মিতালীকে সেদিন দেখলাম শার্টের ওপর একটা কাপড় বেশ কায়দা করে জড়িয়ে বেরিয়েছে। কাপড়টা দেখে আমার চোখে প্রথমেই যেটা মনে হল, ওড়না। আমাদের ছেলেবেলায় ওড়না চিনতে ফ্যাশন ডিজাইনের ডিগ্রি লাগত না। সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে থাকলে ওড়না, মাথায় দিলে ঘোমটা, গলায় পেঁচালে শীতের সময় মাফলার হওয়ার সম্ভাবনা। কাপড়জাত জিনিসের জগত তখন বেশ সরল ছিল।
এখন আর সে দিন নেই।
আমি খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলাম,
‘শার্টের উপরে ওড়না পরছ কেন?’
মিতালী এমনভাবে আমার দিকে তাকাল, যেন আমি এইমাত্র বলেছি পৃথিবী চ্যাপ্টা এবং সূর্য সন্ধ্যাবেলা হাতির পিঠে চড়ে বাড়ি ফেরে।
বলল,
‘এটা ওড়না না, গাধা। এটাকে বলে স্টোল।’
আমি বললাম, ‘ও।’
এই ‘ও’ শব্দটার মধ্যে আমার অনেক কথা ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন প্রেম করে একটা শিক্ষা হয়েছে, সব কথা মুখ দিয়ে বের করতে নেই। কিছু কথা মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়েই মুখের কাছাকাছি এসে আবার ইউ-টার্ন নিয়ে ফিরে যাওয়া ভালো।
তা সত্ত্বেও আমার বিজ্ঞানমনস্ক মনটা একটু আহত হল। কারণ জিনিসটা দেখতে অবিকল ওড়না। আমার সামনে যদি কেউ একটা আলুকে টেবিলে রেখে বলে, ‘এটা আলু না, গাধা, এটাকে বলে পটেটো’, তাহলে আমি ভাষাগত পার্থক্য মেনে নেব, কিন্তু আলুর চরিত্র বদলে গেছে বলে বিশ্বাস করব না।
আমি অবশ্য মিতালীর সামনে এই যুক্তি দিলাম না।
কারণ মিতালী আমার গার্লফ্রেন্ড।
আর বহুদিন পাশাপাশি থাকার সুবাদে আমি একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সূত্র আবিষ্কার করেছি। নিউটন যদি প্রেম করতেন, তাঁর তিনটে গতিসূত্রের পরে সম্ভবত চতুর্থ সূত্র হিসেবে এটা লিখে যেতেন:
ফ্রেন্ডের সঙ্গে তর্ক করা যায়, যদি ফ্রেন্ড গার্ল না হয়।
গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে তর্কের সমস্যা হল, আপনি আলোচনা শুরু করবেন ‘স্টোল আর ওড়নার পার্থক্য’ দিয়ে, শেষ পর্যন্ত কী করে যেন গিয়ে দাঁড়াবে ২০২৪ সালের কোনো এক মঙ্গলবার রাতে আপনি ওর মেসেজের উত্তর দিতে সতেরো মিনিট দেরি করেছিলেন সেই ঘটনায়।
মেয়েদের স্মৃতিশক্তির এই জায়গাটা আমাকে বরাবর মুগ্ধ করে।
আমি গতকাল দুপুরে কী খেয়েছি মনে করতে পারি না। মিতালী চার বছর আগে কোন রেস্টুরেন্টে বসে আমি কোন ওয়েট্রেসকে ‘থ্যাংক ইউ’ বলার সময় একটু বেশি হাসি দিয়েছিলাম, সেটাও মনে রাখতে পারে।
এ এক আশ্চর্য আর্কাইভ।
গুগলের সার্ভার ডাউন হতে পারে, মিতালীর সার্ভার ডাউন হয় না।
তাই সেদিন আর কিছু বললাম না।
