তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ২৩ জুলাই ১৮৯৮। মৃত্যু ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। এই দুটো তারিখ লিখে দিলে জীবনীকারের একটা সুখ হয়। মানুষটাকে দুটো পেরেক দিয়ে ইতিহাসের দেওয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া গেল। মাঝখানে তিয়াত্তর বছর। ব্যস। এর মধ্যে উপন্যাস লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, পুরস্কার পেয়েছেন, বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত লেখক হয়েছেন। পরীক্ষায় পাঁচ নম্বরের প্রশ্ন এলে কাজ চলে যাবে।
মুশকিল হচ্ছে, তারাশঙ্করকে এভাবে ধরতে গেলে লোকটা হাতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যান।
পাখির ছবি তুলে তাকে চেনা আর তার উড়ে যাওয়া দেখা এক ব্যাপার নয়। একটি চড়ুই কার্নিশে বসে আছে, খুব সুন্দর। তার ঠোঁট আছে, পালক আছে, ডানা আছে, প্রজাতির নামও গুগল করে জানা গেল। কিন্তু সে যখন হঠাৎ কার্নিশ ছেড়ে আকাশে উঠে যায়, তখন ডানার আসল অর্থ বোঝা যায়। ডানা শরীরের সাজসজ্জা নয়। তার মধ্যে একটা গতি রাখা আছে। লেখকেরও তাই।
তাঁর পুরস্কারের তালিকা, জন্মস্থান, রাজনৈতিক যোগাযোগ, ক’টি উপন্যাস, কোন বিশ্ববিদ্যালয় কী পদক দিল, এগুলো দরকারি। কিন্তু এগুলো দাঁড়ে বসে থাকা পাখি। লেখককে একটু উড়তেও দেখতে হয়। তারাশঙ্কর কোথায় উড়ছেন?
বীরভূমের ওপর দিয়ে। রাঢ়ের লাল মাটির ওপর দিয়ে। কাহার, বাউরি, বাগদি, ডোম, সাঁওতাল, বেদে, বাউল, কবিয়াল, জমিদার, চাষি, তান্ত্রিক, বৈষ্ণব, পতিতা, মাতাল, সাধক, চোর, প্রেমিক, রোগী, কবিরাজ, আধপাগল, ক্ষমতাবান, অসহায়, সকলের মাথার ওপর দিয়ে এবং একই সঙ্গে সকলের খুব কাছ দিয়ে।
বাংলা সাহিত্যের ভদ্রলোকের ড্রয়িংরুম থেকে একটু দূরে গেলেই যে এত লোক বাস করে, খবরটি আমাদের নাগরিক সাহিত্যবোধে সব সময় থাকে না। সাহিত্যেও একটা নিউ আলিপুর আছে। সেখানে সোফা আছে, মনস্তত্ত্ব আছে, জানলার পাশে বিষণ্ণতা আছে, চায়ের কাপের গায়ে আঙুল ঘোরাতে ঘোরাতে সম্পর্কের সংকট আছে। অসুবিধা নেই। মানুষের সেগুলোও জীবন।
তারাশঙ্কর দরজা খুলে বললেন, এদিকে এসো বাবা। এখানে মাটি একটু কাঁকুরে। জুতো ছিঁড়ে যেতে পারে।
সাত-আট বছর বয়সে বৈঠকখানার খড়খড়িওয়ালা দরজায় খড়ি দিয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন। উপলক্ষ, একটি পাখির ছানা মারা গেছে।
পাখির ছানা মরে গিয়েছে
মা ডেকে ফিরে গিয়েছে
মাটির তলায় দিলাম সমাধি
আমরাও সবাই মিলিয়া কাঁদি।
এ কবিতা পড়ে জীবনানন্দ দাশের আত্মা সম্ভবত গভীর মানসিক শান্তি অনুভব করবেন। প্রতিদ্বন্দ্বী উঠে আসেনি। কিন্তু কবিতাটি ভাল কি মন্দ, প্রশ্নটা সেখানে নয়। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, তারাশঙ্করের সাহিত্যজীবনের একটা ক্ষুদ্র নকশা ওই চার লাইনের মধ্যেই যেন বসে আছে।
একটা ঘটনা ঘটেছে। একটা প্রাণী মারা গেছে। বালক সেটা দেখেছে। তারপর লিখেছে।
