শেষের কবিতা, প্রথম প্রেম এবং কেতকীর চোখের ছুরি
আমার প্রথম গার্লফ্রেন্ড আমাকে উপহার দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা।
আমার প্রথম গার্লফ্রেন্ড আমাকে উপহার দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা।
বইটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ গম্ভীর মুখে বসে ছিলাম। প্রেমিকার দেওয়া বই, তার ওপর নাম শেষের কবিতা। আমি স্বভাবতই ধরে নিলাম, বইয়ের ভেতরে নিশ্চয়ই সারি সারি কবিতা। প্রথম কবিতা পড়েই চোখ ভিজবে, দ্বিতীয় কবিতায় বুকের মধ্যে হাওয়া ঢুকবে, তৃতীয় কবিতার পরে প্রেমিকাকে ফোন করে বলব, “তুমি আমার জীবনে না এলে আমি কী নিয়ে বেঁচে থাকতাম?”
সেই বয়সে মানুষ বই পড়ার আগেই বইয়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক ঠিক করে ফেলে। বইটি কী বলছে, তার চেয়ে বইটি আমার প্রেমের পক্ষে কী সাক্ষ্য দেবে, সেই চিন্তাই প্রধান।
আমার প্রেমিকা যে বইটিকে কবিতার বই ভেবেছিল, তার দোষ ধরব কী করে? আমিও জানতাম না। দুজনেই বয়সে কম। জ্ঞান ছিল অল্প, আবেগ ছিল পাইকারি। আমাদের সেই বয়সে পৃথিবীর যাবতীয় বস্তু প্রেমের উপকরণ হয়ে উঠত। বৃষ্টি মানে প্রেম। রিকশার হুড মানে প্রেম। লোডশেডিং মানে প্রেম। পরীক্ষায় ফেল করলেও মনে হতো, আহা, প্রেমের জন্য পড়াশোনা হল না। পেট খারাপ হলেও মনে হতো বিরহের লক্ষণ।
মানুষের কিশোর বয়সে একটি বিচিত্র রোগ হয়। সে সবকিছুর মধ্যে প্রেম খোঁজে। রাস্তার পাশে শুকনো পাতা উড়লে মনে হয় কেউ আমাকে মনে করছে। জানলার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা নামলে মনে হয় কোনও এক বিষণ্ন নারী দূর থেকে আমার নাম লিখছে। রাতে কুকুর ডাকলেও বুকটা কেমন করে ওঠে। কুকুরটির ব্যক্তিগত সমস্যা থাকতে পারে, সে-সম্ভাবনা প্রেমিক যুবকের মাথায় আসে না।
আমি তখন শেষের কবিতা পড়তে বসে অমিত আর লাবণ্যকে নিয়ে নিজের প্রেমের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুরু করে দিলাম। অমিত যা বলছে, তার অর্ধেক বুঝি, বাকি অর্ধেক নিজের সুবিধামতো বুঝে নিই। লাবণ্যর সংযম দেখে ভাবি, আমার প্রেমিকাও নিশ্চয়ই গভীর। সে যে তিন দিন ধরে ফোন করেনি, তার কারণ হয়তো তার আত্মা রবীন্দ্রনাথের কোনও জটিল নন্দনতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যস্ত।
পরে বুঝেছি, ফোন না করার আরও সাধারণ কারণও থাকে।
