ইউসুফ ইদ্রিস: ডেল্টার কাদা, হাসপাতালের গন্ধ, আর মানুষের ভাঙা জীবনের গল্প
ইউসুফ ইদ্রিস ছোটগল্পকে নতুন জীবন দেন; ডেল্টার গ্রাম, কায়রোর হাসপাতাল, রাজনীতি, যৌনতা, দারিদ্র্য, এবং মানুষের নীরব স্বপ্ন; সব একসঙ্গে মিশিয়ে।
১৯২৭ সালের ১৯ মে। মিশরের নীলনদের ডেল্টা অঞ্চলের এক পরিবারে জন্ম নিল একটি ছেলে; ইউসুফ ইদ্রিস। জন্মের সময় কেউ জানত না, এই ছেলেটি পরে আরব সাহিত্যের ছোটগল্পের ভেতর এক নতুন ভাষা, নতুন গতি, নতুন মানুষ নিয়ে আসবে। কিন্তু সেই শুরুটা ছিল একেবারেই নিঃসঙ্গতার ভিতরে।
ইদ্রিসের বাবা কাজ করতেন জমি পুনরুদ্ধারের প্রকল্পে; নদীর পাড় কেটে, নতুন জমি উদ্ধার করে, কৃষির জন্য প্রস্তুত করার কাজ। এই কাজের প্রকৃতি ছিল ঘুরে বেড়ানো; কখনো ডেল্টার এক শহর, কখনো অন্য গ্রাম। ফলে পরিবার থেকে তিনি থাকতেন দূরে, শহরের বাইরে। পরিবারের বড় ছেলে ইউসুফকে তাই খুব ছোট বয়সেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে; দাদা-দাদির কাছে।
সেই গ্রাম্য বাড়িটা ছিল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভিড়ে ভরা, কিন্তু শিশুটির জন্য সেখানে ছিল না স্নেহের উষ্ণতা। বাড়ির কর্ত্রী ছিলেন তার দাদি; একজন কঠোর, সংযত, আবেগপ্রকাশে অনাগ্রহী নারী। শিশুর প্রতি মমতা দেখানোর যে স্বাভাবিক ভঙ্গি আমরা কল্পনা করি, তা তার মধ্যে ছিল না। ইউসুফ সেখানে বড় হচ্ছিল এক ধরনের দূরত্বের মধ্যে।
তবে বাড়িতে ফিরে গেলেও খুব ভিন্ন কিছু হতো না। তার মা-ও ছিলেন প্রায় একই রকম কঠোর, অনমনীয়। মা ও ছেলের মধ্যে যে কোমল, অন্তরঙ্গ সম্পর্ক আমরা সাধারণত দেখি, তা তাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। ফলে ছোটবেলা থেকেই ইউসুফ ইদ্রিসের মনে একটি অভাব জমে উঠতে থাকে; ভালোবাসার অভাব, স্পর্শের অভাব, স্বীকৃতির অভাব।
শুধু একজন মানুষকে সে খুব মনে করত; তার বাবা। বাবার প্রতি তার গভীর টান ছিল। কিন্তু সেই মানুষটিও বেশিরভাগ সময় থাকতেন দূরে। ফলে ছেলেটি বড় হতে থাকে একাকিত্ব আর লাজুক স্বভাব নিয়ে।
স্কুলও ছিল বাড়ি থেকে অনেক দূরে। প্রতিদিন তাকে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হতো; কখনো কাঁচা রাস্তা, কখনো ধুলোমাখা পথ, কখনো মাঠের মাঝ দিয়ে। এই দীর্ঘ হাঁটার পথেই ধীরে ধীরে সে তৈরি করে নিতে থাকে নিজের আরেকটি জগৎ; কল্পনার জগৎ।
এই জগতে তার কোনো অভাব নেই। সেখানে সে একা নয়, সেখানে তার কাছে আছে সবকিছু; বন্ধু, স্নেহ, সাহস। বাস্তব জীবনের কষ্টগুলো সেখানে এসে মিলিয়ে যায়। মাত্র দশ বছর বয়সেই তার এই কল্পনাশক্তি এত প্রবল হয়ে ওঠে যে সে নিজের জন্য বানিয়ে ফেলে গল্পের পর গল্প; একটি পুরো গল্পের জাল। সেই জালের ভেতরেই সে বাস করতে শুরু করে।
এই কল্পনার ভেতরেই আসলে জন্ম নিচ্ছিল একজন গল্পকার।
কৈশোরে সে আবার ফিরে আসে বাবা-মায়ের কাছে। তখন পরিবারে তার সঙ্গে আছে দুই ভাই এবং দুই বোন। কিন্তু পরিবারটি স্থির ছিল না। বাবার কাজের কারণে তারা এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে বেড়ায়; নীলনদের ডেল্টার নানা ছোট শহর। শেষ পর্যন্ত এসে স্থির হয় কায়রোতে।
