The Alchemist পড়লে মাঝে মাঝেই মনে হয়, বইটা রবিবার সকালের মোটিভেশনাল সেমিনার ভুলবশত বুকস্টলে ঢুকে পড়েছে। আর আমরা, সুশীল পাঠক, বই হাতে নিয়ে ভাবছি; এই যে ‘বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তোমাকে সাহায্য করবে’; এটা কি সত্যিই কোয়েলহো লিখছেন, না পাশের পাড়ার লাইফ কোচ হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস আপডেট করছেন?
সমস্যাটা আসলে খুব জটিল কিছু নয়। এতটাই সরল যে সাহিত্য নামক প্রাণীটি একটু লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
আমার প্রথম অভিযোগ। গল্পটা খুব সোজা। একদম ফেবল-টাইপ। এক ছেলেটা বেরোল, স্বপ্ন দেখল, পথ চলল, শিক্ষা পেল, ফিরে এল। মাঝখানে মরুভূমি, কয়েকজন গুরু, কিছু সংকেত, আর এক ধরনের স্থায়ী ‘আহা, বুঝলাম’ ভাব। কিন্তু সমস্যা হল, এই ‘বুঝলাম’টা খুব তাড়াতাড়ি এসে যায়। দস্তয়েভস্কি যেখানে চরিত্রকে ছেঁচে-ছেঁচে আত্মার ভেতর থেকে অপরাধবোধ বার করেন, সেখানে কোয়েলহো ভদ্রলোক এক কাপ গরম চা দিয়ে বলেন, “তোমার Personal Legend খুঁজে নাও।” পাঠক তখন খানিকটা বিভ্রান্ত; এটা কি যাত্রাপালা, না আত্ম-উন্নয়ন কর্মশালা?
এবার চরিত্রের কথায় আসি। সান্তিয়াগো আছে, আলকেমিস্ট আছে, ফাতিমা আছে; কিন্তু তারা যেন মানুষ নয়, বরং দার্শনিক নোটবুকের মার্জিনে আঁকা প্রতীক। তারা কথা বলে, কিন্তু তাদের কথার ভেতরে জীবনের জটিলতা কম, উপদেশ বেশি। যেন প্রত্যেকেই জীবনের ‘Key Takeaway’ হয়ে জন্মেছে। বাস্তব মানুষ যেমন কখনো কখনো অর্থহীন কথা বলে, ভুল করে, দ্বিধায় থাকে; এখানে সেই অসুবিধাজনক মানবিকতাটা নেই। সবকিছু খুব পরিষ্কার, খুব সাজানো। একটু বেশিই।
প্রসঙ্গত, এই ‘প্রতীক’-এর বিষয়টাও মজার। মরুভূমি মানে পরীক্ষা। সোনা মানে জ্ঞান। আলকেমি মানে আত্মার রূপান্তর। সবকিছু এত স্পষ্ট যে পাঠককে আলাদা করে ভাবতে হয় না। বরং বই নিজেই নিজের ব্যাখ্যা করে দেয়। যেন শিক্ষক পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্রের উত্তরপত্র বিলিয়ে দিয়েছেন; “এই নাও, পড়ে নাও, কাল লিখে দিও।” এতে উত্তীর্ণ হওয়া সহজ, কিন্তু আবিষ্কারের আনন্দ কোথায়?
