ঘুম ভাঙার পর প্রথম কয়েক সেকেন্ড রাশেদ সাহেব কিছুই মনে করতে পারলেন না।
তিনি বাঁ হাতটা বাড়িয়ে দিলেন বিছানার ডান পাশে। হাত বাড়ানোর সময় তাঁর চোখ বন্ধ ছিল। চোখ বন্ধ রেখেই তিনি বললেন,
—মশাই, ওঠার সময় হয়েছে।
তাঁর হাত ঠান্ডা চাদরে পড়ল।
রাশেদ সাহেব চোখ মেললেন।
বিছানার ডান পাশে কেউ নেই। বালিশটা পরিষ্কার। চাদর ভাঁজ করা। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে সকালের রোদ এসে বালিশের এক পাশে পড়ে আছে।
তিনি হাত সরিয়ে নিলেন।
সব মনে পড়ল।
টুকু মারা গেছে আজ এগারো দিন।
মৃত্যুর দিন গণনা করা উচিত না। মানুষ তারপরও গণনা করে। কেউ জিজ্ঞেস না করলেও মনে মনে বলে, আজ তিন দিন হলো, আজ সাত দিন হলো, আজ এগারো দিন হলো। সময়কে ছোট ছোট প্যাকেটে ভরে রাখলে দুঃখ বুঝি কিছুটা সহজ হয়।
রাশেদ সাহেব বিছানায় উঠে বসলেন।
ঘড়িতে সাতটা বারো।
টুকু বেঁচে থাকলে সাতটা বারো পর্যন্ত তাঁকে ঘুমাতে দিত না। সকাল ছয়টা পঁয়তাল্লিশে প্রথমবার ডাকত। ডাকটা ছিল অতি ভদ্র। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ফুঁসফুঁস করে নিঃশ্বাস ফেলত।
তাতে কাজ না হলে খাটের কিনারায় থুতনি রাখত।
তারপরও কাজ না হলে ডান পা দিয়ে বিছানায় একটা চাপড় দিত।
শেষ অস্ত্র ছিল কান চাটা।
রাশেদ সাহেবের কান অত্যন্ত স্পর্শকাতর। টুকু এই তথ্য জানত।
তিনি বিছানা থেকে নামলেন। পা রাখতেই তাঁর মনে হলো, সাবধানে পা রাখা দরকার। টুকু প্রায়ই বিছানার পাশে গোল হয়ে শুয়ে থাকত। কয়েকবার তার লেজে পা পড়েছে।
টুকু এখন নেই। তারপরও তিনি সাবধানে পা রাখলেন।
অভ্যাস বড় অদ্ভুত জিনিস। শরীর অনেক সময় মনের চেয়ে পরে খবর পায়।
রাশেদ সাহেব বাথরুমে ঢুকলেন। দরজা বন্ধ করার আগে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ালেন। টুকু দরজার বাইরে অপেক্ষা করবে না, এটা তিনি জানেন। তারপরও দরজা পুরোপুরি বন্ধ করলেন না। সামান্য ফাঁক রাখলেন।
টুকু বন্ধ দরজা পছন্দ করত না।
বিশেষ করে বাথরুমের দরজা।
রাশেদ সাহেব একদিন তাকে বলেছিলেন,
—আমি বাথরুমে ঢুকলেই তোমার ধারণা হয় আমি গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যাব?
টুকু মাথা কাত করেছিল।
মাথা কাত করার অর্থ কী, তার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। তবে রাশেদ সাহেব নিশ্চিত ছিলেন, টুকু কথাটা বুঝেছে।
বাথরুম থেকে বের হয়ে তিনি রান্নাঘরে গেলেন।
রান্নাঘরের দরজার পাশে দুটা স্টিলের বাটি। একটা পানির, আরেকটা খাবারের। পানির বাটিতে সামান্য পানি আছে। খাবারের বাটি খালি।
বাটি দুটা সরানো হয়নি।
কে সরাবে?
তাঁর মেয়ে তিথি বলেছিল,
—বাবা, এগুলো চোখের সামনে রেখো না। আরও কষ্ট হবে।
রাশেদ সাহেব বলেছিলেন,
—কোথায় রাখব?
