ভিক্টোরিয়ান পদ্য মেশিন এবং আজকের GPT
চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন। ১৮৪৫ সাল। লন্ডনের Egyptian Hall। একেবারে চুপচাপ, প্রায় লাজুক ভঙ্গিতে এক পণ্ডিত কাঠের একটা ক্যাবিনেট ঠেলতে ঠেলতে ঢুকছেন। নাম তাঁর জন ক্লার্ক। কোনো কবি নন, কোনো জাদুকরও নন। কিন্তু তিনি দর্শকদের সামনে এমন এক কাণ্ড ঘটাতে চলেছেন, যেটা আজকে শুনলে আমরা বলতাম, “ওহ, এটা তো জেনারেটিভ এআই-এর প্রাগৈতিহাসিক ভার্সন।”
কাঠের ওই বাক্সটার নাম The Eureka। দেখতে চকচকে বুককেস টাইপ, চেস্টনাট রঙের, সামনে ছ’টা ছোট জানালা কাটা। কোনো অলংকার নেই, কোনো নাটকীয় আলো-আঁধারিও না। কিন্তু ওই জানালাগুলোর ভেতর দিয়ে ভিক্টোরিয়ান দর্শকরা যা দেখলেন, সেটা তাঁদের যুগের কল্পনাকে খানিকটা হলেও হকচকিয়ে দেওয়ার মতো। ধীরে ধীরে, টিকটিক শব্দ তুলে, ল্যাটিন শব্দগুলো একটার পর একটা লেখা হচ্ছে। শব্দ, শব্দের পর শব্দ। শেষ পর্যন্ত তৈরি হচ্ছে সম্পূর্ণ হেক্সামিটার ছন্দে লেখা কবিতা।
এই কবিতাগুলোর কোন কবি নেই। নেই কোনো গভীর রাতের যন্ত্রণা বা হৃদয়ভাঙার ইতিহাস। আছে শুধু চাকা, তার, কাঠের পাত, আর নিখুঁতভাবে সাজানো এক যান্ত্রিক যুক্তি। চাকা ঘোরে, সংযোগ বদলায়, আর ভাষা জন্ম নেয়। দর্শকরা দেখছেন, কবিতা লেখা হচ্ছে, কিন্তু কলম নেই, লেখক নেই। আছে শুধু একটি যন্ত্র, যা ভাষাকে অংশে ভেঙে নিয়ে আবার জুড়ে দিতে জানে।
আজকে আমরা যখন ChatGPT নিয়ে বলি, “এটা তো শব্দ বসাচ্ছে সম্ভাবনার অংক হিসেবে”, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ক্লার্কের Eureka-ও ঠিক সেটাই করছিল, তার যুগের ভাষায়, তার যুগের প্রযুক্তিতে। সে ভাবেনি, সে অনুভব করেনি, সে কেবল সম্ভাব্য সংযোজনগুলোর ভেতর দিয়ে হেঁটে গিয়েছে। কিন্তু ফলাফল কবিতা। অন্তত সাধারণ দর্শকের চোখে। ভিক্টোরিয়ান দর্শকরা হয়তো তখনই বুঝে গিয়েছিলেন, বা হয়তো আমাদের মতো বুঝে ওঠেননি, যে কবিতা অর্থ কেবল কবির আত্মা নয়, কবিতা অর্থ কাঠামোও। শব্দের একটা ব্যাকরণ, ছন্দের একটা অঙ্ক, ভাষার একটা যান্ত্রিক দিক। আর সেই দিকটুকু যদি যন্ত্র ধরে ফেলে, তাহলে কবিতা আর একান্ত মানুষের থাকে না।
এই কারণেই The Eureka আজকে আমাদের এত পরিচিত মনে হয়। আমি যখন কাউকে বলি AI, GPT এইগুলো নতুন কিছু নয়। নতুন শুধু গতি, স্কেল, আর আত্মবিশ্বাস। বাকিটা, চাকা ঘোরা আর শব্দ বসা, সেই ১৮৪৫ সাল থেকেই চলছে। তখন অনেকেই ভুরু কুঁচকে তাকান।
