কেয়া
গলির মুখে চায়ের দোকানে পাঁচজন লোক বসে রাজনীতি নিয়ে কথা বলছিল। তাঁদের মধ্যে একজন বলছিলেন, দেশের মানুষের কোনো স্বাধীনতা নেই। নিবারণবাবু থামলেন না। অফিসে পৌঁছাতে আটটা পঁয়তাল্লিশের লোকাল ধরতে হবে। দেশে
তখন কোভিডের সময়। সারাদিন বাসায় থাকি। মনে হচ্ছিল, ধীরে ধীরে শেকড় গজিয়ে যাচ্ছে।
ভাবলাম, গল্প লেখা শুরু করি। লিখলামও। পরে মনে হলো, লেখা ভালো হয়নি। তাই ফেলে রেখেছিলাম।
সম্প্রতি এক লেখক বন্ধু গল্পগুলো পড়ে বললেন, বই করুন।
আমি বললাম, যার লেখাই হয় না, তার আবার বই!
নিচের গল্পটি পড়ুন। কেমন লাগল জানাতে ভুলবেন না।
—---------
কেয়া
রিটন খান
সকাল ছয়টা বাজতে তিন মিনিট বাকি থাকতেই নিবারণবাবুর ঘুম ভেঙে গেল।
অ্যালার্ম বাজার আগেই তাঁর ঘুম ভাঙে। বহু বছরের অভ্যাস। তিনি বিছানায় শুয়ে অন্ধকারের মধ্যে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ছাদে পুরোনো সিলিং ফ্যানটি ঘুরছে। প্রতি তৃতীয় পাকের সময় তার ভেতর থেকে সামান্য খটখট শব্দ ওঠে। নিবারণবাবু বহুদিন ধরে ভাবছেন, ইলেকট্রিশিয়ান ডেকে ফ্যানটা দেখাবেন। ডাকা হয়নি। ফ্যানটিও সম্ভবত বুঝে গেছে, সংসারে তার অবস্থান একজন দীর্ঘদিনের কর্মচারীর মতো। শব্দ করলেও চাকরি যাবে না, আবার মেরামতও হবে না।
পাশে শুয়ে থাকা তাঁর স্ত্রী কেয়া চোখ না খুলেই বললেন,
“উঠবে না?”
নিবারণবাবু উঠে বসলেন।
প্রশ্নটি আসলে প্রশ্ন ছিল না। ত্রিশ বছরের দাম্পত্যে কিছু বাক্য ধীরে ধীরে আদেশ হয়ে যায়, কিছু আদেশ স্নেহের চেহারা নেয়, আর কিছু স্নেহ এমনভাবে দৈনন্দিন হয়ে ওঠে যে মানুষ তার ওজন আর টের পায় না।
তিনি পা নামিয়ে চটি খুঁজলেন। চটি সব সময় বিছানার ডান পাশে থাকে। একদিন ভুল করে বাঁ পাশে রেখেছিলেন। সেদিন ঘুম থেকে উঠে পা নামাতে গিয়ে মেঝেতে ঠেকে তাঁর মনে হয়েছিল পৃথিবীর নিয়ম ভেঙে গেছে।
বাথরুম, দাঁত মাজা, শেভ, গরম জলে স্নান, সাদা গেঞ্জি, নীল শার্ট, কালো প্যান্ট। নিবারণবাবুর দিনের ভেতরে প্রতিটি কাজের নির্দিষ্ট ঘর ছিল। কোনোটির সঙ্গে অন্যটির দেখা হওয়ার সুযোগ নেই।
সাড়ে ছয়টায় তিনি টেবিলে বসলেন। কেয়া দুটো রুটি, সামান্য আলুভাজা আর এক কাপ চা রাখলেন।
“চিনি কম দিয়েছি,” কেয়া বললেন।
