মানুষ ৪০
রিটন খানের ছোট গল্প
রাত তখন এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কুকুরও আর ঘেউ ঘেউ করে না।
বাজারের লোহার শাটারগুলো একে একে নেমে গেছে। মাছের সারির নিচে জমে থাকা নোনা পানি কালচে হয়ে আছে, তার মধ্যে দু-একটা আঁশ চাঁদের আলো পেয়ে চকচক করছে। হোটেলের চুল্লি নিভেছে অনেকক্ষণ। বাসস্ট্যান্ডের দিকে শেষ বাসটা গোঁ গোঁ করতে করতে চলে যাওয়ার পর থেকে রাস্তা ফাঁকা। শুধু মাঝে মাঝে দূরে কোনো ট্রাকের আওয়াজ ওঠে, তারপর সেই শব্দও গিলে ফেলে রাত।
সামাদ পানওয়ালা দোকানের কাঠের পাটাতনের ওপর বসে শেষ খিলিটা বানাচ্ছিল।
দোকান বলতে চার হাত বাই পাঁচ হাতের একটা বাক্স। টিনের ছাউনি। সামনে কাঁচের ছোট শোকেসে জর্দার কৌটো, চুন, খয়ের, এলাচ, সুপারি, বিড়ি, তিন ব্র্যান্ডের সিগারেট, মাথাব্যথার বড়ি, এক টাকার শ্যাম্পুর প্যাকেট। পেছনের দেওয়ালে পুরনো ক্যালেন্ডার। দেবদেবী নেই, সিনেমার নায়িকাও নেই, আছে এক ওষুধ কোম্পানির ছবি, লালচে একটা সুস্থ ফুসফুস আর তার পাশে কালো পচা আরেকটা ফুসফুস। নিচে লেখা, ধূমপান মৃত্যু ঘটায়।
লেখাটার ঠিক সামনে সারি করে সিগারেট রাখা।
সামাদ পানপাতার ডাঁটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল, আর একটা?
লোকটা বেঞ্চে বসে ছিল তখনও।
সন্ধের পর থেকে কত লোক এল গেল। রিকশাওয়ালা, থানার কনস্টেবল, কলেজের ছোকরা, দুজন কাপড়ের দোকানদার, একজন স্কুলমাস্টার, বাসের হেলপার, নেশায় ঢুলতে থাকা এক পাকা চুলের লোক। সবাই চলে গেছে।
এই লোকটা যায়নি।
সামাদ প্রথমে ভেবেছিল কোনো বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। পরে মনে হলো মাতাল। কিন্তু লোকটার মুখে মদের গন্ধ নেই। সিগারেটও ধরায়নি। একবার শুধু বলেছিল, একটা মিষ্টি পান দেন, জর্দা ছাড়া।
সেই পান সে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে খেয়েছে।
এখন তার সামনে লাল রসের কোনো দাগ নেই। মাটিতে থুথুও ফেলেনি।
লোকটা বলল, দেন।
সামাদ আরেকটা পানপাতা নিল।
পাতাটা ভালো নয়। কিনারা একটু ছেঁড়া। ভালো পাতাগুলো কাল সকালের খদ্দেরদের জন্য রেখে দিয়েছে সে। রাতের শেষ লোককে ভালো পান দিয়ে লাভ কী। লোকটা হয়তো আর কোনোদিন আসবেও না।
চুনের ডিবেতে আঙুল ঢুকিয়ে সামান্য চুন মাখাতে গিয়ে সামাদ দেখল লোকটার পা।
খালি পা।
এতক্ষণ খেয়াল করেনি।
রাস্তার ধুলো নেই, কাদা নেই, গোড়ালি ফাটা নয়। অথচ বাজারের এদিকে খালি পায়ে কেউ এলে পায়ের তলা এমন পরিষ্কার থাকার কথা নয়।
সামাদ তাকিয়ে থেকে বলল, জুতা কই আপনার?
লোকটা নিজের পায়ের দিকে চেয়ে যেন প্রথম দেখল।
বলল, খুলে এসেছি।
কোথায়?
