বই পড়ার কারণে আমার জীবনে প্রেম ভেস্তে গেছে। এ-কথা বললে অবশ্য লোকে প্রথমে বিশ্বাস করতে চায় না। ভাবে, লোকটা বোধহয় প্রেমে ধাক্কা খেয়ে এখন রবীন্দ্রনাথ, দস্তয়েভস্কি, কাফকা এঁদের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে। প্রেমিকা চলে গেছে, বেচারা বুকশেলফকে আসামি করেছে।
ব্যাপারটা অত সরল নয়।
আমার বহুদিনের একটা ধারণা হয়েছে, পড়ুয়া ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরা প্রেম করলেও করতে পারে, কিন্তু সংসার করার বেলায় দুবার ভাবে। আর পড়ুয়া মেয়ে হলে তো কথাই নেই। আমাদের দেশের বহু পুরুষ জ্ঞানী মেয়েকে দেখে প্রথমে মুগ্ধ হয়, তারপর সমীহ করে, তারপর একটু ভয় পায়, শেষে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে এমন একটি মেয়েকে বিয়ে করে, যার সামনে অন্তত সকালের চায়ের টেবিলে হেগেল সম্পর্কে পরীক্ষায় বসতে হবে না।
কথাটা শুনে অনেকেই রাগ করবেন। রাগ করতেই পারেন। আমি তো গবেষণাপত্র লিখছি না, নিজের জীবনের ফরেনসিক রিপোর্ট দিচ্ছি। আমার সমস্যাটা শুরু হয়েছিল বইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা একটু বাড়াবাড়ি ধরনের হয়ে যাওয়ার পর। অন্য লোকের প্রেমিকা অভিমান করলে তারা ফুল নিয়ে যায়। আমি বই নিয়ে গেছি।
একবার একজন খুব অভিমান করে বলেছিল, “তোমার কি আমাকে একটুও মনে পড়ে না?”
আমি বললাম, “পড়ে তো।”
সে বলল, “কখন?”
আমি সত্যি কথাই বললাম, “কাল রাতে একটা বইতে একটা লাইন পড়ছিলাম, তখন তোমার কথা মনে হল।”
এখানেই আমার চুপ করা উচিত ছিল। কিন্তু মানুষ নিজের সর্বনাশ সাধারণত একটি বাক্যে করে না।আরেকটা বাক্য যোগ করে। বললাম, “তবে লাইনটা খুব দুঃখের ছিল।”
ব্যস।
তারপর আধঘণ্টা ধরে আমাকে বোঝানো হল, একজন জীবন্ত প্রেমিকার সঙ্গে একজন মৃত লেখকের বইয়ের দুঃখের লাইন মিলিয়ে দেখা সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য আচরণ নয়।
আমি ভেবে দেখলাম, কথাটা মন্দ বলেনি। আসলে মুশকিলটা অন্য জায়গায়, আমার মগজের মানচিত্রে তখন প্রিয়তমার জন্য আলাদা কক্ষ আর পাঠ্যজগতের জন্য পৃথক অন্দরমহল—এমন সুশৃঙ্খল বিভাজন ছিল না। সেখানে সকলেই এক উঠোনে ঘরকন্না করে। দেখা যেত, প্রেমিকা যেখানে বসে আছে, ঠিক তার গা ঘেঁষেই কাফকা দাঁড়িয়ে, বালিশের পাশে জীবনানন্দ ওত পেতে আছেন, আর জানলা দিয়ে মার্কাস অরেলিয়াস তাকিয়ে। একটু তফাতে দস্তয়েভস্কি যথারীতি ভারাক্রান্ত মুখে আসীন। কার সঙ্গে কার মোলাকাত হয়ে যাচ্ছে, তার ওপর আমার বিন্দুমাত্র হাত ছিল না।
প্রেমের প্রথম দিকে অবশ্য এসব ভালোই লাগে। মেয়েরা ভাবে, আহা, ছেলেটা বই পড়ে! কী সুন্দর! অন্য ছেলেরা ক্রিকেট, গাড়ি, শেয়ারবাজার নিয়ে কথা বলে, এ আবার ভার্জিনিয়া উলফ পড়ে।
প্রথম দু-মাস ব্যাপারটা অত্যন্ত রোমান্টিক। ক্যাফেতে বসে আমি বলছি, “দেখো, প্রুস্ত বলছেন স্মৃতি আসলে সরলরেখায় চলে না।” সামনের মানুষটি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। তিন বছর পরে একই বাড়িতে সেই মানুষই বলছে, “প্রুস্তকে দিয়ে বাজারের লিস্টটা করানো যাবে?”
