পড়ুন।
সব পড়ুন।
মহাভারত পড়ুন, পাশের বাড়ির বৌদির বাজারের ফর্দ পড়ুন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ পড়ুন, দেওয়ালে লেখা এখানে প্রস্রাব করিবেন নাপড়ুন, প্রেমিকার শেষ মেসেজ পড়ুন, বাসের টিকিটের পেছনে ছাপা দুর্ঘটনা-বিমার শর্তাবলি পড়ুন। ভালো বই পড়ুন। খারাপ বই পড়ুন। যে-বই পড়ে মনে হবে লেখক আপনাকে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে তিনশো পৃষ্ঠা ধরে সরষের তেল খাইয়েছেন, সেটাও পড়ুন। ক্লাসিক পড়ুন। ক্লাসিকের ভূমিকাও পড়ুন, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আঠারো পৃষ্ঠা ধরে প্রমাণ করেছেন, লেখক কেন মহান, যদিও লেখক নিজে জীবিতকালে বাড়িভাড়া দিতে পারেননি।
আবর্জনা পড়ুন।
আবর্জনা খুব জরুরি।
সভ্যতা তার আসল আত্মজীবনী ডাস্টবিনেই ফেলে রাখে।
একদিকে নোবেল পুরস্কারের ভাষণ। অন্যদিকে ফুটপাতে পড়ে থাকা আধখাওয়া বিরিয়ানির প্যাকেটের ওপর লেখা, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে প্রস্তুত। লেখক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। তার এক হাতে দস্তয়েভস্কি, অন্য হাতে পচা আলুর গন্ধ। দূরে জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের ব্যানার। ব্যানারের নিচে চা-ওয়ালা ছেলেটি আগের রাত থেকে কিছু খায়নি। মঞ্চে একজন বলছেন, সাহিত্য মানুষের মুক্তির কথা বলে। ছেলেটি কাপ ধুচ্ছে। কাপের ফেনায় মুক্তি হচ্ছে। পাঁচ টাকা কাপ।
কে কীভাবে লিখছে, দেখুন।
লোকটা কোথায় কমা দিল। কোথায় বাক্য ভাঙল। কোথায় মিথ্যে বলল। কোথায় মিথ্যেটাকে এত সুন্দর করে সাজাল যে পাঠক নিজের স্ত্রীকে সন্দেহ করল, সরকারকে করল না। কোথায় একটি দরিদ্র মানুষের মৃত্যু এনে উপন্যাসের আবহ তৈরি করল। কোথায় একটি যুদ্ধকে প্রেমকাহিনির পটভূমি বানাল। কোথায় নারীর শরীরকে রূপক বলল, তারপর রয়্যালটির টাকায় ফ্রিজ কিনল। কোথায় কবি লিখলেন, মানুষ মানুষের জন্য, আর দরজায় ভিখিরি এলে কাজের লোককে বললেন, বলে দাও বাড়িতে কেউ নেই।
এসবও পড়ুন।
লেখা শেখা মানে শুধু বাক্যের কোমর দেখা নয়। তার পকেটও তল্লাশি করতে হয়। বাক্যের পকেটে কার টাকা। কার রক্ত। কার কান্না। কার কাটা আঙুল। কোন ইতিহাসের হাড় গুঁজে রাখা হয়েছে। কোন মানুষটিকে ব্যাকরণসম্মতভাবে মেরে ফেলা হয়েছে।
তারপর লিখুন।
লিখুন, যেন আপনার ঘরের মধ্যে হঠাৎ একটি পাগলা ঘোড়া ঢুকে পড়েছে।
লিখুন, যেন পুলিশ দরজায়।
লিখুন, যেন মৃত্যুদণ্ডের আগে আপনাকে একখানা সাদা কাগজ দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, বক্তব্য সংক্ষিপ্ত রাখবেন।
লিখুন, কারণ পৃথিবী আপনার লেখা চায় বলে বসে নেই। পৃথিবী ব্যস্ত। শেয়ারবাজার উঠছে। মন্ত্রী ফিতা কাটছেন। টেলিভিশনে বিশেষজ্ঞরা চেঁচাচ্ছেন। একটি শিশু ড্রেনের পাশে বসে ভাত খুঁজছে। একটি কোম্পানি নতুন সুগন্ধির বিজ্ঞাপনে বলছে, নিজেকে আবিষ্কার করুন। একটি রাষ্ট্র বোমা ফেলছে। পরের দৃশ্যে সাবান।
আপনার লেখা ভালো হলে টিকে যাবে।
হয়তো।
টিকে যাওয়া বলতে কী বোঝেন?
