আমাদের বইয়ের হাট গ্রুপের এডমিনদের সাথে সেদিন আলোচনা হচ্ছিল, এ.আই লেখা যে ভাবে বন্যার মতো আসছে সেক্ষেত্রে আমারা কিভাবে বুঝবো? আমার বক্তব্যটা এখানে পরিষ্কার করি। আমার মতে শিল্পচর্চা সহজ হওয়ার কথা নয়। সহজ হলে সন্দেহ জাগে। কারণ যেটা সহজ, সেটা সাধারণত আমরা মনে করি জরুরি নয়। লুইস গ্লিকের প্রথম বই Firstborn বেরোয় ১৯৬৮ সালে। সেখানে একটি কবিতা বাদ পড়ে—“The House on Marshland।” গ্লিক নিজেই পরে বলেছিলেন, কবিতাটা “ভয়াবহ রকমের খারাপ”। তিনি বড় হয়েছেন লং আইল্যান্ডের উডমিয়ারে, জলাজমি ঘেরা এক টালমাটাল ভূখণ্ডে। তাঁর মাথায় এসেছিল: যে বাড়িগুলো আমাদের স্থায়ি আশ্রয়ের প্রতীক, সেগুলোই তৈরি হচ্ছে এমন এক জমির ওপর, যেটা নিজেই ভরসাহীন। ধারণাটা গভীর। কবিতাটাও হওয়ার কথা ছিল গভীর। হয়তো সেই গভীর হওয়ার আকাঙ্ক্ষাই তাকে মেরে ফেলেছিল। গ্লিক জীবনান্দের মতো একই কবিতা বারবার লিখেছেন। আবার ছিঁড়েছেন। আবার লিখেছেন। ছাড়তে পারেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করেন নি। তবু ভাবনাটা তাড়া করে ফিরেছে।
১৯৭১ সালের বসন্তে তিনি নতুন একটা কবিতা লিখতে শুরু করেন। প্রথম কয়েকটি লাইন নাকি একেবারে নিখুঁত। তারপর আবার সেই পুরোনো সমস্যা। গ্রীষ্মটা কেটে গেল সেই কয়েকটি লাইনের ভেতরেই আটকে থেকে। তিনি কিছুই লিখতে পারছিলেন না। প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙলে সেই লাইনগুলো শুনতেন, যেন কেউ মাথার ভেতর টেপ-রেকর্ড বাজাচ্ছে। অবশেষে শরৎকালে এসে তাঁর মাথায় এল এক অদ্ভুত সমাধান; যে কবিতাটা তিনি লিখতে পারেননি, তার ধ্বংসাবশেষ, তার ফেলনা খসড়াগুলোই ব্যবহার করা যায় নতুন কবিতার জন্য। সেখান থেকেই জন্ম নিল “To My Mother।”
আমরা প্রায়ই সংগ্রামী শিল্পীর রোম্যান্টিক ছবিটা ভালোবাসি। কিন্তু বাস্তবতা কম রোম্যান্টিক। শিল্প মানে ব্যর্থতা, বারবার ব্যর্থতা, আর সেই ব্যর্থতার ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার জেদ। কবিতাটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, ঠিকই। কিন্তু সেই লড়াইটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিছু বানানোর মুহূর্তে মানুষ সবচেয়ে বেশি মানুষ হয়। সেইখানেই বিপদ। জেনারেটিভ এআই-এর উত্থান শুধু কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে তা নয়, এটা সৃষ্টিশীলতার উপর চরম আঘাত। এটা মানুষের উপর আঘাত। এখানে একটা অস্বস্তিকর কথা বলতে হয়। শিল্পীসত্তার অহংকার দরকার। লেখার পরে যখন কেউ ঠিক করে, “হ্যাঁ, এটা আমি অন্যদের পড়তে দেব,” তখন সে আসলে বলছে; আমার কথার মূল্য আছে। এই ঘোষণাটা অহংকার ছাড়া সম্ভব নয়। আপনি যতই বিনয়ী হন, যতই বিনয়ী ভাষায় লিখুন, তবু সেই সিদ্ধান্তটা অহংকারেরই। মহৎ শিল্প অহংকার ছাড়া হয় না।