মানুষের রুচি যে সংসারের মধ্যে ঢুকে কত দ্রুত বাস্তববাদী হয়ে ওঠে, এ নিয়ে আলাদা সমাজবিজ্ঞান হওয়া উচিত। প্রেমের সময় বইয়ের তাক বুদ্ধিমত্তার চিহ্ন। বিয়ের পরে সেই তাকই জায়গা নষ্ট করছে। প্রেমের সময় রাত তিনটে পর্যন্ত বই পড়া রহস্যময়। বিয়ের পরে রাত তিনটে পর্যন্ত আলো জ্বালিয়ে বই পড়া বিরক্তিকর। প্রেমের সময় আপনি বললেন, “আমি একটু একা থাকতে ভালোবাসি”, শুনে মনে হল গভীর মানুষ। সংসারে একই কথা বললে প্রশ্ন আসে, “একা থাকতে হলে বিয়ে করলে কেন?”
এই প্রশ্নের উত্তর আজ পর্যন্ত কোনও দার্শনিক সন্তোষজনকভাবে দিতে পারেননি। আসলে যারা খুব পড়ুয়া, তাদের একটা বিপদ আছে। বই শুধু তাদের সময় খায় না, মনও খায়। আপনি পাশে বসে আছেন, কিন্তু পুরোপুরি সেখানে নেই। আপনার এক অংশ হয়তো এখনও সেই বইয়ের ভেতরে হাঁটছে। একটা বাক্য মাথায় আটকে আছে। একটা চরিত্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবছেন। কোনও ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে আজকের পৃথিবীর মিল খুঁজছেন। কিংবা হঠাৎ মনে হয়েছে, শোপেনহাওয়ারের কথাটা ঠিক ছিল কি না।
এই অবস্থায় পাশে বসা মানুষটি যদি বলে, “কী ভাবছ?”
সঠিক উত্তর হবে, “তোমার কথাই ভাবছি।”
কিন্তু পড়ুয়া মানুষের বড় দোষ, মাঝে মাঝে সত্যি বলে ফেলে। সে বলে, “একটা জিনিস ভাবছিলাম। মানুষ নিজের ইচ্ছাকে স্বাধীন ভাবে কেন, যখন তার ইচ্ছাটাই বহু সামাজিক ও জৈবিক শর্তে তৈরি?”
তারপর সংসারে যে নীরবতা নামে, তাকে দার্শনিক নীরবতা বলা চলে না।
আমি দেখেছি, পড়ুয়া পুরুষ সম্পর্কে সমাজের একটা সহনশীলতা আছে। তার ঘরে হাজার বই থাকলে লোকে বলে, “বাহ, ভদ্রলোক খুব জ্ঞানী।” তার স্ত্রী যদি অতিথিদের চা দিতে দিতে বলে, “ও সারাদিন বই নিয়েই থাকে”, অতিথিরাও সস্নেহে হাসে। যেন লোকটার একটা মিষ্টি বদঅভ্যাস আছে। কেউ তাস খেলে, কেউ মাছ ধরে, লোকটা বই পড়ে।
কিন্তু একই দৃশ্য একজন নারীর ক্ষেত্রে একটু বদলে যায়। একটি মেয়ে যদি খুব বেশি পড়ে, খুব বেশি জানে, খুব স্পষ্টভাবে নিজের মত বলতে পারে, বহু পুরুষ প্রথমে আকৃষ্ট হয় বটে, তারপর একটা অদ্ভুত অস্বস্তি শুরু হয়। কারণ আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পুরুষের জ্ঞানকে ক্ষমতা হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত, নারীর জ্ঞানকে অনেক সময় প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখে।
একজন পুরুষ যদি ডিনার টেবিলে কোনও ঐতিহাসিক তথ্য সংশোধন করে, বলা হয়, “ও এসব খুব জানে।” একজন নারী করলে ঘরে কেউ কেউ ভাবতে শুরু করে, “সবকিছুতেই কথা বলতে হবে?” অথচ সে হয়তো শুধু তথ্যটা ঠিক করেছে। তবু বহু পুরুষের আত্মসম্মান এমন নাজুক কাচের বাসন যে সামান্য তথ্য সংশোধনেই টুং করে শব্দ হয়।
আমি এমন পুরুষ দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা প্রেমিকা থাকলে বন্ধুদের সামনে গর্ব করে পরিচয় করায়। কিন্তু সেই প্রেমিকা যদি তার যুক্তির ভুল ধরে, মুখের চেহারা দেখে মনে হয় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে। প্রেমে জ্ঞানী নারী অলংকার। সংসারে সেই জ্ঞান যদি সমান অধিকার দাবি করে, তখন সমস্যা।
আমাদের সমাজ বহুদিন ধরে ছেলেদের একটা গোপন প্রশিক্ষণ দিয়েছে। স্ত্রী সুন্দরী হলে গর্ব করো। শিক্ষিতা হলে গর্ব করো। চাকরি করলে গর্ব করো। কিন্তু ঘরে ফিরে যেন শেষ কথাটা তোমারই থাকে।
মুশকিল হল, সত্যিকারের পড়ুয়া মানুষ, বিশেষ করে সত্যিকারের পড়ুয়া নারী, এই শেষ কথার নিয়মটা খুব একটা মানতে চায় না। কারণ বই পড়ার একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। আপনি প্রশ্ন করতে শেখেন।
“কেন?”
