উত্তরাধিকার, সীমানা ও তুষারধ্বস: The Duke পড়ে কিছু নোট
পাহাড়ি গ্রামের নিস্তব্ধতা, জমির সীমানা নিয়ে ক্ষুদ্র কিন্তু নির্মম সংঘর্ষ, আর তার ভেতরে উত্তরাধিকার ও বিশেষাধিকারের প্রশ্ন; সবকিছুই আমাকে থামিয়ে থামিয়ে ভাবিয়েছে।
কিছু বই বন্ধ করার পরও মাথার ভেতর তার আবহাওয়া চলতে থাকে; যেন পাহাড়ি হাওয়া জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছে। ২০২৬ বুকার ইন্টারন্যাশনাল লংলিস্টে থাকা The Duke পড়ে শেষ করার পর আমার ঠিক সেই অনুভূতিই হয়েছে। গত উইকেন্ডে বইটি শেষ করলাম, কিন্তু তার দ্বন্দ্ব, তার গদ্যের নাটকীয়তা, তার উত্তরাধিকারের ভার এখনো মাথায় ঘুরছে। একসময় মনে হচ্ছিল, আমি বই পড়ছি না; নেটফ্লিক্সের কোনো টানটান থ্রিলার দেখছি, যেখানে পর্বের শেষে পর্দা অন্ধকার হয়, আর আপনি অস্থির হয়ে পরের পর্বে ক্লিক করেন।
অভ্যাসবশত পড়ার সময় আমি নোট নিই। এটি বহু বছরের পাঠ-অভ্যাস। বই পড়া আমার কাছে সংলাপ। লেখকের সঙ্গে তর্ক, চরিত্রের সঙ্গে সহমত, কখনো বিরোধ। সেই নোটগুলো পরে ফিরে দেখলে বোঝা যায়; কোন জায়গায় আমি থমকে গেছি, কোন বাক্য আমাকে বিরক্ত করেছে, কোন দৃশ্য আমার ভেতরের কোনো সুপ্ত প্রশ্নকে জাগিয়ে তুলেছে। The Duke পড়ার সময়ও তাই করেছি। পাহাড়ি গ্রামের নিস্তব্ধতা, জমির সীমানা নিয়ে ক্ষুদ্র কিন্তু নির্মম সংঘর্ষ, আর তার ভেতরে উত্তরাধিকার ও বিশেষাধিকারের প্রশ্ন; সবকিছুই আমাকে থামিয়ে থামিয়ে ভাবিয়েছে।
একটি পাহাড়ি গ্রামে ঢোকার আগে যেমন দূর থেকে তার আকার দেখা যায়; শুধু রেখা, শুধু ছায়া; আর কাছে গেলে তবেই বোঝা যায় তার ঘরবাড়ি, তার ক্ষত, তার ইতিহাস; তেমনই একটি উপন্যাসের প্রথম কণ্ঠ আমাদের ভুল পথে চালিত করতে পারে। কণ্ঠস্বরই এখানে প্রথম পর্বতশ্রেণি। আর সেই কণ্ঠস্বর যদি হয় ইচ্ছাকৃতভাবে অলঙ্কারময়, প্রায় আড়ম্বরপূর্ণ, সামান্য আত্মরতি-দুষ্ট, তবে পাঠক এক মুহূর্তের জন্য ভেবে বসতেই পারেন, তিনি বুঝি উনিশ শতকের কোনো কুলীন আখ্যানের মধ্যে প্রবেশ করছেন।
কিন্তু এই ভ্রমই উপন্যাসের প্রথম কৌশল। ফাউন্ডারি সংস্করণের সাম্প্রতিক বই The Duke–এর শুরুতেই আমরা যে বর্ণনাভঙ্গির মুখোমুখি হই, তা আমাদের সময়বোধকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিচ্যুত করে। পরে স্পষ্ট হয়, বর্ণনাকারী আদতে সমসাময়িক। তাঁর বারোক, সুসজ্জিত, প্রায় নাটকীয় কণ্ঠস্বরই আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় তাঁর সঙ্গে; ডিউক, যে আদতে একজন কাউন্ট। এই ভাষাই চরিত্র। এই ভঙ্গিই মানসিকতা।
ডিউকের আসল নাম “ডিউক” নয়। ভালোর্গানা গ্রামের মানুষজন; ডোলোমাইটস পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত এক দূরবর্তী, প্রায় আত্মমগ্ন গ্রাম; তাকে বিদ্রূপ করে এই নাম দিয়েছে। তারা তাকে সহ্য করেছে, কিন্তু কখনো আপন করেনি। তার শহুরে শিকড়, তার আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য, তার বংশগত মর্যাদা; সবই তাকে গ্রামবাসীদের কাছে বহিরাগত করে রেখেছে। গ্রহণ আছে, কিন্তু স্বীকৃতি নেই।
ডিউক তার বিশাল বাড়ি এবং বিস্তৃত জমিদারি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে কুড়ির কোঠায়, বাবা-মায়ের বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর। সিমামোন্তে পরিবারের কোট অব আর্মস, শতাব্দীব্যাপী ইতিহাস, এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা; সবই এসে পড়েছে তার কিছুটা অনিচ্ছুক কাঁধে।
বাকি সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে, সে গত দশ বছর ধরে মূল তহবিলের উপর নির্ভর করে দিন কাটাচ্ছে। তার দৈনন্দিনতা প্রায় গৃহস্থালি: এস্টেটের ছোটখাটো কাজ, আউটবিল্ডিং মেরামত এবং পারিবারিক আর্কাইভ ঘাঁটা। একজন সম্ভ্রান্ত বংশধরের জীবন এখানে কোনো জাঁকজমক নয়, বরং এক ধরনের স্থগিত অস্তিত্ব।
ডিউক নিঃসঙ্গ। সে নিজেকে আলাদা রাখে, এবং জানে; গ্রামের সঙ্গে তার দূরত্ব আছে। তার একমাত্র বন্ধু নেলসো তাবিওনা; এক প্রবীণ, সদালাপী, কিন্তু নিজের জ্ঞানের ওপর অগাধ আস্থা রাখা মানুষ। প্রথমে উপদেশ দিতে অনীহা, কিন্তু একবার শুরু করলে থামেন না। গ্রামের তথাকথিত প্রাজ্ঞ ব্যক্তি।
নেলসো-ই এক সকালে এসে ডিউকের শান্তিকে নষ্ট করে। খবর দেয়; পাহাড়ের ঢালে ডিউকের জঙ্গলে গাছ কাটা হচ্ছে। এখানে প্রবেশ করেন আরেক চরিত্র; মারিও; গ্রামের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, যে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ তৈরি করেছে ব্যক্তিস্বার্থে। ডিউকের সামনে প্রশ্ন: শান্তি বজায় রাখবে? না কি পূর্বপুরুষের সম্মান রক্ষা করবে?