তারাশঙ্কর শুধু মনের মধ্যে নীল হাতি উড়িয়ে দিয়ে তিনি সাহিত্য বানাতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। অভিজ্ঞতার শক্ত মাটি তাঁর চাই। মাটি কাদা হতে পারে, রুক্ষ হতে পারে, দুর্গন্ধও বেরোতে পারে। কিন্তু পা যেন কোথাও ঠেকে। দশ বছর বয়সে এক ঘুমহীন রাতে মায়ের কাছে তিনি পড়ছেন কপালকুণ্ডলা। এর মধ্যে দৃশ্যটা একটু মনে রাখা ভাল। গ্রামের এক বালক, রাত, ঘুম আসছে না, মা আছেন, সামনে বঙ্কিমচন্দ্র।
আমাদের সময়ে ঘুম না এলে মানুষ ফোন খোলে। পাঁচ মিনিট পর সে জানতে পারে ব্রাজিলের একটি কুকুর স্কেটবোর্ড চালাচ্ছে, কোনও অভিনেতা ডিভোর্স করেছেন, এবং পৃথিবী শেষ হওয়ার আগে কোন দশটি জিনিস কিনে রাখা উচিত। তারাশঙ্করের দুর্ভাগ্য, এসব ব্যবস্থা ছিল না। ফলে বঙ্কিম পড়তে হয়েছে। সেই ক্ষত আর সারেনি।
তারাশঙ্করের মধ্যে প্রথম থেকেই কবি হওয়ার একটা টান ছিল। কুকুরের সমাধি নিয়েও লিখেছেন, পুজো নিয়েও লিখেছেন। জীবনের শেষ পর্বেও সেই কাঁচা কবিতাগুলো তিনি ভুলতে পারেননি। আত্মকথায় তুলে রেখেছেন। এখানে তাঁর চরিত্রের একটা অদ্ভুত দিক দেখা যায়।
রবীন্দ্রনাথ বৃদ্ধ বয়সে নিজের দুর্বল লেখা নিয়ে চিন্তিত। ভবিষ্যৎ পাঠক যদি আবর্জনাকেও শ্রেয় বলে সাজিয়ে রাখে? কবিরও লজ্জা বলে কিছু আছে। তারাশঙ্করের মধ্যে সে লজ্জা তুলনায় কম। তিনি যেন বলছেন, হ্যাঁ, লিখেছিলাম। খারাপ? তা হোক। তখন আমি ওই ছিলাম। নিজের অতীতকে কসমেটিক সার্জারি করিয়ে প্রকাশ করার ইচ্ছে তাঁর কম।
কিন্তু গদ্যের ক্ষেত্রে আবার সম্পূর্ণ উল্টো লোক।
পুরোনো বই হাতে পেলেই কলম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। সংশোধন করছেন। বাড়াচ্ছেন। চরিত্রে মাংস বসাচ্ছেন। ঘটনা ঢোকাচ্ছেন। হাঁসুলী বাঁকের উপকথা দ্বিতীয় সংস্করণে প্রায় নতুন বই হয়ে গেল। দশ ফর্মার মতো বেড়ে গেল কলেবর।
অর্থাৎ বাল্যকবিতার বেলায়, যা হয়েছে হয়েছে। উপন্যাসের বেলায়, দাঁড়াও, এটা আবার করি।
লেখক হিসেবে এই অতৃপ্তি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তারাশঙ্করের দুর্বলতাও এখানেই। তাঁর মধ্যে সংযমের চেয়ে প্রাচুর্য বেশি। একটা কথা বলতে গিয়ে আরেকটা কথা মনে পড়ে। একটা চরিত্র এসেছে, তার মামাতো ভাইয়ের জীবনটাও বেশ ইন্টারেস্টিং। ওইদিকে একটা সম্প্রদায় আছে, তাদের গানটাও দিলে হয়। তারপর একটা মেলা। সঙ্গে একটা তান্ত্রিক। তার ওপর জমিদারি ভাঙছে। নদীর গতিপথ বদলাচ্ছে। আর একটা প্রেমও আছে। আধুনিক সম্পাদক পাশে থাকলে হয়তো মাথা ধরে বলতেন, দাদা, কাটুন। তারাশঙ্কর বলতেন, আগে তুমি রাঢ়টা দেখে এসো।
তারাশঙ্করের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার সম্ভবত কোনও একটি চরিত্র নয়। তাঁর আবিষ্কার একটি ভূগোল। উত্তর রাঢ়।
‘আবিষ্কার’ কথাটা অবশ্য বিপজ্জনক। জায়গাটা তারাশঙ্কর জন্মানোর আগেও ছিল, মানুষও ছিল। কলম্বাসের মতো ব্যাপার করলে দাঁড়াবে, লোকজন কয়েক হাজার বছর ধরে বসবাস করছে, একজন এসে বললেন, হুররে, পেলাম। বরং বলা যায়, বাংলা কথাসাহিত্যের মানচিত্রে তিনি অঞ্চলটিকে এমন জোরে বসালেন যে আর উপেক্ষা করা গেল না। রাঢ় তাঁর কাছে ব্যাকগ্রাউন্ড নয়। রাঢ় নিজেই একটা চরিত্র।
তার মাটি লাল। তার গ্রীষ্ম আলাদা। জলাভাব আছে। নদী আছে। জঙ্গল আছে। জমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আছে। জমিদারি আছে। সমাজের স্তর আছে। জাতপাত আছে। দেবদেবী আছেন। শাক্ত আচার আছে। বৈষ্ণব গান আছে। তন্ত্র আছে। কুসংস্কার আছে। এবং কুসংস্কার বলে যেটিকে শহুরে মানুষ দু-লাইনে বিদায় দেয়, তার মধ্যে বসবাসকারী মানুষের কাছে সেটাই জগতের কার্যকর ব্যাখ্যা।
