এলিজাবেথ বাথোরিকে নতুন করে পড়া
ইতিহাস বিপজ্জনক; সে কখনও কখনও কাহিনির চেয়ে বেশি সন্দেহপ্রবণ। কবি ও ইতিহাস-অনুসন্ধানী শেলি পুহাক তাঁর বই “দ্য ব্লাড কাউন্টেস”-এ বলছেন, এই রক্তস্নানের উপাখ্যান সম্ভবত এক বিশাল রাজনৈতিক অপপ্রচার।
একজন বৃদ্ধা হাঙ্গেরীয় কাউন্টেস। নাম তাঁর এলিজাবেথ বাথোরি। গল্প বলে— তিনি নাকি কুমারী মেয়েদের ধরে এনে নির্যাতন করতেন, হত্যা করতেন, তারপর তাদের রক্তে স্নান করতেন, যেন যৌবন চিরস্থায়ী থাকে। এই পর্যন্ত পড়েই আমাদের ভেতরের গথিক-পাঠক গরম চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে বলে, আহা, কী চমৎকার ভয়ংকর! যেন ট্রান্সিলভানিয়ার কুয়াশায় দাঁড়িয়ে কাউন্ট ড্রাকুলা নিজের গোঁফে হাত বুলিয়ে বলছেন, মাদাম, আপনিই আমার প্রেরণা।
গল্প এখানেই থামে না। তাঁর চাকর-বাকরেরা সাক্ষ্য দিয়েছিল। তাঁকে নাকি নিজের দুর্গের টাওয়ারের মধ্যে ইট তুলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে শুধু এক ভূতুড়ে মুখ দেখা যেত। ১৯৬০-এর দশকে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে “সবচেয়ে উৎপাদনশীল খুনি” বলে ঘোষণা করল। ৬১০ জনের মৃত্যু তাঁর ঘাড়ে। সংখ্যাটা এমন, যেন খুন নয়, বার্ষিক বিক্রির রিপোর্ট।
কিন্তু ইতিহাস বিপজ্জনক; সে কখনও কখনও কাহিনির চেয়ে বেশি সন্দেহপ্রবণ। কবি ও ইতিহাস-অনুসন্ধানী শেলি পুহাক তাঁর বই “দ্য ব্লাড কাউন্টেস”-এ বলছেন, এই রক্তস্নানের উপাখ্যান সম্ভবত এক বিশাল রাজনৈতিক অপপ্রচার। এক নারীর বিরুদ্ধে কুৎসা, যাতে তাঁকে জনজীবন থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। মানে, কাহিনি নয়, ক্যাম্পেইন। গথিক নয়, গভর্নেন্স।
পুহাকের আগের বই দ্য ডার্ক কুইন্স-এও তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে ক্ষমতাবান নারীদের মৃত্যুর পর চরিত্রহীনতার অভিধানে ঠেলে দেওয়া হয়। এখানে তিনি আরেক ধাপ এগিয়ে বলছেন; বাথোরির গল্প আসলে ১৭শ শতকের হাঙ্গেরির রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাম্রাজ্যিক উত্তেজনার ফল। একজন নারী, যিনি ছিলেন ক্যালভিনিস্ট, জমির মালিক, প্রশাসনিক ক্ষমতার অধিকারিণী; এই তিনটি পরিচয়ই যথেষ্ট সন্দেহজনক ছিল।
বাথোরির পরিবার ইউরোপের প্রাচীনতম অভিজাত বংশগুলোর একটি। তাঁদের মধ্যে কেউ হ্যাপসবার্গ সাম্রাজ্যের উপদেষ্টা, কেউ বিদ্রোহী। ১৬০৩ সাল। তাঁর বড় ছেলে মারা গেল। তুর্কি বাহিনী এস্টেটে হামলা করল। নভেম্বর মাসে স্বামী, যোদ্ধা কাউন্ট ফ্রান্সিস নাদাসদি, অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং ১৬০৪-এর জানুয়ারিতে মারা গেলেন। শোক করার অবকাশ নেই। তিনি নিজেই দুই কাউন্টির লর্ড-লেফটেন্যান্ট হলেন। ট্যাক্স সংগ্রহ, আইনশৃঙ্খলা, রাজনীতি। অর্থাৎ, বিধবা হয়ে ক্ষমতায়। ইতিহাস সাধারণত এই জায়গায় নারীদের নিয়ে কাহিনি লেখে না, কুৎসা লেখে।
