কাপ
পুরোনো দাম্পত্য ঝগড়ায় বর্তমান থাকে খুব কম। মৃত ঘটনাগুলি কবর থেকে উঠে এসে গোলটেবিল বৈঠকে বসে।
ফারহান একদিন সন্ধ্যাবেলা বাসায় ফিরে বলল,
“নীলা, তোমাকে আজ নতুন লাগছে।”
নীলা তখন রান্নাঘরে পেঁয়াজ কাটছিল। পেঁয়াজ কাটার কারণে তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। সে চোখ মুছতে মুছতে বলল,
“নতুন লাগছে মানে?”
“জানি না। অন্যরকম।”
“চুল কেটেছি।”
“ও।”
ফারহান এমনভাবে ‘ও’ বলল, যেন চুল কাটা একটি দুঃসংবাদ। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে শোবার ঘরে চলে গেল।
নীলা পেঁয়াজ কাটতে কাটতে হাসল।
বিয়ের আগে ফারহান তার ছোটখাটো পরিবর্তনও ধরে ফেলত। নীলার কানের দুল বদলালে বলত, দুল দুটি দেখতে বৃষ্টির ফোঁটার মতো। কাজল একটু বেশি হলে বলত, আজ তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি কাউকে খুন করার পরিকল্পনা করছ।
নীলা জিজ্ঞেস করত, কাকে?
ফারহান বলত, আমাকে।
“তোমাকে খুন করব কেন?”
“কারণ আমি তোমার প্রেমে পড়েছি।”
নীলা তখন হাসত। ফারহান তার হাসির দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকত, যেন পৃথিবীর সব রহস্যের উত্তর নীলার সামনের দুই দাঁতের মাঝখানের ছোট্ট ফাঁকে লুকানো আছে।
তাদের পরিচয় হয়েছিল একটি বইয়ের দোকানে। নীলা হাতে নিয়েছিল জীবনানন্দের কবিতার বই। ফারহান পাশ থেকে বলেছিল,
“বইটা কিনবেন না।”
নীলা অবাক হয়ে বলেছিল,
“কেন?”
“এই সংস্করণে ছাপার ভুল আছে।”
“আপনি কীভাবে জানেন?”
“আমি গতকাল কিনেছি।”
“তাহলে ফেরত দেননি কেন?”
“আপনার সঙ্গে আজ দেখা হবে, এই জন্যে রেখে দিয়েছি।”
কথাটা খুবই দুর্বল ছিল। তবু নীলা হেসেছিল। সুদর্শন যুবকদের দুর্বল কথাও অনেক সময় শক্তিশালী মনে হয়।
পরের তিন মাস তাদের জীবন অস্বাভাবিক হয়ে গেল। তারা প্রতিদিন নতুন কিছু আবিষ্কার করত। নীলা জানল, ফারহান কফিতে চিনি খায় না, কিন্তু মিষ্টি দইয়ের পাত্র একা শেষ করতে পারে। ফারহান জানল, নীলা ভয় পেলে দ্রুত কথা বলে এবং রাগ করলে খুব ধীরে কথা বলে।
তারা শহরের সব রাস্তায় হাঁটল। একই ফুচকার দোকানে বারবার গেল। মাঝরাতে টেলিফোনে কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ল। একদিন ভোরে ফারহান ফোন করে বলল,
“আকাশ দেখেছ?”
“না।”
“দেখো।”
নীলা জানালা খুলে দেখল, আকাশে তেমন কিছু নেই। সামান্য মেঘ। ফ্যাকাশে আলো।
সে বলল,
“কী দেখব?”
“আমি যে আকাশ দেখছি, তুমিও সেই আকাশ দেখছ। ব্যাপারটা আশ্চর্য না?”
তখন নীলার ব্যাপারটি সত্যিই আশ্চর্য মনে হয়েছিল।
বিয়ের ছয় বছর পর একই আকাশ নিয়ে তাদের আর কোনো কথা হয় না।
এখন তাদের কথা হয় বাজারের তালিকা, গ্যাসের বিল, গাড়ির কিস্তি, স্কুলের ফি এবং ফারহানের মা কবে এসে থাকবেন, এইসব নিয়ে।
তাদের পাঁচ বছরের একটি মেয়ে আছে। নাম অর্পা। অর্পা পৃথিবীর যাবতীয় অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে।
“মা, মাছ পানি খায়?”