তারাশঙ্কর সেই ভিতরকার পৃথিবীটি জানতেন। এই জানাটা গুরুত্বপূর্ণ। কোনও সমাজকে বাইরে থেকে দেখলে মানুষ প্রধানত তার অদ্ভুত রীতিগুলো দেখে। ভিতর থেকে দেখলে বোঝে, ওই রীতির মধ্যে মানুষ কীভাবে প্রেম করে, ভয় পায়, লোভ করে, ঈর্ষা করে, বাঁচে, মরে। তারাশঙ্করের সাহিত্যে তাই লোকজ জীবন কোনও প্রদর্শনী নয়। চিড়িয়াখানার খাঁচার সামনে ফলক ঝোলানো নেই: ‘এই যে দেখিতেছেন, বাউরি। ইহারা এইরূপে জীবনযাপন করে।’ তাঁর লোকেরা কথা বলে। ঝগড়া করে। কামনা করে। ভুল করে। অত্যাচারও করে।
এটা জরুরি। কারণ দরিদ্র বা প্রান্তিক মানুষকে সাহিত্যে আনার পর আমাদের আরেকটি বদভ্যাস দেখা দেয়। আমরা তাকে তৎক্ষণাৎ মহৎ বানিয়ে ফেলি। গরিব মানেই দেবদূত। নিপীড়িত মানেই নৈতিকতায় শতকরা একশো। তারাশঙ্কর ওই ধরনের সার্টিফিকেট বিতরণে বিশেষ আগ্রহী নন।
তাঁর মানুষের পেটে ক্ষুধা আছে। শরীরে কাম আছে। মনে হিংসা আছে। প্রেমও আছে। একই মানুষের মধ্যে সব আছে। মানুষ ব্যাপারটাই দুর্ভাগ্যক্রমে খুব অপরিষ্কার।
তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসটির নামই কবি। নিতাই কবিয়াল বাংলা উপন্যাসের এক আশ্চর্য চরিত্র। তারাশঙ্কর বলেছেন, তাঁদের গ্রামের বাউরি, ডোমদের মধ্যেই কত কবি আছেন। তাঁদের একজনকে ‘মানস সরোবরে স্নান করিয়ে’ তিনি তাঁর উপন্যাসের নায়ক হিসেবে ‘অভিষেক’ করেছেন।
বাক্যটাও লক্ষ্য করার মতো। ‘একজনকে নিয়ে চরিত্র করেছি’ বললে কাজ চলত। না। মানস সরোবর লাগবে। স্নান লাগবে। অভিষেক লাগবে। তারাশঙ্করের মধ্যে কোথাও একটা স্থায়ী কবিয়াল বসে আছেন। তিনি সাধারণ বাক্যকে চুপচাপ যেতে দেন না। মাঝে মাঝে মাথায় পাগড়ি পরিয়ে ঢাকঢোল বাজিয়ে পাঠান।
আজকের সংযমী গদ্যরুচিতে এতে বিরক্তি হতে পারে। আমরা এখন বাক্যকে বলি, ওজন কমাও। বিশেষণ বাদ দাও। মেটাফর দুটো কমাও। সকালে ওটস খাও। তারাশঙ্কর অন্য প্রকৃতির। তাঁর মধ্যে প্রাচুর্য।
বাউলের গানের মতো, কবিগানের লড়াইয়ের মতো, গ্রামের মেলার মতো। যেখানে মাইকটা একটু বেশি জোরে বাজবেই, জিলিপির পাশে নাগরদোলা থাকবে, তার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে তত্ত্ব বলবে, আর একটু দূরে একজন গাঁজা খেয়ে গান ধরবে। তাঁর গদ্যের মধ্যেও গান ঢুকে পড়ে।
ইমারত-এর মতিবালা ছাদ পিটতে পিটতে গান গায়। তৃষ্ণা-র ক্ষুদিরাম গান ধরে। আরোগ্য নিকেতন-এ ছড়া আছে। বিষাদের মধ্যেও কোথাও হাসি। এ হাসির একটা পারিবারিক ইতিহাসও আছে।
তারাশঙ্করের গ্রামের ব্রজজ্যাঠা ছিলেন পোস্টাপিসের চাকুরে, তন্ত্রসাধক, গাঁজা ও মদ দুই-ই গ্রহণ করতেন, আধপাগল, আত্মভোলা এবং ভাল গায়ক। একজন মানুষের পরিচয়ের জন্য এই তথ্যগুলোই যথেষ্ট। এর পরে তাঁর লিংকডইন প্রোফাইলের দরকার পড়ে না।
গ্রীষ্মের ভয়াবহ রোদে একদিন কুটুমবাড়ি যাওয়ার পথে তাঁর জুতো ছিঁড়ে গেল। খালি পায়ে কাঁকুরে রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছে খোঁড়াচ্ছেন। ধনী আত্মীয়রা জিজ্ঞেস করল, ব্রজবাবু খোঁড়াচ্ছেন কেন?