হাঙ্গেরি তখন অস্থির। পশ্চিমে হ্যাপসবার্গ-শাসিত রয়্যাল হাঙ্গেরি, পূর্বে ট্রান্সিলভানিয়া। ওসমানীয় আক্রমণ, গৃহযুদ্ধ, সিংহাসনের দাবিদারদের সংঘর্ষ। তার ওপর প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলনের অভিঘাত। হ্যাপসবার্গরা ক্যাথলিক, স্বামী লুথেরান, বাথোরি ক্যালভিনিস্ট। লুথেরান ও ক্যালভিনিস্টদের নিজেদের মধ্যেও বিভাজন। সন্দেহ, নালিশ, ধর্মীয় কাঁটাতার। এই উত্তপ্ত পরিবেশেই গুজব জন্মায় দ্রুত, বাঁচে দীর্ঘকাল।
কিছু লুথেরান পাদ্রি চিঠিতে তাঁর এক কর্মচারীকে “carnifex” বলেছেন। অনুবাদকরা সেটিকে “জল্লাদ” বা “নির্যাতনকারী” করেছেন। পুহাক বলছেন, শব্দটি হয়তো লেন্ট-উপবাসের সময় মাংস খাওয়ার ইঙ্গিত। যদি সত্যিই ভয়ংকর অপরাধ হত, তবে শাস্তি তিন মাসের কমিউনিয়ন-নিষেধাজ্ঞা হতো কেন? ধর্মতাত্ত্বিক ভাষার ভুল অনুবাদ থেকে তৈরি হয়েছে রক্তাক্ত উপাখ্যান।
আরও একটি বিষয়; বাথোরির এস্টেটে ছিল মেয়েদের জন্য এক ধরনের ফিনিশিং স্কুল। অভিজাত পরিবারের কন্যারা এসে শিক্ষা নিত। সেই জায়গাকেই পরবর্তীতে নির্যাতনকক্ষ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। যে “নির্যাতন পদ্ধতি”র বিবরণ পাওয়া যায়, তার অনেকটাই ১৬শ শতকের চিকিৎসাপদ্ধতির সঙ্গে মিলে যায়। রিউমাটিজ়ম সারাতে নেট্ল দিয়ে চাবুক মারা, টাইফাসে গরম প্রয়োগ। ইতিহাসের কুয়াশায় চিকিৎসা আর নির্যাতনের সীমানা প্রায়শই অস্পষ্ট।
এখানে প্রবেশ করেন জর্জ থুর্জো; György Thurzó। হ্যাপসবার্গ অনুগত, রাজনৈতিকভাবে চতুর। ১৬১০ সালে তিনি বাথোরির এস্টেটে হানা দেন এবং দাবি করেন, তিনি তাঁকে হাতেনাতে ধরেছেন। পুহাক বলেন, এই দাবির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং হ্যাপসবার্গদের তখন অর্থের প্রয়োজন ছিল, এবং অভিজাতদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ তুলে সম্পত্তি দখল করা ছিল এক চেনা কৌশল।
বাথোরির চাকরদের কাছ থেকে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। তাঁকে আদালতে সশরীরে হাজিরার সুযোগ দেওয়া হয়নি। গৃহবন্দি অবস্থায় তিনি নিজের নির্দোষ হওয়ার দাবি করে গেছেন। বিচারহীন শাস্তি; ইতিহাসে এর নজির কম নয়, বিশেষত যখন অভিযুক্ত একজন শক্তিশালী নারী।
পড়তে পড়তে আমি ভাবছিলাম আমরা কোন গল্পকে বিশ্বাস করতে চাই? রক্তস্নান-রোম্যান্স, নাকি নথিপত্র-নির্ভর বিরক্তিকর সত্য? কাহিনি বেশি স্মরণীয়। “৬১০ খুন” সংখ্যা হিসেবে আকর্ষণীয়। রাজনীতি, অনুবাদ-ত্রুটি, ধর্মীয় বিভাজন; এগুলো কম সিনেম্যাটিক শোনায় । ফলে কিংবদন্তি টিকে থাকে, নথি পড়ে থাকে।
পুহাকের বই মূলত ঐ সময়ের প্রতিচ্ছবি। কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ধর্মীয় উত্তেজনা, সাম্রাজ্যিক স্বার্থ ও লিঙ্গবিদ্বেষ মিলে একজন নারীকে দানবে পরিণত করতে পারে। “রক্তকন্যা”র কিংবদন্তি হয়তো ভয়ংকর, কিন্তু সত্য আরও ভয়ংকর; কারণ তা আমাদের শেখায়, ইতিহাসের দুর্গে অনেক সময় ইট তুলে দেয় শত্রুরা, আর জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে আমরা যা দেখি, তা আলো নয়, প্রচারের ছায়া।