বেশিরভাগ লেখকই আমাদের মতোই অসম্পূর্ণ মানুষ। তাদের দোষ আছে, দুর্বলতা আছে। আমরা চাইলে সেগুলো ক্ষমা করতে পারি, কারণ সেই অহংকারটা শেষ পর্যন্ত এক ধরনের সামষ্টিক মুক্তির জন্যই কাজ করে। এই কাজটা ধীর, অন্ধকারে ঘটে, রহস্যময়। শিল্প এমনই।
এআই টুলগুলো বলছে, কয়েক মিনিটে বই লিখে দেবে। সেকেন্ডে উপন্যাস। অ্যামাজনে ইতিমধ্যেই ঢল নেমেছে এআই-তৈরি বইয়ের—শিশুদের বই, রঙ করার বই, উইকিপিডিয়া থেকে কপি-পেস্ট করা জীবনী। বিশৃঙ্খলা। বাংলা অনুবাদেও ভয়াবহ অবস্থা। আর এটা বাড়বেই। আটকানো যাবে না।
এই বইগুলোর ভাষা খুব মোলায়েম। সব সহজ। কিন্তু এই সহজের মধ্যেই প্রতারণা। শিল্প সহজ হওয়ার কথা নয়। সংগ্রামের ফেটিশে ভোগার দরকার নেই, শিল্প জন্মায় ব্যর্থতা পেরিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। অহংকার এখানে মানবিক। যন্ত্রকে সেই জায়গায় বসালে শিল্প হয় না।
অনলাইনে অসংখ্য মানুষ এআই-এর কাছে যায় রাইটার্স ব্লক নামের রোগ সারাতে। অথচ তারা জানে না ওই আটকে যাওয়াটাই শিল্পের জ্বালানি। আমি কবিতা লিখি, আমার প্রতিটা শব্দ কষ্ট করে বানানো, প্রতিটা বাক্য একটা খাদের উপর দড়ির সেতু। পড়তে পড়তে আমি অসুস্থ হয়ে যাই, ভালোবাসায়। সেই অস্বস্তিই শিল্প। শিল্পীদের এই জেদটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশ্বাসটাই; জগত সংসারে আমরা তুচ্ছ হতে পারি, তবু কিছু বানাতে পারি। সৃষ্টিশীল কাজ সময় চায়। অসমাপ্ত কাজ, চাপা পড়া সম্ভাবনা; এই সবই শিল্পের ইতিহাসের অংশ।
লেখক ভাবনা থেকে বাস্তবায়ন করেন, সন্তানের মতো করে কাজটাকে বড় করেন, প্রতিদিন তাকে খাওয়ানো, আবার নতুন জামা পরানো, বারবার ছিঁড়ে ফেলা। এই শ্রমই শিল্প। যা জীবিত, তা কঠিনকে আঁকড়ে ধরে। ফকনার নোবেল বক্তৃতায় বলেছিলেন, তরুণ লেখকরা ভয় পাচ্ছে; “আমি কবে উড়ে যাব?” তাঁর ভয় ছিল, সেই ভয়ের মধ্যে ভালোবাসা, করুণা, ত্যাগ; এই পুরোনো সত্যগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। ভালো শিল্পী হওয়া মানে ভালো মানুষ হওয়া নয়। কিন্তু এই জেদ; নিজের কণ্ঠে কিছু বলার; এটাই শক্তি। কবিতা মানুষকে ভালো বানায় না। কিন্তু লেখার সেই মুহূর্ত, যখন মাথা ঝিনঝিন করে; আমার সেটা দরকার।
এই এ.আই আমি চিনি। এটাই আমার পেশা। এখানে শব্দেরা হঠাৎ মিলতে শুরু করে। এআই জীবন সহজ করছে। কিন্তু শিল্পের কাজ সহজ করা নয়। শিল্প শেষ আশ্রয়।