—স্টোররুমে তুলে রাখো।
—ও ফিরে এসে খাবার খুঁজলে?
কথাটা বলার পর তিথি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
—বাবা, ও আর ফিরবে না।
রাশেদ সাহেব বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন,
—আমি কি জানি না?
তিনি জানতেন।
জানার মধ্যেও অনেক ধরনের জানা আছে। মাথা একভাবে জানে। হাত-পা অন্যভাবে জানে। ঘরের দরজা, সিঁড়ি, রান্নাঘরের বাটি, সোফার নিচে আটকে থাকা লাল বল, সবাই আলাদা আলাদাভাবে জানে।
রাশেদ সাহেব কেটলিতে পানি দিলেন। চা বানানোর সময় বললেন,
—আজ চিনি একটু কম দেব। ডাক্তার চিনি কমাতে বলেছেন।
কেউ কোনো উত্তর দিল না।
তিনি চায়ের কাপ হাতে ডাইনিং টেবিলে বসলেন।
টুকু এই সময় টেবিলের নিচে বসে থাকত। তাকে কখনো চা দেওয়া হয়নি। বিস্কুটও না। তারপরও সে প্রতিদিন এমন মুখ করে তাকিয়ে থাকত, যেন আজ একটা বিশেষ ব্যবস্থা হবে।
রাশেদ সাহেব বিস্কুটের কৌটা খুললেন।
একটা বিস্কুট বের করে মাঝখান দিয়ে ভাঙলেন।
অর্ধেকটা নিজের মুখে দেওয়ার পর অন্য অর্ধেকটা হাতে রয়ে গেল।
তিনি কিছুক্ষণ বিস্কুটের টুকরোটার দিকে তাকিয়ে থেকে পুরোটা মুখে দিলেন।
বিস্কুটটা তাঁর কাছে নোনতা মনে হলো।
যদিও বিস্কুট মিষ্টি।
মানুষের জিভও মাঝে মাঝে ভুল করে।
রাশেদ সাহেব অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা। স্ত্রী মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। স্ত্রীর নাম নাসরিন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর প্রথম ছয় মাস তিনি খুব নিয়ম করে জীবন যাপন করেছিলেন।
ভোরে উঠতেন।
হাঁটতে যেতেন।
নাশতার পর পত্রিকা পড়তেন।
দুপুরে গোসল করতেন।
রাতে খবর দেখতেন।
এই নিয়মের কোনোটাই তিনি উপভোগ করতেন না। তারপরও করতেন। কারণ জীবিত মানুষের কিছু কাজ নিয়ম করে করতে হয়। নিয়ম ভেঙে ফেললে চারপাশের লোকজন চিন্তিত হয়।
তিথি তখন চট্টগ্রামে থাকে। তার স্বামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে। সপ্তাহে তিনবার বাবাকে ফোন দিত।
—বাবা, খেয়েছ?
—খেয়েছি।
—কী খেয়েছ?
এই প্রশ্নটার উত্তর দিতে রাশেদ সাহেবের অসুবিধা হতো। তিনি কী খেয়েছেন, মনে করতে পারতেন না। কখনো কখনো খাওয়াই হতো না।
তিথি একদিন হঠাৎ একটা বাদামি রঙের কুকুর নিয়ে এল।
কুকুরটার বয়স তখন তিন মাস। কান দুটো প্রয়োজনের তুলনায় বড়। সামনের পা মোটা। চোখে গভীর চিন্তিত ভাব।
তিথি বলল,
—বাবা, এর নাম টুকু।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—কুকুরের নাম টুকু কেন?
—ওর আগের মালিক রেখেছে।
—আগের মালিক কোথায়?
—বিদেশে চলে যাচ্ছে।
—বিদেশে কুকুর নেওয়া যায়।
—অনেক ঝামেলা।
—আমার কোনো ঝামেলা নেই?
তিথি বলল,
—তুমি একা থাকো।
—একা থাকা এবং কুকুর পালনের সম্পর্ক কী?
তিথি উত্তর দিল না।
টুকুকে মেঝেতে নামিয়ে দিল। টুকু প্রথমে চারপাশে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে রাশেদ সাহেবের ডান পায়ের ওপর সামনের দুই পা রেখে দাঁড়াল।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—এই, নামো।
টুকু নামল না।
—তুমি কি বাংলা বোঝো না?