গ্রন্থাগারের অন্ধকার তাকে খাবে। উইপোকা তার দর্শন বুঝবে। কোনো প্রেমিক তার পাতায় শুকনো ফুল রাখবে। কোনো ছাত্র পরীক্ষার আগের রাতে সারাংশ খুঁজবে। কোনো বিপ্লবী তার বাক্য উদ্ধৃত করবে, তারপর ক্ষমতায় গিয়ে বাক্যটাকে গ্রেপ্তার করবে। কোনো প্রকাশক নতুন মলাটে লিখবে, অবশ্যপাঠ্য কালজয়ী রচনা, কারণ পুরোনো সংস্করণের প্লেট এখনো গোডাউনে পড়ে আছে।
লেখা খারাপ হলে জানালা দিয়ে ফেলে দিন।
তবে নিচে মানুষ আছে কি না দেখে নেবেন।
খারাপ লেখা মাথায় পড়ে মানুষ মারা গেলে সাহিত্যসভা বসবে। সভাপতি বলবেন, লেখকের সামাজিক দায়িত্ব থাকা উচিত। সম্পাদক বলবেন, লেখাটির মধ্যে সম্ভাবনা ছিল। মৃতের পরিবারকে একটি স্মারক দেওয়া হবে। স্মারকে বানান ভুল থাকবে।
তবু ফেলুন।
নিজের লেখার প্রতি মায়া লেখকের প্রথম পারিবারিক রোগ। সন্তান কুৎসিত হলেও মা তাকে সুন্দর বলে। লেখা কুৎসিত হলে লেখক ভূমিকা লেখে।
বলে, সময় আমাকে বুঝতে পারেনি।
সময় খুব ব্যস্ত ছিল, মশাই। আপনার সাতাশ পৃষ্ঠার প্রতীকী বৃষ্টির জন্য সে ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেনি।
সঙ্গে খাতা রাখুন।
ছোট খাতা।
বড় খাতা দেখলে ভাবনা ভয় পায়। সাদা পৃষ্ঠার বিশাল মাঠে ভাবনা নিজেকে উদ্বাস্তু মনে করে। ছোট খাতায় তাকে ধরে ফেলুন। বাসে, ট্রেনে, বাজারে, শ্মশানে, বিয়েবাড়িতে, হাসপাতালের করিডরে। প্রেম করতে করতে ভাবনা এলে লিখে নিন। প্রেমিকা রাগ করবে। তাকে বলুন, তোমার কথাই লিখছি। এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিথ্যে, কিন্তু সাহিত্য ও প্রেম দুটোই সামান্য মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে হাঁটে।
মাথায় আসা ভাবনা বেশিক্ষণ থাকে না।
মাথা কোনো সরকারি গুদাম নয়। সেখানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা দুর্বল। তিন মিনিট আগে যে বাক্যটি এসে আপনার কানের কাছে দাঁড়িয়েছিল, একটু পরেই সে বাস ধরে চলে যাবে। তার হাতে ছিল একটি লাল ব্যাগ। ব্যাগে হয়তো আপনার জীবনের সবচেয়ে দরকারি গল্প। আপনি ভাবলেন, পরে লিখব। পরে এসে দেখলেন বাসস্ট্যান্ড খালি। মাটিতে একটি বাদামের খোসা। দূরে রাষ্ট্রায়ত্ত বাস ধোঁয়া ছাড়ছে।
ভাবনা হারালে থানায় জিডি করা যায় না।
বিবরণ: মাঝারি উচ্চতা, চোখে বিষণ্ণতা, শেষবার দেখা গেছে বাথরুমে দাঁত মাজার সময়।
পুলিশ বলবে, নিজের অসাবধানতা।
অতএব লিখে রাখুন।
অর্ধেক বাক্য। একটি শব্দ। একটি মুখ। ভাঙা স্যান্ডেলের শব্দ। মায়ের কাশির ভেতর বিরতি। বাবার পুরোনো মানিব্যাগের গন্ধ। হাসপাতালের লিফটে দাঁড়ানো লোকটির চোখ। মসজিদের মাইকের নিচে ঘুমিয়ে থাকা কুকুর। বিদ্যালয়ের দেয়ালে নৈতিক শিক্ষার বাণী, তার ঠিক নিচে শিক্ষক ছাত্রকে চড় মারছেন। নববধূর হাসি। বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দা। নির্বাচনের পোস্টারে প্রার্থীর দাঁত। কসাইখানার পাশে ফুলের দোকান।
সব লিখুন।
কোনটি পরে গল্প হবে, আপনি জানেন না।
একটি মাছির ডানা কখনো কখনো উপন্যাসের চেয়ে বেশি সত্য বহন করে।
চোখ খোলা রাখুন।
শুধু তাকাবেন না। দেখা শিখুন।
