরোনো গান গুনগুন করে গাইছে। কিছুক্ষণের জন্য ধুলোর মনে পড়ে যাচ্ছে, একদিন সে মাটি ছিল। আর প্রতিটি জানলা নিজের মধ্যে এক টুকরো মেঘ ধরে রেখেছে।
শেষের দুটি পঙ্ক্তি আমার বিশেষ প্রিয়।
ধুলোর মনে পড়ে যাচ্ছে, সে একদিন মাটি ছিল।
মানুষের ক্ষেত্রেও কি ব্যাপারটা অনেকটা এই রকম? প্রতিদিনের কাজকর্ম, দায়িত্ব, হিসাবনিকাশ, সামাজিক অভিনয়, সাফল্যের পেছনে ছোটাছুটি, এসবের মধ্যে আমরা নিজেদের কিছু অংশ ক্রমশ হারিয়ে ফেলি। তারপর হঠাৎ কোনও একটি গান, পুরোনো বইয়ের ভেতরে পাওয়া চিঠি, পরিচিত গন্ধ কিংবা বৃষ্টির শব্দ আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটির সঙ্গে আবার পরিচয় করিয়ে দেয়।
আমার কাছে বৃষ্টি অনেকটা সেই কাজটাই করে।
একটা বৃষ্টির মধ্যে আমি আমার প্রথম পরীক্ষার দিনটাকে খুঁজে পাই। আরেকটার মধ্যে প্রথম প্রেম। কোনও এক বৃষ্টির শব্দে পুরোনো বন্ধুত্বের কথা মনে পড়ে। কোনও এক মেঘলা বিকেলে মনে পড়ে যায় প্রথম ঝগড়ার অভিমান। আবার কোনও এক বর্ষণমুখর দুপুরে মনে পড়ে, আমার ছেলের জন্মের সময়ও পৃথিবী এভাবেই ভিজেছিল।
কী আশ্চর্য, এতগুলো আলাদা সময়, এতগুলো আলাদা মানুষ, এতগুলো আলাদা অনুভূতি, অথচ তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে একই প্রাকৃতিক ঘটনার সম্পর্ক!
সময়ের ব্যাপারে আমাদের একটা মৌলিক অসুবিধা আছে। সে কেবল সামনের দিকে এগিয়ে যায়। যে দিনটা পেরিয়ে গেল, যে মানুষটা চলে গেল, যে কথাটা বলা হলো না, যে মুহূর্তটা হাতছাড়া হয়ে গেল, তাকে আর ফিরিয়ে আনার কোনও ব্যবস্থা নেই। পদার্থবিদেরা সময়ের প্রকৃতি নিয়ে যতই তর্ক করুন, ব্যক্তিগত জীবনে আমরা এই নিষ্ঠুর নিয়মটার সঙ্গে মোটামুটি পরিচিত।
বৃষ্টি অবশ্য এই নিয়মের মধ্যে মাঝেমধ্যে একটা ছোটখাটো গোলমাল পাকিয়ে দেয়।
বাইরে বৃষ্টি নামল। আপনি জানলার সামনে দাঁড়ালেন। হঠাৎ দেখলেন, আপনার বয়স অনেকটা কমে গেছে। আপনি আবার সেই প্রথম পরীক্ষার দিনের শিশু। আবার প্রথম প্রেমে পড়া তরুণ। আবার পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন। আবার হাসপাতালের সেই মুহূর্তটায় ফিরে গেছেন, যখন প্রথমবার নিজের সন্তানকে দেখেছিলেন।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো জানলার কাচ বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। আর আপনার স্মৃতি ঠিক উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করেছে।
এই কারণেই বৃষ্টি নিয়ে আমার ফ্যাসিনেশনের শেষ নেই।
এখনও বৃষ্টি নামলে আমি মাঝেমধ্যে সব কাজ বন্ধ করে দিই। জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। দেখি, আকাশ থেকে জল পড়ছে। রাস্তাঘাট ভিজছে। গাছের পাতাগুলো কাঁপছে। মানুষের ব্যস্ততা কিছুক্ষণের জন্য ব্যাহত হচ্ছে। পৃথিবী নিজের মতো করে একটা পুরোনো অনুষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছে।
আর আমি ভাবি, আমার জীবনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটার দিনেও কি বৃষ্টি হবে?
জানি না।
তবে একটা ব্যাপার বেশ মজার। আমার জীবনের এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দিনে বৃষ্টি হাজির ছিল, অথচ বৃষ্টির নিজের কোনও স্মৃতি নেই। প্রথম প্রেমের বৃষ্টিটা জানত না, আমি প্রেমে পড়েছি। প্রথম ঝগড়ার বৃষ্টিটা জানত না, আমি অভিমান করেছি। আমার ছেলের জন্মের দিনের বৃষ্টিটাও জানত না, আমার পৃথিবীটা সেদিন চিরকালের জন্য বদলে গেছে।
সমস্ত স্মৃতি আমার একার।
বৃষ্টি শুধু পড়েছিল।
বৃষ্টি। বৃষ্টি। বৃষ্টি। বৃষ্টি। বৃষ্টি।
-রিটন খান



