নীল দরজার ওপাশে
এখন সে হাসে না। বইয়ের আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। একটা বই বের করে। প্রথম পৃষ্ঠা পড়ে। কখনো দ্বিতীয় পৃষ্ঠাও পড়ে। তারপর বুকের ভেতর চাপা অস্বস্তি শুরু হয়। বই বন্ধ করে আবার জায়গামতো রেখে দেয়।
খোকনের বয়স বত্রিশ।
বত্রিশ বছর বয়সে একজন মানুষের কিছু নির্দিষ্ট সমস্যা থাকার কথা। চাকরিতে উন্নতি হচ্ছে না, বিয়ে হচ্ছে না, চুল পড়ছে, রাতে ঘুম হচ্ছে না। খোকনের এই চারটি সমস্যাই আছে। এর সঙ্গে নতুন একটি সমস্যা যোগ হয়েছে।
সে কোনো বই শেষ করতে পারে না।
একসময় খোকন বইয়ের পোকা ছিল। পোকা কথাটা সে পছন্দ করত না। তার ধারণা, বই যারা পড়ে তাদের সঙ্গে পোকামাকড়ের তুলনা করা অন্যায়। পোকামাকড় বই খায়, পাঠক বই পড়ে। দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
তার ছোট বোন মিতু বলত, একই বিষয়। তুইও বই খাস। শুধু দাঁত দিয়ে খাস না।
খোকন তখন হেসে ফেলত।
এখন সে হাসে না। বইয়ের আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। একটা বই বের করে। প্রথম পৃষ্ঠা পড়ে। কখনো দ্বিতীয় পৃষ্ঠাও পড়ে। তারপর বুকের ভেতর চাপা অস্বস্তি শুরু হয়। বই বন্ধ করে আবার জায়গামতো রেখে দেয়।
মিতু একদিন বলল, তোর সমস্যা কী?
খোকন বলল, জানি না।
বই পড়তে ইচ্ছা করে না?
ইচ্ছা করে।
তাহলে পড়িস না কেন?
পারি না।
এই উত্তরে মিতু সন্তুষ্ট হলো না। সে সাধারণত কোনো উত্তরেই সন্তুষ্ট হয় না। তার ধারণা, পৃথিবীর সব মানুষই গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য তার কাছ থেকে গোপন করছে।
সে সন্দেহভরা চোখে বলল, প্রেমে পড়েছিস?
না।
ব্যর্থ প্রেম?
না।
সফল প্রেম?
সেটাও না।
তাহলে সমস্যা ডাক্তারকে দেখা।
খোকন বলল, বই পড়তে না পারলে কোন ডাক্তার দেখায়?
মিতু সঙ্গে সঙ্গে বলল, চোখের ডাক্তার।
খোকন চোখের ডাক্তার দেখাল। ডাক্তার তার চোখে আলো ফেললেন। দূরের অক্ষর পড়তে দিলেন। চোখের চাপ মাপলেন। শেষে বললেন, আপনার চোখ ভালো।
খোকন বলল, বই পড়তে পারি না।
ডাক্তার বললেন, অডিওবুক শুনুন।
ডাক্তারের পরামর্শ তার পছন্দ হলো না। কেউ ভাত খেতে না পারলে তাকে ভাতের গল্প শোনানো যায় না।
খোকনের এই অসুখ শুরু হয়েছে তিন বছর আগে।
সেবার পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে সে একটি বই কিনেছিল। বইটির নাম ছিল নীল দরজার ওপাশে। লেখকের নাম অচিন্ত্য দাশ। লেখকের ছবি ছিল না। জীবনী ছিল না। প্রকাশকের ঠিকানাও অস্পষ্ট। শুধু লেখা, পুরান ঢাকা।
বইটির মলাট নীল। মলাটের মাঝখানে একটি দরজা আঁকা। দরজায় কোনো হাতল নেই।
দোকানদার বইটি দিতে চায়নি।
লোকটির নাম ছিল বাচ্চু। তার নিচের ঠোঁট অস্বাভাবিক মোটা। কথা বলার সময় ঠোঁটটি আলাদাভাবে নড়ত।
বাচ্চু বলেছিল, অন্য বই নেন।
খোকন বলেছিল, কেন?
বইটা ভালো না।
পড়ে দেখেছেন?
না।
না পড়েই বুঝলেন ভালো না?
বাচ্চু নিচের ঠোঁট নাড়িয়ে বলল, ভালো বই মানুষ রেখে দেয়। এই বই সবাই ফেরত দেয়।
খোকন হেসে বলেছিল, বই ফেরত নেয় নাকি?
আপনি আনলে নেব।
কত দেবেন?