“খায়।”
“তাহলে ওদের পেট সব সময় পানিতে ভরা থাকে?”
“হয়তো।”
“বাবা তোমাকে ভালোবাসে?”
নীলা থমকে যায়।
প্রশ্নটি অপ্রয়োজনীয় না। বরং ভয়াবহ প্রয়োজনীয়।
সে বলে,
“ভালোবাসে।”
“কীভাবে বুঝলে?”
“বুঝি।”
“বাবা তো তোমাকে চুমু দেয় না।”
নীলা বলে,
“সবকিছু তোমার সামনে করতে হবে?”
অর্পা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলে,
“আমার সামনে করলে সমস্যা কী?”
সেদিন রাতে নীলা ফারহানকে কথাটা বলল। ফারহান ল্যাপটপে অফিসের কাজ করছিল।
সে হেসে বলল,
“মেয়ের নজর খুব তীক্ষ্ণ।”
নীলা বলল,
“তোমার কী মনে হয়?”
“কী মনে হবে?”
“আমাদের মধ্যে কিছু বদলে গেছে?”
ফারহান ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলল,
“সবকিছু বদলায়।”
“সেটা জানি।”
“তাহলে?”
নীলা কিছু বলল না।
ফারহান দশ মিনিট পর ল্যাপটপ বন্ধ করল। ততক্ষণে নীলা পাশ ফিরে শুয়েছে।
সে বলল,
“তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছ?”
নীলা জবাব দিল না। সে জেগে ছিল। এই পরিস্থিতিতে ঘুমিয়ে থাকার অভিনয় করা স্ত্রীদের একটি প্রাচীন কৌশল।
ফারহান বাতি নিভিয়ে দিল।
অন্ধকারে সে বলল,
“নীলা।”
নীলা চুপ করে রইল।
“আমাদের মধ্যে কী বদলেছে?”
নীলা এবার বলল,
“জানি না।”
“তুমি তো বললে বদলেছে।”
“মনে হয়।”
“কী মনে হয়?”
“আগে তুমি আমাকে দেখলে খুশি হতে।”
“এখন হই না?”
“জানি না।”
“তুমি সব প্রশ্নের উত্তর জানি না দিয়ে দিচ্ছ।”
নীলা উঠে বসল। বলল,
“আগে তুমি আমার সঙ্গে কথা বলার অজুহাত খুঁজতে। এখন কথা না বলার অজুহাত খোঁজো।”
ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“অফিসে চাপ যাচ্ছে।”
“ছয় বছর ধরে?”
“এইসব কথার মানে কী?”
“কোনো মানে নেই।”
এই কথাটির পর তাদের ঝগড়া শুরু হলো।
ঝগড়ার বিষয় ছিল ভালোবাসা। কিন্তু আলোচনায় উঠে এল ভাঙা মিক্সার, ফারহানের মায়ের একটি মন্তব্য, নীলার বড় বোনের স্বামীর আচরণ, গত ঈদে কোথায় যাওয়া হয়েছিল এবং ফারহান কেন তিন বছর আগে নীলার জন্মদিন ভুলে গিয়েছিল।
পুরোনো দাম্পত্য ঝগড়ায় বর্তমান থাকে খুব কম। মৃত ঘটনাগুলি কবর থেকে উঠে এসে গোলটেবিল বৈঠকে বসে।
ঝগড়ার শেষে ফারহান বলল,
“তুমি কী চাও?”
নীলা বলল,
“জানি না।”
“আবার জানি না?”
“আমি চাই তুমি নিজে বুঝবে।”
“মানুষের মনের কথা বুঝে ফেলার কোনো যন্ত্র এখনো আবিষ্কার হয়নি।”
নীলা শান্ত গলায় বলল,
“আগে তো বুঝতে।”
ফারহান বালিশ নিয়ে বসার ঘরে চলে গেল।
পরদিন সকাল থেকে তাদের কথা বন্ধ।
তবে সংসারের সব কাজ ঠিকমতো চলতে লাগল। নীলা জিজ্ঞেস করল,
“চা খাবে?”
ফারহান বলল,
“খাব।”
“চিনি?”
“না।”
“টোস্ট দেব?”
