নীরবতার খাতা
রিটন খানের ছোট গল্প
বৃষ্টি শুরু হয়েছিল দুপুরের একটু আগে। প্রথমে জানালার কার্নিশে দু-একটি ফোঁটা, তারপর টিনের ছাদের ওপর এমন শব্দ উঠল যেন কেউ অন্ধকার ঘরে বসে একমুঠো মুদ্রা গুনছে। বহুবাজারের পুরোনো বাড়িটির দেয়াল আগে থেকেই স্যাঁতসেঁতে ছিল। বৃষ্টি নামলে প্লাস্টার আরও একটু ফুলে উঠত, তারপর কোথাও কোথাও চুপচাপ খসে পড়ত।
ডাক্তার অনিরুদ্ধ সেন নিজের চেম্বারের জানালাটি আধখোলা রেখে বসেছিলেন। বাইরে ট্রামের ঘণ্টা শোনা যাচ্ছিল। খানিক দূরে চায়ের দোকানের ছেলেটি গলা তুলে বলছিল, “দুই নম্বর টেবিলে এক কাপ লিকার।” সেই চায়ের মধ্যে লিকার কতখানি, জল কতখানি, এ নিয়ে কলকাতার কোনো মনোবিশ্লেষক আজ পর্যন্ত গবেষণা করেননি। অনিরুদ্ধের মনে হত, করা উচিত।
তাঁর টেবিলে একটি কালো মলাটের খাতা খোলা ছিল।
রোগীদের উপসর্গ তিনি সেখানে লিখতেন না। লিখতেন তাদের নীরবতার হিসাব।
“প্রশ্ন শুনে এগারো সেকেন্ড চুপ।”
“মায়ের কথা উঠতেই ডান হাতের আঙুল শক্ত।”
“হাসলেন, কিন্তু শ্বাস নিলেন না।”
“বললেন, কিছু হয়নি। তারপর জানালার দিকে তাকালেন।”
খাতাটির নাম তিনি দিয়েছিলেন, নীরবতার খাতা।
সেদিন বেলা তিনটার দিকে সিঁড়িতে ধীর পায়ের শব্দ উঠল। তাঁর সহকারী ছিল না। দরজায় ঘণ্টাও বাজল না। কেবল দুবার খুব আস্তে কড়া পড়ল।
অনিরুদ্ধ দরজা খুলে দেখলেন, একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন।
সাদা শাড়ি। পাড়ে সরু ধূসর নকশা। নিচের দিকে সর্ষের তরকারির মতো একটি ফিকে হলুদ দাগ। ভেজা চুল খোঁপা করা, কয়েকটি গোছা কপালে লেগে আছে। শরীর থেকে পুরোনো আতরের গন্ধ আসছে, তার সঙ্গে মিশে আছে ভেজা কাঠ, কয়লার ধোঁয়া আর দূরপাল্লার ট্রেনের কামরার একধরনের স্থায়ী গন্ধ।
মহিলা বললেন, “আমি মাধবীলতা রায়।”
কণ্ঠটি নিচু, ভাঙা। মনে হল প্রতিটি শব্দ মুখ পর্যন্ত তুলে আনতে তাঁকে আলাদা পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
অনিরুদ্ধ তাঁকে চিনতেন।
একসময় কলকাতার বড়ো বড়ো সংগীত সম্মেলনে তাঁর নাম ছাপা হত। আকাশবাণীতে গান করেছেন। রবীন্দ্রসংগীত, টপ্পা, পুরাতনী। তাঁর বাবা হেমাঙ্গ রায় ছিলেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক। উত্তর কলকাতার ভদ্রসমাজে পরিবারটির পরিচিতি ছিল। এখন সেই বাড়ির বারান্দার রেলিং মরচে ধরে খসে পড়ছে, কিন্তু বসার ঘরে এখনও পিয়ানো ঢাকা থাকে সাদা কাপড়ে। বাঙালি ভদ্রতার একটি সুবিধা আছে, ঘরের ছাদ ভেঙে পড়লেও পিয়ানোর ঢাকনাটি পরিষ্কার রাখা যায়।
মাধবীলতা চেয়ারে বসে বললেন, “আমার কিছু হয়নি।”
অনিরুদ্ধ খাতায় লিখলেন না।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে এসেছেন কেন?”
“ওরা বলেছে।”
“ওরা কারা?”
“বাড়ির লোক।”
“আপনার কী মনে হয়?”