ওপরে।
সামাদ হেসে ফেলল।
রাত বেশি হলে মানুষ উল্টাপাল্টা কথা বলে। নিজেরই অভিজ্ঞতা আছে। গত বছর রমজানের শেষে টানা তিন রাত দোকান করে চতুর্থ রাতে বাড়ি ফেরার সময় সামাদ নিজেই একটা ছাগলকে মানুষ ভেবেছিল।
পান ভাঁজ করতে করতে বলল, কোন ওপর?
লোকটা এবার তার দিকে তাকাল।
চোখ দুটো মোটেও ভয়ংকর নয়। বরং ক্লান্ত। চোখের নিচে কালি। কপালে ঘাম নেই। চুল পাকতে শুরু করেছে। বয়স বোঝা যায় না, চল্লিশও হতে পারে, ষাটও হতে পারে।
আসমান।
সামাদ পানটা এগিয়ে দিল।
এই নেন আসমানের পান।
লোকটা পান মুখে দিয়ে ধীরে ধীরে চিবোল।
সামাদ দোকান গোছাতে শুরু করল। জর্দার কৌটো বন্ধ। সুপারি ঢাকল। টাকার বাক্স টেনে এনে গুনল।
দুশো সাতাত্তর টাকা।
খুব খারাপ দিন না।
তার মধ্যে একশো বিশ টাকা বাকিতে গেছে।
তাহলে খারাপই।
বাড়িতে আজ চাল নিয়ে যেতে হবে। মেয়েটার কাশির সিরাপও শেষ। ছোট ছেলেটা সকালে বলেছে স্কুলে দশ টাকা লাগবে পতাকা কিনতে। কিসের পতাকা সামাদ ঠিক বোঝেনি। স্কুলে এখন সবকিছুর জন্য টাকা লাগে। একদিন গাছ লাগানোর টাকা, একদিন শহীদ দিবসের টাকা, একদিন পরীক্ষার ফি, একদিন উন্নয়ন ফি। দেশের উন্নতি যত বাড়ে, সামাদের খরচও তত বাড়ে।
টাকা গুনতে গুনতে সে জিজ্ঞেস করল, বাড়ি যাবেন না?
লোকটা বলল, আমার বাড়ি একটু দূর।
কত দূর?
অনেক।
কোন জেলা?
লোকটা একটু ভেবে বলল, জেলা নেই।
সামাদ টাকা গোনা থামিয়ে তার দিকে তাকাল।
আপনার মাথাটা ঠিক আছে তো?
এইবার লোকটা হাসল।
হাসলে তাকে একটু সুন্দর দেখায়।
সে বলল, ছিল।
কবে খারাপ হলো?
মানুষ হওয়ার পর।
সামাদ বিরক্ত হলো।
এই ধরনের কথা তার পছন্দ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেপেলেরা মাঝে মাঝে আসে, পান খেতে খেতে রাজনীতি, দর্শন, কবিতা করে। দশ টাকার পান খেয়ে পঞ্চাশ টাকার বক্তৃতা দেয়। শেষ পর্যন্ত বলে, মামা পরে দেব।
সামাদ বলল, ভাই, দোকান বন্ধ করব।
করেন।
আপনি উঠেন তাহলে।
উঠছি।
লোকটা উঠল না।
সামাদ টিনের ছোট বাতিটা নিভিয়ে শুধু সামনের বাল্বটা জ্বালিয়ে রাখল। অন্ধকার একটু ঘন হলো। তখন হঠাৎ একটা গন্ধ পেল সে।
পোড়া গন্ধ।
বিদ্যুতের তার পুড়লে যেমন হয়, আবার ঠিক তেমনও নয়। চুল পোড়ার গন্ধ আছে। সঙ্গে মাংসের মতো কিছু।
সামাদ নাক টেনে বলল, কই কিছু পুড়ছে নাকি?
লোকটা বলল, আমার গা থেকে হতে পারে।
এইবার সামাদ সত্যিই একটু ভয় পেল।
লোকটা চুপ করে পান চিবোয়।
দূরে কোথাও একটা কুকুর হঠাৎ ডেকে উঠেছিল। একবার। তারপর আর ডাকেনি।
সামাদ বলল, আপনি কে ভাই?
লোকটা উত্তর দেওয়ার আগে পানটা গিলে ফেলল।
সামাদ স্পষ্ট দেখল।
পুরো পান।
চিবানো পাতা, সুপারি, সব।
গিলে ফেলল।
তারপর বলল, নাম অনেক।
একটা বলেন।
আপনাদের ভাষায়?
