সম্পর্কের গোড়ার দিকে যৌনতার একটা বিরাট সুবিধে থাকে: তখন যৌনতা নিজেই নিজের বিজ্ঞাপন।
দুজন মানুষ যখন মহাকাশচারীর মতো একে অপরের শরীরি মানচিত্র প্রথমবার পড়ছে, তখন প্রতিটি তিল কিংবা হাসির ভাঁজ এক-একটি রোমাঞ্চকর আবিষ্কার। কার ঘাড়ে কী আদিম ঘ্রাণ লুকানো আছে, কার ওষ্ঠের ছোঁয়ায় অসময়ের ব্যস্ততা, আর কার হাত শুরুর দিকে সুবোধ বালকের মতো থেকে আচমকা সমস্ত শাসনতন্ত্র পাল্টে দেয়—সবই তখন অনাস্বাদিত। এই অধ্যায়ে কামনার জন্য কোনো পৃথক লজিস্টিক সাপোর্টের প্রয়োজন হয় না। বিকেলের কফিতে চুমুক দিতে দিতেই হয়তো রাতের চিত্রনাট্য নতুন করে লেখা হয়ে যায়। সিনেমা হলের অন্ধকারে বসে পরিচালক তাঁর নান্দনিক সৃজনের চেয়ে দর্শকদের উদাসীনতাতেই বেশি আপ্লুত হতে পারেন। সেই সময়ে একটি গভীর আলিঙ্গন বা দীর্ঘ চুমু আসলে কোনো ট্রেলার নয়, বরং সেটিই মূল সিনেমা। পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর জন্য তখন কোনো আগাম নোটিশ লাগে না; শরীর নিজেই নিজের পরবর্তী পরিচ্ছেদগুলো সাবলীলভাবে অনুবাদ করে নেয়।
এই পর্যায়ে প্রত্যাখ্যানের ভয়ও তুলনামূলক কম।
এই পর্যায়ে দু’জনের মনেই এই নব্য ভূখণ্ড উন্মোচনের ব্যাকুলতা থাকে। ফলে ‘আজ কি তবে?’—এই জিগ্যেসটা হাওয়ায় ভাসানোর আগেই উত্তর মিলে যায়। আর কখনও যদি তা শব্দে অনুবাদ করতেও হয়, তার ভেতরে কোনো প্রশাসনিক দপ্তরের ফাইল জমা দেওয়ার দুশ্চিন্তা বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আদিম কোনো শঙ্কা কাজ করে না।
‘না’ শুনলেও তখন মানুষ সাধারণত ধরে নেয়, আজ ক্লান্ত, কাল দেখা যাবে।
‘হ্যাঁ’ শুনলেও বিপদ নেই। কারণ হ্যাঁ-এর পরে কী করতে হয়, সে বিষয়ে শরীরের নিজস্ব একটি পুরনো সিলেবাস আছে।
কিন্তু সম্পর্ক পুরনো হলে ব্যাপারটা অদ্ভুতভাবে পাল্টে যায়।
যৌনতা কমতে কমতে এমন একটা জায়গায় পৌঁছতে পারে, যেখানে যৌনতার চেয়ে যৌনতা শুরু করাটাই বড় ঘটনা।
একটা সময় যে মানুষটির কোমরে হাত রাখার আগে জাতিসংঘের অনুমোদন লাগত না, এখন তার দিকে এগোতে গিয়ে মাথার মধ্যে সিকিউরিটি কাউন্সিল বসে যায়।
আজ বলব?
আজ ও খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে।
গত সপ্তাহেও তো আমি শুরু করেছিলাম।
সেদিন ও বলেছিল মাথা ধরেছে।
আজ যদি আবার না বলে?
আমি কি খুব চাপ দিচ্ছি?
ও নিজে কখনও শুরু করে না কেন?
ও কি আর আমাকে চায় না?