শেষের কবিতা নিয়ে আমাদের সাধারণ স্মৃতিতে ঝরনা আছে, পাহাড়ি রাস্তা আছে, প্রজাপতি আছে, মলমল আছে, চন্দনের গন্ধ আছে। অমিতের কথার ঝলক আছে, লাবণ্যর শান্ত সৌন্দর্য আছে। শিলঙের প্রকৃতি এমনভাবে চারপাশে বিছানো যে পাঠকের মনে হয় পাহাড়ের বাতাসেও বোধহয় শিক্ষিত প্রেমিক-প্রেমিকাদের কথাবার্তা ভেসে বেড়ায়।
আমরা উপন্যাসটির চারপাশে দীর্ঘদিন এক ধরনের পবিত্র সুগন্ধ ছড়িয়ে রেখেছি। স্কুল-কলেজের প্রেমে কেউ একটু বেশি সাহিত্যিক হলে প্রেমিকাকে শেষের কবিতা দেয়। প্রেমিকা বইয়ের ভেতর শুকনো ফুল রাখে। পাতার কোণে তারিখ লেখে। কোনও একটি বাক্যের নিচে পেন্সিলের দাগ টেনে রাখে। সম্পর্ক ভেঙে গেলে বইটি আর ফেরত দেওয়া হয় না। রবীন্দ্রনাথ মাঝখানে জামিনদার হয়ে পড়ে থাকেন।
কিন্তু বয়স বাড়ার পরে আবার বইটি খুললে দেখা যায়, সেই মলমল, চন্দন, ঝরনা আর প্রজাপতির ভেতরে শরীরও আছে। কেবল মন নয়। কেবল আত্মা নয়। কেবল উচ্চাঙ্গের কথোপকথন নয়। চোখ আছে, বাহু আছে, বুক আছে, আবরণ আছে, দৃষ্টির মধ্যে ছুরি আছে।
বিশেষ করে কেতকী মিত্তির।
কেতকীকে আমরা অনেক সময় উপন্যাসের পাশে দাঁড়ানো আধুনিক পোশাকের এক নারী হিসেবে দেখে চলে যাই। যেন অমিত-লাবণ্যর গভীর প্রেমের পাশে তিনি একটু উজ্জ্বল, একটু ফ্যাশনেবল, খানিক বাহ্যিক চরিত্র। লাবণ্য যদি পাহাড়ি ঝরনা হন, কেতকী যেন শহরের দামি পারফিউম। ঝরনার প্রশংসা করতে গিয়ে পারফিউমের গন্ধটুকু নাকে নিয়ে আমরা আর বিশেষ আলোচনা করি না।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কেতকীকে কেবল পোশাক পরিয়ে মঞ্চে আনেননি। তাঁর চোখে রেখেছেন “ছুরির ঝলক”। তাঁর বুক ও বাহু অনাবৃত। তাঁর দেহের ওপরে রয়েছে “সাপের খোলসের মতো ফুরফুরে আবরণ”।
এই বর্ণনা নিছক পোশাকের বিবরণ নয়। এখানে দেহকে একই সঙ্গে প্রকাশ এবং আড়াল করা হচ্ছে। আবরণটি শরীর ঢেকে রাখছে, আবার সেই ঢেকে রাখার মধ্য দিয়েই শরীরের উপস্থিতি আরও স্পষ্ট করে তুলছে। সাপের খোলসের তুলনাটি খুব নিরীহ উপমা নয়। সাপের খোলস পাতলা, চকচকে, দেহের আকৃতি অনুসরণ করে। তার মধ্যে আকর্ষণ আছে, ভয় আছে, পুরোনো চামড়া বদলে নতুন শরীর নিয়ে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত আছে।
কেতকীকে দেখার মধ্যে তাই এক ধরনের বিপদ মিশে থাকে।