হ।
ইবলিস।
সামাদের ডান হাত টাকার বাক্সের ওপর স্থির হয়ে গেল।
লোকটা আবার বলল, শয়তানও বলেন। ডেভিল বলেন কেউ কেউ। নাম নিয়ে আমার বিশেষ আপত্তি নেই।
সামাদ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
তারপর অকারণে হেসে উঠল।
এই রাতদুপুরে পাগলই জুটল শেষে।
সে বলল, শয়তান সাহেব, পান কেমন হলো?
ভালো।
আরেকটা দেব?
দেন।
সামাদ নিজের হাসি থামাতে পারল না।
হাসতে হাসতেই পানপাতা বের করল।
এইবার ভালো পাতাই নিল।
চুন, খয়ের, মিষ্টি জর্দা না, লোকটা জর্দা খায় না। একটু নারকেল কুচি দিল। দুটো এলাচ ভেঙে দিল।
পান বানাতে বানাতে বলল, শয়তানের টাকা আছে তো?
আছে।
দেখি।
লোকটা পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা কয়েন রাখল পাটাতনের ওপর।
সামাদ কয়েনটা তুলে ধরল।
চেনে না।
এক পাশে কোনো রাজামহারাজার মুখ। অন্য পাশে আগুনের মধ্যে মানুষের মতো একটা আকৃতি।
কোন দেশের?
লোকটা বলল, খুব পুরনো দেশের।
এটা চলবে না। বাংলাদেশি টাকা দেন।
আমার কাছে নেই।
তাহলে পানও নাই।
লোকটা বিনীত গলায় বলল, বাকিতে দেন।
সামাদ এবার এমন জোরে হাসল যে কাশতে হলো।
শয়তান বাকিতে পান খায়!
খায়।
বাকি শোধ করেন?
সবাইয়ের করি।
কবে?
সময় হলে।
সামাদের হাসি ধীরে ধীরে থেমে গেল।
কথাটার ভেতরে কী ছিল সে ধরতে পারল না।
সে পানটা লোকটার হাতে দিয়ে বলল, নেন। জীবনে শয়তানকে বাকিতে পান খাওয়াইছি, এই গল্প অন্তত বলতে পারব।
কাকে বলবেন?
বউরে।
বিশ্বাস করবে?
করবে না।
বন্ধুদের?
তারাও না।
তাহলে?
সামাদ ভাবল।
তারপর বলল, নিজেরে বলব।
লোকটা পান মুখে দিল।
এইবার তারা দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
রাত আরও গাঢ় হয়ে এসেছে। মশারা সামাদের পায়ের কাছে ঘুরছে। পায়ের পাতায় দুই জায়গায় কামড়েছে। সে নখ দিয়ে চুলকাল।
শয়তান বলল, সামাদ সাহেব।
সামাদ চমকে তাকাল।
আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?
জানি।
কই থেকে?
অনেক কিছু জানি।
আমার বউয়ের নাম?
হালিমা।
মেয়ের?
শাপলা।
ছেলের?
রাব্বি।
সামাদের মুখ শুকিয়ে গেল।
লোকটা শান্ত গলায় বলল, ভয় পাবেন না।
ভয় পাব না মানে? রাত বারোটার সময় এক লোক আমার বউ-বাচ্চার নাম বলে, তারপর বলে আমি শয়তান, আমি ভয় পাব না?
আপনি তো অনেক ভয় পেয়েছেন জীবনে।
সামাদ চুপ।
লোকটা বলতে লাগল, গত মাসে মেয়ের জ্বর যখন কমছিল না। তার আগে যখন দোকানের মাল বাকিতে এনে টাকা দিতে পারেননি। থানার লোক সিগারেট নিয়ে টাকা না দিলে। বাজার কমিটির লোক চাঁদা চাইলে। বউয়ের পেটে ব্যথা উঠেছিল যেদিন। আপনার ছোট ভাই জমির ভাগ চাইতে এসেছিল। ভয় তো আপনার পরিচিত জিনিস।
সামাদের বুকের মধ্যে ঠক করে উঠল।
সে বলল, আপনি এসব জানেন কেমনে?