এতক্ষণে শরীরের কাজটা মস্তিষ্ক দখল করে নিয়েছে। এবং মানুষের মস্তিষ্ক যখন কোনো সহজ ব্যাপারের দায়িত্ব নেয়, তখন সে তার যথাসাধ্য চেষ্টা করে ব্যাপারটাকে জিএসটি রিটার্ন বানিয়ে ফেলতে।
এখানেই একটা চক্র তৈরি হয়।
কামনার ভাটা যত ঘনীভূত হয়, শরীরি আহ্বানের ব্যাকরণ ততখানিই জটিল হয়ে দাঁড়ায়। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আদিম আতঙ্ক যখন প্রতিটি সংকেতকে গ্রাস করে, তখন মানুষ গুটিয়ে নেয় তার স্পর্শের অধিকার। আর এই নৈশব্দের প্রভাবেই ঘনিষ্টতার পরিধি আরও সঙ্কুচিত হতে থাকে। শেষমেশ এমন এক বিষণ্ণ রাত আসে, যখন দু’জন মানুষ শয্যায় সহাবস্থান করেও একে অপরের ওষ্ঠ বা তিল নয়, বরং সিলিং ফ্যানের ঘূর্ণিতে নিজের আহত অহংকারের হিসেব মেলায়।
কেউ কিছু বলছে না।
দু’জনেরই হয়তো ইচ্ছে আছে।
কিন্তু মাঝখানে বসে আছে প্রত্যাখ্যানের স্মৃতি।
এই স্মৃতি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান কর্মচারী। তাকে একবার চাকরি দিলে সে কখনও অফিস কামাই করে না।
ধরা যাক, স্বামী এক রাতে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরতে গেলেন। স্ত্রী বললেন, ‘আজ খুব ক্লান্ত।’
একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বাক্য।
কিন্তু যিনি শুনলেন তাঁর মস্তিষ্ক বাক্যটির একটি বৃহৎ সমালোচনামূলক সংস্করণ প্রকাশ করতে পারে।
‘আজ খুব ক্লান্ত’ থেকে হতে পারে:
‘আমি আর তোমার প্রতি আকৃষ্ট নই।’
তারপর:
‘আমাদের সম্পর্ক শেষের দিকে।’
তারপর:
‘নিশ্চয়ই অন্য কেউ আছে।’
তারপর রাত দুটো নাগাদ মানুষটি মনে মনে গোটা বিবাহবিচ্ছেদের মামলাও জিতে ফেলেছেন।
অন্যদিকে সেই নারীর ক্লান্তির নেপথ্যে হয়তো আস্ত একটা দিনের নির্ভেজাল ধকল ছিল। সকাল সাতটার সেই জরুরি মিটিং, সন্তানের চিকিৎসক, বাজারের ফিরিস্তি, রান্নাঘর সামলানো, অফিসের বিষাক্ত কোনো ইমেল কিংবা ড্যাশবোর্ডে জ্বলে ওঠা গাড়ির চেক-ইঞ্জিন লাইট—সবই যেন তাঁর শরীর আর মস্তিষ্কের ওপর দিয়ে স্টীম রোলার চালিয়ে গেছে। সেই মুহূর্তে কোনো আদিম ব্যাকরণ নয়, তিনি স্রেফ পৃথিবীর এই বিরক্তিকর কোলাহল থেকে ঘুমের আশ্রয়ে ডুব দিতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু প্রত্যাখ্যাত মানুষ সাধারণত ইতিহাসের নিরপেক্ষ গবেষক হয় না।
সে আহত পক্ষ।
আর আহত পক্ষ ফুটনোট পড়ে না।
এই কারণেই যৌনতা যত বিরল হয়, প্রতিটি যৌন উদ্যোগ তত বেশি অর্থ বহন করতে শুরু করে।
নতুন সম্পর্কে একটা চুমু শুধুই চুমু হতে পারে।
দীর্ঘদিনের সম্পর্কে কখনও সেই চুমুর কাঁধে পুরো সম্পর্কের রিপোর্ট কার্ড চাপিয়ে দেওয়া হয়।
‘ও সাড়া দিল তো?’
‘আগের মতো লাগল?’
‘ও কি আমাকে এখনও ভালোবাসে?’
‘আমি কি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি?’
‘আমার শরীর কি আর আকর্ষণীয় নয়?’
একটি মানুষ অন্য মানুষের ঘাড়ে চুমু খেতে গিয়েছিল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে অস্তিত্ববাদ শুরু হয়ে গেল।
সার্ত্র থাকলে খুশি হতেন।
সমস্যার আরও একটা দিক আছে। ‘না’ যেমন ভয়ের, অনেক সময় ‘হ্যাঁ’-ও ভয়ের হয়ে ওঠে।
কথাটা শুনতে অদ্ভুত।
কিন্তু অনেকদিন যৌনতা না হলে হঠাৎ যৌনতার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার মধ্যেও চাপ জন্মায়।
এখন আমাকে কেমন হতে হবে?