টুকু তখন তাঁর পায়ের কাছে বসে পড়ল।
সেই রাতেই টুকু তাঁর বিছানায় উঠে এসেছিল।
রাশেদ সাহেব তাকে নামিয়ে দিয়েছিলেন।
সে আবার উঠেছিল।
তিনি আবার নামিয়েছিলেন।
এই ঘটনা মোট সাতবার ঘটেছিল। অষ্টমবার তিনি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে উঠে দেখেন, টুকু তাঁর হাঁটুর পেছনে গোল হয়ে ঘুমাচ্ছে।
মানুষের পরাজয় অনেকভাবে ঘটে।
কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে।
কখনো তিন মাস বয়সী একটা কুকুরছানার কাছে।
তিন মাসের মধ্যে বাড়ির সব নিয়ম বদলে গেল।
রাশেদ সাহেবকে ভোরে উঠতে হয়। টুকুকে বাইরে নিয়ে যেতে হয়। দুপুরে খাবার দিতে হয়। বিকেলে হাঁটতে হয়। মাসে একবার গোসল করাতে হয়। নখ কাটতে হয়। কানের ভেতর পরিষ্কার করতে হয়।
এসব কাজের কোনোটাই তাঁর ভালো লাগত না।
তিনি সবাইকে তাই বলতেন।
—আমার জীবন শেষ করে দিয়েছে।
তিথি হাসত।
—তুমি টুকুকে পছন্দ করো না?
—একদম না।
—তাহলে ওকে দিয়ে দিই?
—কাকে দেবে?
—কেউ নিয়ে নেবে।
—সবাই কুকুর পালতে পারে না। দায়িত্বজ্ঞান লাগে।
—তুমি দায়িত্বশীল বলেই তোমার কাছে রেখেছি।
—এইসব চালাকি আমার সঙ্গে করবে না।
তারপর তিথি একবার টুকুকে নিয়ে চট্টগ্রাম যেতে চেয়েছিল।
রাশেদ সাহেব গম্ভীর গলায় বলেছিলেন,
—ওখানে গরম বেশি। ওর কষ্ট হবে।
টুকুকে আর নেওয়া হয়নি।
সন্ধ্যার পর রাশেদ সাহেব টেলিভিশন দেখতেন। টুকু তাঁর পায়ের কাছে শুয়ে থাকত। মাঝেমধ্যে ঘুমের মধ্যে দৌড়ানোর মতো করে পা নাড়ত।
রাশেদ সাহেব বলতেন,
—স্বপ্নে কী দেখছ? চোর ধরছ?
টুকু চোখ না খুলেই লেজ নাড়ত।
নাসরিন মারা যাওয়ার পর রাশেদ সাহেব বাড়িতে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছিলেন। কথা বলার মানুষ ছিল না।
টুকু আসার পর আবার কথা বলা শুরু করলেন।
তিনি বাজারের দাম নিয়ে কথা বলতেন।
দেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতেন।
নিজের হাঁটুর ব্যথার কথা বলতেন।
তিথির শ্বশুরবাড়ির লোকজন নিয়ে মন্তব্য করতেন।
একদিন তিনি বললেন,
—তোমাকে একটা গোপন কথা বলি। তিথির শাশুড়ি মহিলা সুবিধার না।
টুকু মনোযোগ দিয়ে শুনল।
—কাউকে বলবে না।
টুকু কাউকে বলেনি।
মানুষের গোপন কথা রাখার ক্ষমতা কম। কুকুরের এই ক্ষমতা অসীম।
রাশেদ সাহেবের বাড়িতে কাজ করত রহিমা। তার বয়স পঞ্চাশের মতো। যদিও সে সবাইকে বলত চল্লিশ। মানুষের নিজের বয়স সম্পর্কে বলার স্বাধীনতা থাকা উচিত। রহিমা টুকুকে ভয় পেত।
প্রথম দিকে বাড়িতে ঢুকেই বলত,
—চাচা, বাঘডারে ধরেন।
—ও বাঘ না। কুকুর।
—নাম তো টুকু। মাইনষের নামে নাম।
—নাম দিয়ে কিছু হয় না। তোমার নাম রহিমা বলে তুমি কি সব সময় রহম করো?