“দাও।”
মানুষ রাগ করে কথা বন্ধ করতে পারে। নাশতা বন্ধ করতে পারে না।
তিন দিন পর ফারহান অফিস থেকে ফেরার সময় দুটি সিনেমার টিকিট নিয়ে এল। নীলা টিকিট দেখে বলল,
“অর্পাকে কে দেখবে?”
“মা আসবেন।”
“তোমার মাকে বলেছ?”
“বলেছি।”
নীলা টিকিট হাতে নিয়ে দেখল, রাত নয়টার শো।
সে বলল,
“এত রাতে?”
“একসময় তো রাত বারোটার শো দেখতাম।”
“তখন অর্পা ছিল না।”
ফারহান বলল,
“তখন আমাদের হাঁটুতে ব্যথাও ছিল না।”
নীলা না চাইলেও হাসল।
ফারহান বলল,
“হাসলে তোমাকে এখনো আগের মতো লাগে।”
নীলা সঙ্গে সঙ্গে হাসি থামিয়ে দিল।
সিনেমা দেখতে গিয়ে তারা সিনেমা দেখল না। হলের পাশে ছোট একটি কফির দোকানে বসে রইল। ফারহান দুই কাপ কফি নিয়ে এল।
নীলা এক চুমুক দিয়ে বলল,
“এতে চিনি নেই।”
“তুমি তো চিনি ছাড়া খাও।”
“আমি অল্প চিনি খাই।”
ফারহান অবাক হয়ে বলল,
“তাই?”
নীলা কাপের দিকে তাকিয়ে রইল।
ফারহান বলল,
“ছয় বছরেও আমি জানি না তুমি কফিতে চিনি খাও।”
“একসময় জানতে।”
“হয়তো ভুলে গেছি।”
“হুঁ।”
“তোমার কি মনে হয় ভালোবাসা শেষ হয়ে গেছে?”
নীলা অনেকক্ষণ পর বলল,
“মাঝে মাঝে মনে হয়।”
“আমারও মনে হয়।”
নীলা মুখ তুলে তাকাল।
ফারহান শান্ত গলায় বলল,
“তারপর আবার মনে হয়, শেষ হলে তোমার পাশে বসে এত ভয় লাগত না।”
“কীসের ভয়?”
“তুমি চলে যাবে।”
নীলা কাপ নামিয়ে রাখল।
ফারহান বলল,
“আগে তোমাকে দেখলে বুক ধড়ফড় করত। এখন ধড়ফড় করে না। কিন্তু তুমি একদিন বাসায় না থাকলে বাসাটা অচেনা লাগে। তোমার কাপ রান্নাঘরে না দেখলে মনে হয় কিছু একটা হারিয়েছে। এগুলো কি ভালোবাসা না?”
নীলা বলল,
“হতে পারে অভ্যাস।”
“অভ্যাস কি খুব খারাপ?”
“জানি না।”
“আবার জানি না?”
নীলা বলল,
“অভ্যাসের মধ্যে যত্ন থাকলে খারাপ না।”
ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
“তোমার কী দরকার, বলো।”
“সব কথা বলে দিতে হয়?”
“হ্যাঁ। আমি এখন আর তোমার মনের কথা পড়তে পারি না।”
“আগেও পারতে না। আন্দাজ করতে।”
“এখনো আন্দাজ করতে পারি। বেশির ভাগ ভুল হয়।”
নীলা বলল,
“আমি ক্লান্ত।”
“কীসে?”
“সবকিছু সামলাতে সামলাতে। ঘর, অর্পা, আমার অফিস, তোমার মা, আমার মা। তুমি বাসায় ফিরে ক্লান্ত হও। আমি বাসায় থেকেও ক্লান্ত হই, বাইরে গিয়েও ক্লান্ত হই।”
ফারহান মাথা নিচু করে বলল,
“আমি বুঝিনি।”
“আমি বলিনি।”
“কেন বলোনি?”
“ভেবেছি, নিজে বুঝবে।”
“আবার সেই একই সমস্যা।”
নীলা মৃদু গলায় বলল,
“হ্যাঁ।”
ফারহান বলল,
“আমি ভাবতাম তুমি আমাকে আর পছন্দ করো না। তোমাকে ছুঁতে গেলেও কখনো কখনো তুমি সরে যাও।”
“আমি ক্লান্ত থাকি।”
“আমি ভাবতাম তুমি বিরক্ত।”
“আমি মাঝে মাঝে বিরক্তও থাকি।”
“কীসে?”