আগের মতো পারব তো?
ও কি আনন্দ পাচ্ছে?
আমাদের মধ্যে অস্বস্তিটা বোঝা যাচ্ছে না তো?
এতদিন পরে ব্যাপারটা কি কৃত্রিম লাগবে?
শরীরের যে কাজটি মূলত আনন্দের, সেখানে আচমকা একজন অদৃশ্য পরীক্ষক এসে বসেছে। তিনি নম্বর দিচ্ছেন। পারফরম্যান্স, আকর্ষণ, আবেগ, স্থায়িত্ব, উদ্যোগ, প্রতিক্রিয়া সব কিছুরই মূল্যায়ন চলছে।
মানুষ তখন প্রেমিক বা প্রেমিকা কম, পরীক্ষার্থী বেশি।
এই জায়গায় ‘স্টার্ট-আপ কস্ট’ কথাটা বেশ উপযোগী।
অর্থনীতির পাতায় যাকে আমরা প্রাথমিক লগ্নি বা ‘স্টার্ট-আপ কস্ট’ বলি, ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়নেও তার একটি নিগূঢ় সংস্করণ বিদ্যমান। এই বিনিয়োগে মুদ্রার প্রয়োজন পড়ে না; বরং এখানে লগ্নির প্রধান উপজীব্য হলো সাহস, মুহূর্তের নিরবচ্ছিন্ন সময়, মানসিক আয়োজন এবং প্রত্যাখ্যানের নীল বিষটুকু হজম করার অসীম সক্ষমতা। সর্বোপরি, নিজের অবাধ্য অহংকারকে সুবোধ বালকের মতো কিছুক্ষণের জন্য আলমারির অন্ধকার তাকে তুলে রাখার দুর্লভ দক্ষতাটুকুই এখানে মূল মূলধন।
সম্পর্ক নতুন থাকলে এই খরচ কম।
দু’জনেই উত্তেজিত। আগ্রহ দৃশ্যমান। সংকেত স্পষ্ট।
সম্পর্ক পুরনো হলে সংকেতের ভাষা কখনও অস্পষ্ট হয়ে যায়।
একজন ভাবছে, ‘আমি তো ওর কাছে গিয়ে বসেছি, বুঝতে পারছে না?’
অন্যজন ভাবছে, ‘ও তো শুধু পাশে বসেছে।’
একজন একটু বেশি সময় ধরে হাত রাখল।
অন্যজন ভাবল, ‘আজ মানুষটা বেশ স্নেহশীল।’
প্রথমজন দশ মিনিট পরে মনে মনে ঘোষণা করল, আমার ইঙ্গিতও আর বোঝে না।
মানবসভ্যতা চাঁদে গিয়েছে, পরমাণু ভেঙেছে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানাচ্ছে, অথচ বিছানায় নিজের সঙ্গী যৌনতা চাইছে কি না বোঝার জন্য আজও অনেক পরিবারে ব্যবহৃত প্রযুক্তি হল আন্দাজ।
আর আন্দাজের একটা অসুবিধে আছে।
ভুল হলে লজ্জা লাগে।
তাই দীর্ঘ সম্পর্কে যৌনতা নিয়ে সরাসরি কথা বলা অত্যন্ত জরুরি হলেও মানুষ সেটাই সবচেয়ে কম করে।
কে কতবার চায়।
কীভাবে শুরু করলে ভালো লাগে।
কোন সময় সুবিধে।
কী ধরনের স্পর্শ বিরক্তিকর।
কোন ‘না’ কেবল আজকের না, আর কোন ‘না’-র পিছনে বড় অভিমান জমেছে।
এসব নিয়ে স্বাভাবিক কথোপকথন অনেক সম্পর্কেই হয় না।
তার বদলে হয় হিসেব।
‘গত তিনবার আমিই শুরু করেছি।’
‘ও আমাকে ছ’বার ফিরিয়েছে।’
‘আমি কাছে গেলে ও ফোন দেখে।’
‘আমি না চাইলে ও রেগে যায়।’
এই হিসেব যৌনতার ব্যাংক স্টেটমেন্ট।
এর মধ্যে প্রেম থাকতে পারে, কিন্তু অডিটও চলছে।
আর অডিট চলাকালীন কামনা একটু অসুবিধেয় পড়ে। তাকে যদি প্রতি বার নিজের রসিদ দেখাতে হয়, সে একসময় ব্যবসা গুটিয়ে দেয়।