“কে বলেছে?”
“এর প্রমাণ কী?”
“এই নিয়মটা কে বানিয়েছে?”
“শুধু এতদিন ধরে চলছে বলেই কি ঠিক?”
এগুলো প্রেমের প্রথম মাসে দারুণ আকর্ষণীয় প্রশ্ন।
বিয়ের দশম বছরে রাত সাড়ে এগারোটায় যদি স্বামী বলে, “আমাদের বাড়িতে সবসময় এভাবেই হয়েছে”, আর স্ত্রী জিজ্ঞেস করে, “তাতে কী প্রমাণ হয়?”, তখন উপনিষদীয় আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আরও একটা ব্যাপার আছে। বেশি বই পড়লে মানুষের প্রত্যাশাও বদলায়। সব ক্ষেত্রে নয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই। আপনি অনেক জীবন দেখে ফেলেন। নিজে না বেঁচেও।
আন্না কারেনিনার সঙ্গে ট্রেনে উঠেছেন, এমা বোভারির ভুল দেখেছেন, এলিজাবেথ বেনেটের অহংকার দেখেছেন, মিসেস ড্যালোয়ের নিঃসঙ্গতা দেখেছেন, টলস্টয়ের সংসার দেখেছেন, কাফকার আতঙ্ক দেখেছেন, চেখভের বিবাহিত মানুষদের দেখেছেন।
ফলে নিজের জীবনে কোনও নাটক ঘটলে আপনার মাথায় একটা ভয়ঙ্কর লাইব্রেরি খুলে যায়। অন্য মানুষ ভাবছে, “আজকে আমাদের একটু ঝগড়া হয়েছে।” আপনি মনে মনে ভাবছেন, “এই আবেগের গঠনটা তো ইবসেনের নাটকের মতো!”
এ অবস্থায় প্রেম করা সহজ নয়। আপনি সম্পর্কের ভেতরেও ফুটনোট দেখতে শুরু করেন। একদিন আমার একজন বলেছিল, “তুমি সবকিছু এত বিশ্লেষণ করো কেন?”
আমি বললাম, “জানি না।”
সে বলল, “এই ‘জানি না’-টাও তুমি বিশ্লেষণ করবে এখন।”
সত্যি বলতে কী, তখনই আমার বুঝে যাওয়া উচিত ছিল সম্পর্কটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো নয়।
পড়ুয়া মানুষের আরেক বিপদ, তার নির্জনতা লাগে। এটা প্রেমিক-প্রেমিকার পক্ষে প্রথমে খুব বোঝা কঠিন। মানুষ ভাবে, ভালোবাসলে তো সব সময় আমার সঙ্গে থাকতে চাইবে। কিন্তু বইপোকা মানুষ আপনাকে গভীরভাবে ভালোবেসেও মাঝে মাঝে একা ঘরে দরজা বন্ধ করে বসতে চাইবে।
আপনার সঙ্গে ঝগড়া হয়নি। মন খারাপও নেই। অন্য কোনও নারী বা পুরুষের কথাও ভাবছে না। সে শুধু চার ঘণ্টা ধরে একটা বই পড়তে চায়। এই “শুধু” শব্দটাই সংসারে অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ চার ঘণ্টা বই পড়াকে যে মানুষ চার ঘণ্টা নিঃসঙ্গ আনন্দ বলে জানে, তার সঙ্গী অনেক সময় সেটাকে চার ঘণ্টা অবহেলা বলে অনুভব করে। দুজনেই নিজের জায়গা থেকে ঠিক। আর প্রেমের বহু ট্র্যাজেডির মতো এখানেও ভিলেন খুঁজে পাওয়া কঠিন।
আমার তো মনে হয়, বইপড়ুয়া মানুষের সঙ্গে সংসার করতে হলে বইকে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে মেনে নিতে হয়। স্বামী, স্ত্রী এবং বই।
কখনও বই আগে ঘুমোবে। কখনও স্ত্রী। কখনও স্বামী। বিছানার মধ্যে পড়ে থাকা খোলা বই দেখে তাকে সরিয়ে জায়গা করতে হবে। কোনও কোনও রাতে মানুষটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বুঝবেন তার চোখ আপনার দিকে, কিন্তু মগজে অন্য কোথাও একটা বাক্য চলছে।
আবার এমনও হবে, একদিন আপনি ভেঙে পড়েছেন, সেই পড়ুয়া মানুষটাই কোনও বই থেকে শেখা ভাষা নয়, বরং বহু মানুষের দুঃখ পড়তে পড়তে তৈরি হওয়া একটা গভীর সহমর্মিতা দিয়ে আপনার পাশে বসে থাকবে।
এই জায়গাটাও বলা দরকার। বই মানুষকে শুধু বিচ্ছিন্ন করে না। বই আরও সহনশীল করে, আরও কৌতূহলী করে, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে শেখায়। সমস্যা বই নয়। সমস্যা হয় যখন বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভাষা আর সম্পর্কের মানুষের ভাষা একে অন্যের কাছে অনুবাদ হয় না।