ডাক্তার চিনি কমাতে বলেছেন। ডাক্তার আরও বলেছেন, হাঁটতে হবে, দুশ্চিন্তা কমাতে হবে, রাতে সাত ঘণ্টা ঘুমোতে হবে। নিবারণবাবু সব কথা মন দিয়ে শুনেছিলেন। মানুষ চিকিৎসকের ঘরে বসে সাধারণত এমন ভঙ্গি করে যেন এবার থেকে তার জীবন বিজ্ঞানসম্মতভাবে চলবে। তারপর বাড়ি ফিরে পুরোনো জীবনটাকেই একটু অপরাধবোধ মিশিয়ে চালিয়ে যায়।
তিনি রুটির টুকরো ছিঁড়তে ছিঁড়তে জানালার বাইরে তাকালেন। সামনের বাড়ির কার্নিশে একটি কাক বসে ছিল। কাকটি ঘাড় বাঁকিয়ে রাস্তা দেখছে। তার অফিস নেই, মাসের শেষে ঋণের কিস্তি নেই, মেয়ের বিয়ে নিয়ে আত্মীয়দের প্রশ্ন নেই। তবু নিবারণবাবুর মনে হল, কাকটির জীবনও খুব স্বাধীন নয়। তাকে খাবার খুঁজতে হবে। শীত, বৃষ্টি, রোগ, বড়ো পাখি, মানুষের পাথর, সবই আছে।
প্রকৃতি কাউকে ছুটি দেয় না।
সাতটা কুড়িতে তিনি বাড়ি থেকে বেরোলেন।
গলির মুখে চায়ের দোকানে পাঁচজন লোক বসে রাজনীতি নিয়ে কথা বলছিল। তাঁদের মধ্যে একজন বলছিলেন, দেশের মানুষের কোনো স্বাধীনতা নেই। নিবারণবাবু থামলেন না। অফিসে পৌঁছাতে আটটা পঁয়তাল্লিশের লোকাল ধরতে হবে। দেশের স্বাধীনতা নিয়ে চিন্তার জন্য তাঁর হাতে তখন সাড়ে চার মিনিটও ছিল না।
তিনি একটি সরকারি দপ্তরে হিসাবরক্ষকের কাজ করেন। চাকরির বয়স সাতাশ বছর। প্রথম দিন কাজে যোগ দিয়ে তিনি ভেবেছিলেন, কয়েক বছর অভিজ্ঞতা নিয়ে অন্য কিছু করবেন। ব্যবসা করতে পারেন। ছোটবেলা থেকে তাঁর ছবি আঁকার হাতও ভালো ছিল। কলেজের বন্ধু অসিত বলেছিল, আর্ট কলেজে ভর্তি হতে।
বাবা শুনে বলেছিলেন,
“ছবি এঁকে সংসার চলে?”
নিবারণবাবু উত্তর দেননি।
তাঁর বাবা মিথ্যে বলেননি। সংসার চালাতে টাকা লাগে। অসুস্থ শরীর, বৃদ্ধ মা, স্কুলে পড়া সন্তান, ভাড়া, বাজার, ওষুধ, সবকিছুরই হিসাব আছে। শুধু স্বপ্নের হিসাবের খাতা কেউ রাখে না। ফলে খরচের তালিকায় তার নাম ওঠে না, আবার বকেয়া হিসেবেও তাকে দেখা যায় না।
অফিসে ঢুকেই নিবারণবাবু হাজিরা খাতায় সই করলেন। তারপর নিজের টেবিলে বসে কম্পিউটার চালু করলেন। তাঁর ডেস্কের ওপর তিনটি ফাইল, একটি ক্যালকুলেটর, লাল-নীল দুটি কলম এবং কাচের নিচে মেয়ের ছোটবেলার ছবি।
ছবিতে মেয়েটির বয়স পাঁচ। মাথায় দুটি ঝুঁটি। হাতে লাল বেলুন।
এখন তার বয়স ছাব্বিশ। বেঙ্গালুরুতে চাকরি করে। বছরে দুবার আসে। ফোনে বাবাকে বলে,
“তুমি একটু নিজের মতো বাঁচো।”
নিবারণবাবু কথাটির অর্থ বোঝেন না। নিজের মতো বাঁচা বলতে কী বোঝায়? সকালে দেরি করে ওঠা? অফিস কামাই করা? হঠাৎ ট্রেনে উঠে কোথাও চলে যাওয়া? নাকি কারও অনুমতি ছাড়া নিজের ইচ্ছাকে সত্য বলে স্বীকার করা?