তবে যৌনতার ফ্রিকোয়েন্সি কমা মানেই সম্পর্কের ভালোবাসা কমে গেছে, এমন সরল সমীকরণও চলে না।
যৌবন চিরস্থায়ী কোনো শনিবারের নিশিযাপন নয় যে তা কেবল বিশের কোঠাতেই থমকে থাকবে।
চাকরি থাকে।
সন্তান থাকে।
বৃদ্ধ বাবা-মা থাকেন।
ঘুমের অভাব থাকে।
শরীর বদলায়।
হরমোন বদলায়।
ওষুধ থাকে।
উদ্বেগ থাকে।
নিজের শরীর নিয়ে সংকোচ থাকে।
কখনও বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভ থাকে।
অন্ধকার ঘনিয়ে এলে কোনো ব্যক্তি যখন শয্যার আশ্রয়ে ফেরেন, তখন কেবল রক্ত-মাংসের শরীরটিই সেখানে উপনীত হয় না। বরং তাঁর সঙ্গে চাদরের তলায় এসে ভিড় জমায় দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার রক্তচক্ষু, সন্তানের পাঠশালার দুশ্চিন্তা, ব্যাংকের ঋণের বোঝা, মেরুদণ্ডের অবাধ্য যন্ত্রণা আর আগামীকালের নিরেট ডেডলাইন; এই অদৃশ্য সহযাত্রীরা তখন কামনার চেয়েও বেশি সজাগ হয়ে পাশে বসে থাকে।
এত লোকের সামনে কামনার পক্ষে কাজ করা কঠিন।
এই পথপরিক্রমায়, সম্পর্কের বর্ষীয়ান অধ্যায়গুলোতে কামনার ব্যাকরণ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সম্মুখীন হয়।
শুরুর দিকে আকাঙ্ক্ষা নিজে থেকেই আসে, তারপর মানুষ যৌনতায় যায়।
দীর্ঘ সম্পর্কে অনেক সময় মানুষকে আগে ঘনিষ্ঠতার দিকে একটু এগোতে হয়, তারপর আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে।
অর্থাৎ আগুন সবসময় আগে থেকে জ্বলছে না। কখনও দুটো শুকনো কাঠ পাশাপাশি রাখতে হয়, একটু সময় দিতে হয়, তারপর আগুন ধরে।
এই সময়ে সবচেয়ে দরকারি জিনিস সম্ভবত যৌনতাকে সম্পর্কের গণভোট না বানানো।
আজ একজন না বলেছে।
এর মানে আজ একজন না বলেছে।
প্রতিটি ‘না’-এর পিছনে মহাভারত খুঁজলে কৃষ্ণও ক্লান্ত হয়ে পড়বেন।
যৌনতায় বারবার ‘না’ শোনার বেদনাকে নিছক অতিসংবেদনশীলতা বলে লঘু করা চলে না। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে একজন যখন ব্যাকুল হয়ে সংকেত পাঠান, আর অন্যজন ক্রমাগত সেই আহ্বান অগ্রাহ্য করে নীরবতার দেয়াল তুলে রাখেন, তখন অপর প্রান্তের সেই আহত অস্তিত্বের রক্তক্ষরণ কোনো কাল্পনিক তত্ত্ব নয়, বরং এক আদিম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা।
এই কষ্টের ভাষা অনেক সময় রাগ হয়ে বেরোয়।
‘তোমার তো কখনও ইচ্ছে করে না।’
বাক্যটির পিছনে হয়তো রয়েছে:
‘আমি আর তোমার কাছে কাঙ্ক্ষিত বোধ করি না।’
কিন্তু মানুষ কোমল বাক্য বলার সময় সবচেয়ে বেশি অদক্ষ হয় ঠিক যখন তার সবচেয়ে বেশি কোমল হওয়া দরকার।
ফলে দ্বিতীয় ব্যক্তি শুনল অভিযোগ।
সে আত্মরক্ষায় গেল।
‘সারাদিন আমি কী করি তুমি দেখো?’