সাধারণ মানুষ বলত, পায়ে ফোসকা পড়েছে। ব্রজজ্যাঠা সঙ্গে সঙ্গে মনোহরশাহী কীর্তনের সুরে উত্তর দিলেন:
ভাস্করেরই কর অতীব প্রখর,
ফোসকা পড়িল পায়,
তাহারও উপর পথেতে কাঁকর,
লবণের ছিটা ঘায়ে।
জীবনের কষ্টকে গান বানিয়ে ফেলার এই ক্ষমতা তারাশঙ্করের সাহিত্যে নানা জায়গায় আছে। কষ্ট কমে যায় না। কিন্তু কষ্টের ওপর মানুষের একটা অধিকার তৈরি হয়। আমি যদি আমার দুর্দশা নিয়ে গান বানাতে পারি, দুর্দশা তখন আর আমাকে পুরোপুরি মালিকানাধীন করতে পারে না। এখানেই লোকসংস্কৃতির বড় শক্তি।
তারাশঙ্করের সাহিত্য নিয়ে পুরোনো সমালোচকেরা একটি শব্দ বারবার ব্যবহার করেছেন: প্রবৃত্তি। কথাটা জটিলও, বিপজ্জনকও।
কারণ মানুষকে প্রবৃত্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে শুরু করলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রয়েড এসে বসবেন। তার পর ডারউইন। একটু পরে শোপেনহাওয়ার দরজায় কড়া নাড়বেন। শেষে দেখা যাবে একটা গ্রামের মাতাল কেন প্রতিবেশীর সঙ্গে মারামারি করল বোঝার জন্য আমরা ভিয়েনা, গালাপাগোস আর ফ্রাঙ্কফুর্ট ঘুরে এলাম।
তারাশঙ্করের ক্ষেত্রে প্রবৃত্তির কথাটা সহজভাবে বোঝা ভাল। মানুষের সভ্য মুখটির নিচে কয়েকটি জোরালো তাড়না কাজ করে। ক্ষুধা। কামনা। আত্মরক্ষা। ক্ষমতা। প্রেম। ঈর্ষা। ভয়। দলের প্রতি আনুগত্য। নিজেকে টিকিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা। কখনও সেই তাড়নার ওপর ধর্ম বসে। কখনও সমাজ। কখনও নীতি। কখনও ভালবাসা। আর কখনও সব বাঁধ ভেঙে যায়।
তারাশঙ্করের কৌতূহল প্রধানত ওই ভাঙার শব্দটার দিকে। সেজন্য তাঁর সাহিত্যে কেবল কোমল বা মধুর রস নেই। রৌদ্র আছে। ভয় আছে। বীভৎসতা আছে। মৃত্যুর গন্ধ আছে। জীবন তাঁর কাছে ফুলের বাগান হলে সঙ্গে কসাইখানাও আছে। দুটো একই শহরে।
সমালোচক জগদীশ ভট্টাচার্য একসময় তুলনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, শরৎচন্দ্রের আরাধ্যা যেন রাধিকা, তারাশঙ্করের আরাধ্যা নগ্নিকা কালী। বাক্যটা ভারী সুন্দর। সুন্দর বাক্য বিপজ্জনকও হয়, কারণ তার চাকচিক্যে যুক্তির ফাটল চাপা পড়ে যায়। শরৎচন্দ্রকে শুধু কোমল-মধুর বলে ছেড়ে দেওয়া কঠিন। তাঁর জগৎও অত নিরামিষ নয়। কিন্তু তারাশঙ্করের ক্ষেত্রে কালীমূর্তির উপমাটি একটা সত্য ধরতে পারে। তাঁর জীবনদৃষ্টিতে সৃষ্টি আর ধ্বংস পাশাপাশি। মাতৃত্ব আর রক্ত। প্রেম আর কাম। মৃত্যু আর পুনর্জন্ম। সভ্য আচারের নীচে আদিম শরীর। তিনি মানুষের মুখ দেখে থামেন না। দাঁতও দেখেন। (হয়ত কোন পাঠক এটা পড়তে পড়তে তার নিজের দাঁতের ব্যাথার কথা মনে পড়বে)।
তারিণী মাঝির কথা এখানে বিশেষভাবে না বলে পারছি না। সংকটের মুহূর্তে প্রেম আর আত্মরক্ষার সংঘর্ষ। আমরা নিজেদের সম্বন্ধে খুব উচ্চ ধারণা পোষণ করি। বলি, প্রিয় মানুষের জন্য প্রাণ দিয়ে দেব।
