নারীর অদৃশ্য শ্রম (টাইপরাইটারের গল্প)
এটা এমন সহজ যন্ত্র, যে নারীও চালাতে পারে। উনিশ শতকের চোখে ‘সহজ’ আর ‘নারীর কাজ’ প্রায় সমার্থক শব্দ।
টাইপরাইটারের জন্মলগ্নেই যে ভুল বোঝাবুঝিটা ঢুকে গিয়েছিল, সেটা কেবল যন্ত্র নিয়ে নয়, কাজ নিয়েও। ১৮৭২ সালে যখন ক্রিস্টোফার ল্যাথাম শোলস তাঁর টাইপরাইটার জনসমক্ষে আনলেন, তখন নিজে সামনে দাঁড়ালেন না। দাঁড়ালেন তাঁর মেয়ে লিলিয়ান। ভেলভেট বডিস, ফুলস্কার্ট, ডান হাত কি-বোর্ডের ওপর, বাঁ হাতে ক্যারেজ রিলিজ। ছবিটার বক্তব্য এতটাই স্পষ্ট যে আলাদা করে ক্যাপশন লাগার কথা নয়: এটা এমন সহজ যন্ত্র, যে নারীও চালাতে পারে। উনিশ শতকের চোখে ‘সহজ’ আর ‘নারীর কাজ’ প্রায় সমার্থক শব্দ।
এই ভুলটা তখনই শুরু। টাইপরাইটারকে সহজ বলা হল, টাইপিংকে বলা হল কমদামি দক্ষতা, আর যাঁরা এই কাজ করলেন, তাঁদের শ্রমকে দেখা হল আধা-যান্ত্রিক, আধা-মানবিক কিছু একটা হিসেবে। অথচ বাস্তবে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। টাইপরাইটার যত ‘সহজ’ বলে বাজারে বিক্রি হয়েছে, টাইপিস্টের কাজ ততটাই জটিল, বহুস্তরীয়, আর বুদ্ধিবৃত্তিক।
ম্যাড মেনের প্রথম পর্বে জোয়ান হলওয়ে যখন পেগি অলসনকে টাইপরাইটার দেখিয়ে বলেন, “পুরুষেরা এমনভাবেই বানিয়েছে যে মেয়েরাও পারে”, তখন সেটাই একশো বছরের পুরনো ধারণার রিহার্সাল। ইতিহাস বলছে, ১৮৮০ সালের আগে যেখানে মহিলা ক্লার্ক ছিল চার শতাংশ, ১৯২০-তে সেটা পঞ্চাশ শতাংশে পৌঁছয়। কিন্তু এই সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে সমান হারে বাড়েনি সম্মান। কারণ এই কাজকে শুরু থেকেই ‘সহজ’ বলে চালানো হয়েছিল।
বাস্তবে টাইপিস্ট হওয়া মানে শুধু কি-বোর্ড টোকা নয়। ট্রেনিং স্কুল, সময়, টাকা, অনুশীলন; সব লাগে। উপরন্তু অফিসে ঢুকেই কাজ শেষ নয়। সেক্রেটারিদের হাত ধরেই টাইপিং ঢুকে পড়ে গবেষণা, সম্পাদনা, নথি তৈরির জগতে। ১৯৩০-এর দশকের সেক্রেটারিয়াল ম্যানুয়াল খুললে দেখা যায়, একদিকে মার্কিন ট্যাক্স কোড, অন্যদিকে হাসিমুখে ফোন ধরার পাঠ। মানে একসঙ্গে হিসেবরক্ষক, সম্পাদক, মনস্তত্ত্ববিদ, আর হালকা অভিনয়শিল্পী।
এই দক্ষতা অফিসের চার দেওয়ালে আটকে থাকেনি। দ্য গ্রেগ রাইটার-এর মতো পত্রিকা মেয়েদের উৎসাহ দিচ্ছিল লেখকদের সাহায্য করতে। টাইপিং, প্রুফ, ইনডেক্সিং; এসবের বিজ্ঞাপন ছাপা হত সাহিত্যপত্রিকায়। এখানে জন্ম নেয় ‘অমানুয়েন্স’-এর ধারণা। নামটা যত পুরোনো, কাজটা তত আধুনিক। লেখকের মুখের ভাষাকে ছাপার অক্ষরে রূপ দেওয়া।
কাগজে নাম না থাকলেও, আধুনিক সাহিত্যের ভিত গড়ায় এই অদৃশ্য সহযোগিতায়। হেনরি জেমসের কথাই ধরা যাক। কবজি ব্যথায় লিখতে না পেরে তিনি ডিক্টেশন শুরু করলেন। এলেন মেরি ওয়েল্ড। সকালে ‘সেক্রেড আওয়ার্স’, রেমিংটন মেশিন, আর একটানা উপন্যাস। দ্য উইংস অব দ্য ডাভ, দ্য অ্যাম্বাসাডর্স, দ্য গোল্ডেন বোল; এই তিনটে বই শুধু লেখেননি জেমস, টাইপও হয়েছেন। ১৯৪ দিন লেগেছে একটার পেছনে। কমা পর্যন্ত ঠিক জায়গায় বসাতে হত। ওয়েল্ড জানতেন, কোন বাক্যে জেমস কী চাইছেন। তাই বইয়ের ভেতরে ঢুকে পড়েছিলেন তিনি, পাঠক হিসেবে, সম্পাদক হিসেবে।