কিন্তু মানুষের ভিতরে একটা জিনিস আছে, তাকে বলে কৌতূহল। আর আমার মধ্যে সেই কৌতূহলের সঙ্গে আরেকটা বদগুণও আছে, কেউ আমাকে ‘গাধা’ বললে আমি সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণ করতে চাই যে অন্তত গাধাটা শিক্ষিত।
বাড়ি ফিরে গুগল খুললাম।
সার্চ দিলাম:
difference between stole and dupatta
তারপর পড়তে শুরু করলাম।
দেখলাম, ব্যাপারটা আমার ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
স্টোল সাধারণত তুলনামূলক সরু, লম্বা, অনেক সময় শাল আর স্কার্ফের মাঝামাঝি ধরনের পোশাক-অনুষঙ্গ। ওড়না বা দুপাট্টা দক্ষিণ এশিয়ার পোশাকসংস্কৃতিতে দীর্ঘদিনের জিনিস, সাধারণত একটু চওড়া, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তা, লেহেঙ্গা ইত্যাদির সঙ্গে ব্যবহৃত হয়। আবার ফ্যাশনের বাজারে কাপড়ের মাপ, পরার ধরন, কাপড়ের উপাদান, ডিজাইন এসবের ওপর নাম বদলে যায়।
আমি যত পড়ি, ততই দেখি স্টোল এবং ওড়না একে অন্যের খুব দূরসম্পর্কের আত্মীয় নয়। বরং একই পরিবারের দুই বোন বলা যায়। একজন ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ে, আরেকজন বাংলা মিডিয়ামে।
একজনের নাম স্টোল।
আরেকজনের নাম ওড়না।
একজন কফিশপে যায়।
আরেকজন বিয়েবাড়িতে যায়।
কিন্তু বাতাস জোরে উঠলে দুজনকেই ধরে রাখতে হয়।
এই জায়গায় এসে আমার মনে আনন্দ হল।
ভাবলাম, কাল মিতালীকে ধরব।
সব তথ্য-প্রমাণ নিয়ে বসব। উইকিপিডিয়া থাকবে, দুটো ফ্যাশন ওয়েবসাইট থাকবে, দরকার হলে কাপড়ের দৈর্ঘ্য-প্রস্থের চার্ট বানাব। আমি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার মানুষ, প্রয়োজনে PowerPoint presentation-ও করা যায়।
Slide 1:
Stole vs Orna: A Comparative Study
Slide 2:
Historical Background
Slide 3:
Why Riton Was Technically Not Completely Wrong
শেষ স্লাইডে লিখব:
Conclusion: গাধা বলা কিছুটা অতিরঞ্জিত।
তারপর নিজেরই হাসি পেল।
কারণ আমি জানি, এই প্রেজেন্টেশন দেখানোর পরে মিতালী বড়জোর তিন সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বলবে,
‘হইছে? এখন চা বানাও।’
ব্যস।
বহু বছরের গবেষণা ওখানেই শেষ।
প্রেমের সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটা হচ্ছে প্রতিটা তর্ক জেতার চেষ্টা করা। বয়স কম থাকলে মানুষ ভাবে, সত্য প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। কে ঠিক, কে ভুল, সেটা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত সভা মুলতবি করা যাবে না।
বয়স একটু বাড়লে বোঝা যায়, সংসার কিংবা প্রেম সুপ্রিম কোর্ট না। এখানে প্রতিটা মামলার রায় দরকার নেই।
কিছু মামলা ফাইলেই পড়ে থাকুক।