যত দিয়ে নিচ্ছেন, ততই দেব।
খোকন বইটি একশো বিশ টাকা দিয়ে কিনেছিল।
সেই রাতেই পড়তে শুরু করল।
গল্পটি ছিল এক গ্রামের ডাকপিয়নকে নিয়ে। ডাকপিয়নের নাম কাশেম। সে প্রতিদিন এমন কিছু চিঠি বিলি করত, যেগুলো কেউ লেখেনি। মৃত বাবার কাছ থেকে ছেলের কাছে চিঠি আসছে। জন্ম না নেওয়া সন্তান তার মাকে লিখছে। পুকুরে ডুবে মারা যাওয়া এক মেয়ে স্কুলের বান্ধবীকে জানাচ্ছে, পানির নিচে তার খুব ঠান্ডা লাগে।
গল্পের শুরুটা অদ্ভুত হলেও ভাষা ছিল খুব সাধারণ। কাশেম সকালে ভাত খায়। তার স্ত্রী তরকারিতে লবণ বেশি দেয়। ডাকঘরের পোস্টমাস্টার দুপুরে ঘুমায়। গ্রামের চেয়ারম্যানের হাঁপানি আছে। সবকিছু এত পরিচিত যে অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোও স্বাভাবিক মনে হয়।
খোকন রাত জেগে পড়ল।
ভোরের দিকে বই শেষ হলো।
শেষ পৃষ্ঠায় কাশেম নিজের নামে একটি চিঠি পায়। খামের ওপর তার হাতের লেখা। চিঠির ভেতর মাত্র একটি বাক্য:
‘যে দরজার কোনো হাতল নেই, সেই দরজা ভেতর থেকে খোলে।’
কাশেম বাড়ি ফিরে দেখে, তার শোবার ঘরের দেয়ালে নীল রঙের একটি দরজা।
গল্প সেখানেই শেষ।
খোকন বই বন্ধ করল। তখন ফজরের আজান হচ্ছে। জানালার বাইরে আকাশ ধূসর। পাশের বাড়ির ছাদে একটি কাক বসে আছে। কাকটি তার দিকে তাকিয়ে আছে বলে মনে হলো।
খোকনের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা তৈরি হলো।
সেই শূন্যতা দুঃখের না। আনন্দেরও না। মনে হলো তার ভেতর থেকে পরিচিত কিছু সরিয়ে নিয়ে সেখানে অন্য কিছু রেখে দেওয়া হয়েছে।
সকালবেলা মিতু বলল, সারারাত পড়েছিস?
হুঁ।
বই কেমন?
খোকন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, খুব খারাপ।
তাহলে সারারাত পড়লি কেন?
জানি না।
বইটা আমাকে দিবি?
না।
খোকন বইটি কাউকে দিল না। ফেরতও দিল না। আলমারির একেবারে ওপরের তাকে রেখে দিল।
তারপর থেকেই পরিবর্তন শুরু হলো।
আগে সে গোয়েন্দা কাহিনি খুব পছন্দ করত। এখন গোয়েন্দা বই খুললেই বিরক্ত লাগে। খুন হয়েছে, খুনি কে, কেন খুন করেছে, এসব তার কাছে ছেলেমানুষি মনে হয়। মানুষের মৃত্যু ঘটলে আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, মৃত মানুষটি কোথায় গেল। অথচ গোয়েন্দারা পড়ে থাকে সিগারেটের ছাই আর জুতার দাগ নিয়ে।
প্রেমের উপন্যাস পড়তেও তার কষ্ট হয়। নায়ক নায়িকা কেন নিজেদের মনের কথা বলে না, এই প্রশ্নে সে অস্থির হয়ে পড়ে। দুজন মানুষ একে অন্যকে ভালোবাসে অথচ তিনশো পৃষ্ঠা ধরে ভুল বোঝাবুঝি করছে। খোকনের ইচ্ছা করে বইয়ের ভেতর ঢুকে তাদের দুজনকে এক ঘরে বসিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।
কবিতা পড়তে গেলে সমস্যা আরও বেশি হয়। কিছু কিছু লাইন পড়ামাত্র তার চোখের সামনে নীল দরজা ভেসে ওঠে।
একসময় সে নতুন বই কেনা বন্ধ করল।
তার বদলে অদ্ভুত সব কাজ শুরু করল।
রাতে ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রাস্তার বাতিগুলোর নিচে ছায়া দেখে। অচেনা বাড়ির বন্ধ জানালার দিকে তাকিয়ে ভাবে, ওই ঘরে কে জেগে আছে। মাঝেমধ্যে পুরোনো পোস্টকার্ড কিনে আনে। যাদের জন্য লেখা হয়েছিল, তারা এখন বেঁচে আছে কি না, হিসাব করার চেষ্টা করে।
মিতু বলল, তুই দিন দিন পাগল হচ্ছিস।
খোকন বলল, হতে পারে।
পাগলরা নিজের পাগলামি স্বীকার করে না।
তাহলে আমি পাগল না।
এটাও পাগলের মতো কথা।
খোকন জবাব দিল না।
এক বৃহস্পতিবার বিকেলে সে অফিস থেকে ফেরার সময় আবার বাচ্চুর দোকানে গেল। দোকানটি নেই। সেখানে এখন মোবাইল ফোনের কভার বিক্রি হয়।
দোকানের ছেলেকে খোকন জিজ্ঞেস করল, এখানে আগে পুরোনো বইয়ের দোকান ছিল না?