মাধবীলতার কাঁধ সামান্য উঠে গেল। যেন দুই কাঁধের মাঝখানে অদৃশ্য দরজা বসানো, তিনি সেটি বন্ধ করে দিলেন।
“ক্লান্তি,” তিনি বললেন। “নার্ভ। আবহাওয়া।”
তারপর চুপ।
অনিরুদ্ধ ঘড়ির দিকে তাকালেন না। তিনি নীরবতা গুনতেন মনে মনে।
সতেরো সেকেন্ড।
মাধবীলতার ডান হাতের আঙুল শাড়ির আঁচল মুঠো করে ধরেছিল। শ্বাস বুক পর্যন্ত উঠছে, তারপর আটকে যাচ্ছে।
অনিরুদ্ধ বললেন, “আপনি শেষ কবে গান করেছিলেন?”
মাধবীলতা তাঁর দিকে তাকালেন।
সে দৃষ্টিতে রাগ ছিল না। লজ্জা ছিল। আর ছিল এমন এক সতর্কতা, যা আহত পশুর চোখে দেখা যায়।
“গাই না।”
“কেন?”
“ইচ্ছে করে না।”
“গলা বসে গেছে?”
“না।”
“সুর ভুলে যান?”
“না।”
“তাহলে?”
তিনি ঠোঁট খুললেন। কোনো শব্দ এল না।
অনিরুদ্ধ খাতায় লিখলেন:
গানের প্রশ্নে মুখ খোলে, শব্দ আসে না।
সেদিন আর বেশি কথা হয়নি।
দ্বিতীয় সপ্তাহে মাধবীলতা বললেন, ঘটনাটি ঘটেছিল স্টার থিয়েটারের এক অনুষ্ঠানে। শহরের এক নামী সাংস্কৃতিক সংস্থা তাঁকে বিশেষ সম্মাননা দিচ্ছিল। মঞ্চে তখন আলো বেশি, বাতাস কম। সামনে পরিচিত মুখ। অধ্যাপক, কবি, আমলা, গায়ক, দু-একজন ব্যবসায়ী, যারা শিল্পকে ভালোবাসেন কি না জানা নেই, তবে শিল্পীর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে ভালোবাসেন।
মাধবীলতা গান শুরু করেছিলেন।
প্রথম অন্তরার মাঝখানে তাঁর গলা আটকে যায়।
কেউ ভেবেছিল মাইক্রোফোনের গোলমাল। তবলচি তাল ধরে রেখেছিল। হারমোনিয়ামের শিল্পী তাঁর দিকে তাকিয়েছিলেন। তিনি আবার শুরু করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শব্দ বেরোয়নি।
পেছন থেকে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক এগিয়ে এসে হেসে বলেছিলেন, “শিল্পীরাও তো মানুষ। বয়স হলে একটু-আধটু হয়।”
দর্শকের মধ্যে হাসির ঢেউ উঠেছিল।
খুব জোরে নয়।
ভদ্রলোকেরা কখনো খুব জোরে হাসেন না। তাঁরা ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসেন, যাতে অপমানটি মার্জিত থাকে।
মাধবীলতা বললেন, “আমি চলে এসেছিলাম।”
“তারপর?”
“তারপর আর কিছু নেই।”
“বাড়ি ফিরে কী করেছিলেন?”
“শাড়ি বদলেছি।”
“খেয়েছিলেন?”
“মনে নেই।”
“ঘুম?”
“না।”
“কেঁদেছিলেন?”
মাধবীলতা তাকালেন জানালার দিকে। বাইরে বৃষ্টির জল নর্দমা উপচে রাস্তায় উঠছিল।
“আমার কান্না আসে না,” তিনি বললেন।
অনিরুদ্ধ তাঁর কাঁধের দিকে তাকালেন। কাঁধ দুটি আবার উঠে গেছে।
“কান্না না এলে শরীর কী করে?”
মাধবীলতা উত্তর দিলেন না।
পরের কয়েকটি সেশনেও তিনি কথা বললেন টুকরো টুকরো করে।
শৈশবে ভোর পাঁচটায় উঠে রেওয়াজ করতে হত। শীতকালেও। তাঁর বাবা দরজার বাইরে বসে থাকতেন। সুর একটু নেমে গেলে বলতেন, “আবার।”
একদিন আট বছরের মাধবীলতার জ্বর ছিল। মা বলেছিলেন, “আজ থাক।”
বাবা উত্তর দিয়েছিলেন, “শিল্পীর শরীর বলে কিছু নেই। শৃঙ্খলা আছে।”
মাধবীলতা সেদিনও গেয়েছিলেন।
“বাবা কি কখনো আপনার গান শুনে খুশি হতেন?” অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করেছিলেন।
“হতেন।”
“বলতেন?”
“না।”
“কীভাবে বুঝতেন?”