দুপুরে অফিসের বড়োবাবু তাঁকে ডেকে পাঠালেন।
“আগের মাসের রিপোর্টে চারশো আশি টাকা গরমিল আছে।”
নিবারণবাবু বললেন, “আমি আবার দেখছি।”
“দেখে লাভ কী? আপনার বয়স হচ্ছে, নিবারণবাবু। মনোযোগ কমে যাচ্ছে।”
বড়োবাবুর বয়স নিবারণবাবুর চেয়ে সাত বছর কম। কিন্তু পদমর্যাদা মানুষের বয়স দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। তাঁর সামনে বসলে নিবারণবাবুর মনে হয়, তিনি স্কুলের ছাত্র, বাড়ির কাজ ভুলে গেছেন।
টেবিলে ফিরে তিনি হিসাব দেখতে শুরু করলেন। ভুলটি তাঁর ছিল না। নতুন ছেলেটি একটি সংখ্যা দুবার লিখেছে। নিবারণবাবু তা বড়োবাবুকে জানাতে পারতেন। জানালেন না। ছেলেটির চাকরি অস্থায়ী। বাড়িতে অসুস্থ বাবা। গত সপ্তাহে সে নিবারণবাবুর কাছে পাঁচ হাজার টাকা ধার চেয়েছিল।
নিবারণবাবু গরমিল ঠিক করে দিলেন।
বিকেল পাঁচটা চল্লিশে অফিস থেকে বেরিয়ে তিনি বাসে উঠলেন। জানালার ধারে জায়গা পেলেন না। মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাতল ধরলেন। বাসের ভেতরে মানুষের ঘাম, সস্তা সুগন্ধি, ভাজা বাদামের গন্ধ আর ক্লান্তির বাষ্প মিশে আছে। সবাই কোথাও ফিরছে। বাড়ি, মেস, হাসপাতাল, প্রেমিকার কাছে, বৃদ্ধ মায়ের কাছে, অথবা এমন একটি ঘরে যেখানে কেউ অপেক্ষা করছে না।
হঠাৎ বাসটি ব্রেক করল। নিবারণবাবুর শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। পাশে দাঁড়ানো একটি ছেলের কাঁধ ধরে তিনি নিজেকে সামলালেন।
ছেলেটি বিরক্ত হয়ে তাকাল।
নিবারণবাবু হাত সরিয়ে নিলেন। বললেন, “সরি।”
মানুষ শরীর নিয়েও পুরোপুরি স্বাধীন নয়। বাস ব্রেক করলে শরীর সামনে যাবে। জ্বর এলে বিছানায় পড়বে। বয়স হলে হাঁটু ব্যথা করবে। একদিন হৃদপিণ্ড থামবে। যতই ইচ্ছাশক্তির বই পড়া হোক, মাধ্যাকর্ষণ এবং মৃত্যু মোটিভেশনাল বক্তৃতা শোনে না।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিনি দেখলেন কেয়া বসার ঘরে নেই। রান্নাঘরেও নেই। শোবার ঘরে গিয়ে দেখলেন, কেয়া মেঝেতে পড়ে আছেন।
প্রথমে নিবারণবাবু কিছুই বুঝতে পারলেন না। তাঁর মনে হল, কেয়া হয়তো আলমারির নিচে কিছু খুঁজতে গিয়ে শুয়ে পড়েছেন। তারপর দেখলেন, তাঁর ডান হাতটি অস্বাভাবিকভাবে বাঁকানো। মুখের এক পাশ সামান্য নেমে গেছে।
হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, পরীক্ষা, কাগজে সই, টাকা জমা, ডাক্তারদের দ্রুত হাঁটা। সমস্ত ঘটনা এমন গতিতে ঘটল যে নিবারণবাবুর নিজস্ব কোনো অনুভূতি তৈরি হওয়ার সময় পেল না।
রাত দেড়টার দিকে ডাক্তার বললেন,
“স্ট্রোক হয়েছে। এখন বাহাত্তর ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
আইসিইউর বাইরে একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে নিবারণবাবু বসে রইলেন। তাঁর হাতে কেয়ার শাড়ির আঁচল থেকে খোলা একটি সেফটিপিন। হাসপাতালে আনার সময় শাড়িটি বদলাতে হয়েছিল। নার্স পিনটি তাঁর হাতে দিয়েছিল। কেন দিয়েছিল, তিনি জানেন না।
সামনের দেয়ালে একটি ঘড়ি ঝুলছিল। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতি তার কাজ করছে। হাসপাতালের কর্মীরা নিয়ম পালন করছে। টাকা অনুযায়ী কেবিন, বিধি অনুযায়ী সাক্ষাৎ, রিপোর্ট অনুযায়ী চিকিৎসা। এই বিশাল ব্যবস্থার মধ্যে নিবারণবাবু বসে আছেন একটি সেফটিপিন হাতে।
হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল, বিয়ের পর কেয়া একবার বলেছিল,
“সমুদ্র দেখতে যাব?”