তিনি কোমল প্রেমের নিরাপদ প্রতিমা নন। তাঁর চোখ ধারালো। তাঁর শরীর সচেতনভাবে দৃশ্যমান। তিনি জানেন তাঁকে দেখা হচ্ছে। আরও বড় কথা, তিনি দেখছেন যে তাঁকে দেখা হচ্ছে। পুরুষের দৃষ্টি সেখানে একতরফা থাকে না। চোখের ছুরি ফিরে আসে দর্শকের দিকেও।
সেই সময়ে বাঙালি উপন্যাসে নারীর অনাবৃত বুক, বাহু, দেহের গায়ে স্বচ্ছ ও ফুরফুরে আবরণের বর্ণনা রবীন্দ্রনাথ এমনভাবে বসিয়েছেন যে পাঠক একদিকে সৌন্দর্য অনুভব করে, অন্যদিকে অস্বস্তিও এড়াতে পারে না। এই অস্বস্তিটিই গুরুত্বপূর্ণ। কামনা যখন সাহিত্যে প্রবেশ করে, সে ঘণ্টা বাজিয়ে ঘোষণা দেয় না। সে গন্ধ হয়ে আসে, কাপড়ের ভাঁজ হয়ে আসে, দৃষ্টির ঝিলিক হয়ে আসে, একটি শরীর আরেকটি শরীরের সামনে কীভাবে উপস্থিত হচ্ছে, তার মধ্যে এসে বসে।
আমাদের পাঠাভ্যাসে রবীন্দ্রনাথকে দীর্ঘদিন এমন একটি উঁচু আসনে বসানো হয়েছে, যেখানে তাঁর চরিত্রগুলোর শরীর থাকার কথা আমরা প্রায় ভুলে গেছি। তাঁরা প্রেমে পড়বেন, কিন্তু ঘামবেন না। তাঁরা আকুল হবেন, কিন্তু শরীরের দিকে তাকাবেন না। তাঁরা গান গাইবেন, চিঠি লিখবেন, দর্শন আলোচনা করবেন। কামনা করলে আমাদের রবীন্দ্রভক্তির পাঞ্জাবির কলার একটু শক্ত হয়ে যায়।
অথচ রবীন্দ্রনাথ মানুষের শরীর সম্পর্কে মোটেই অনবহিত ছিলেন না। তাঁর সাহিত্যে চুল, চোখ, কণ্ঠ, গন্ধ, ত্বক, হাত, চলন, কাপড়ের স্পর্শ বারবার ফিরে আসে। তাঁর নারী-পুরুষেরা কেবল আদর্শের বাহক নয়। তারা পরস্পরের উপস্থিতিতে আলোড়িত হয়। কেউ সেই আলোড়ন সংযত করে, কেউ সাজসজ্জার মধ্যে প্রকাশ করে, কেউ কথার আড়ালে লুকিয়ে রাখে।
শেষের কবিতায় অমিতের মন লাবণ্যর দিকে যায়, কিন্তু তার জীবনের সামাজিক, শারীরিক ও বাস্তব বিন্যাস কেতকীর সঙ্গে অন্য রকম সামঞ্জস্য খুঁজে পায়। অমিত ও লাবণ্যর সম্পর্কের মহিমা তাদের অসম্পূর্ণতার মধ্যে। তারা পরস্পরের ভেতরে যে প্রেম আবিষ্কার করে, তাকে দৈনন্দিন সংসারের থালাবাসন, অসুখ, বাজারের হিসাব আর একই কথা বারবার বলার ক্লান্তির মধ্যে নামিয়ে আনতে ভয় পায়।
এই ভয়কে তারা নন্দনতত্ত্বের ভাষা দেয়।
মানুষ নিজের ভয়কে একটু শিক্ষিত ভাষায় বলতে পারলে নিজের কাছেও খুব সম্মানজনক শোনায়। কেউ বলে, “আমাদের সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষা করা দরকার।” সহজ বাংলায় কথাটার মানে দাঁড়াতে পারে, “বিয়ে করে যদি তিন মাসের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়, তখন এই সুন্দর স্মৃতিটা কোথায় রাখব?”