মাধবীলতা অনেকক্ষণ ভেবেছিলেন।
“সেদিন ভুল ধরতেন কম।”
মায়ের কথা উঠলে তাঁর ভাষা আরও ভেঙে যেত।
“মা… দরজা… বন্ধ।”
“কেন বন্ধ করতেন?”
“কাঁদতেন।”
“আপনি শুনতেন?”
“সবাই শুনত।”
“কেউ দরজা খুলত না?”
মাধবীলতা মাথা নেড়েছিলেন।
“আপনার বাবা?”
“তিনি খবরের কাগজ পড়তেন।”
অনিরুদ্ধ সেই রাতে নিজের বাড়িতে ফিরে বহুক্ষণ বসে ছিলেন। বাড়ি বলতে বালিগঞ্জের একটি ছোটো ফ্ল্যাট। স্ত্রী মৃণালিনী মারা গেছেন তিন বছর। তাঁরা শেষ পাঁচ বছর একই বিছানায় শুয়েও আলাদা ঘরে বাস করতেন। সকালবেলা মৃণালিনী তাঁর জন্য চা রাখতেন, অনিরুদ্ধ ধন্যবাদ দিতেন। রাতে তিনি জিজ্ঞেস করতেন, “ওষুধ খেয়েছ?” মৃণালিনী বলতেন, “হ্যাঁ।” তাঁদের বিবাহের শেষ দিকটায় যত্ন ছিল, শিষ্টাচার ছিল, অভিযোগও ছিল না।
কেবল স্পর্শ ছিল না।
মৃণালিনী মারা যাওয়ার পর অনিরুদ্ধ আবিষ্কার করেছিলেন, দীর্ঘদিন কথা না বলেও দুজন মানুষ পরস্পরের চারপাশে একটি সংসার সাজিয়ে রাখতে পারে। কাপ, চামচ, ওষুধের বাক্স, ভাঁজ করা শাড়ি, আয়নার সামনে চিরুনি। সব থাকে। মানুষটি থাকে না।
কলেজ স্ট্রিটের এক বইয়ের দোকানে তিনি প্রায়ই যেতেন। দোকানের সামনে ফুটপাতে পুরোনো বই সাজিয়ে বসত নীলা। বয়স তিরিশের বেশি নয়। গোল চশমা, কপালে ঘাম, আঙুলে কালির দাগ। বইয়ের দাম বলার সময় সে ক্রেতার মুখ দেখে দাম বাড়াত বা কমাত। অধ্যাপকদের কাছ থেকে বেশি নিত, ছাত্রদের কাছ থেকে কম। এ ছিল তার নিজস্ব অর্থনীতি।
নীলা একদিন বলেছিল, “আপনি মানুষের মন নিয়ে কাজ করেন, অথচ সব সময় এত চুপ করে থাকেন কেন?”
অনিরুদ্ধ বলেছিলেন, “শোনাই আমার কাজ।”
“নিজের কথা কাকে শোনান?”
তিনি উত্তর দেননি।
সেই রাতে তাঁর মনে হয়েছিল, নীলা প্রশ্নটি ভুল করেনি। তিনি কেবল উত্তর দেওয়ার অভ্যাস হারিয়েছেন।
মাধবীলতার চিকিৎসা যত এগোল, অনিরুদ্ধ নিজের ভেতরে তত অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলেন। রোগীর শরীরের প্রতিটি প্রতিরোধ তাঁর চোখে ধরা পড়ছিল। প্রশ্নের আগে থেমে যাওয়া শ্বাস। বাবার কথা উঠলে শক্ত হয়ে যাওয়া চোয়াল। মায়ের কথা বলার সময় পেটের ওপর হাত চেপে রাখা। খাবারের প্রসঙ্গে ঘৃণা। ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড়। হঠাৎ বুকে ব্যথা।
তিনি বললেন, “আপনার শরীর আপনার হয়ে কথা বলছে।”
মাধবীলতা মৃদু হাসলেন।
“শরীরের এত কথা থাকলে মুখের দরকার কী?”
অনিরুদ্ধ উত্তর দিলেন, “মুখ অনেক সময় পরিবারের ভদ্রতা রক্ষা করে। শরীর সেই শিক্ষা পায় না।”
মাধবীলতা প্রথমবার একটু দীর্ঘক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“আপনি কি সব রোগীকেই এমন কথা বলেন?”
“না।”
“আমাকে কেন বললেন?”