কিছু বিতর্কে ‘ঠিক আছে’ বলে উঠে চা খেতে যাওয়া অধিকতর বুদ্ধিমানের কাজ।
বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ আপনার গার্লফ্রেন্ড।
আমি জীবনে অনেক জায়গায় তর্ক করেছি। অফিসে করেছি, বন্ধুর সঙ্গে করেছি, বই নিয়ে করেছি, রাজনীতি নিয়ে করেছি, দর্শন নিয়ে করেছি। সক্রেটিস থেকে সার্ত্র পর্যন্ত টেনে এনেছি। কিন্তু প্রেমিকার সঙ্গে তর্ক করতে গিয়ে বুঝেছি, পশ্চিমা দর্শনের সব দার্শনিক এখানে এসে অসহায়।
কান্ট এসে বলবেন, ‘যুক্তির একটা সার্বজনীন নীতি আছে।’
মিতালী বলবে,
‘কান্টকে বলো আগে স্টোল চিনতে শিখতে।’
কান্ট চুপ।
হেগেল হয়তো ডায়ালেকটিক চালু করবেন। Thesis: এটা ওড়না। Antithesis: এটা স্টোল। Synthesis পর্যন্ত যাওয়ার আগেই মিতালী বলবে,
‘বেশি পাকামি কোরো না।’
হেগেলও শেষ।
অ্যারিস্টটলের লজিকও এখানে খুব একটা কাজে লাগবে না।
Premise 1: সব লম্বা কাপড় ওড়না নয়।
Premise 2: স্টোল একটি লম্বা কাপড়।
Conclusion বলার আগেই প্রেমিকা বলবে,
‘তোমার কি আর কোনো কাজ নেই?’
সুতরাং দর্শনশাস্ত্র যেখানে ব্যর্থ, সেখানে আমি কে?
আর পোশাকের নাম নিয়ে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে পুরুষজাতির একটা জন্মগত দুর্বলতা আছে। আমাদের কাছে রঙের নামও সীমিত।
লাল।
নীল।
সবুজ।
কালো।
সাদা।
খুব বেশি হলে বেগুনি।
মেয়েরা সেখানে এমন সব রঙের নাম জানে, শুনলে মনে হয় বাংলা সাহিত্যের হারিয়ে যাওয়া চরিত্র।
মভ।
টারকোয়েজ।
সেজ।
রাস্ট।
কোরাল।
বারগান্ডি।
মিতালী একবার একটা পোশাক দেখিয়ে বলেছিল, ‘কালারটা ডাস্টি রোজ।’
আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম।
আমার চোখে গোলাপের দুটো অবস্থা ছিল। টাটকা গোলাপ আর শুকনা গোলাপ। এখন জানতে পারলাম গোলাপের আবার ধুলাবালিসহ একটা সরকারি রঙ আছে।
আমি বলেছিলাম, ‘এটা তো গোলাপি।’
সেদিনও যে আমাকে কী বলা হয়েছিল সেটা পাঠকের জানার প্রয়োজন নেই।
শুধু বলি, গাধা শব্দটার সঙ্গে আমার সম্পর্ক পুরনো।
তারপর আছে মেয়েদের পোশাকের নাম।
স্কার্ফ, স্টোল, শল, দুপাট্টা, র্যাপ, কেপ, শ্রাগ, কার্ডিগান, কিমোনো, পালাজো, কুলট, টিউনিক।
আমি প্রথম ‘শ্রাগ’ শব্দটা শুনে ভেবেছিলাম মেয়েটা হয়তো কাঁধ ঝাঁকিয়েছে।
বললাম, ‘কী হয়েছে?’
মিতালী বলল, ‘কী আবার হবে?’
আমি বললাম, ‘তুমি তো শ্রাগ বললে।’
ও কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
‘তোমার সঙ্গে কথা বলাই ভুল।’
এরকম কথা আমি বহুবার শুনেছি।
তবু কথা বলা বন্ধ হয়নি।
এই হল প্রেম।
একজন ভাবে অন্যজন একটা গাধা।
গাধাটাও পরদিন আবার ফোন করে।
এখন অবশ্য আমি অনেক বুদ্ধিমান হয়েছি।
মিতালী কিছু পরে এসে যদি বলে,
‘দেখো তো কেমন লাগছে?’