এ কথাটি সাধারণত খুব নিরাপদে বলা হয়ে থাকে। ঘরটি নিরাপদ। চা খেতে খেতে। পাখা চলছে। প্রাণ দেওয়ার কোনও তাৎক্ষণিক আশঙ্কা নেই। কিন্তু জলের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে সিদ্ধান্তটা আবার চাইলে দেখা যাবে। তারাশঙ্করের আগ্রহ ওই ‘জলের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে’। মানুষ যখন বিপদের মুখোমুখি, তার নীতিকথা, কবিতা, শপথ, প্রেমের ডায়লগ সব সরিয়ে দিলে ভেতর থেকে কী বেরোয়? এই প্রশ্ন নিষ্ঠুর। সাহিত্যিকদের কিছু নিষ্ঠুর প্রশ্ন করতেই হয়।
কিন্তু এখানেই তারাশঙ্করের জীবনদৃষ্টি থেমে থাকেনি। পরিণত বয়সে তাঁর চিন্তার মধ্যে প্রেম, একাত্মতা এবং আত্মবিসর্জনের গুরুত্ব ক্রমেই বড় হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ শুধু নিজের প্রাণ বাঁচায়, এই সিদ্ধান্তে তিনি স্থির থাকেননি। মানুষ নিজের প্রাণও দেয়। দুটোই সত্য। মানুষের ঝামেলাই এটাই।
তারাশঙ্করের প্রথম দিককার রচনায় ব্যক্তিমানুষ প্রবল। পরে ক্যানভাস বড় হতে থাকে। কালিন্দী থেকে গণদেবতা, পঞ্চগ্রাম, হাঁসুলী বাঁকের উপকথা। একজন মানুষ আরেকজনকে ভালবাসছে, ঘৃণা করছে, ঠকাচ্ছে, এই স্তর পেরিয়ে একটা জনপদ কীভাবে বদলাচ্ছে, সেই দিকে নজর যায়।
এখানে তারাশঙ্কর খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনও সমাজ বদলায় মানে শুধু একটা নতুন আইন হল বা নতুন নেতা এল, এমন নয়। রাস্তা বদলায়। অর্থনীতি বদলায়। জমির মালিকানা বদলায়। নতুন যন্ত্র আসে। পুরোনো পেশা অপ্রয়োজনীয় হয়। জাতপাতের সম্পর্ক একটু আড়ালে যায়। পুরোনো দেবতার ক্ষমতা কমে। নতুন শিক্ষার ভাষা ঢোকে। তারপর একদিন দেখা যায়, দাদু যে পৃথিবীকে স্বাভাবিক ভেবেছিলেন, নাতির কাছে সেটি প্রাগৈতিহাসিক।
হাঁসুলী বাঁকের উপকথা সেই পরিবর্তনের এক অসাধারণ দলিল। এখানে ‘উপকথা’ শব্দটির মধ্যেই একটি বিপন্নতা আছে। আজ যা জীবন, কাল সেটা গল্প হয়ে যাবে। মানুষ নিজের বর্তমানকে কখনও ইতিহাস বলে অনুভব করে না। সে ভাত খায়, বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে, ধার চায়, মাঠে যায়। পঞ্চাশ বছর পরে গবেষক এসে বলবেন, ‘এই সময়কালে গ্রামীণ উৎপাদন-সম্পর্কের রূপান্তর লক্ষণীয়।’ যে লোকটির পেটে সেদিন ভাত ছিল না, সে শুনলে সম্ভবত গবেষককে মারত।
তারাশঙ্কর দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়ান। মানুষের ক্ষুধাটাও দেখেন। ইতিহাসের পরিবর্তনটাও।
মোহিতলাল মজুমদার তারাশঙ্করের মধ্যে এক ধরনের ‘বৈজ্ঞানিক কৌতূহল’ দেখেছিলেন। তারাশঙ্কর ল্যাবরেটরিতে সাদা কোট পরে বাউরির ওপর টেস্টটিউব ধরেছেন, এমন নয়। অর্থ হচ্ছে, তিনি জানতে চান। মানুষ এমন কেন? এই সম্প্রদায় এমনভাবে থাকে কেন? এই বিশ্বাস কোথা থেকে এল? এই কামনা মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়? এই ভয়? এই সামাজিক বন্ধন? জীবনের কলকব্জা খুলে দেখতে চান।