আমি পাঁচ ঘণ্টা বই পড়লাম। আমার কাছে সেটা জীবনের প্রয়োজন। অন্যজনের কাছে তার অর্থ হতে পারে, আমি পাঁচ ঘণ্টা তাকে সময় দিইনি। এই দুই অর্থের মধ্যে যে ফাঁক, সেখানে অনেক সম্পর্ক পড়ে গিয়ে পা ভাঙে।
আর পড়ুয়া মেয়েদের ক্ষেত্রে এই ফাঁক আরও জটিল। কারণ সে শুধু নিজের সময় চাইছে না, নিজের মানসিক স্বাধীনতাও চাইছে। তার নিজের লেখক আছে, নিজের ভাবনা আছে, নিজের বৌদ্ধিক জগৎ আছে। সে স্বামীর মতামত ধার করে নিজের মতামত বানাবে না। সে হয়তো বলবে,
“তুমি যাকে খুব ভালো বই বলছ, আমার একেবারেই ভালো লাগেনি।” অনেক পুরুষ এরকম একটি বাক্য শুনে এমনভাবে আহত হয় যেন স্ত্রী বইয়ের সমালোচনা করেনি, শ্বশুরবংশের ওপর আক্রমণ করেছে।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, বুদ্ধিমতী নারীদের পুরুষেরা ভয় পায় কেন? তার একটা কারণ সম্ভবত নিয়ন্ত্রণের সমস্যা। যে মানুষ প্রশ্ন করে, তাকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। যে পড়েছে, সে জানে পৃথিবীতে জীবনযাপনের বহু মডেল আছে। সে জানে, “সব মেয়েকেই এটা করতে হয়” কথাটা প্রায়ই মিথ্যা। সে জানে, ইতিহাসের অধিকাংশ সামাজিক নিয়ম ঈশ্বর আকাশ থেকে ফ্যাক্স করেননি, মানুষই বানিয়েছে। মানুষ বানালে মানুষ বদলাতেও পারে।
এই জ্ঞান সংসারের পক্ষে বিপজ্জনক নয়, কিন্তু কর্তৃত্বের পক্ষে মাঝে মাঝে বিপজ্জনক। তাই জ্ঞানী নারীকে ভালো লাগে দূর থেকে। তার লেখা পড়া যায়। তার বক্তৃতা শোনা যায়। তার সঙ্গে কফি খেয়ে ছবি তুলে পোস্টও দেওয়া যায়।
কিন্তু প্রতিদিন সকালে উঠে সেই মানুষটির সঙ্গে একই বাড়িতে ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়া, সিদ্ধান্ত ভাগ করে নেওয়া, ভুল স্বীকার করা, যুক্তিতে হেরে যাওয়া, আবার সন্ধ্যায় একসঙ্গে ডাল খাওয়া, এই শিক্ষাটা আমাদের বহু পুরুষ এখনও পুরো শেখেনি।
এই জন্যই বলি, পড়ুয়া মেয়েদের ব্যাপারে ছেলেরা একশো হাত দূরে থাকে কথাটা পুরো ঠাট্টা হলেও ঠাট্টার নিচে একটু ইতিহাস পড়ে আছে।
আমাদের এই বাংলা সাহিত্যের দিকে একটু নজর দিলেই স্পষ্ট হবে, শিক্ষিতা নারীদের নিয়ে কী গভীর এক ভয়ের সংস্কৃতি আমরা লালন করি!
সেখানে মেয়েদের পড়ার পরিধি বাড়লে মগজে অবাধ্যতার বীজ জন্মাবে, এটাই অলিখিত নিয়ম। উপন্যাস পাঠে নাকি চরিত্রের বিনাশ ঘটে, এমন এক আদিম আতঙ্ক আজও ঘরে ঘরে খেলা করে। চিঠিপত্র লেখার হাত থাকলেই ধরে নেওয়া হয় সে কেবল নিষিদ্ধ প্রেমের খসড়া তৈরি করবে। আর বিলিতি ভাষা শিখলে তো কথাই নেই—স্বামীর আধিপত্যকে অগ্রাহ্য করাই যেন তার একমাত্র গন্তব্য হয়ে ওঠে।
এখনকার সমাজে অবশ্য সেই সাবেক বুলিগুলো সরাসরি শোনা যায় না। পরিবর্তিত এই আধুনিকতায় অত্যন্ত সুকৌশলে নতুন লেবেল সেঁটে দেওয়া হয়, “মেয়েটি বড্ড বেশি ওপিনিয়নেটেড।” শব্দবন্ধের খোলসটুকু বদলেছে ঠিকই, কিন্তু অন্দরমহলে সেই চিরচেনা অস্বস্তি আজও অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
তবে সব দায় মেয়েদের ওপর চাপালে ভুল হবে, পড়ুয়া পুরুষরাও কিন্তু খুব একটা নিরীহ গোছের জীব নন। তাদেরও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠার অজস্র পথ ও পাথেয় মজুত আছে। এমন অনেককেই চিনি, যারা অতি তুচ্ছ কথোপকথনকেও মুহূর্তে একটি জ্ঞানগর্ভ সেমিনারে রূপান্তরিত করতে সিদ্ধহস্ত।
হয়তো স্ত্রী ক্লান্ত গলায় বললেন, “আজ মাথাটা বড্ড যন্ত্রণা করছে।”
অমনি তিনি শুরু করলেন, “আসলে পেইন পারসেপশনের এই মনস্তাত্ত্বিক দিকটি কিন্তু অত্যন্ত আকর্ষণীয়...”