জেমস নিজেই স্বীকার করেছেন, ডিক্টেশনের ফলে তাঁর বাক্য আরও লম্বা, আরও পাকানো হয়ে উঠেছে। কারণ হাতের বাধা নেই। বাক্য মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে অবাধে। এই বদলটা হয়তো হতই, কিন্তু যিনি শুনছেন, তিনি যদি না বোঝেন তাহলে সেই লেখা টিকত না। তাই জেমস বই উৎসর্গ করলেন: “টু মিস ওয়েল্ড, হার কল্যাবোরেটর।”
এর পর এলেন থিওডোরা বোসানকেট। ‘রেমিংটন প্রিস্টেস’। নিউ ইয়র্ক এডিশন তৈরি হল তাঁর হাত ধরে। পুরোনো বই নতুন করে ফুলে উঠল। এক একটা দৃশ্যে এত সংযোজন যে পাতার নম্বরের পাশে ‘a, b, c’ গিয়ে মাঝামাঝি বর্ণমালা পর্যন্ত পৌঁছল। যন্ত্র বদলালে জেমস কাজই করতে পারতেন না। শব্দের সঙ্গে যন্ত্রের আওয়াজও দরকার ছিল।
মৃত্যুর পরেও এই সম্পর্ক থামেনি। সিয়ান্সে, অটোম্যাটিক রাইটিংয়ে, জেমস নাকি আবার ডিক্টেশন শুরু করেন। বোসানকেট সব টাইপ করে রাখেন। লেখা পড়া যায় না, কিন্তু টাইপ করা আছে। অভ্যাস মরেনি।
এই শ্রমের দাম কত ছিল, জানা নেই। সম্ভবত পুরুষদের চেয়ে কম। তবু এই কাজকে তাঁরা উপভোগ করেছেন। সকালে ডিক্টেশন, বিকেলে নিজের জীবন। জেমস ফুল তুলতেন, বই বাঁধাই শেখাতেন। ভদ্রলোক ছিলেন।
কিন্তু গৃহস্থালির অমানুয়েন্সদের হিসেব আরও জটিল। ভেরা নাবোকভ। স্বামী টাইপ করতে পারেন না, গাড়ি চালাতে পারেন না। সবটাই ভেরা। লোলিতা বাঁচানো থেকে শুরু করে কনট্র্যাক্ট, লেকচার নোট, গুগেনহাইম অ্যাপ্লিকেশন; সব তাঁর হাতে। দিনে অফিস, রাতে টাইপরাইটার, মাঝে সন্তানের দেখভাল। নিউমোনিয়ায় পড়লে দিনে পাঁচ পাতা। তার বেশি নয়।
টেবিলে ইন্ডেক্স কার্ড, পাশে টাইপরাইটার। ট্রিপ্লিকেট কপি। কার লেখা, বোঝা যেত টাইপিং দেখেই। ভেরা ছিলেন প্রথম পাঠক, শেষ ভরসা।
ভিভিয়েন এলিয়টও ছিলেন তাই। দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড শুধু এজরা পাউন্ডের নয়। সংলাপ শানানো, শব্দ বদলানো, লাইন যোগ; সব জায়গায় ভিভিয়েন। টাইপ করে দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল তাঁর। ফল হয়েছে, কবিতা। বিয়ে টেকেনি।
দ্বিতীয় স্ত্রী ভ্যালেরি ছিলেন সেক্রেটারি-স্ত্রী। টাইপিং, চিঠিপত্র, শেষ নাটক। মৃত্যুর পর দশ খণ্ড চিঠিপত্র। আর প্রথম স্ত্রী ভিভিয়েনের কাজের স্বীকৃতি।
টাইপরাইটারের যুগ খুব ছোট। হাতে লেখা আর কম্পিউটারের মাঝখানে এক শতক। কিন্তু এই শতকেই সাহিত্যের ভিত নড়েছে। টলস্টয়ের স্ত্রী সোফিয়া হাতে লিখেছেন ওয়ার অ্যান্ড পিস সাত বার। মেয়ে আলেকজান্দ্রা টাইপরাইটারে ডিক্টেশন নিচ্ছেন। বিজ্ঞাপনে মেয়ের ছবি, স্ত্রীর কাজ অদৃশ্য।
এই অদৃশ্য শ্রমটাই আমাদের বুঝতে হবে। টাইপিং মানে যন্ত্র চালানো নয়। মানে ভাষা বোঝা, গতি ধরা, চিন্তার সঙ্গে তাল মেলানো। লেখককে মুক্ত করা। পাঠযোগ্য লেখা তৈরি করা। সম্পাদক হওয়া। প্রথম পাঠক হওয়া। এই কাজ সহজ নয়। সহজ বলে চালানো হয়েছে বলেই এতদিন দেখা হয়নি।
এখন আর্কাইভ খুললে দেখা যাচ্ছে, কাগজে কাগজে এই মেয়েদের ছাপ। নাম নেই, কিন্তু লেখা আছে। আর যত দেখব, ততই বোঝা যাবে, আধুনিক সাহিত্য একা লেখা হয়নি। কিবোর্ডের অন্য পাশে আরেকটা মস্তিষ্ক ছিল। সেটা নারীর।