এখানে সাহিত্যিকের সঙ্গে শিশুর একটা মিল আছে। শিশুকে একটা ঘড়ি দিলে সে হয়তো খুলে ফেলবে, ভিতরে কী আছে দেখবে। বড়রা বলবে, নষ্ট করলি! লেখকও কখনও কখনও সমাজের ঘড়ি খুলে ফেলেন। তারাশঙ্করের দুর্দমনীয় কৌতূহল ওই জাতের। আর এই কারণেই তাঁর সাহিত্য শুধু রসাস্বাদনের উদ্দেশ্যে মানুষকে সুন্দর করে নয়; রোগীর মতোও দেখে। সাধকের মতোও দেখে। তান্ত্রিকের মতোও।
মোহিতলাল ‘তান্ত্রিক দৃষ্টি’ কথাটি ব্যবহার করেছিলেন। ‘তান্ত্রিক’ শুনে অনেকে সঙ্গে সঙ্গে করোটি, লাল জবা আর অমাবস্যা ভাবতে পারেন। ব্যাপারটা এখানে অত সিনেম্যাটিক নয়। এর একটা অর্থ এই হতে পারে, জীবনের কোনও অংশকে ‘অশুচি’ বলে বাদ দেওয়া যাবে না। ঘৃণা? দেখো। কাম? দেখো। লোভ? দেখো। মৃত্যু? সেটাও।
মানুষের যে অংশটি সভ্য সমাজ পর্দার আড়ালে রাখে, শিল্পীর কাজ কখনও কখনও পর্দাটা একটু সরানো। তারাশঙ্কর সেটা করেছেন।
সজনীকান্ত দাস বলেছিলেন, তারাশঙ্করের শিল্প বিষয়কে অনুসরণ করে চলে। এটি প্রশংসাও, আবার সামান্য শ্লেষ মিশিয়ে পড়লে অভিযোগও হয়ে যেতে পারে। কারণ ‘আর্ট বিষয়কে অনুসরণ করে’ বলতে বোঝানো যায়, বিষয় এত প্রবল যে শিল্পরূপ তার পেছনে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়চ্ছে। বুদ্ধদেব বসুর আপত্তির জায়গাটাও ছিল সম্ভবত এখানে। তারাশঙ্করের লেখার উপকরণের অভাব নেই। সমস্যা, সব সময় সেই উপকরণ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সেখানে। অভিযোগটি পুরো উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তারাশঙ্কর মাঝে মাঝে বেশি বলেন। বাক্য বাড়ে। আবেগ বাড়ে। ঘটনা বাড়ে। পাত্রপাত্রী বাড়ে। জীবনও অবশ্য অল্প বলে না। এখানেই সমালোচকের বিপদ। খুব সংযত লেখককে বলা যায়, জীবন নেই। খুব প্রাচুর্যময় লেখককে বলা যায়, সংযম নেই। সমালোচক হওয়া মোটের ওপর বেশ নিরাপদ পেশা। লেখক বেচারা যেদিকেই যান, ধরা পড়বেন।
তারাশঙ্করের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা তাই শুধু তাঁর ‘দোষ’ কী ছিল, তা নয়। ওই তথাকথিত দোষ ছাড়া তাঁর গুণগুলো সম্ভব হত কি? যাঁর জগৎ এত লোক, এত জাতি, এত গান, এত বিশ্বাস, এত প্রবৃত্তি, এত সমাজগত পরিবর্তনে ঠাসা, তাঁর সাহিত্য যদি জাপানি জেন-বাগানের মতো হয়, সন্দেহ হত।
তারাশঙ্করকে আবার ‘আঞ্চলিক সাহিত্যিক’ও বলা হয়। শব্দটা ব্যবহার করা যায়। সাবধানে। কারণ ‘আঞ্চলিক’ শব্দটির মধ্যে মাঝে মাঝে একটা কলকাতাকেন্দ্রিক নাক-সিঁটকানো ভাব লেগে থাকে। কলকাতার প্রেম বিশ্বজনীন। বীরভূমের প্রেম আঞ্চলিক। পার্ক স্ট্রিটে মানুষ একা হলে সেটা অস্তিত্ববাদ। লাভপুরে মানুষ একা হলে লোকসাহিত্য। ব্যাপারটা একটু গোলমেলে।
টমাস হার্ডির ওয়েসেক্স আঞ্চলিক। ফকনারের ইয়কনাপাটোফা আঞ্চলিক। মার্কেসের মাকোন্দো আঞ্চলিক। কিন্তু মানুষ সেখানে যে কারণে কাঁদে, সেই কান্নার পাসপোর্ট লাগে না।
তারাশঙ্করের রাঢ়ও তেমন। স্থানীয়তা তাঁর সীমা এবং তাঁর শক্তি। তিনি সব পৃথিবী জানেন না। কোনও লেখকই জানেন না। নিজের জানা অঞ্চলটাকে এত গভীরভাবে জানেন যে তার মধ্যে দিয়ে বৃহত্তর মানুষকে দেখা যায়।