অমিত ও লাবণ্য তাদের প্রেমকে পরিণতির বদলে স্মৃতির মধ্যে রেখে দেয়। তাদের প্রেমের সৌন্দর্য তাই কিছুটা জাদুঘরের জিনিসের মতো। কাচের বাক্সে রাখা। আলো পড়ে। দর্শক দেখে। হাত দেওয়া নিষেধ।
কেতকী সেই কাচের বাক্সের বাইরে থাকা জীবন।
তিনি সামাজিক, দৃশ্যমান, আধুনিক, আত্মসচেতন। তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে শরীর, দৈনন্দিনতা, দাম্পত্য এবং পারস্পরিক অভ্যাসের জায়গা আছে। তাঁকে ঘিরে কামনা কোনও দার্শনিক কুয়াশার মধ্যে লুকিয়ে থাকে না। তাঁর পোশাক, তাঁর দৃষ্টি, তাঁর উপস্থিতি, সবই ইন্দ্রিয়ের দিকে সরাসরি হাত বাড়ায়।
লাবণ্যকে আমরা শুনি। কেতকীকে আমরা দেখি।
এই দুই ক্রিয়ার ভেতরেই উপন্যাসের একটি সূক্ষ্ম বিভাজন কাজ করে। লাবণ্যর সঙ্গে অমিতের সম্পর্ক ভাষা, ভাবনা, বুদ্ধি ও আত্মীয়তার। কেতকীর ক্ষেত্রে দৃষ্টি, সামাজিক উপস্থিতি, দেহ এবং পরিচিত জীবনযাপনের শক্তি বেশি সক্রিয়। তবে এই বিভাজন একেবারে সরল নয়। লাবণ্যরও শরীর আছে, কেতকীরও মন আছে। রবীন্দ্রনাথ কাউকেই একটি মাত্র মাত্রায় আটকে রাখেননি। পাঠকের অলসতা চরিত্রদের ভাগ করে নেয়। একজনকে পূজার জন্য রাখে, আরেকজনকে দেখার জন্য।
আমরা সাধারণত যে প্রেমকে খুব মহান বলি, তার মধ্যে দূরত্বের ভূমিকা অনেক। দূরের মানুষকে নিখুঁত রাখা সহজ। সে নাক ডাকে কি না জানা যায় না। রাগলে কেমন মুখ করে জানা যায় না। সকালে ঘুম থেকে উঠে তার চেহারা কেমন হয়, সেটাও রহস্য। কল্পনা তার চুল আঁচড়ে দেয়, মুখ ধুইয়ে দেয়, ভালো জামা পরিয়ে সামনে আনে।
কাছের মানুষ এই সুবিধা পায় না।
দাম্পত্যের বড় বিপদ হচ্ছে, সেখানে মানুষকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখা যায়। প্রেমিকার সঙ্গে ঝরনার ধারে কবিতা বলা যায়। স্ত্রীর সঙ্গে প্লাম্বার কখন আসবে, সেই আলোচনা করতে হয়। পাহাড়ি পথের প্রজাপতি খুব সুন্দর। রান্নাঘরের সিঙ্কে আটকে থাকা খাবারের টুকরো কবিতায় বিশেষ কাজে লাগে না।
অমিত ও লাবণ্য এই দৈনন্দিনতার হাতে তাদের প্রেমকে তুলে দিতে চায়নি। তারা জানত কি জানত না, সে তর্ক থাকতে পারে। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্তে এক ধরনের নান্দনিক আত্মরক্ষা আছে। তারা ভালোবাসার স্মৃতিকে বাঁচিয়েছে, পাশাপাশি সংসারের পরীক্ষাও এড়িয়ে গেছে।
কেতকী সেই পরীক্ষার জগতে প্রবেশ করতে সক্ষম।
তাঁর চোখে ছুরির ঝলক থাকার কারণও হয়তো এখানে। তিনি কেবল আকর্ষণের বস্তু নন, তিনি এমন এক নারী যিনি পুরুষের রোমান্টিক আত্মপ্রতারণা ভেদ করতে পারেন। অমিত নিজের বুদ্ধি, ভাষা ও অভিনবত্ব নিয়ে খুব সচেতন। সে অন্যদের বিচার করে, সাহিত্য নিয়ে ঘোষণা দেয়, প্রচলিত রুচির দিকে তাচ্ছিল্যের চোখে তাকায়। কেতকীর চোখের ছুরি সেই আত্মমুগ্ধতাকেও কাটে।