রহিমা এই কথায় সন্তুষ্ট হতো না।
টুকু অবশ্য রহিমাকে পছন্দ করত। তার পেছনে পেছনে ঘুরত। রহিমা রান্না করলে রান্নাঘরের দরজায় বসে থাকত।
রহিমা বলত,
—কিছু পাইবা না। এইভাবে তাকাইয়া লাভ নাই।
তারপর গোপনে মাংসের টুকরা দিত।
টুকু মারা যাওয়ার পর রহিমা তিন দিন কাজে আসেনি। চতুর্থ দিন এসে চোখ ফুলিয়ে বলেছিল,
—জ্বর আছিল।
রাশেদ সাহেব বলেছিলেন,
—মিথ্যা কথা বলছ কেন?
রহিমা আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেছিল,
—ঘরে ঢুকতে ভয় লাগে। মনে হয় বাঘটা দৌড়াইয়া আইব।
রাশেদ সাহেব বলেছিলেন,
—আমারও তাই মনে হয়।
সেদিন রহিমা রান্না করেনি। রান্নাঘরের মেঝেতে বসে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল।
রাশেদ সাহেব বারান্দায় বসে ছিলেন।
তিনি কাঁদেননি।
পুরুষ মানুষ সব সময় কাঁদে না। তারা অনেক সময় বসে থাকে। বসে থাকাটাই কান্না।
টুকুর অসুখ ধরা পড়ে শীতের শুরুতে।
প্রথমে সে খাবার কমিয়ে দিল।
রাশেদ সাহেব ভাবলেন, পেট খারাপ।
তারপর হাঁটতে গিয়ে বারবার বসে পড়তে লাগল।
ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন, কিডনির সমস্যা। বয়সও হয়েছে।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—বয়স কত?
—প্রায় বারো।
—বারো আবার বয়স হলো?
ডাক্তার কিছু বললেন না।
মানুষ নিজের বয়স আর প্রিয় প্রাণীর বয়স একই নিয়মে মাপে না।
নিজের বারো বছর কিছুই না।
কুকুরের বারো বছর অনেক।
চিকিৎসা চলল। ওষুধ, ইনজেকশন, বিশেষ খাবার। রাশেদ সাহেব ইন্টারনেটে পড়ে পড়েও অনেক কিছু জানলেন। কোন খাবারে ফসফরাস কম, কতটুকু পানি প্রয়োজন, কীভাবে বমি বন্ধ করা যায়।
টুকু ওষুধ খেতে চাইত না।
রাশেদ সাহেব রাগ করতেন।
—তোমার ভালোর জন্য করছি। আমার কি আনন্দ লাগে তোমার মুখের ভেতর ট্যাবলেট ঢোকাতে?
টুকু মুখ ফিরিয়ে নিত।
—এই জন্যই বলে কুকুরের বুদ্ধি কম।
কথাটা সত্যি ছিল না।
টুকু অনেক কিছু বুঝত।
শেষ রাতে সে বিছানায় উঠতে পারেনি। মেঝেতে শুয়ে ছিল। রাশেদ সাহেব নিজেই নিচে নেমে তার পাশে শুয়েছিলেন।
তিথি ফোনে বলেছিল,
—বাবা, হাসপাতালে নিয়ে যাও।
—ডাক্তার বলেছেন এখন নিয়ে গিয়ে লাভ নেই।
—আমি রওনা দিচ্ছি।
—এসো না। এত রাতে রাস্তায় বের হবে না।
—তুমি একা পারবে?