কায়রো শহর ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম এক পৃথিবী। এখানেই কিশোর ইদ্রিস প্রথম উপলব্ধি করে যৌনতার জগৎ। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে সে জড়িয়ে পড়ে এমন সব সম্পর্কের মধ্যে, যেখানে তার সঙ্গিনীরা প্রায়ই তার দ্বিগুণ বয়সের নারী। তখন তার মনে নারীর সঙ্গে সম্পর্কের অর্থ ছিল একটাই; জয় করা, অধিকার করা। প্রেম বা গভীর মানসিক সম্পর্কের ধারণা তখনো তার কাছে স্পষ্ট ছিল না।
পরে জীবনের অনেক পরে এসে সে বুঝতে পারে সম্পর্কের অন্য মাত্রাও আছে। কিন্তু সেই কিশোর বয়সের আকাঙ্ক্ষা, হতাশা আর গোপন আকুলতা তার গল্পে বারবার ফিরে এসেছে। তার বিখ্যাত গল্প “The Dregs of the City”–এর নায়কের যে অস্থির নারী অনুসরণ, তা যেন সেই কিশোর ইদ্রিসেরই প্রতিধ্বনি।
ছাত্রজীবনে খুব তাড়াতাড়িই সে ঠিক করে ফেলে; সে ডাক্তার হবে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মিশর তখন ভীষণ অস্থির। ব্রিটিশ প্রভাব, রাজা ফারুকের দুর্নীতি, ছাত্র আন্দোলন; সব মিলিয়ে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশ।
ইদ্রিস এই আন্দোলনের ভেতরেই ঢুকে পড়েন। তিনি অংশ নেন ব্রিটিশবিরোধী বিক্ষোভে। ছাত্রদের অধিকার রক্ষার কমিটির নির্বাহী সচিব হন। ছাত্র পরিষদের সম্পাদক হিসেবে বিপ্লবী পত্রিকা প্রকাশের দায়িত্ব নেন। এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কলেজ থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কারও করা হয়।
কারাগারের সেই সময়েই, ১৯৫১ সালে, তিনি লেখেন তার প্রথম ছোটগল্প। ছাত্রসমাজের মধ্যে গল্পটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যেন চিকিৎসা আর রাজনীতির মাঝখানে তৃতীয় এক পথ খুলে যায়; সাহিত্য।
ডাক্তারি পাশ করার পর তিনি কায়রোর বৃহত্তম সরকারি হাসপাতাল কাসর এল আইনিতে চাকরি নেন। হাসপাতালের করিডোর, রোগীর কষ্ট, দারিদ্র্যের গন্ধ; এই সব অভিজ্ঞতা তার গল্পের উপাদান হয়ে ওঠে।
একই সময়ে তিনি ব্রিটিশবিরোধী গোপন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গামাল আবদেল নাসের ক্ষমতায় উঠলে তিনি শুরুতে তাকে সমর্থন করেন। কিন্তু খুব দ্রুত হতাশ হন। ১৯৫৪ সালে যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে বিপ্লব তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি, তখন ইদ্রিস নাসের সরকারের বিরোধিতা শুরু করেন। ফলস্বরূপ আবার গ্রেপ্তার। আবার আটক।
এই বন্দিত্বের সময় তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। কিন্তু ১৯৫৬ সালে পার্টি ছেড়ে দেন; কারণ তিনি উপলব্ধি করেন যে কমিউনিজমের একনায়কতান্ত্রিক দিক তার পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়।
ইদ্রিসের সাহিত্যজীবন শুরু হয় আসলে ছাত্রাবস্থাতেই। তার ছোটগল্প প্রকাশিত হতে থাকে কায়রোর বিখ্যাত দৈনিক Al Masri এবং সাপ্তাহিক Rose el Youssef–এ।