ছেলে বলল, ছিল।
বাচ্চু নামে একজন বসত।
চিনি না।
দোকান কবে উঠে গেছে?
অনেক আগে।
কত আগে?
ছেলেটি বিরক্ত হয়ে বলল, আমি কীভাবে বলব? আমি তখন স্কুলে পড়ি।
খোকন পাশের চায়ের দোকানে খোঁজ নিল। দোকানদার বৃদ্ধ মানুষ। তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, বইয়ের দোকান ছিল। বাচ্চু চালাত না। বাচ্চুর বাবা চালাত।
বাচ্চু?
বাচ্চু ছোটবেলায় মারা গেছে। পানিতে ডুবে।
খোকন বলল, আপনি নিশ্চিত?
চা-ওয়ালা বিরক্ত হলেন। পানিতে ডুবে মরার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার কী আছে? মানুষ পানিতে ডুবলে উঠে আসে, জানাজা হয়, কবর হয়। তিনি বললেন, আমি জানাজায় ছিলাম।
খোকন আর কিছু বলল না।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে সে আলমারির ওপরের তাক থেকে নীল দরজার ওপাশে নামাল।
বইটির মলাট আর নীল নেই। ধূসর হয়ে গেছে। আঁকা দরজাটিও নেই।
খোকন দ্রুত পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগল।
সব পৃষ্ঠা সাদা।
একটি অক্ষরও নেই।
শুধু শেষ পাতায় কালো কালিতে লেখা:
‘এবার তোমার চিঠি বিলি করার সময় হয়েছে।’
খোকন অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
রাত বারোটার দিকে দরজায় টোকা পড়ল।
মিতু পাশের ঘর থেকে বলল, ভাইয়া, দেখ তো কে এসেছে।
খোকন দরজা খুলল।
বাইরে কেউ নেই।
মেঝেতে একটি খাম পড়ে আছে।
খামের ওপর লেখা, ‘মিতু রহমান।’
লেখাটা খোকনের।
মিতু পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে বলল, আমার চিঠি?
খোকন খামটি তুলল। তার হাত কাঁপছে।
মিতু বলল, কে দিয়েছে?
জানি না।
খুলব?
না।
কেন?
খোকন উত্তর দিতে পারল না।
মিতু তার হাত থেকে খাম নিয়ে ফেলল। খাম ছিঁড়ে চিঠি বের করল। তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
খোকন বলল, কী লেখা?
মিতু চিঠি ভাঁজ করতে করতে বলল, কিছু না।
কিছু না মানে?
মিতু তার দিকে তাকাল। মেয়েটির চোখে পানি। সে হাসার চেষ্টা করে বলল, মা লিখেছে।
তাদের মা মারা গেছেন সাত বছর আগে।
খোকন বলল, কী লিখেছে?
মিতু শান্ত গলায় বলল, তরকারিতে লবণ কম দিতে বলেছে। তোর ব্লাডপ্রেশার বাড়ছে।
খোকন বসার ঘরের সোফায় বসে পড়ল।
মিতু তার পাশে এসে বসল। কিছুক্ষণ পর মাথা রাখল ভাইয়ের কাঁধে।
দুজনের কেউ কথা বলল না।
পরদিন থেকে খোকন আবার বই পড়তে শুরু করল।
তবে আগের বইগুলো আর পড়তে পারল না। রহস্যকাহিনি, প্রেমের উপন্যাস, হাসির গল্প, সব আলমারিতে পড়ে রইল। তার ভেতরের মাটিতে সেসব ফসল আর জন্মায় না।
সে এখন শুধু এমন বই খোঁজে, যেসব বইয়ের পৃষ্ঠা বন্ধ করার পরও গল্প শেষ হয় না। চরিত্ররা রাতে দরজায় টোকা দেয়। মৃত মানুষ চিঠি পাঠায়। বহুদিনের হারানো কণ্ঠ হঠাৎ রান্নাঘর থেকে বলে ওঠে, তরকারিতে লবণ কম হয়েছে।
এই ধরনের বই খুব বেশি লেখা হয় না।
খোকন তাই নিজেই একটি বই লিখতে শুরু করেছে।
বইটির নাম এখনো ঠিক করেনি।
প্রথম বাক্যটি লিখেছে:
‘বইটি পড়া শেষ করার পর লোকটি বুঝতে পারল, বইটি আসলে তাকে পড়ছিল।’
তারপর আর লিখতে পারছে না।
কারণ প্রতিরাতে তার ঘরের দেয়ালে নীল রঙের একটি দরজা দেখা যায়।
দরজাটিতে কোনো হাতল নেই।
গতকাল রাতে দরজার ওপাশ থেকে কেউ খুব মৃদু গলায় বলেছে, খোকন, দরজাটা খোলো।
খোকন বলেছে, বাইরে থেকে খোলা যায় না।
ওপাশের মানুষটি হেসে বলেছে, কে বলল তুমি বাইরে আছ?