ভাষার কথাও বলি। কোয়েলহোর ভাষা খুব সহজ। এই ‘সহজ’ শব্দটা কিন্তু দুই রকম। এক, টলস্টয়ের সহজতা; যেখানে গভীরতা লুকিয়ে থাকে। আরেকটা হল ফেসবুক কোটসের সহজতা; যেখানে গভীরতার বদলে থাকে তৎক্ষণাৎ শেয়ারযোগ্যতা। The Alchemist আমার কাছে দ্বিতীয়টার দিকে হেলে পড়ে। বাক্যগুলো পড়ে মনে হয়, একটু আগে কেউ ‘Life is a journey’ টাইপ কিছু লিখে গেছেন, আর আমরা সেটা বুকমার্ক করে রেখেছি।
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়টা অবশ্য এর মূল বার্তা। “তোমার স্বপ্ন অনুসরণ করো, বিশ্ব তোমাকে সাহায্য করবে।” শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু জীবন নামক বস্তুটি একটু বেশি নিষ্ঠুর। সে মাঝে মাঝে বলে, “তুমি স্বপ্ন দেখো, আমি meanwhile বিদ্যুৎ বিল পাঠাচ্ছি।” ফলে এই বার্তাটা আমার কাছে একটু সরলীকৃত, এমনকি বিপজ্জনক রকমের আশাবাদী বলে মনে হয়। যেন দারিদ্র্য, শ্রেণি, রাজনীতি; এসবের কোনো অস্তিত্ব নেই। সব সমস্যার সমাধান একটাই: বিশ্বাস রাখো।
এখানেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। বইটা যতটা না বলে, তার চেয়েও বেশি বলে ফেলে। কারণ সে ‘দেখায়’ কম, ‘বলে’ বেশি। প্রতিটি উপলব্ধি এমনভাবে পরিবেশন করা হয় যেন পাঠককে সন্দেহ করার সুযোগ না দেওয়াই শ্রেয়। অথচ সাহিত্য তো একটু ফাঁক রাখে, একটু অন্ধকার রাখে, যেখানে পাঠক নিজে ঢুকে পড়তে পারে। এখানে সেই অন্ধকার নেই। সব আলো জ্বালানো।
একজন নারী কেন এই বই পছন্দ করে আমি বুঝি না। ফাতিমা আছেন, কিন্তু তিনি যেন মরুভূমির মধ্যে একটি সুন্দর প্রতীক্ষা। তার অস্তিত্ব মূল চরিত্রের যাত্রাকে সম্পূর্ণ করার জন্য। তার নিজস্ব কোনো যাত্রা নেই। যেন গল্পের ভেতরে তিনি এক ধরনের ‘অনুপ্রেরণামূলক বিরামচিহ্ন’।
বইটাকে বলা হয় ‘জীবন বদলে দেবে’। পাঠক বসেন, প্রস্তুত হন; এবার হয়তো ভিতরে কিছু কেঁপে উঠবে। তারপর দেখেন, ভিতরে যা কেঁপে উঠছে সেটা একটু আগে ইনস্টাগ্রামেও পড়েছিলেন। তখন আমার মধ্যো একটা প্রতারণার বোধ আসে। মনে হয়, সাহিত্য নয়, motivational quote-এর লম্বা সংস্করণ পড়লাম।
এখানে একটা কথা মনে পড়ে যায়; বেস্টসেলার বানানোর এক অদ্ভুত কায়দা আছে, যেখানে গল্পের চেয়ে ‘হুজুগ’টাই বড় কথা । The Alchemist সেই হুজুগের এক নিখুঁত উদাহরণ। এটা এমন এক বই, যা পড়ার আগে আপনি শুনেছেন, পড়ার পরে আপনি উদ্ধৃত করেন, আর মাঝখানে পড়ার সময় আপনি খানিকটা ভাবেন; “আমি কি কিছু মিস করছি, না বইটাই আমাকে মিস করছে?”
তবু সব শেষ হয়ে যায় না। কারণ একটা সত্যিও আছে। এই বই অনেক মানুষকে ছুঁয়েছে। হয়তো তারা সেই সরলতায় শান্তি পেয়েছে, যা আমরা ‘সরলীকরণ’ বলে সন্দেহ করি। কেউ কেউ তো বাস্তবের চেয়ে নিজের কল্পনার মধ্যেই পূর্ণ জীবন খুঁজে পান; সেই জীবন কি কম সত্যি?
The Alchemist কোন ভাবেই উপন্যাস নয়। কিন্তু এটি একটি ঘটনা। এক ধরনের আধুনিক পুরাণ। যেখানে সাহিত্য, আধ্যাত্মিকতা আর সেলফ-হেল্প একসঙ্গে বসে চা খাচ্ছে। কেউ বলছে, “এটা গভীর।” কেউ বলছে, “এটা ফাঁকা।” আর বইটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক সেই আলকেমিস্টের মতো; যিনি জানেন, সোনা বানানোর রহস্যটা আসলে সোনায় নয়, বিশ্বাসে।