১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পসংকলন Arkhas Layali (The Cheapest Nights)। বইটির ভূমিকায় ছিলেন মিশরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক তাহা হুসেইন। তিনি ইদ্রিসকে ঘোষণা করেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী এক তরুণ লেখক হিসেবে।
১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় আরেকটি সংকলন, যার মধ্যে ছিল তার প্রথম ছোট উপন্যাস A Love Story। এই সময়ে তিনি এখনও ডাক্তারি করছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বাস্থ্য পরিদর্শক হিসেবে কাজ করেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় গল্প “Death from Old Age”। কিছুদিন তিনি মনোরোগবিদ্যাও চর্চা করেন।
১৯৬০ সালে তিনি স্থির করেন; চিকিৎসা নয়, সাহিত্যই হবে তার পেশা। ডাক্তারি ছেড়ে দিয়ে তিনি কায়রোর দৈনিক Al Gomhoureya–র সম্পাদক হন।
১৯৫৬ থেকে ১৯৬০; এই সময়ে তিনি ভ্রমণ করেন সমগ্র আরব বিশ্বে। নতুন রাজনৈতিক স্রোত, সামাজিক পরিবর্তন, স্বাধীনতার আন্দোলন; সবকিছু কাছ থেকে দেখেন।
১৯৬১ সালে তিনি সরাসরি জড়িয়ে পড়েন আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামে। ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইরত গেরিলাদের সঙ্গে তিনি পাহাড়ে যোগ দেন। ছয় মাস তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। পরে আলজেরিয়ান সরকার তাকে বীরত্বের জন্য সম্মাননা দেয়।
যুদ্ধে আহত হয়ে তিনি মিশরে ফিরে আসেন। তখন তিনি ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক। একের পর এক উপন্যাস, গল্প, নাটক প্রকাশিত হতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মিশরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমকালীন লেখক হিসেবে স্বীকৃতি পান। বিশেষ করে তার ছোটগল্প ব্যাপক প্রশংসা পায়। মিশরের আরেক বড় সাহিত্যিক তৌফিক এল হাকিম বলেন: ইউসুফ ইদ্রিস আমার মতে ছোটগল্পের নবায়নকারী এবং এক ধরনের প্রতিভা। ১৯৬৩ সালে তাকে দেওয়া হয় Order of the Republic।
কিন্তু সাফল্য তাকে রাজনৈতিক প্রশ্ন থেকে সরিয়ে দেয়নি। ১৯৬৯ সালে তিনি লেখেন নাটক The Schemers। নাসের সরকারের নীতির তীব্র সমালোচনা থাকার কারণে নাটকটি সেন্সর করে নিষিদ্ধ করা হয়। এরপরও তিনি লিখে যান। কায়রো এবং বৈরুত; দুই শহরেই তার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। সরকারের বিরুদ্ধে তার সমালোচনা চলতেই থাকে। শেষ পর্যন্ত তাকে কিছু সময়ের জন্য জনজীবন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করা হয়।
১৯৭৩ সালের অক্টোবর যুদ্ধের পরে তিনি আবার প্রকাশ্যে ফিরে আসেন এবং কায়রোর বিখ্যাত দৈনিক Al Ahram–এর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার বহু সাক্ষাৎকার ও প্রবন্ধে ইউসুফ ইদ্রিস একটি বিষয় বারবার বলেছেন।