লাবণ্য অমিতের ভাষার সমান অংশীদার। কেতকী তার দেহী ও সামাজিক বাস্তবতার সাক্ষী।
এই কারণেই শেষের কবিতা কেবল বিচ্ছেদের সৌন্দর্যের উপন্যাস নয়। এখানে প্রেমকে কীভাবে আমরা কল্পনা করি, কামনাকে কীভাবে সাজাই, বিয়েকে কীভাবে ভয় পাই এবং শরীরকে কীভাবে সাহিত্যিক ভাষার আবরণ পরাই, তারও অনুসন্ধান আছে।
কামনা এই উপন্যাসে অশ্লীল নয়। রবীন্দ্রনাথের কলমে কামনা পর্দা একটু সরায়। চোখের মধ্যে আলো ফেলে। মলমলের কাপড়কে হাওয়ায় নড়ায়। তারপর পাঠকের দিকে তাকিয়ে দেখে, সে কতটুকু বুঝল।
আমরা অনেকেই বুঝিনি।
আমার প্রথম প্রেমিকা বুঝেছিল কি না জানি না। আমি তো একেবারেই বুঝিনি। বইটি হাতে নিয়ে ভাবছিলাম, এ বই পড়ার পরে প্রেম কীভাবে আরও গভীর করা যায়। এখন মনে হয়, বইটি বরং শেখাচ্ছিল, প্রেম গভীর হলেই তাকে বিয়ে পর্যন্ত টেনে নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। কোনও কোনও প্রেম মানুষের জীবনে থাকে অসমাপ্ত সুরের মতো। আর কোনও কোনও মানুষ আসে সংসারের পূর্ণ বাদ্যযন্ত্র নিয়ে, সঙ্গে হিসাবের খাতা, বাজারের ব্যাগ এবং চোখে ছুরির ঝলক।
প্রথম প্রেমের বয়সে আমি লাবণ্যকে খুঁজেছি।
বয়স একটু বাড়ার পরে কেতকীকে দেখতে শিখেছি।
আরও পরে বুঝেছি, অমিতকে নিয়েও সতর্ক থাকা দরকার। যে পুরুষ প্রেমের মাঝখানে বসেও নিজের সাহিত্যতত্ত্ব এত বেশি ব্যাখ্যা করে, সংসারে গিয়ে তার সঙ্গে ঝগড়া হলে সে হয়তো ক্ষমা চাওয়ার বদলে তিন পৃষ্ঠার প্রবন্ধ লিখবে।
আমার প্রথম গার্লফ্রেন্ড বইটি আমাকে কেন দিয়েছিল, আজ যখন তাকে জিজ্ঞাসা করি। সে বলে মনে নেই রে! হয়তো নামটি সুন্দর লেগেছিল। হয়তো সত্যিই ভেবেছিলাম কবিতার বই। হয়তো বইয়ের দোকানের লোক বলেছিল প্রেমিককে দেওয়ার জন্য উপযুক্ত। বইয়ের দোকানিরা প্রেমের ইতিহাসে কত সম্পর্কের নীরব মধ্যস্থতাকারী, সে হিসাব কেউ রাখে না।
তবে ওর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। সে এই লেখাটি পড়ছে। তাকে তাই সরাসরি বলি। তুমি আমাকে একটি উপন্যাস দিয়েছিল, আমি ভেবেছিলাম কবিতা। বহু বছর পরে বুঝলাম, আমাদের প্রথম প্রেমটিও বোধহয় তেমন ছিল। আমরা ভেবেছিলাম মহাকাব্য, আসলে কয়েকটি সুন্দর অনুচ্ছেদ। কিছু ঝরনা, কিছু প্রজাপতি, সামান্য চন্দনের গন্ধ এবং শেষে কারও চোখে ক্ষণিকের ছুরির ঝলক।
বইটি রয়ে গেছে।
তুমি রয়েছো।
রবীন্দ্রনাথের বইয়ের এই এক বিপজ্জনক স্বভাব। প্রেমিক-প্রেমিকা বদলে যায়, তিনি তাকের মধ্যে বসে সব দেখেন। তারপর একদিন বয়স হলে বই খুলে এমন কিছু দেখিয়ে দেন, যা যৌবনে চোখের সামনে ছিল, তবু দেখা হয়নি।