কামনার আলাপ থেকে গৃহস্থালির খতিয়ান, সেখান থেকে সাত বছর আগের শ্বশুরবাড়ির কোনো তিক্ত স্মৃতি, কিংবা বিস্মৃত জন্মদিনের নালিশ—মধ্যরাতের নিস্তব্ধতায় গোটা সম্পর্কের ইতিহাসই যেন তখন কোনো কড়া অডিটের মুখে পড়ে যায়।
যৌনতা তখন অনেক দূরে বসে চা খাচ্ছে।
এই চক্র ভাঙতে হলে যৌনতাকে আবার একটু ছোট করতে হয়।
প্রতিটি স্পর্শের পরে যৌনতা ঘটতেই হবে, এই চাপ কমাতে হয়।
চুমু মানে চুমু হতে পারে।
জড়িয়ে ধরা মানে জড়িয়ে ধরা।
একসঙ্গে শোয়া মানেই পরবর্তী কর্মসূচি বাধ্যতামূলক নয়।
কারণ মানুষ যদি জানে যে কাছে এলেই তাকে শেষ পর্যন্ত যেতে হবে, সে অনেক সময় কাছেই আসে না।
আবার উদ্যোগ নেওয়াকেও অপমানের ঝুঁকি থেকে একটু মুক্ত করতে হয়।
একজন বলতে পারে, ‘আজ তোমার কাছে থাকতে ইচ্ছে করছে।’
অন্যজন বলতে পারে, ‘আজ আমার শরীর সায় দিচ্ছে না, কিন্তু এসো একটু জড়িয়ে থাকি।’
এই কথোপকথনে কারও আত্মসম্মান নষ্ট হল না।
কেউ আদালতে হারল না।
আগামীকাল আবার চেষ্টা করা যাবে।
বহুদিনের পুরনো সমীকরণে শরীরি উদযাপনের অন্যতম প্রধান সার্থকতা সম্ভবত এই সাবলীল স্বস্তিটুকু পুনরায় উদ্ধার করা।
কারণ কামনা শুধু শরীরের মধ্যে থাকে না। কামনা নিরাপত্তার মধ্যেও থাকে।
আমি জানি, তোমাকে চাইতে পারি।
তুমি না বলতে পারো।
তোমার না আমাকে অপমান করবে না।
আমার চাওয়া তোমাকে ঋণী করবে না।
এবং আমাদের দু’জনেরই ইচ্ছা হলে আমরা আবার সেই পুরনো আশ্চর্য জায়গাটায় যেতে পারি, যেখানে বহু বছরের পরিচিত মানুষটাকেও কয়েক মিনিটের জন্য নতুন মনে হয়।
সম্পর্কের শুরুর যৌনতায় রহস্যের সুবিধে আছে।
দীর্ঘ সম্পর্কের যৌনতায় আছে ইতিহাসের সুবিধে।
এই মানুষটির শরীরি মানচিত্র এখন আপনার নখদর্পণে। তাঁর সঙ্কোচের সীমানা, অবসাদের ধূসর রেখা—সবই আপনার চেনা। কোন বিন্দুতে তিনি শঙ্কিত হন, কোথায় খুঁজে পান পরম নির্ভরতা, কিংবা কোন কৌশলে তাঁর ওষ্ঠে হাসি ফোটানো যায় আর কখন নৈশব্দই পরম সমাধান—এসবই এখন এক পুরনো সিলেবাসের মতো কণ্ঠস্থ।
তবে নিবিড় পরিচিতি থাকলেই যে সেখান থেকে আদিম আকাঙ্ক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অঙ্কুরিত হবে, প্রকৃতির এমন কোনো প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা নেই।
মাঝে মাঝে সেই কামনার ভাটার টানে নতুন করে জোয়ার ডেকে আনতে হয়।
মনের রুদ্ধ দুয়ারগুলো নিজ হাতে উন্মুক্ত করতে হয়।
আর সব ছাপিয়ে বড় কথা হলো, এই শরীরি আহ্বানের কড়া নাড়াকে প্রত্যাখ্যানের এমন বিষাক্ত আতঙ্কে পর্যবসিত করা চলবে না যাতে দু’জন মানুষ এক শয্যায় থেকেও কেবল নীরবতার অতল গহ্বরে ডুবে থাকেন, অথচ ওপাশে অন্যজন আজও ব্যাকুল প্রতীক্ষায় রয়েছে কি না, তা দেখার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেন।