জীবন কখনো স্থির নয়। জীবন মানেই পরিবর্তন। মূল্যবোধ ও ধারণাগুলোকেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। যেখানে স্থবিরতা, সেখানে জীবন নেই। মানুষ জন্মায়নি আগের প্রজন্মের তৈরি পরিস্থিতি অন্ধভাবে মেনে নেওয়ার জন্য।
তিনি বিশ্বাস করতেন লেখক সমাজে বিপ্লবের একটি শক্তি। তার ভাষায়: একজন লেখক অন্য মানুষের থেকে আলাদা কারণ সে পরিবেশের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। আর লেখার সময় তিনি পরিকল্পনা করে লিখতেন না। তার মতে গল্প শুরু হয় এক ধরনের অন্তর্দৃষ্টি থেকে। চরিত্ররা পরে নিজেরাই গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
ইউসুফ ইদ্রিসের গল্পের প্রধান উপাদান; কর্মজীবী মানুষ, দরিদ্র মানুষ, সংগ্রামী মানুষ। তার শৈশবের গ্রামীণ পরিবেশের প্রতি তার গভীর টান বহু গল্পে ফুটে উঠেছে। যেমন “All on a Summer’s Night” গল্পে পাঠক যেন মিশরের গ্রামের খড়ের গন্ধ, পশুর ঘামের গন্ধ, মাটির আর্দ্রতা পর্যন্ত অনুভব করতে পারে।
গল্প “The Shame”–এ তিনি দেখান কৃষকের মানসিকতার জটিলতা। “The Funeral Ceremony”–তে দেখা যায় এমন এক দারিদ্র্য, যেখানে প্রতিদিনের খাবারের সংগ্রাম মানুষের কাছ থেকে মৃত্যুর মুহূর্তেও সামাজিক সৌজন্য কেড়ে নেয়।
“The Cheapest Nights”–এর আবদেল করিম সেই হাজার হাজার কৃষকের প্রতিনিধি, যাদের জীবন দারিদ্র্যের বৃত্তে বন্দি। শীতের রাতে তার করার কিছু নেই। গ্রামের বিনোদন তার নাগালের বাইরে। তাই সে ফিরে যায় বিছানায়; স্ত্রীর কাছে। সেই সস্তা বিনোদনই আবার জন্ম দেয় নতুন সন্তানদের, যাদের খাওয়ানোর সামর্থ্য তার নেই।
ইদ্রিসের গল্পে প্লট প্রায় নেই বললেই চলে। তিনি বিচার করেন না। তিনি বিশ্লেষণও করেন না। বরং কয়েকটি নিখুঁত আঁচড়ে চরিত্রগুলোকে তুলে ধরেন।
একজন বৃদ্ধ পুলিশ, যিনি যৌন অক্ষমতায় ভুগছেন; আব্দু, যে জীবিকা অর্জনের জন্য নিজের রক্ত বিক্রি করে; “দ্য এরান্ড” গল্পের এল শাবরাউই; এইসব চরিত্র পাঠকের মনে স্থায়ী হয়ে থাকে। ইউসুফ ইদ্রিসের সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক উদ্ভাবন ছিল ভাষা। তিনি প্রথম আরবি লেখক যিনি সাহিত্যে সচেতনভাবে ব্যবহার করেন কথ্য আরবি। চরিত্রদের সংলাপে তিনি ব্যবহার করেন দৈনন্দিন ভাষা, আর বর্ণনায় ব্যবহার করেন ধ্রুপদি আরবি। এই দুই ভাষার সূক্ষ্ম পালাবদল তার গল্পকে দিয়েছে এক নতুন বাস্তবতা।
শুরুতে আরব সমালোচকেরা তীব্র আপত্তি করেন। তাদের মনে হয়েছিল তিনি আরবি সাহিত্যের ঐতিহ্য ভেঙে দিচ্ছেন। কিন্তু পরে তারা মেনে নেন; কারণ পাঠক প্রথমবারের মতো অনুভব করছিলেন একেবারে নিজের ভাষায় লেখা সাহিত্য। যেন আরবি সাহিত্যে প্রথমবার মানুষ নিজেরই কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছে।
এভাবেই ইউসুফ ইদ্রিস ছোটগল্পকে নতুন জীবন দেন; ডেল্টার গ্রাম, কায়রোর হাসপাতাল, রাজনীতি, যৌনতা, দারিদ্র্য, এবং মানুষের নীরব স্বপ্ন; সব একসঙ্গে মিশিয়ে।
রিটন খান