এই জাতীয় মানুষকে যদি সমাজ সংসার থেকে চিরতরে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়, আমি অন্তত আদালতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাব না। আবার অনেক পড়ুয়া পুরুষ বইকে স্রেফ একধরনের সামাজিক ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে প্রয়োগ করেন।
তাদের প্রতিটি বাক্যের ফুটনোটে কোনও না কোনও বিখ্যাত লেখকের নাম ওত পেতে থাকে।
“নিটশে এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন...”
“মিশেল ফুকো থাকলে হয়তো বলতেন...”
“কিয়ের্কেগার্ডের দর্শনের জানলা দিয়ে যদি দেখি...”
অথচ অভাগী স্ত্রী হয়তো কেবল এটুকু জানতে চেয়েছিলেন যে, পরদিন সন্তানকে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব কার।
সেই নিতান্ত ঘরোয়া প্রশ্নে কিয়ের্কেগার্ডের অস্তিত্ব যে কতটা অপ্রাসঙ্গিক, তা ওই পাঠমগ্ন মানুষের মগজে ঢোকে না। আমি নিজেও এই একই অপরাধে অসংখ্যবার অপরাধী হয়েছি বলে মনে মনে সন্দেহ করি।
বইপড়ুয়া মানুষের এক অদ্ভুত ব্যাধি আছে—যা সে জেনেছে, তা অন্যের ওপর উগরে দেওয়ার এক তীব্র তাড়না। ব্যাপারটা অনেকটা নতুন হারমোনিয়াম হাতে পাওয়া সেই অবুঝ বালকের মতো। পার্শ্ববর্তী শ্রোতা গান শুনতে উৎসুক কি না, সেই হিতাহিত জ্ঞানটুকু তখন লোপ পায়। যন্ত্র যখন হাতে আছে, তখন সুরের নামে অত্যাচার চলতেই থাকবে।
আবার অনেক পাঠক একপ্রকার গূঢ় বৌদ্ধিক অহংকারের ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে থাকেন। ভাবেন, যার পাঠ্যাভ্যাস কম, সে বুঝি মানুষ হিসেবেও কিছুটা অপূর্ণ। এই মানসিকতাটি অত্যন্ত কদর্য একটি বদঅভ্যাস ছাড়া আর কিছুই নয়।
আমি আমার এই দীর্ঘ যাপনে এমন অনেক মানুষকে দেখেছি, যারা কোনওদিন দর্শনের বারান্দা দিয়েও হাঁটেননি, অথচ মানুষের গভীর যন্ত্রণা অবলীলায় এমনভাবে উপলব্ধি করেন, যা নিয়ে দশখানা গবেষণাপত্র অনায়াসেই লিখে ফেলা সম্ভব।
আবার এমন বহু ‘জ্ঞানী’র মোলাকাত পেয়েছি, যাদের পুরো লাইব্রেরি হয়তো নখদর্পণে, কিন্তু পাশের মানুষের চোখের জল মোছার ন্যূনতম সংবেদনশীলতা নেই।
বই হয়তো তথ্যের জোগান দেয়, সমৃদ্ধ করে, কিন্তু সার্থক মানুষ হয়ে ওঠাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কঠিন পরীক্ষা। সেই জীবন-যুদ্ধে কেবল পাণ্ডিত্যপূর্ণ ফুটনোট দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব নয়।
আমার জীবনের প্রেমগুলো কেন বারে বারে মুখ থুবড়ে পড়েছে, তার হিসেব মেলাতে বসে কেবল বইকেই কাঠগড়ায় তোলাটা অনুচিত হবে। আসল দোষটি তো আমার নিজের চারিত্রিক গঠনের মধ্যেই নিহিত ছিল। বইয়ের জন্য বরাদ্দ সময়ের হিসেবে আমি দরাজ হলেও, রক্তমাংসের মানুষের জন্য নির্দিষ্ট সময়টুকু দেওয়ার পাটিগণিতে আমি বড্ড কাঁচা ছিলাম।
সঙ্গীর কথা মন দিয়ে শোনার বদলে প্রায়শই আমি নিজের মগজের ভেতরে চলতে থাকা অজস্র সংলাপে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়তাম। কখনও অবাস্তবভাবে ভেবে নিয়েছি যে, আমার এই নির্জনতার প্রয়োজনটুকু অন্যজন বিনাবাক্যে বুঝে নেবে। আমি নিজে থেকে পরিষ্কার করে কিছুই বুঝিয়ে বলিনি। আবার কখনও ভুলভাবে ধরে নিয়েছি, যে আমায় ভালোবাসবে, সে সমান্তরালভাবে আমার এই স্থবির বইয়ের জগতটাকেও আপন করে নেবে। আসলে এটিও ছিল একপ্রকার চূড়ান্ত অবিবেচক ও অন্যায় প্রত্যাশা।