রাশেদ সাহেব বলেছিলেন,
—পারব।
তিনি পারেননি।
রাত তিনটার দিকে টুকুর শ্বাস ভারী হয়ে গেল। প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার আগে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠছিল।
রাশেদ সাহেব তার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন,
—ভয় পেয়ো না। আমি আছি।
টুকু চোখ মেলে তাকিয়েছিল।
সেই চোখের দৃষ্টি রাশেদ সাহেবের পরিচিত ছিল না। সেখানে ভয় ছিল, ক্লান্তি ছিল, আবার বিশ্বাসও ছিল।
সে বিশ্বাস করেছিল, রাশেদ সাহেব কিছু একটা করবেন।
রাশেদ সাহেব কিছুই করতে পারেননি।
মানুষকে যখন কোনো প্রাণী পুরোপুরি বিশ্বাস করে, তখন মানুষের অসহায়তা আরও বেড়ে যায়।
ভোর চারটা সতেরো মিনিটে টুকুর শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
রাশেদ সাহেব তখনও তার মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছিলেন।
কতক্ষণ পর তিনি বুঝেছিলেন টুকু আর নেই, তা তাঁর মনে নেই।
সকালে তিথি এসে দেখে বাবা মেঝেতে বসে আছেন। টুকুর মাথাটা তাঁর কোলে।
তিথি বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিল।
রাশেদ সাহেব বলেছিলেন,
—ও শেষ মুহূর্তে খুব ভয় পেয়েছিল।
—তুমি পাশে ছিলে।
—ও ভাবছিল আমি ওকে বাঁচাব।
—তুমি ওকে একা থাকতে দাওনি।
—কিন্তু বাঁচাতে পারিনি।
তিথি বলেছিল,
—সব ভালোবাসার কাজ বাঁচানো না, বাবা। কোনো কোনো ভালোবাসার কাজ পাশে থাকা।
রাশেদ সাহেব উত্তর দেননি।
তিনি বড় বড় কথা পছন্দ করেন না।
কিন্তু কথাটা তাঁর মনে রয়ে গেছে।
সকাল দশটার দিকে তিথি আবার ফোন করল।
—বাবা, কী করছ?
—চা খাচ্ছি।
—নাশতা?
—খাব।
—রহিমা এসেছে?
—আসবে।
—আজ আমি আসব?
—কেন আসবে?
—তোমার সঙ্গে থাকতে।
—আমার সঙ্গে থাকার দরকার নেই। আমি ভালো আছি।
—আচ্ছা।
তিথির গলায় বোঝা গেল সে বিশ্বাস করেনি।
ফোন রাখার আগে বলল,
—বাবা, টুকুর জিনিসগুলো এখনই সরাতে হবে না।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—আমি কি সরাতে বলেছি?
—না।
—তাহলে অকারণে উপদেশ দাও কেন?
—আচ্ছা, দিচ্ছি না।
ফোন রেখে রাশেদ সাহেব বারান্দায় গেলেন।
বারান্দার এক কোণে টুকুর লাল রঙের বল পড়ে আছে। বলটার এক পাশ দাঁতের দাগে ক্ষয়ে গেছে।
টুকু বল আনতে পারত। তবে দিতে চাইত না।
বল ছুড়ে দিলে দৌড়ে নিয়ে আসত। তারপর পাঁচ হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকত।
রাশেদ সাহেব বলতেন,
—দাও।
টুকু দিত না।
—না দিলে আবার ছুড়ব কীভাবে?
টুকু সামান্য এগিয়ে আসত। তিনি হাত বাড়ালেই সরে যেত।
এটা নিয়ে তার বিপুল আনন্দ ছিল।
রাশেদ সাহেব বলটা হাতে নিলেন। উঠানের দিকে ছুড়ে মারলেন।
বলটা সিঁড়ির কাছে গিয়ে থেমে গেল।
কেউ দৌড়ে গেল না।
তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন।
তারপর নিজেই নিচে নেমে বলটা তুলে আনলেন।
বেলা দুইটার দিকে রহিমা এল। হাতে বাজারের ব্যাগ।
—চাচা, কী রান্ধুম?
—যা ইচ্ছা।
—মাছ আনছি।
—রান্না করো।
রহিমা রান্নাঘরে ঢুকে থেমে গেল।
—বাটিগুলা এখনো এইখানে?
—হ্যাঁ।
—ধুইয়া রাইখা দিই?
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—পানির বাটিটা ধুয়ে পানি দাও।
রহিমা তাঁর দিকে তাকাল।
—পানি দিমু?
—হ্যাঁ।
—কার জন্য?
রাশেদ সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন,
—পাখি পানি খেতে পারে। বিড়াল খেতে পারে। পানির বাটি খালি রাখতে হবে কেন?