“তোমার ওপর। নিজের ওপর। জীবনের ওপর।”
ফারহান দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
কফির দোকান বন্ধ করার সময় হয়ে গেছে। কর্মচারীরা চেয়ার টেবিল গুছাচ্ছে। বাইরে মৃদু বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
ফারহান বলল,
“চলো বৃষ্টিতে হাঁটি।”
নীলা বলল,
“ঠান্ডা লাগবে।”
“আগে তো লাগত না।”
“আগে আমাদের বয়স কম ছিল।”
“আমাদের বয়স এখনো খুব বেশি না।”
“আমার হাঁটুতে ব্যথা।”
“আমারও আছে।”
দুজন বৃষ্টির মধ্যে বের হলো। একই ছাতার নিচে পাশাপাশি হাঁটতে গিয়ে দেখা গেল, ছাতাটি খুব ছোট। ফারহানের ডান কাঁধ ভিজছে। নীলার বাঁ কাঁধ।
নীলা বলল,
“ছাতাটা আমার দিকে বেশি করে ধরেছ কেন?”
“তোমার ঠান্ডা লাগে।”
“তোমার লাগে না?”
“লাগে।”
“তাহলে মাঝখানে ধরো।”
ফারহান ছাতা মাঝখানে ধরল। এখন দুজনেরই কাঁধ সমানভাবে ভিজছে।
নীলা বলল,
“এতে লাভ কী হলো?”
ফারহান বলল,
“ক্ষতিটা ভাগ হয়ে গেল।”
নীলা আবার হাসল।
তারা রাস্তার পাশে একটি দোকানে ঢুকল। দোকান বন্ধ হচ্ছিল। ফারহান দুটি সাদা কফির কাপ কিনল। খুব সাধারণ কাপ। কাপের গায়ে কোনো ছবি নেই, কোনো লেখা নেই।
নীলা বলল,
“কাপ কিনছ কেন?”
“আমাদের পুরোনো কাপ দুটো আলাদা। তোমারটায় নীল ফুল, আমারটায় ফুটবল। এই দুটো একই রকম।”
“একই রকম কাপ দিয়ে কী হবে?”
“প্রতি শুক্রবার রাতে আমরা এই কাপে কফি খাব।”
“কফি খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে?”
“না।”
“তাহলে?”
“কথা বলব। কোনটা ঠিক নেই, সেটা বের করব।”
নীলা একটি কাপ হাতে নিয়ে বলল,
“তুমি মনে রাখতে পারবে?”
“ফোনে রিমাইন্ডার দিয়ে রাখব।”
“রোমান্টিক ব্যাপারেও এখন রিমাইন্ডার লাগে?”
ফারহান বলল,
“গ্যাসের বিলের জন্যে লাগে, ভালোবাসার জন্যে লাগলে অসুবিধা কী?”
শুক্রবার রাতে তারা নতুন কাপে কফি খেল। ফারহান ভুল করে নীলার কফিতে চিনি দিল না। নীলা নিজেই চিনি দিয়ে নিল।
তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বলল না। অর্পার স্কুলের কথা বলল। বারান্দায় একটি লেবুগাছ লাগানো যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা করল। ফারহান বলল, সে মাঝে মাঝে ভয় পায়। নীলা বলল, সেও পায়।
কথা শেষ হলে ফারহান কাপ ধুয়ে রাখল। আগে সে কখনো কাপ ধুত না।
ঘুমানোর সময় অর্পা এসে তাদের মাঝখানে শুয়ে পড়ল। বলল,
“বাবা, তুমি মাকে ভালোবাসো?”
ফারহান বলল,
“বাসি।”
“কীভাবে বুঝলে?”
ফারহান কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল,
“তোমার মা কফিতে অল্প চিনি খায়। আমি অনেকদিন ভুলে ছিলাম। এখন আবার মনে রাখার চেষ্টা করছি।”
অর্পা বলল,
“এটা ভালোবাসা?”
ফারহান বলল,
“সম্ভবত।”
নীলা অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে ফারহানের হাত ধরল।