আপনি একজন মানুষকে ভালোবাসলেন বলে তার তিন হাজার বই, রাতজাগা পড়া, রবিবারের বইয়ের দোকান, বিছানায় বই, সোফায় বই, ডাইনিং টেবিলে বই, গাড়িতে বই, বাথরুমে বই, আর প্রতি মাসে “এটাই শেষ বই কিনলাম” বলে আরও সাতাশটা বই কেনার অপরাধও ভালোবাসতেই হবে, এমন কোনও বৈবাহিক আইন নেই।
আমার অন্দরমহলে বইয়ের মিছিল যখন ক্রমশ দীর্ঘ হতে হতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাল, যেখানে নতুন আগন্তুকদের জন্য ইঞ্চিখানেক জমিও অবশিষ্ট নেই, তখন অবধারিতভাবেই প্রশ্ন উঠল—এদের ঠাঁই হবে কোথায়?
আমি বরাবরের মতোই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতাম, “ঠিক ব্যবস্থা হয়ে যাবে।” বইয়ের ওপর আমার এই অগাধ আস্থা জগতের আর কারও মধ্যে সঞ্চারিত করা যায়নি। পরিবারের বাকিদের ধৈর্য যখন শেষ সীমায়, তখন একদিন একজন চরম বিরক্তির সুরে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “এই অরণ্যে শেষ পর্যন্ত মানুষ থাকবে, নাকি শুধু বই-ই রাজত্ব করবে?” আমি নীরব ছিলাম। জানতাম, ওটা উত্তরের প্রত্যাশায় করা কোনও প্রশ্ন নয়, বরং একপ্রকার আলঙ্কারিক ক্ষোভ। তাছাড়া সেই মুহূর্তে সত্য কথাটি বলতে যাওয়া সম্পর্কের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থার পক্ষে মোটেও হিতকর হত না।
বইপাগলদের বিরুদ্ধে একটা চিরকালীন নালিশ আছে—তারা উৎসব-পার্বণেও বই উপহার দেয়। এই অপরাধ অবশ্য তারা অত্যন্ত পবিত্র আবেগ থেকেই করে থাকে। নিজের ভুবনে বইয়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনও সম্পদ তাদের জানা নেই, তাই সেই শ্রেষ্ঠত্বকেই তারা প্রিয়জনের হাতে তুলে দিতে চায়। কিন্তু মুশকিল হল, সকলের অভিধানে ‘বই’ আর ‘প্রেমপত্র’ সমার্থক নয়।
কারও কাছে দামি সুগন্ধির শিশিই অনুরাগের ভাষা। কেউ হয়তো গয়নার উজ্জ্বলতায় প্রেম খোঁজে। কারও কাছে একটু নিরিবিলিতে ঘুরে আসাটাই সার্থকতা। আবার কারও দাবি হতে পারে কেবল একান্তে বসে দু-দণ্ড আলাপ করা।
আপনি সঙ্গীর মনের গতিপ্রকৃতি উপেক্ষা করে তার হাতে চারশো পাতার একটি গূঢ় রুশ উপন্যাস গুঁজে দিয়ে যদি আশা করেন যে, দস্তয়েভস্কির জটিলতার মধ্যেই সে আপনার হৃদয়ের গভীরতা আবিষ্কার করবে, তবে পরদিন আপনার ফোনে তার নির্লিপ্তির জন্য বইটিকে দায়ী করা সাজে না।
বই নিয়ে আমার এই রোমান্টিকতা মাঝে মাঝে মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। আমার মনে হয়, প্রিয় মানুষের সঙ্গে পাঠ্যজগত নিয়ে নিবিড় সংলাপ গড়ে তুলতে পারাই হল সখ্যের এক চূড়ান্ত রূপ। সে কোন লেখককে দু-চোখে দেখতে পারে না, সেই তথ্যটুকুও আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। আমাদের রুচি যে অক্ষরে অক্ষরে মিলতেই হবে, এমন কোনও দায়বদ্ধতা নেই। বরং বিতর্ক হোক। সে সজোরে বলুক, “তোমার এই পছন্দের লেখকটি কী যে অসহ্য!” আমি পাল্টা আক্রমণে বলি, “আসল সৌন্দর্যটাই তো তুমি ধরতে পারলে না।” তার বিদ্রুপের হাসি ঝরে পড়ুক, “তুমি বুঝি জগতের সব সৌন্দর্য একা চিনে বসে আছ!”