রাস্তার মানুষকে দৃশ্য বানাবেন না। তার জুতোর ক্ষয় দেখুন। হাঁটার গতি দেখুন। সে কাকে এড়িয়ে যাচ্ছে দেখুন। তার পকেটে হাত কেন। তার মুখে যে হাসি, সেটি বেতন পাওয়ার, ঋণ পাওয়ার, অপমান গেলার, না কি বাড়ি ফিরে আত্মহত্যার আগে শেষবার স্বাভাবিক থাকার হাসি।
চোখ খোলা রাখলে অসুবিধা আছে।
আপনি অনেক কিছু দেখে ফেলবেন।
দেখবেন, যে মানুষটি মঞ্চে মানবতার কথা বলছেন, গাড়িতে উঠে চালককে মানুষ মনে করছেন না। দেখবেন, যে সম্পাদক তরুণ লেখকদের সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন, তিনি নিজের ভাতিজার কবিতা ছাপছেন। দেখবেন, যে সমাজ নারীর সম্মান রক্ষায় মিছিল করে, সেই সমাজই সন্ধ্যার পর তার পোশাকের দৈর্ঘ্য মাপে। দেখবেন, জাতীয় পতাকা দুলছে, পতাকার নিচে একজন মানুষ না খেয়ে অজ্ঞান। দেশপ্রেমিকেরা পতাকাটিকে সামলাতে ছুটেছে। মানুষটিকে নয়। কারণ পতাকা ক্যামেরায় ভালো আসে।
লেখকের চোখে আরাম কম।
চোখ খুললে ঘুম নষ্ট হয়।
ঘুম নষ্ট হলে লেখা হয়।
আর লেখার সময় ও জায়গাকে রক্ষা করুন।
রক্ষা করুন, যেন সেখানে একটি আহত হরিণ লুকিয়ে আছে।
দরজা বন্ধ করুন। ফোন উল্টো করে রাখুন। নোটিফিকেশনকে মরতে দিন। পৃথিবী প্রতি সাত সেকেন্ডে আপনাকে জানাতে চাইবে, একজন অচেনা মানুষ তার সকালের নাশতার ছবি দিয়েছে, একটি কোম্পানি আপনার জন্য বিশেষ অফার এনেছে, একজন নেতা আবারও জাতিকে বাঁচিয়েছেন, আপনার পুরোনো সহপাঠী পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে লিখেছে, জীবন সুন্দর।
আপনার জীবন তখন সুন্দর হওয়ার সময় পাবে না।
আপনি লিখছেন।
লেখার জায়গায় কাউকে ঢুকতে দেবেন না।
বন্ধু না। আত্মীয় না। সম্পাদক না। বাজারের ব্যাগ না। বিদ্যুৎ বিল না। খুব প্রিয় মানুষও না।
প্রিয় মানুষ বিপজ্জনক।
তারা ভালোবেসে দরজা খুলে ঢোকে। বলে, শুধু এক মিনিট। তারপর জিজ্ঞেস করে, কী লিখছ? তারপর পড়তে চায়। তারপর বলে, ভালো হয়েছে, কিন্তু ওই চরিত্রটা কি আমাকে নিয়ে? তারপর তিন দিনের সম্পর্ক-সংকট। চরিত্রটি ততক্ষণে আত্মহত্যা করে ফেলেছে। লেখকও কাছাকাছি।
ভালোবাসা লেখাকে খাদ্য দেয়। আবার ভালোবাসাই লেখার ঘরে ঢুকে চেয়ার টেনে বসে, বলে, আগে আমার সঙ্গে কথা বলো।
তখন লেখককে নিষ্ঠুর হতে হয়।
সাময়িকভাবে।
দরজার বাইরে প্রিয়তম মানুষটি থাকবে। ভেতরে বাক্য। একটিকে বেছে নিতে হবে। মানুষটি চলে যেতে পারে। বাক্যটিও চলে যেতে পারে। এই দুই প্রস্থানের মাঝখানে বসে লেখক বুঝতে পারে, স্বাধীনতা আসলে খুব আরামদায়ক জিনিস নয়।
লেখার সময় রক্ষা করুন।
সময়কে টুকরো টুকরো করে অন্যেরা নিয়ে যাবে। অফিস নেবে। পরিবার নেবে। বাজার নেবে। ফোন নেবে। ক্লান্তি নেবে। সামাজিক সৌজন্য নেবে। যে লোকটির সঙ্গে আপনার কোনো কথা নেই, সে ফোন করে বলবে, কী খবর। তারপর পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে নিজের খবর দেবে।
দিনের শেষে দেখবেন, আপনার জন্য পাঁচ মিনিট পড়ে আছে।
সেই পাঁচ মিনিটেরও দাঁত আছে।
তাকে ধরুন।
লিখুন।
একটি বাক্য।
একটি অসমাপ্ত মুখ।
একটি মৃত ভিখিরির পাশে হলুদ ট্রাফিক আলো।
একটি সোনার মূর্তির বাক্সের ওপর পচে থাকা ইতিহাস।
একটি জাতীয় সংগীতের ভেতর ক্ষুধার শব্দ।
একটি শিশুর কান্না, যা মাইকের ভাষণ ভেদ করে উঠতে পারছে না।
একটি খাতা খুলে বসে আছে।
জানালা খোলা।
নিচে সভ্যতা দাঁড়িয়ে।
আপনার খারাপ লেখার অপেক্ষায়।
—--
রিটন খান