এই ছোট্ট বিরোধ দ্রুত রূপ নেয় প্রতিহিংসামূলক সংঘর্ষে। কৌশল, প্রতারণা, ক্ষুদ্রতা; সব মিলিয়ে এক প্রতিবেশী যুদ্ধ। শীতের নির্মম পাহাড়ি প্রেক্ষাপটে সংঘর্ষ ঘনীভূত হয়। তারপর বসন্তে গিয়ে তা এক পূর্ণাঙ্গ বিস্ফোরণে পৌঁছায়। এই দ্বন্দ্বই উপন্যাসের চালিকাশক্তি; যার পরিণতি চমকপ্রদ।
বাইরের সংঘর্ষের পাশাপাশি ভেতরের আরেকটি কাজ চলছে; ডিউক তার পারিবারিক কোডেক্স অনুলিপি করছে। ১৫শ শতক থেকে তার দাদার মৃত্যুপূর্ব সময় পর্যন্ত বিস্তৃত বংশলতিকা, ইতিহাস, কীর্তি, ব্যর্থতা; সবই সেখানে। এই প্রতিলিপিকরণ শুধু নথিভুক্তি বলে পাঠকের ভ্রম হয়, কিন্তু তা আত্মসমীক্ষা। সে ভাবতে শুরু করে: উত্তরাধিকার মানে কী? রক্তের গৌরব কি ব্যক্তিসত্তাকে ছাপিয়ে যায়? বিশেষ সুবিধা কি অপরাধবোধ সৃষ্টি করে?
ডিউকের আর্কাইভ অনুসন্ধান আসলে তার আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রচেষ্টা। সে কি তার সুবিধাপ্রাপ্ত জন্মের মধ্যে কোনো নৈতিক মানে খুঁজে পেতে চায়? সে কি শতাব্দীব্যাপী সম্ভ্রান্ততার ভার থেকে মুক্তির কোনো যুক্তি খুঁজছে? এখানেই উপন্যাস তার দার্শনিক গভীরতায় পৌঁছায়।
লেখক মেলকিওর্রের অলঙ্কারসমৃদ্ধ গদ্য অন্তোনেল্লা লেত্তিয়েরির ইতালি থেকে অনুবাদে আশ্চর্য নিপুণতায় ধরা পড়েছে। অনুবাদ এখানে কেবল ভাষান্তর নয়, বায়ুমণ্ডল স্থানান্তর। পাঠক যেন ভালোর্গানার পাহাড়ি শীত অনুভব করেন, দ্বন্দ্বের উত্তাপ অনুভব করেন, উত্তরাধিকারের ভার অনুভব করেন। এই ইংরেজি অনুবাদ নাটকীয়তার স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়; কখনো তুষারধ্বসের মতো দ্রুত, কখনো আত্মচিন্তার মতো স্থির।
ধরা যাক, পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে; এ কি কেবল প্রতিবেশী বিবাদ? না। এটি মূলত ক্ষমতা বনাম নৈতিকতার প্রশ্ন। এটি বংশগত বিশেষাধিকার বনাম ব্যক্তিগত পরিচয়ের সংকট। এটি আধুনিকতার ভেতরে অতীতের ওজন। ডিউক বাইরের শত্রুর সঙ্গে লড়ে, কিন্তু ভেতরে লড়ে নিজের অবস্থান নিয়ে।
The Duke একাধারে বিনোদনমূলক, আবার বুদ্ধিবৃত্তিক। এটি সংঘর্ষের গল্প, কিন্তু তার চেয়েও বেশি উত্তরাধিকার ও আত্মপরিচয়ের গল্প। পাহাড়ি গ্রামে শুরু হওয়া একটি ছোট বিরোধ আমাদের নিয়ে যায় সময়, রক্ত, ক্ষমতা, এবং নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্নে। শেষ পর্যন্ত, ডিউকের প্রশ্নটি আমাদেরও প্রশ্ন হয়ে ওঠে: আমরা যা পেয়েছি; তা কি কেবল সম্পদ? না কি এক ধরনের নীরব দায়? উত্তর স্পষ্ট নয়। কিন্তু উপন্যাস আমাদের সেই অস্বস্তির মধ্যে রেখে দেয়; যেখানে উত্তরাধিকার মানে শুধু গৌরব নয়, জিজ্ঞাসাও।