এই সংঘাতের মধ্যেও তো একধরনের মাধুর্য থাকে। কিন্তু বিপত্তি তখনই ঘটে, যখন একজনের অস্তিত্বের কেন্দ্রে থাকে বই, আর অন্যজনের কাছে তা কেবল অবসরের ধুলোবালিমাখা বিনোদন। তখন প্রতিদিনের ছকে বাঁধা যাপনে ছোট ছোট ফাটলগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে।
“ছুটির দুপুরে কোথায় যাওয়া যায়?” একজন হয়তো সাগরের গর্জনে মন বসাতে চায়। অন্যজন ব্যস্ত হয়ে বলে, বরং এমন এক প্রাচীন শহরের অলিগলিতে যাই, যেখানে কোনো ধুলোমাখা পুরোনো বইয়ের দোকান পাওয়া যাবে। “শনিবারের সন্ধ্যাটা কীভাবে কাটবে?” একজন বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় মাততে চায়। অন্যজন অনুরোধ করে, কোথাও না গিয়ে ঘরেই বসা যাক, হাতের এই অসম্পূর্ণ বইটি শেষ করা দরকার। “আলোটা নেভাব? ঘুমোবে না?” “আর কয়েকটা পাতা বাকি, এই অধ্যায়টুকু শেষ করে নিই।” ঘণ্টাখানেক গড়িয়ে যাওয়ার পর উত্তর আসে, “এই পরিচ্ছেদটা একটু বেশিই বড় ছিল।” সংসার নামের জটিল সমীকরণটি এই ছোট ছোট অবহেলাতেই জীর্ণ হতে শুরু করে।
তাই আমার মনে হয়, কোনও পড়ুয়া মানুষের সঙ্গে প্রণয়-ডোরে আবদ্ধ হওয়ার আগে একটি বিশেষ বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ থাকা একান্ত প্রয়োজন। ঠিক যেমনটা আমরা সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে দেখে থাকি।
সতর্কীকরণ: এই ব্যক্তি কথোপকথনের মাঝখানে বইয়ের দোকানে ঢুকে যেতে পারে। রাত দুইটায় আলো জ্বালিয়ে পড়তে পারে। বেড়াতে গিয়ে স্থানীয় লাইব্রেরি দেখতে চাইতে পারে। আপনার সঙ্গে ঝগড়ার পরেও বই পড়তে পারবে, যা দেখে আপনার মনে হতে পারে তার কোনও কষ্টই হয়নি। আসলে হয়েছে, কিন্তু কষ্টের মধ্যেও সে পড়তে পারে।
আর পড়ুয়া মেয়ের জন্য আলাদা সতর্কীকরণ দরকার।
এই নারী আপনার প্রতিটি বক্তব্যে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আপনার ভুল তথ্য সংশোধন করতে পারে। নিজের ঘর, সময়, কাজ, মতামত ও একাকিত্ব চাইতে পারে। মাঝে মাঝে আপনার চেয়ে বেশি জানতেও পারে। এই পরিস্থিতিতে পুরুষত্বের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে নিজের চিকিৎসা নিজ দায়িত্বে করুন।
এখন প্রশ্ন হল, তাহলে পড়ুয়া মানুষের প্রেম বা সংসার হয় কীভাবে? হয়। খুব সুন্দরভাবেই হয়।
আসলে সেখানে একটি সত্যকে মেনে নিতেই হয় যে, প্রেম মানেই সব কৌতূহলকে এক সুতোয় গাঁথা নয়। কারও কাছে পাঁচ ঘণ্টা বইয়ের পাতা ওল্টানো জরুরি হতে পারে, অন্যজনের কাছে সুরের জগতে ডুবে থাকা। কেউ হয়তো দর্শনের গোলকধাঁধায় ঘোরে, কেউ আবার রান্নাঘরের শিল্পকলায় মগ্ন। ইতিহাসের ধুলো ঝাড়া আর বাগানের পরিচর্যা—দুটিই সমান্তরাল যাপন হতে পারে। ভালোবাসার সার্থকতা এতে নয় যে, দুজনেই একই পৃষ্ঠায় বুকমার্ক গুঁজে রেখেছে কি না। আসল পরীক্ষা হল, সঙ্গীর নিভৃত আনন্দের আঙিনাকে অন্যজন মর্যাদা দিতে পারল কি না।
“আমার পাঠ্যজগত তোমাকে বুঝতেই হবে”—এমন দাবি আদতে একপ্রকার অবিচার। আবার, “তুমি বই পড়ো” বলে বিদ্রুপ করাটাও সম্পর্কের স্বাস্থ্যের পক্ষে মোটেও শুভ নয়।