প্রায় একশো আশি বছর পরে দৃশ্যটা বদলেছে। এখন সেই Egyptian Hall নেই, কাঠের ক্যাবিনেট নেই, চেস্টনাট রঙের বাক্সে কাটা ছ’টা জানালাও নেই। আছে একটা সাদা টেক্সট বক্স। আমরা সেখানে একটা প্রম্পট টাইপ করি, এন্টার চাপি, আর ব্রাউজারের ট্যাব রিফ্রেশ হতে যতক্ষণ লাগে, তার মধ্যেই GPT উগরে দেয় প্রবন্ধ, সনেট, কোড, এমনকি নিখাদ স্বীকারোক্তিও। বাইরে থেকে দেখলে দুই জগতের মধ্যে কোনো মিল নেই। একদিকে পালিশ করা মহগনি কাঠ, অন্যদিকে ফ্ল্যাট ইউআই। কিন্তু ভেতরের টেনশনটা আশ্চর্য রকম একই।
আজ যে গল্পটি বলবো আসলে সেই ধারাবাহিকতার গল্প। কীভাবে জন ক্লার্কের যন্ত্র আধুনিক ভাষা মডেলের অনেক আগেই তার ছায়া ফেলেছিল। কীভাবে তখনকার মানুষও, আজকের মতোই, একটু বিস্মিত, একটু মুগ্ধ, আর একটু শঙ্কিত হয়ে দেখেছিল ভাষা নিজে নিজে তৈরি হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতা সৃজনশীলতা, স্বয়ংক্রিয়তার সীমা এবং GPT-এর জাদুকরী ও অস্বস্তিকর দিকগুলো শেখায়।
কারণ সমস্যাটা প্রযুক্তির নয়, অনুভূতির। তখনও প্রশ্ন উঠেছিল, যদি যন্ত্র কবিতা লেখে, তাহলে কবি কে। আজ প্রশ্ন উঠছে, যদি মডেল প্রবন্ধ লেখে, কোড লেখে, প্রেমপত্র লেখে, তাহলে মানুষটা কোথায় দাঁড়াবে। ক্লার্কের Eureka যেমন দেখিয়ে দিয়েছিল ভাষা ভাঙা যায়, সাজানো যায়, নিয়মে বাঁধা যায়, GPT সেটা করছে বহুগুণ গতিতে, বহুগুণ স্কেলে।
এই জন্যই GPT আমার কাছে অদ্ভুতভাবে এত পরিচিত লাগে। আমরা জানি, এটা নতুন। আবার একই সঙ্গে মনে হয়, কোথাও যেন আগে দেখেছি। সেই পরিচিতির ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভয়টা। কারণ জাদু যতক্ষণ রহস্য, ততক্ষণ সহনীয়। কিন্তু জাদু যখন প্রক্রিয়া হয়ে যায়, তখনই সেটা অস্বস্তি তৈরি করে।
ক্লার্কের Eureka কোনো সর্বজ্ঞ যন্ত্র ছিল না। ওটা বানানো হয়েছিল একেবারে নির্দিষ্ট একটি কাজের জন্য: চাহিদামতো শুদ্ধ ছন্দে, শুদ্ধ ব্যাকরণে ল্যাটিন হেক্সামিটার পংক্তি (মহাকাব্যিক ছন্দ) তৈরি করা। সামনে ঢাকনাটা খুলুন, হ্যান্ডেল ঘোরান, আর God Save the Queen বাজাতে যতটা সময় লাগে, ততক্ষণ অপেক্ষা করুন। তারপর ছ’টা ছোট জানালার ভেতর দিয়ে দেখা যাবে, নতুন এক লাইনের কবিতা হাজির। যান্ত্রিক দিক থেকে দেখলে, Eureka আসলে ছিল এক ধরনের ভৌত ব্যাকরণ-ইঞ্জিন, সঙ্গে ছন্দের হিসাব। ভেতরে কী ছিল? ঘূর্ণায়মান ড্রাম, প্রত্যেকটা ড্রাম একটি করে শব্দ-অবস্থান সামলাচ্ছে। কাঠের স্টেভ, তাতে অক্ষর ছাপা, যেগুলো স্টপ-ওয়্যারের কারণে কখনো ওপরে, কখনো নিচে নামে, যাতে ঠিক অক্ষরটা ঠিক জানালায় এসে মিলে যায়। আর তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, আগেভাগে বানানো কঠোর নিয়ম। কোন শব্দের পরে কোন শব্দ বসতে পারে, কোন রূপ কোন কারক আর কালে মানায়, কোথায় জোর পড়বে, কোথায় পড়বে না; সবই আগে থেকে হিসেব করা।