বলেছি তো।
শয়তান?
হ্যাঁ।
সামাদ একবার রাস্তার দিকে তাকাল।
কেউ নেই।
দৌড়ে যাবে?
দোকানের টাকা ফেলে?
দোকান ফেলে?
আর দৌড়ে গেলেই বা কী হবে?
সে ধীরে ধীরে পাটাতনে বসে পড়ল।
বলল, আপনি আসছেন কেন?
পান খেতে।
মিথ্যা কথা।
শয়তান একটু হাসল।
দেখেন, এই অভিযোগটা আমার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি।
আপনি মিথ্যা বলেন না?
বলি। কিন্তু আপনারা যখন বলেন, তখন বেশি বলেন।
সামাদ মুখ শক্ত করল।
আমাগো ঘাড়ে দোষ দিয়েন না।
আমি দিচ্ছি না।
সব খারাপ কাজ আপনার প্ররোচনায় হয় না?
কে বলেছে?
হুজুররা বলে।
তাদের ব্যবসা আছে।
কথাটা বলে শয়তান এমন স্বাভাবিকভাবে পান চিবোতে লাগল, যেন বাজারের আরেক দোকানদারের হিসাব নিয়ে কথা হচ্ছে।
সামাদ অস্বস্তিতে পড়ল।
শয়তান বলল, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
করেন।
আজ থানার কনস্টেবল যে দুই প্যাকেট সিগারেট নিয়ে গেল, টাকা চেয়েছিলেন?
না।
কেন?
চাইলে ঝামেলা করে।
আমি কি বলেছিলাম টাকা না চাইতে?
না।
দুপুরে যে বুড়ি দুই টাকার সুপারি বাকিতে চেয়েছিল, দেননি কেন?
সামাদ রেগে গেল।
ব্যবসা করি। সবাইরে বাকিতে দিলে আমার বাচ্চা খাবে কী?
ঠিক।
শয়তান মাথা নেড়ে বলল, খুব ঠিক কথা।
সামাদের রাগ আরও বাড়ল।
আপনি কী বোঝাতে চান?
কিছু না।
তাহলে জিজ্ঞেস করেন কেন?
সময় কাটাই।
শয়তানেরও সময় কাটে?
অনন্তকাল খুব লম্বা জিনিস, সামাদ সাহেব।
বাতিটা একবার দপ করে উঠল।
সামাদ লক্ষ্য করল লোকটার ছায়া নেই।
বাল্বের আলো তার শরীর পেরিয়ে পেছনের দেওয়ালে পড়েছে। বেঞ্চের ছায়া আছে। কৌটার ছায়া আছে। সামাদের নিজের মাথার ছায়াও আছে।
লোকটার নেই।
এইবার সামাদের মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে ঠাণ্ডা কিছু নেমে গেল।
সে খুব আস্তে বলল, আপনি সত্যিই?
শয়তান পান শেষ করে বলল, এই নিয়ে এতক্ষণ কী আলোচনা করছি?
সামাদের জিভ শুকিয়ে গেছে।
পানি খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু গ্লাস তুলতে হাত কাঁপবে, সে জানে। তাই তুলল না।
শয়তান হঠাৎ বলল, আপনি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না?
কি?
মানুষ সাধারণত করে।
কী জিজ্ঞেস করে?
মরার পর কী হয়। দোজখ কেমন। আল্লাহ আছেন কি না। কার সঙ্গে কার বউ পালাবে। লটারির নম্বর। ব্যবসা বাড়ানোর উপায়। শত্রু কবে মরবে।
সামাদ কিছুক্ষণ ভাবল।
তারপর বলল, আমার মাইয়াটা বাঁচবে তো?
শয়তান মুখ তুলে তাকাল।
প্রথমবার তার মুখ বদলে গেল।
কেমন যেন বিরক্ত, ক্লান্ত।
সে বলল, এই প্রশ্নটাই করেন কেন?
কাশি যায় না।
ডাক্তার দেখান।
টাকা লাগে।
সরকারি হাসপাতালে যান।
গেছিলাম।
তারপর?
ডাক্তার ছিল না।
শয়তান আর কথা বলল না।
সামাদ বলল, আপনি জানেন না?