আমি আর পোশাকের নাম শনাক্ত করার চেষ্টা করি না।
বলেই দিই,
‘খুব সুন্দর।’
কারণ এই উত্তরটি পোশাকের ইতিহাসের প্রায় সব যুগে কার্যকর।
হরপ্পা সভ্যতা থেকে Milan Fashion Week পর্যন্ত।
ওড়না হোক, স্টোল হোক, শাল হোক, স্কার্ফ হোক, পর্দার কাপড় কেটে বানানো হোক, আমার উত্তর একই:
‘খুব সুন্দর লাগছে।’
এরপর যদি জিজ্ঞেস করে,
‘কোনটা বেশি ভালো, এটা না আগেরটা?’
এখানে সমস্যা।
এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখনও বিজ্ঞান আবিষ্কার করতে পারেনি।
আগেরটা বললে বলবে,
‘তাহলে এটা পরলাম কেন?’
এটা বললে বলবে,
‘মানে আগেরটা খারাপ লাগছিল?’
দুটোই ভালো বললে বলবে,
‘তুমি ভালো করে দেখইনি।’
এখানে আইনস্টাইন থাকলেও আপেক্ষিকতার নতুন তত্ত্ব লিখতে বসতেন।
আমি এখন একটা কৌশল ব্যবহার করি।
বলি,
‘দুটোর vibe আলাদা।’
এই ‘vibe’ শব্দটা অসাধারণ।
মানে কিছুই না, কিন্তু শুনলে মনে হয় গভীর কিছু বলেছি।
মিতালীও কয়েক সেকেন্ড ভেবে নেয়।
আমি ততক্ষণে জায়গা ছেড়ে সরে পড়ি।
তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে, মিতালীর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। পোশাকের নাম শিখেছি, রঙের নাম শিখেছি, কোন জিনিস কোথায় পরতে হয় শিখেছি। সবচেয়ে বেশি শিখেছি কখন চুপ থাকতে হয়।
এই শেষ শিক্ষাটাই মানুষের জীবনে সবচেয়ে কাজে লাগে।
ছোটবেলায় আমাদের শেখানো হয় কথা বলতে।
বড় হয়ে জীবন শেখায় কোথায় কথা না বলাই ভালো।
সেদিন গুগল ঘেঁটে আমি যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছিলাম যে স্টোল আর ওড়নার মধ্যে আত্মীয়তা খুবই ঘনিষ্ঠ।
পরদিন মিতালীর সঙ্গে দেখা হল।
ও আবার সেই স্টোলটাই পরে এসেছে।
আমি তাকালাম।
ও বলল,
‘কী দেখছ?’
আমি বললাম,
‘কিছু না।’
ও সন্দেহের চোখে বলল,
‘গুগল করছিলে?’
আমি চুপ।
মিতালী হেসে বলল,
‘করছ, আমি জানি।’
আমি বললাম,
‘হ্যাঁ।’
‘কী পাইছ?’
এই জায়গাটাতেই আমার জীবনের বহু বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগল।
আমি বলতে পারতাম, ‘দেখো, technically তুমি পুরো ঠিক না।’
বললাম না।
আমি বলতে পারতাম, ‘স্টোল আর ওড়না প্রায় একই জিনিস।’
বললাম না।
আমি বলতে পারতাম, ‘গাধা বলাটা প্রত্যাহার করো।’
সেটাও বললাম না।
আমি শুধু বললাম,
‘দেখলাম তুমি ঠিকই বলছ।’
মিতালী খুব সন্তুষ্ট হয়ে সামনে হাঁটতে লাগল।
আমি পেছনে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে ভাবলাম,
গুগল আমাকে জ্ঞান দিয়েছে।
জীবন দিয়েছে বুদ্ধি।
আর মিতালী শিখিয়েছে, এই দুই জিনিস সবসময় একসঙ্গে ব্যবহার করতে নেই।