এটা এলোমেলো কোন ব্যাপার না। ক্লার্ক আসলে নিয়মগুলোকে হার্ডওয়্যারের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। ব্যাকরণ ছিল কাঠ আর তারের মধ্যে বন্দি। সম্ভাবনার পরিসর বিশাল—তৎকালীন হিসাবে লক্ষ লক্ষ লাইন; কিন্তু তা সীমাহীন নয়। বলা যায়, এটা ছিল নিয়ন্ত্রিত দৈত্য কিন্তু লাগাম পরানো। ভিক্টোরিয়ান দর্শকদের কাছে এই অভিজ্ঞতা রীতিমতো ধাক্কা খাওয়ার মতো। Illustrated London News হিসেব কষে জানিয়েছিল, এই যন্ত্র সপ্তাহে হাজার হাজার লাইন তৈরি করতে পারে। মানুষ দাঁড়িয়ে দেখছে, একটা কাঠের বাক্স, কেবল গিয়ার আর ক্র্যাঙ্কের জোরে, এমন সব লাইন বানাচ্ছে “Martial encampments foreshadow many oppositions abroad”—ভার্জিল নয়, কিন্তু অর্থবহ।
জন ক্লার্কও এই ব্যাপারটা না এড়িয়ে উপমা দিয়ে আরও বাড়িয়ে তুলেছিলেন। তিনি বলতেন, এই যন্ত্রের কাজ হলো ভাষার এক ধরনের ক্যালাইডোস্কোপিক ইভল্যুশন। আপনি একটু ঘোরালেন, আর আগেই সাজানো উপাদানগুলো নতুন বিন্যাসে ফিরে এল। নতুন, কিন্তু বৈধ। কম্পিউটার শব্দটা তখনো আবিষ্কার হয় নি, কিন্তু উপমাটা ছিল প্রায় মানবিক, প্রায় জ্ঞানতাত্ত্বিক।
এই যন্ত্র চিন্তা করে কীভাবে? নতুন কিছু সৃষ্টি করে না। যা আগে থেকেই কোড করা আছে, সেই সম্ভাবনাগুলোকেই ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে সামনে আনে। ভাষা এখানে আবিষ্কৃত নয়, পুনর্বিন্যাসিত। আর ঠিক এই জায়গাতেই, একশো আশি বছর পর, GPT-কে দেখেও আমাদের অস্বস্তি হয়। কারণ কাঠের বাক্স বদলে গেছে, কিন্তু যুক্তিটা বদলায়নি।
আধুনিক GPT মডেলগুলোর নির্মাণপ্রণালি ক্লার্কের Eureka-র সঙ্গে একেবারেই মেলে না। এখানে গিয়ার নেই, কাঠের স্টেভ নেই, ল্যাটিন হেক্সামিটারের মতো সংকীর্ণ বাধ্যবাধকতাও নেই। তবু আত্মীয়তার একটা স্পষ্ট ছাপ আছে। অন্তত তিনটি মৌলিক জায়গায় এই দুই যন্ত্র একই বংশের বলে ধরা যায়।
প্রথমত, দুটোই শূন্য থেকে কিছু সৃষ্টি করে না, পুনর্বিন্যাস করে। GPT ভাষা আবিষ্কার করে না। সে বিপুল কর্পাস থেকে শেখা প্যাটার্নগুলোকে সম্ভাবনার নিয়মে নতুন করে সাজায়। ক্লার্কও সেটাই করেছিলেন, শুধু পার্থক্য তাঁর নিয়মগুলো ছিল মানুষ বসানো, কাঠে আর তারে খোদাই করা; GPT-র নিয়মগুলো শেখা, পরিসংখ্যানভিত্তিক, এবং অদৃশ্য। কিন্তু যুক্তিটা একই। ভাষা এখানে আগে থেকেই আছে, যন্ত্র কেবল তার সম্ভাব্য চলাচলের পথগুলো খোলে।
দ্বিতীয়ত, বিস্ময়ের কেন্দ্রটা দুই ক্ষেত্রেই সাবলীলতা। ভিক্টোরিয়ান দর্শকের চোখ কপালে উঠেছিল এই দেখে যে একটা যন্ত্র ঠিকঠাক ল্যাটিন কবিতা লিখছে। আজ GPT ব্যবহারকারী অবাক হয় এই দেখে যে লেখা পড়তে তার নিজের মতো, বা কোনো বিশেষজ্ঞের মতো, বা কোনো ঔপন্যাসিকের মতো। দুই ক্ষেত্রেই “ওয়াও”টা গভীর অর্থবোধে নয়, মসৃণতার মধ্যে। বাক্য ঠিকঠাক চলছে, ছন্দ ভাঙছে না, ভাষা আটকে যাচ্ছে না; এইটাই বিস্ময়।