জানি না।
আপনি শয়তান হয়ে এইটাও জানেন না?
সব জানা আমার কাজ না।
তাহলে কী জানেন?
মানুষ কোথায় দুর্বল, তা মোটামুটি জানি।
সামাদ গুম হয়ে বসে থাকল।
তার মেয়ের বয়স আট। রাতে কাশি উঠলে বুকের ভেতর বাঁশির মতো শব্দ হয়। ওষুধ খেলে দুই দিন কমে, আবার শুরু হয়। গত সপ্তাহে মেয়েটা বলেছিল, আব্বা, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব।
সামাদ বলেছিল, আগে বাঁচ।
কথাটা বলেই পরে সারারাত ঘুমাতে পারেনি।
শয়তান বলল, আরেকটা পান দেবেন?
সামাদ এবার বিনা কথায় বানাতে শুরু করল।
হাত আর কাঁপছে না।
পান বানাতে বানাতে বলল, একটা কথা কই?
কন।
আপনারে মানুষ এত ভয় পায় কেন?
আমাকে?
হ।
শয়তান একটু ভাবল।
তারপর বলল, সুবিধা হয়।
কার?
সবার।
মানে?
মানুষ নিজের কাজ আমার ঘাড়ে দিতে পারে। আমি অভিযোগ করি না।
সামাদ পান বাড়িয়ে দিল।
তাহলে খুনখারাবি?
মানুষ।
ধর্ষণ?
মানুষ।
যুদ্ধ?
মানুষ।
বাচ্চারে না খাওয়ায়ে রাখা?
মানুষ।
ওষুধ চুরি?
মানুষ।
শয়তান একটু হাসল।
আমি এত কাজ একা করলে বিশ্রাম নিতাম কখন?
সামাদ হাসল না।
সে বলল, তাহলে আপনার কাম কী?
শয়তান পানটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দেখল।
বলল, একটু ঠেলা দিই কখনো।
কতটুকু?
খুব অল্প।
মানুষ বাকি পথ নিজে যায়?
বেশির ভাগ সময় দৌড়ে যায়।
বাজারের ঘড়িতে রাত একটা বাজল।
টং।
শব্দটা ছড়িয়ে গেল ফাঁকা রাস্তায়।
শয়তান উঠে দাঁড়াল।
সামাদ বলল, যাবেন?
হ্যাঁ।
কই?
আরেক জায়গায়।
কী জায়গা?
একটা হাসপাতাল।
কেন?
ওখানে আজ রাতে কিছু কাজ আছে।
সামাদের বুক ধক করে উঠল।
কী কাজ?
শয়তান বেঞ্চ থেকে নামতে নামতে বলল, আমার না।
সে রাস্তায় পা দিল।
সামাদ ডাকল, শোনেন।
শয়তান ফিরল।
বাকিটা?
কোনটা?
পানের টাকা।
শয়তান কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল। তারপর বলল, আপনার খাতায় লিখে রাখেন।
কী নামে লিখব?
একটু ভেবে লোকটা বলল, মানুষের নামে লিখে রাখেন।
সে হাঁটতে শুরু করল।
দশ পা।
বিশ পা।
তারপর অন্ধকারে আর তাকে দেখা গেল না।
সামাদ অনেকক্ষণ বসে রইল।
বাজারে বাতাস উঠেছে। শুকনো পানপাতার একটা টুকরো পাটাতন থেকে উড়ে রাস্তায় গেল। দূরে হাসপাতালের দিক থেকে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা গেল। তারপর আরেকটা।
সামাদ ধীরে ধীরে টাকার বাক্স টেনে নিল।
বাকির খাতাটা বের করল।
পাতার পর পাতা নাম।
বাবুল ৩২।
কাশেম ১৭।
জব্বার ৪৫।
বাজার পুলিশ ২৮০।
হারুন মাস্টার ৬০।
নিচের ফাঁকা লাইনে কলম রেখে সে একটু ভাবল।
তারপর লিখল,
মানুষ ৩০।
খাতা বন্ধ করতে গিয়ে আবার খুলল।
তিরিশের ওপর একবার দাগ টেনে লিখল,
মানুষ ৪০।
শয়তান তিনটা পান খেয়েছিল।
হিসাব ভুল করা ঠিক নয়।