রহিমা বাটিটা ধুয়ে পানি ভরে দিল।
দুপুরে খাওয়ার পর রাশেদ সাহেব সোফায় বসলেন। টেলিভিশন চালু করলেন। শব্দ খুব কম।
এই সময় টুকু তাঁর পাশে এসে বসত। প্রথমে মেঝেতে। তারপর ধীরে ধীরে সোফার ওপর উঠে শরীর লাগিয়ে দিত।
টুকুর শরীরের একটা আলাদা গন্ধ ছিল। শ্যাম্পু, রোদ, ধুলো এবং কুকুরের নিজস্ব গন্ধ মিলে তৈরি।
রাশেদ সাহেব একসময় গন্ধটা পছন্দ করতেন না।
এখন তাঁর মনে হলো, গন্ধটা একবার পেলে ভালো হতো।
তিনি সোফার পাশের কুশনে হাত রাখলেন।
কুশন ঠান্ডা।
বিকেলে দরজার ঘণ্টা বাজল।
রাশেদ সাহেব দরজা খুলে দেখলেন, আট-নয় বছরের একটা ছেলে দাঁড়িয়ে। নিচতলার নতুন ভাড়াটের ছেলে। নাম সম্ভবত রায়ান।
ছেলেটির হাতে নীল রঙের প্লাস্টিকের গাড়ি।
সে বলল,
—দাদু, আপনার কুকুরটা কোথায়?
রাশেদ সাহেব বললেন,
—মারা গেছে।
ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
—কেন মারা গেছে?
—অসুখ হয়েছিল।
—আবার একটা আনবেন?
—না।
—কেন?
—কুকুর পালা ঝামেলা।
ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল,
—ও আমাকে দেখলে লেজ নাড়ত।
—সবাইকে নাড়ত।
—আমাকে বেশি নাড়ত।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—হতে পারে।
ছেলেটা চলে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আবার ফিরে এসে বলল,
—ও কি আপনাকে বেশি ভালোবাসত?
প্রশ্নটা শুনে রাশেদ সাহেব বিরক্ত হলেন।
ছোট বাচ্চারা মাঝেমধ্যে এমন প্রশ্ন করে যার উত্তর দেওয়া কঠিন।
তিনি বললেন,
—যাও, খেলতে যাও।
ছেলেটা চলে গেল।
সন্ধ্যার কিছু আগে বৃষ্টি শুরু হলো।
টুকু বৃষ্টি পছন্দ করত না। বাইরে নিয়ে গেলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাত। তারপর রাশেদ সাহেবের দিকে এমনভাবে তাকাত, যেন বৃষ্টির জন্য তিনিই দায়ী।
তিনি বলতেন,
—আমার হাতে থাকলে বন্ধ করে দিতাম।
টুকু পা ভেজাতে চাইত না। শুকনো জায়গা খুঁজে খুঁজে হাঁটত।
রাশেদ সাহেব বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখলেন।
উঠানের পাশে পানির বাটিটা রাখা। বৃষ্টির পানি পড়ে বাটি উপচে যাচ্ছে।
তিনি নিচে নেমে বাটিটা বারান্দার ছাদের নিচে সরিয়ে রাখলেন।
ফিরে আসার সময় অভ্যাসবশত বললেন,
—বাইরে যেও না। বৃষ্টি হচ্ছে।
নিজের কথা নিজের কানে গেল।
তিনি থমকে দাঁড়ালেন।
তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উঠলেন।
রাতে তিথি আবার ফোন করল।
—বাবা, খেয়েছ?
—খেয়েছি।
—কী খেয়েছ?
রাশেদ সাহেব এবার মনে করতে পারলেন।
—মাছের ঝোল। ডাল।
—ওষুধ?
—খেয়েছি।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
তিথি বলল,
—তুমি কি কাঁদছ?
—না।
—তোমার গলা ওরকম কেন?
—বয়স হয়েছে। গলা খারাপ হবে না?
তিথি কিছু বলল না।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—টুকু কি আমাকে খুব বেশি ভালোবাসত?
প্রশ্নটা করার পর তাঁর মনে হলো, প্রশ্নটি করা ঠিক হয়নি।
তিথি খুব সহজ গলায় বলল,
—হ্যাঁ।
—তুমি কীভাবে জানো?
