রবিবার কেন আমার প্রিয় গল্প
এই গল্পটা পড়তে গেলে মনে হয় আপনি দু’জন ভীষণ বুদ্ধিমান, ভীষণ বেয়াদব, ভীষণ জীবিত মানুষের আলাপ শুনছেন।
রবিবার আমার প্রিয় গল্প। এই গল্পটা পড়তে গেলে মনে হয় আপনি দু’জন ভীষণ বুদ্ধিমান, ভীষণ বেয়াদব, ভীষণ জীবিত মানুষের আলাপ শুনছেন। রবীন্দ্রনাথ এখানে গল্প বলেননি, একটা দীর্ঘ কথোপকথনের ফাঁদ পেতেছেন। সেই ফাঁদে একবার পা পড়লে আর বেরোনো মুশকিল। অভীক আর বিভা। এই দু’জন মানুষ গল্পের চরিত্র না হয়ে একসময় দাঁড়িয়ে যায় চিন্তার দুই প্রান্তে। অভীক একটু বেশি কথা বলে, একটু বেশি জানে, একটু বেশি ব্যঙ্গ করে, একটু বেশি নির্দয়। বিভা তুলনায় সংযত, কিন্তু নির্বোধ নয়। বরং এই গল্পের সবচেয়ে বিপজ্জনক চরিত্র সে-ই। কারণ সে চুপ করে থাকে, আর চুপ থাকা মানুষের ভিতরে সবসময় একটা বিস্ফোরক জমে।
অভীক বলছে, ...’এ তোমার কী রকম কথা হল। শ্রদ্ধার ব্যক্তিগত বিশেষত্ব নেই? জাতকে-জাত যেখানে যাকেই দেখব শ্রদ্ধা করে করে বেড়াব? মাল যাচাই নেই, একেবারে wholesale শ্রদ্ধা ? একে বলে protection ব্যবসাদারিতে বাইরে থেকে কৃত্রিম মাসুল চাপিয়ে দর-বাড়ানো।’
অভীকের শ্রদ্ধা-বিষয়ক তর্কটা পড়লেই বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ এখানে সভ্যতার একটা বড় ভণ্ডামিকে ধরে ফেলেছেন। ‘wholesale শ্রদ্ধা’ রসিকতাটা সাংস্কৃতিক রোগের নাম। যাকে দেখলেই শ্রদ্ধা করতে হবে, যাচাই নেই, বিচার নেই, প্রশ্ন নেই। শ্রদ্ধা এখানে সামাজিক টোল ট্যাক্স। অভীক যেটাকে ‘protection ব্যবসা’ বলছে, সেটা আসলে সংস্কৃতির আন্ডারগ্রাউন্ড ইকোনমি।
এই গল্পে একটা আশ্চর্য ব্যাপার আছে। প্রায় প্রত্যেকটা সংলাপ আলাদা করে কোট করার মতো। কারণ এখানে গল্প এগোয় না ঘটনা দিয়ে, এগোয় বাক্য দিয়ে। “অপরাধ অত্যন্ত প্রত্যক্ষ না হলে সমাজ নিজের গরজে তাকে পাশ কাটিয়ে যায়”—এই একটা লাইন দিয়েই সমাজতত্ত্বের অর্ধেক বই তুলে রাখা যায়। আবার “আর্টের প্রমাণ রুচির পথে”—এই কথাটা পড়লে আজকের কালচারাল প্যানেল ডিসকাশনের উপর অল্প একটু করুণা জন্মায়।
অভীক যখন ঐশ্বর্য নিয়ে কথা বলে, তখন সে আসলে ভোগের দর্শনকে চিরে ফেলছে। ক্রাইসলারের গাড়ি বনাম মানুষের মর্যাদা; এই দ্বন্দ্বটা আজও একচুল নড়েনি। বরং গাড়ির মডেল বদলেছে, মানুষ আরও ছোট হয়েছে। ‘মডার্ণ কালটাই খেলো’; এই অভিযোগটা আজ পড়লে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ যেন আগাম সাবস্ক্রিপশন নিয়ে ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন। নন্দীভৃঙ্গীর হাতে আয়না; এই ইমেজটা আজকের আত্মব্যঙ্গী সভ্যতার জন্য একেবারে পারফেক্ট।
বিভার রূপবর্ণনায় রবীন্দ্রনাথ যা করেন, সেটা প্রায় নিষ্ঠুর। রূপ নয়, লাবণ্য। ব্যাখ্যা করা যায় না, কিন্তু কাজ করে। এই সৌন্দর্য বাজারের নয়, ‘ইতরজনের মিষ্টান্ন নয়’। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির সঙ্গে তুলনা করে যে সৌন্দর্যকে ‘inscrutable’ বলা হয়, সেটা আসলে একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক কামনা। সব সৌন্দর্য ভোগের জন্য নয়, কিছু সৌন্দর্য বোঝার জন্য।
অভীকের নারীবিষয়ক স্বীকারোক্তিগুলো আজ পড়লে কেমন যেন লাগে, কিন্তু সেই অস্বস্তিটাই গল্পের শক্তি। “আমরা চাই মেয়েদের মাধুর্য, ওরা চায় পুরুষের ঐশ্বর্য”—এই বাক্যটা নির্মম পর্যবেক্ষণ। রবীন্দ্রনাথ এখানে অ্যানাটমিস্ট। তিনি সমাজটাকে কেটে দেখাচ্ছেন।
ভগবান সাম্যবাদী হলে কী হত—এই অভীকের পাগলামি আসলে দারুণ সিরিয়াস প্রশ্ন। অসমতা কি কেবল সমাজের সৃষ্টি, না প্রকৃতিরও একটা ভূমিকা আছে? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই, কিন্তু প্রশ্নটা করার সাহসটাই সাহিত্য।
আর বিভার কথাগুলো। খুব সাধারণ, খুব চুপচাপ। ভাগ্য, ঈর্ষা, খোঁচা লাগা—এই স্বীকারোক্তিগুলোতে কোনো নাটক নেই। কিন্তু এখানেই রবিবার আলাদা। এখানে প্রেম মানে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করার ঝুঁকি।
এই সব মিলিয়ে রবিবার আমার প্রিয় গল্প, কারণ এখানে রবীন্দ্রনাথ এক অসহ্য বুদ্ধিমান কথোপকথনকারী হয়ে উঠেছেন। যিনি কাউকে খুশি করার দায় নেননি। যিনি জানতেন, কিছু গল্প পড়ে ভালো লাগার জন্য নয়, কিছু গল্প পড়ে অস্বস্তিতে থাকার জন্য। রবিবার সেই রকমই এক গল্প।