তারাশঙ্করের সাহিত্যবোধে ‘সত্য’ কথাটা বারবার ফিরে আসে। এখানে শরৎচন্দ্রের একটি কথা মনে রাখার মতো। সাহিত্য সত্য ঘটনার রিপোর্ট নয়। কিন্তু কল্পনার সৌধ দাঁড়াবে এমন মাটির ওপর, যেখানে নিচে সত্যের ভিত্তি আছে। তারাশঙ্করের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা এই। তিনি সাংবাদিক নন। হাঁসুলী বাঁকের উপকথা জনগণনা রিপোর্ট নয়। কবি কোনও নৃতাত্ত্বিক জরিপ নয়। তবু ভিতরে অভিজ্ঞতা আছে।
মানুষের আচরণের সত্য আছে। পরিবেশের সত্য আছে। ভাষার সত্য আছে। যে কারণে কল্পনা বিশ্বাসযোগ্য হয়। সাহিত্যে সত্যি বলতে ‘ঘটেছিল’ সব সময় জরুরি নয়। ‘ঘটতে পারে’ অনেক বেশি জরুরি।
আর তারও গভীরে আছে, ‘মানুষ এরকম করতে পারে।’ তারাশঙ্করের মানুষ সেই পরীক্ষায় বারবার সত্যি হয়ে ওঠে।
বাংলা সাহিত্য-সমালোচনার পুরোনো অভ্যাস, লেখকদের দেবদেবীর মতো সাজানো। বঙ্কিম শিব। রবীন্দ্রনাথ সুন্দর। শরৎচন্দ্র রাধা। তারাশঙ্কর কালী। আর একটু চললে মানিক নিশ্চয় ভৈরব, বিভূতিভূষণ বনদেবতা, তারপর অফিসিয়াল প্যান্থিয়ন তৈরি হয়ে যাবে। তুলনা বোঝার সুবিধা দেয়। আবার খুব দ্রুত সরলও করে।
বঙ্কিম নীতি নিয়ে ভেবেছেন, সত্য। কিন্তু তাঁর উপন্যাসে প্রবৃত্তির ঝড়ও প্রবল। রবীন্দ্রনাথ সৌন্দর্যের শিল্পী, সত্য। কিন্তু চোখের বালি, নষ্টনীড়, যোগাযোগ, ঘরে বাইরে পড়লে বোঝা যায়, নৈতিক সংঘর্ষ থেকে তিনি মোটেই ছুটি নেননি। শরৎচন্দ্র প্রেমের লেখক। তাঁর প্রেমও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে ধাক্কা খায়। তারাশঙ্কর প্রবৃত্তির লেখক। তাঁর মধ্যেও প্রেম ও মানবতার বিশ্বাস গভীর। বড় লেখকের অসুবিধা হচ্ছে, তাঁকে এক লাইনে ধরলে তিনি পরের বই দিয়েই লাইনটা ভেঙে দেন।
তারাশঙ্করের চিন্তার আরেকটা দিক না বললে তাঁর ছবি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তিনি ঐতিহ্যবাদী। ভারতবর্ষ তাঁর কাছে সভ্যতার এক দীর্ঘ আত্মপরিচয়। গৌতম বুদ্ধ তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। গান্ধী গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করেন একাত্মতায়। মানুষের মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক আছে যা সামাজিক শ্রেণি, জাত, ধর্ম, বাহ্য বিভাজনের গভীরে যায়।
আজকের পাঠকের কাছে এই ভাষা একটু সেকেলে লাগতে পারে। ‘মানবতা’ শব্দটি এখন বললেই অনেকের মনে হয় কোনও পুরোনো সম্মেলনের ব্যানার খুলে গেছে। কিন্তু তারাশঙ্করের কাছে বিশ্বাসটা অলংকার ছিল না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, তাঁর সাহিত্যের সঙ্গে তার কোনও বিরোধও নেই। মানুষের নিচে প্রবৃত্তি আছে বলেই মানুষ কেবল প্রবৃত্তি নয়। হিংসা আছে বলেই অহিংসার প্রশ্ন আসে। স্বার্থ আছে বলেই আত্মত্যাগ বিস্ময়কর। বাঘ যদি কখনও শিকার না করত, তার পাশে হরিণ নিরাপদে বসে থাকলে কোনও মহত্ত্ব থাকত না। মানুষের অন্ধকার জানার পরেও তারাশঙ্কর আলোর সম্ভাবনা ছাড়েননি। এটাই তাঁর মানবতার মূল্য।