—তুমি ঘরে না থাকলে ও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত।
—ও তো সবার জন্যই অপেক্ষা করত।
—তোমার জন্য আলাদাভাবে করত।
—আলাদাভাবে অপেক্ষা আবার কী?
—তুমি ফিরলে দেখোনি?
রাশেদ সাহেব দেখেছেন।
তিনি প্রতিদিন দেখেছেন।
বাজার থেকে ফিরলে টুকু এমনভাবে ছুটে আসত, যেন রাশেদ সাহেব পাঁচ বছর পর যুদ্ধ থেকে ফিরেছেন। দশ মিনিটের জন্য বাইরে গেলেও একই ঘটনা ঘটত।
মানুষ তার জীবনে অনেক জায়গায় ফিরে আসে।
অফিস থেকে বাড়ি ফেরে।
ভ্রমণ থেকে ফেরে।
রাগ করে বেরিয়ে গিয়ে ফেরে।
কিন্তু কেউ তার ফেরাকে প্রতিবার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঘটনা বলে মনে করে না।
টুকু করত।
তিথি বলল,
—বাবা?
—হুঁ।
—তুমি কাঁদতে পারো।
—কাঁদব কেন?
—মন চাইলে।
—মন যা চায়, সব করতে নেই।
—আজ করতে পারো।
রাশেদ সাহেব ফোন রেখে দিলেন।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে বাড়ির সব দরজা-জানালা পরীক্ষা করলেন। প্রধান দরজার ছিটকিনি লাগালেন। রান্নাঘরের বাতি নিভালেন। পানির কল বন্ধ করলেন।
শোবার ঘরে এসে দেখলেন, বিছানার ডান পাশে চাদর সামান্য কুঁচকে আছে।
তিনি চাদর ঠিক করলেন না।
বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন।
ঘর অন্ধকার।
বাইরে বৃষ্টির শব্দ।
একসময় তাঁর মনে হলো, বিছানার পাশে মেঝেতে নখের হালকা শব্দ হচ্ছে।
টিক।
টিক।
টিক।
তিনি নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনলেন।
আবার শব্দ হলো।
তিনি জানেন, পুরোনো বাড়িতে নানা ধরনের শব্দ হয়। কাঠের আসবাব ঠান্ডায় সংকুচিত হয়। জানালায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে। টিকটিকি দেয়াল বেয়ে হাঁটে।
সব শব্দের ব্যাখ্যা থাকে।
তিনি অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
হাতের নিচে কিছু নেই।
তারপরও তিনি হাতটা নামিয়ে রাখলেন বিছানার পাশে। অনেকক্ষণ।
যেন অন্ধকারের ভেতর থেকে পরিচিত একটা মাথা এসে তাঁর তালুর নিচে জায়গা নেবে।
কেউ এল না।
রাশেদ সাহেব ফিসফিস করে বললেন,
—ভয় পেয়ো না। আমি আছি।
কথাটা কাকে বললেন, তিনি জানেন না।
টুকুকে?
নিজেকে?
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।
রান্নাঘরের পাশে পানিভরা বাটিটা পড়ে আছে। লাল বলটা বারান্দায়। সোফার কুশনের এক পাশে কয়েকটা বাদামি লোম এখনো আটকে আছে।
ঘর ধীরে ধীরে টুকুর অনুপস্থিতি শিখে ফেলবে।
বিছানার পাশে আর জায়গা রেখে হাঁটতে হবে না। বাথরুমের দরজা ফাঁক করে রাখতে হবে না। বিস্কুট ভাঙার সময় অর্ধেক আলাদা করতে হবে না। বাজার থেকে ফেরার পর দরজা খোলার আগে হাসি প্রস্তুত রাখতে হবে না।
সবকিছু আবার সহজ হয়ে যাবে।
শুধু রাশেদ সাহেবের ঘুম ভাঙার পরের কয়েক সেকেন্ড সহজ হবে না।
সেই কয়েক সেকেন্ডে টুকু বেঁচে থাকবে।
পাশেই গোল হয়ে শুয়ে থাকবে।
রাশেদ সাহেব হাত বাড়াবেন।
তারপর ঠান্ডা চাদর ছুঁয়ে সব মনে পড়বে।