অনিরুদ্ধ বুঝলেন, তাঁর পেশাগত ভদ্রতার দেয়ালে ছোটো একটি ফাটল ধরেছে।
তিনি বললেন, “হয়তো আপনার জন্য নয়। নিজের জন্য বলেছি।”
মাধবীলতা সেই দিন আর কিছু বলেননি। যাওয়ার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “আপনার স্ত্রী আছেন?”
অনিরুদ্ধ বললেন, “ছিলেন।”
“আপনি তাঁকে ভালোবাসতেন?”
প্রশ্নটি এত সরাসরি ছিল যে অনিরুদ্ধের বুকের মধ্যে শ্বাস আটকে গেল। নিজের শরীরের এই সামান্য বিশ্বাসঘাতকতা তিনি লক্ষ করলেন।
“জানি না,” তিনি বললেন।
মাধবীলতা মাথা নেড়ে চলে গেলেন।
পরদিন নীরবতার খাতায় অনিরুদ্ধ নিজের নামে প্রথম নোট লিখলেন:
স্ত্রীর কথা উঠলে শ্বাস বন্ধ। উত্তর দেওয়ার আগে সাত সেকেন্ড।
বর্ষা তখন শহরটিকে ধীরে ধীরে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। ট্রামের জানালায় কাদা ছিটছিল। কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের নিচে ইট বসানো হয়েছে। পুরোনো বাড়ির দেয়াল থেকে চুন ঝরছে। চায়ের কাপের পাশে মাছি বসে আছে। মোড়ে মোড়ে সভা, মিছিল, মাইকে বিপ্লব। শহরটি মানুষের মুক্তির কথা খুব জোরে বলে, কিন্তু ঘরের ভেতর কার কান্না শোনা যাচ্ছে, সে বিষয়ে তার আগ্রহ কম।
এক সন্ধ্যায় মাধবীলতা এলেন ভিজে অবস্থায়। ছাতা ছিল, তবু ব্যবহার করেননি।
“আজ গান শুনছিলাম,” তিনি বললেন।
“কার?”
“নিজের।”
“রেকর্ড?”
“হ্যাঁ।”
“কেমন লাগল?”
“মনে হল অন্য কেউ।”
“ভালো গাইছিলেন?”
“খুব।”
কথাটি বলেই তাঁর মুখ বিকৃত হয়ে গেল। তিনি যেন হাসতে চাইলেন, কিন্তু গাল কেঁপে উঠল।
“সেই মেয়েটিকে ঘৃণা করেন?” অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন।
“না।”
“হিংসে?”
“হয়তো।”
“কেন?”
“সে জানত না…”
“কী জানত না?”
“গান শেষ হলে কী থাকে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে বিদ্যুৎ চলে গেল।
ঘর অন্ধকার। পাখা থেমে গেল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ এক লাফে বেড়ে উঠল। দূরে কোথাও মিছিলের স্লোগান ভেসে আসছিল। শব্দ বোঝা যাচ্ছিল না, শুধু ছন্দ।
অনিরুদ্ধ টেবিলের ড্রয়ারে হাতড়াতে লাগলেন। দেশলাই পাওয়া গেল, মোমবাতি পাওয়া গেল না।
“বসুন,” তিনি বললেন। “আলো আসবে।”
মাধবীলতা বললেন, “আলো সব সময় আসে?”
প্রশ্নটি অন্ধকারে অন্যরকম শোনাল।
অনিরুদ্ধ উত্তর দিলেন না।
বৃষ্টির মধ্যে ট্রামের ঘণ্টা বাজল। তারপর এক মুহূর্তের জন্য শহরটি যেন সম্পূর্ণ থেমে গেল।
মাধবীলতা খুব আস্তে শ্বাস নিলেন।
প্রথমবার তাঁর কাঁধ ওঠেনি।
অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি সুর বেরিয়ে এল।
পুরোনো গান। অনিরুদ্ধ চিনতে পারলেন, কিন্তু গানের নাম মনে করতে পারলেন না। মাত্র একটি লাইন। স্বর ভেঙে যাচ্ছিল। কোথাও সুর নিচে নেমে গেল, কোথাও নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল। মঞ্চের মাধবীলতা এমন গান কোনোদিন গাইতেন না। তাঁর বাবা শুনলে নিশ্চয় বলতেন, “আবার।”
কিন্তু সেই এক লাইনে এমন কিছু ছিল, যা নিখুঁত গানে সচরাচর থাকে না।
একজন আট বছরের জ্বরগ্রস্ত মেয়ে।