বিপরীত মেরুর কথাটাও মনে রাখা দরকার। বই না পড়লে মানুষ অগভীর হয়ে যায়—এই অহংকার যেমন ভ্রান্ত, তেমনই পড়ুয়া হওয়ার দোহাই দিয়ে সংসারের দায় এড়ানোটাও চরম মূর্খামি। বইপাগল মানুষকে শেষমেশ ওই মলাট বন্ধ করার কঠিন পাঠটি নিতেই হয়। এ এক অদ্ভুত জটিল শিক্ষা। ছাপানো হরফের জীবনকে সাময়িক বিদায় জানিয়ে বাস্তবের রক্তমাংসের মানুষের দিকে ফিরতে হয়।
কেউ কথা বলছে—মন দিয়ে শুনতে হয়। কেউ প্রতীক্ষায় আছে—তার কাছে পৌঁছাতে হয়। প্রিয়জন ব্যথিত হলে দস্তয়েভস্কিকে উল্টো করে নামিয়ে রেখে তার পাশে গিয়ে বসতে হয়। কেননা বই অনন্তকাল অপেক্ষা করতে জানে। মানুষের সেই অসীম ধৈর্য সবসময় থাকে না।
এই সাধারণ বোধটুকু আমার মগজে ঢুকতে বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গেছে। বই কখনও অভিমান করে সংসার ত্যাগ করেনি। অর্ধেক বছর তাকে স্পর্শ না করলেও সে শেলফে ঠিক আগের মতোই অবিচল থেকেছে। নিশুতি রাতে তাকে টেনে নিলেও সে অনুযোগ করেনি যে, “এতক্ষণ কোথায় ছিলে?” যেখানে থেমেছিলাম, ঠিক সেখান থেকেই সে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
মানুষের হৃদয় অতটা প্রশ্বস্ত নয়। হওয়াটাও হয়তো অস্বাভাবিক। মানুষের সময়টুকু ফুরিয়ে যায়, তার মান-অভিমান, ক্লান্তি আর শরীরের দাবি থাকে। বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব আসলে এক পাক্ষিক নিরাপদ আশ্রয়ের মতো। কিন্তু মানুষের সঙ্গে ঘর করতে গেলে ফিরতি দাবির মুখোমুখি হতে হয়।
বোধহয় এই বাস্তবতার অলিগলিতেই আমার মতো পাঠকরা পথ হারায়। আমরা ভাবি, মনের গভীরে অনুরাগ থাকলেই বুঝি দিন কেটে যাবে। অথচ ভালোবাসারও একটা নিজস্ব ব্যাকরণ আর প্রায়োগিক দিক থাকে।
সময়মতো ফোন করা, সঙ্গ দেওয়া, কথা শোনা—এগুলোও জরুরি। একই গল্প বারবার শুনেও ক্লান্তিহীনতার অভিনয়টুকু করতে হয়। মাঝে মাঝে ওই প্রিয় জগতের দরজা বন্ধ রাখা শিখতে হয়।
এমনকী রবিবাসরীয় বিকেলে বইয়ের বিপণিকে উপেক্ষা করে হেঁটে চলে যাওয়ার অভ্যাস করতে হয়। শেষোক্ত এই বিদ্যায় আমি আজও কাঁচা রয়ে গেলাম। এই কারণেই বোধহয় বইয়ের ভিড়ে আমার প্রেমগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে, আর সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর বইগুলোই আজও রাজত্ব করছে। জীবনের এই পাটিগণিত বড়ই বিচিত্র।
একদিন যে মানুষটি চরম বিরক্তিতে বলেছিল, “তুমি তোমার ওই কাগজের স্তূপ নিয়েই থাকো”, সে আজ আর আমার জীবনে নেই। অথচ আশ্চর্য, সেই তাকভর্তি মলাটগুলো আজও ঠিক আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। বইয়ের পাহাড়ের বুক থেকে তারা যেন মাঝে মাঝে আমায় উপহাস করে বলতে চায়, “কী হে, শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলাম তো আমরাই!”
আমি তখন তাদের এই নীরব আস্ফালন দেখে মনে মনে উত্তর দিই, “বেশি আহ্লাদে আটখানা হওয়ার কিছু নেই। আমার এই নিঃসঙ্গতার প্রধান আসামি তো তোরাই।” বইগুলো অবশ্য কোনও পাল্টা জবাব দেয় না। এই শব্দহীনতাই তাদের মস্ত বড় গুণ—যেখানে তর্কের অবকাশ নেই।
আর ঠিক এখানেই বোধহয় রক্তমাংসের মানুষের সঙ্গে জড় জগতের বড় বেশি অমিল রয়ে গেল।