একজন লেখককে বিচার করতে কী লাগে? শুধু ভালবাসা যথেষ্ট নয়। শুধু বিদ্বেষও নয়। সৎ পাঠক দরকার। যিনি লেখকের সামাজিক প্রতিষ্ঠা দেখে হাঁটু গেড়ে বসবেন না। আবার লেখক ফ্যাশনে নেই বলে নাকও সিঁটকাবেন না। যিনি দুর্বলতা দেখবেন। শক্তিও দেখবেন। তারাশঙ্করের মতো লেখকের ক্ষেত্রে এই ভারসাম্য খুব দরকার। তাঁর ভাবোচ্ছ্বাস আছে। আড়ম্বর আছে। গ্রাম্যতার ছাপ আছে। পুনরুক্তি আছে। সংযমহীনতা আছে। একই সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতার ব্যাপ্তি আছে। মানুষ দেখার ক্ষমতা আছে। চরিত্র নির্মাণের শক্তি আছে। অঞ্চলকে জীবন্ত করে তোলার বিরল সামর্থ্য আছে। গান আছে। কৌতুক আছে। রক্ত আছে। ধুলো আছে। একটা মানুষকে ভালবাসলে তার সব দোষকে গুণ বলার দরকার হয় না। সেটি প্রেম নয়, জনসংযোগ। তারাশঙ্করের শক্তিকে বড় করে দেখতে তাঁর দুর্বলতা ঢাকার প্রয়োজন নেই।
শেষ পর্যন্ত আবার পাখিটায় ফেরা যাক। একজন সমকালীন লেখককে বিচার করার সবচেয়ে বড় অসুবিধা, আমরা তাঁর খুব কাছে দাঁড়িয়ে থাকি। খুব কাছে দাঁড়ালে মানুষের নাক বড় দেখায়। একটু দূরে গেলে মুখ দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, নিকটের লোক লেখককে বর্তমানের আলপিন দিয়ে আটকে ফেলে। পাখার বিস্তার মাপে, উড়ান দেখে না।
তারাশঙ্কর আজ আমাদের কাছ থেকে যথেষ্ট দূরে। ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এ তাঁর মৃত্যু হয়েছে। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় কেটে গেছে। এখন অন্তত তাঁর উড়ানটি একটু ভাল দেখা যায়। তিনি বাংলা কথাসাহিত্যকে এমন মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন, যাদের অস্তিত্ব সাহিত্যিক ভদ্রসমাজ সহজেই ফুটনোট বানিয়ে রাখতে পারত।
তিনি মাটি চিনতেন। গন্ধ চিনতেন। মানুষের শরীর চিনতেন। মানুষের ভয় চিনতেন। ধর্মের তীব্রতা চিনতেন। সমাজের বদল চিনতেন। প্রেমের দুর্বলতা এবং শক্তি দুই-ই চিনতেন। আর আশ্চর্যভাবে, এত অন্ধকার দেখেও মানুষের ওপর তাঁর বিশ্বাস পুরো ভাঙেনি। সম্ভবত এই জায়গাতেই তারাশঙ্করকে আমাদের আবার পড়া দরকার।
কারণ আমরা মানুষকে এখন খুব তাড়াতাড়ি শ্রেণিবদ্ধ করি। ভাল। খারাপ। প্রগতিশীল। প্রতিক্রিয়াশীল। শিকার। অপরাধী। সভ্য। অসভ্য। তারাশঙ্করের পৃথিবী এত পরিষ্কার নয়। সেখানে যে মানুষটি গান গায়, সে কামনাও করে। যে অত্যাচারিত, সে সুযোগ পেলে অত্যাচারও করতে পারে। যে নিজের প্রাণ বাঁচাতে ভালবাসার মানুষকে ঠেলে দেয়, অন্য কোনও দিনে সেই মানুষই কারও জন্য জীবন দিতে পারে। যে সমাজ নিষ্ঠুর, সেই সমাজের ভেতরেই গান জন্মায়। যে জীবন কুৎসিত, তারই মধ্যে সৌন্দর্য হঠাৎ মাথা তোলে।
রাঢ়ের কাঁকুরে পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তারাশঙ্কর সম্ভবত এই কথাটাই বারবার দেখেছেন। মানুষকে দূর থেকে দেখলে তত্ত্ব হয়। আরও একটু কাছে গেলে গল্প হয়। আর খুব কাছে গেলে দেখা যায়, তত্ত্বটি ঠিক টিকছে না। সেখান থেকেই সাহিত্য শুরু।