বন্ধ দরজার পেছনে কাঁদতে থাকা মা।
খবরের কাগজ হাতে বসে থাকা বাবা।
মঞ্চের আলো।
ভদ্র দর্শকের হাসি।
না-খাওয়া রাত।
দীর্ঘ বিবাহের স্পর্শহীন বিছানা।
কলেজ স্ট্রিটে বই বিক্রি করা এক তরুণীর প্রশ্ন।
সব একসঙ্গে এসে সেই ভাঙা স্বরে আশ্রয় নিল।
লাইনটি শেষ হওয়ার পর মাধবীলতা কাঁদলেন না। তাঁর শরীর সামনের দিকে একটু ঝুঁকে এল। দুই হাত হাঁটুর ওপর। তিনি অনেকক্ষণ ধরে নিঃশ্বাস নিলেন, ছাড়লেন।
অনিরুদ্ধ অন্ধকারে বসে রইলেন।
তিনি কোনো ব্যাখ্যা দিলেন না। কোনো প্রশংসাও করলেন না। “খুব ভালো” বললে মুহূর্তটি নষ্ট হয়ে যেত। মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে, যখন প্রশংসাও একধরনের অভদ্রতা।
বিদ্যুৎ ফিরে এলে মাধবীলতার মুখে জল দেখা গেল। বৃষ্টির, না চোখের, বোঝা গেল না।
তিনি বললেন, “খুব খারাপ গাইলাম।”
অনিরুদ্ধ বললেন, “হ্যাঁ। সুর ভেঙেছিল।”
মাধবীলতা তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হাসলেন। সেই হাসিতে প্রথমবার লজ্জা ছিল না।
“আবার গাইব?”
“আজ নয়।”
“কেন?”
“আজ যা হয়েছে, তাকে একটু থাকতে দিন।”
মাধবীলতা উঠে দাঁড়ালেন। দরজার কাছে গিয়ে থামলেন।
“আমি কি ভালো হয়ে যাব?”
অনিরুদ্ধ অনেক উত্তর জানতেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উত্তর, মনোবিশ্লেষণের উত্তর, আশ্বাস দেওয়ার উত্তর। তিনি কোনোটিই বললেন না।
“আপনি হয়তো আবার গান করবেন,” তিনি বললেন। “হয়তো করবেন না। কিন্তু আজ আপনি আপনার গলার শব্দ শুনেছেন।”
মাধবীলতা ধীরে মাথা নেড়ে চলে গেলেন।
সেদিন রাতে অনিরুদ্ধ কলেজ স্ট্রিটে গেলেন। বৃষ্টি তখনও পড়ছিল। বেশিরভাগ দোকান বন্ধ। নীলা ত্রিপল টেনে বই ঢাকছিল।
অনিরুদ্ধ দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনি সেদিন একটি প্রশ্ন করেছিলেন।”
নীলা তাকাল। “আমি অনেক প্রশ্ন করি।”
“নিজের কথা কাকে শোনাই।”
“উত্তর পেয়েছেন?”
অনিরুদ্ধ ভেজা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর জামার কাঁধে জল পড়ছিল। বহুদিন ধরে তিনি শিখেছেন কীভাবে কথা এড়িয়ে যেতে হয়, কীভাবে ভদ্রভাবে হাসতে হয়, কীভাবে নিজের ভেতরের দরজায় তালা রাখতে হয়।
সেদিন তিনি বললেন, “কাউকে না। এটাই সমস্যা।”
নীলা ত্রিপল থেকে হাত সরিয়ে তাঁর দিকে তাকাল।
কোনো সান্ত্বনা দিল না। কোনো জ্ঞানও দিল না।
শুধু বলল, “চা খাবেন?”
রাস্তার পাশের দোকানে চা এল কাচের গ্লাসে। চা দুর্বল। জল বেশি। চিনি অসম্ভব বেশি। অনিরুদ্ধ তবু ধীরে ধীরে খেলেন।
পরদিন সকালে নীরবতার খাতা খুলে তিনি মাধবীলতার পাতায় লিখলেন:
অন্ধকারে এক লাইন গান। সুর ভাঙা। শ্বাস সম্পূর্ণ।
তারপর নিজের পাতায় লিখলেন:
প্রথমবার সত্য উত্তর। কোনো ব্যাখ্যা নেই।
জানালার বাইরে রাতের বৃষ্টির জল তখনও কার্নিশ থেকে পড়ছিল। দূরে ট্রাম চলল, ঘণ্টা বাজল। শহর তার পুরোনো অভ্যাসে আবার ব্যস্ত হয়ে উঠল।
মাধবীলতা সুস্থ হয়ে যাননি। অনিরুদ্ধও নিজের জীবন নতুন করে সাজিয়ে ফেলেননি। পুরোনো বর্ম এত সহজে খোলে না। কখনো সেটিই শরীরের অংশ হয়ে যায়।