নিবারণবাবু বলেছিলেন, “এই বছর একটু টানাটানি। পরের বছর যাব।”
পরের বছর মেয়ে হল। তারপর মেয়ের স্কুল। বাবার অসুখ। বাড়ির ঋণ। অফিসের বদলি। কেয়ার মায়ের মৃত্যু। এক বছর আরেক বছরের পাশে এসে এমনভাবে দাঁড়াল যে মাঝখান দিয়ে সমুদ্র দেখা গেল না।
কেয়া আর কখনো সমুদ্রের কথা তোলেননি।
নিবারণবাবুর হঠাৎ মনে হল, তাঁরা দুজন একটি ঘরে বহু বছর ধরে বাস করেছেন। ঘরটির দরজা খোলা ছিল। কেউ পাহারা দেয়নি। তবু তাঁরা বের হননি।
কারণ বাইরে যাওয়ার কথা তাঁদের মনে পড়েনি।
কয়েদি যদি প্রতিদিন একই সময়ে ওঠে, একই বাটিতে ভাত খায়, একই দেয়ালের দিকে তাকায়, একসময় দেয়াল আর তার চোখে পড়ে না। সে শুধু জীবনযাপন করে। বন্দিত্ব তখন ইটের তৈরি থাকে না। তা অভ্যাস হয়ে যায়।
ভোর চারটার দিকে একজন নার্স এসে বললেন,
“আপনি চাইলে একটু বাড়ি ঘুরে আসতে পারেন। এখন রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল।”
নিবারণবাবু মাথা নাড়লেন।
তিনি হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে এলেন। আকাশের রং ধূসর। ফুটপাতে একটি কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। দূরে চায়ের দোকান খুলছে। দুধের গাড়ি যাচ্ছে। শহর আবার তার নির্ধারিত কাজ শুরু করেছে।
নিবারণবাবু হাঁটতে লাগলেন।
কোথায় যাচ্ছেন, জানেন না।
প্রথমে ধীরে, তারপর একটু জোরে। একটি মোড়ে এসে তিনি থামলেন। ডান দিকের রাস্তা বাড়ির দিকে গেছে। বাঁ দিকের রাস্তা নদীর দিকে।
অফিসে যাওয়ার দিনগুলোতে তিনি সব সময় ডান দিকে যান।
সেদিন বাঁ দিকে হাঁটলেন।
নদীর ধারে পৌঁছাতে সূর্য উঠে গেল। ঘাটে কয়েকজন মানুষ স্নান করছে। একজন বৃদ্ধ কাপড় কাচছেন। দুটি ছেলে জলে পাথর ছুড়ছে। দূরে একটি নৌকা যাচ্ছে, তার পেছনে সরু ঢেউ তৈরি হচ্ছে।
নিবারণবাবু সিঁড়িতে বসে পকেট থেকে সেফটিপিনটি বের করলেন।
এত ছোট একটি বস্তু। বন্ধ করলে কাপড় আটকে রাখে। খুললে সামান্য ধারালো হয়ে ওঠে।
তিনি সেটি খুলে হাতের তালুতে রাখলেন।
তারপর অনেক বছর পর নিজের কাছে একটি প্রশ্ন করলেন।
কেয়া সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে তাঁরা কোথায় যাবেন?
উত্তরটি সঙ্গে সঙ্গে এল না। স্বাধীনতার প্রথম অসুবিধা সম্ভবত এই। কেউ বলে দেয় না, এখন কী করতে হবে।
নিবারণবাবু নদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কিছুক্ষণ পরে খুব আস্তে বললেন,
“সমুদ্র।”
নৌকাটি তখন অনেক দূরে চলে গেছে। তবু তার তৈরি ঢেউ এসে ঘাটের শেষ সিঁড়িতে লাগল।
মানুষটি উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে খোলা সেফটিপিন।