তৃতীয়ত, লেখকত্ব নিয়ে সংশয়। Eureka প্রশ্ন তুলেছিল, যদি যন্ত্র ব্যাকরণসম্মত হেক্সামিটার লিখতে পারে, তাহলে কবির কাজটা কী। GPT সেই প্রশ্নটাকে ল্যাটিন কবিতার ছোট ঘর থেকে তুলে এনে প্রায় সব ভাষানির্ভর ক্ষেত্রের উপর চাপিয়ে দিয়েছে; ছাত্রের প্রবন্ধ, স্ক্রিনপ্লে, রিপোর্ট, প্রেমপত্র পর্যন্ত। লেখক কে, শ্রমটা কোথায়, কৃতিত্ব কার; এই সংশয় এখন আর সীমিত নয়।
অবশ্যই বড় পার্থক্য আছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। জন ক্লার্ক একেবারে নির্দিষ্ট একটা ক্ষেত্রকে হার্ড-কোড করেছিলেন: ল্যাটিন হেক্সামিটার। GPT শেখে বিশাল, LLM ভাষা-মডেল, যেখানে ঘরানা, বিষয়, ভঙ্গি প্রায় অসীম। কিন্তু ধারণাগত স্তরে দুটোই পুনর্বিন্যাসের ইঞ্জিন, যারা লেখকের মুখোশ পরে আছে। পার্থক্যটা হলো মাপের, অস্বচ্ছতার, আর আমরা কতটা দায়িত্ব, কতটা কর্তৃত্ব, এই সিস্টেমগুলোর হাতে তুলে দিতে রাজি।
ক্লার্কের Eureka-কে সত্যি সত্যি বুঝতে চাইলে, আপনাকে যে কাজগুলো করতে হবে। ক্যাবিনেট খুলুন, ভিতরের প্রতিটা তার, প্রতিটা স্টপ, প্রতিটা স্টেভ ধরে ধরে এগোতে থাকুন। লজিকটা জটিল, কিন্তু পাঠযোগ্য। আপনি আঙুল তুলে বলতে পারবেন: এই তারটা ওই শব্দটার পরে এই শব্দটা আসতে দেবে না। এই ড্রামের ঘূর্ণনের হারটা ঠিক করে দেয়, লাইনের বদল কোন প্যাটার্নে হবে। অর্থাৎ, যন্ত্রটা নিজেই একটা যুক্তি। পিতল আর কাঠে লেখা একখানা প্রস্তাব: ভাষাকে কীভাবে ফর্মাল নিয়মে বেঁধে রাখা যায়, আর সেই বাঁধন থেকেই কীভাবে “নতুন” বাক্য বেরোয়। Eureka-র ভিতরটা দেখলেই বোঝা যায়, এটা আসলে সীমাবদ্ধতার শিল্প। এখানে কবিতার কোন উৎস নেই, কবিতা আসে কাঠামো থেকে।
আর GPT? ওখানে আপনি ক্যাবিনেট খুলবেন কী করে? খুললেও তো কিছু দেখা যাবে না। GPT হলো লক্ষ লক্ষ, বা বিলিয়ন বিলিয়ন প্যারামিটারের এক পরিসংখ্যানের কুয়াশা, যেটা বিশাল ডেটাসেটে গ্রেডিয়েন্ট ডিসেন্টের চাপ খেয়ে এমন এক আকার পেয়েছে, যার ভিতরকার নিয়ম কেউ আঙুল দিয়ে দেখাতে পারে না। একটা মাত্র ওয়েট দেখিয়ে আপনি বলতে পারবেন না: “এইটাই সেই অংশ।” বা “এইটা ভার্জিলের মতো টোন এনে দেয়, আর ওইটা ভার্জিনিয়া উল্ফের মতো।” এখানে নিয়ম ঘোষণা করা নয়, নিয়ম বেরিয়ে আসে। উদ্ভূত। উদীয়মান।
তবু, কাঠের বাক্স আর নিউরাল নেটের মধ্যে কিছু কাঠামোগত মিল আছে, যেগুলো ব্যাপারটাকে একই পরিবারে ফিরিয়ে আনে।
এক, stateful generation.
Eureka একটা নির্দিষ্ট যান্ত্রিক state space-এর (কোনো সমস্যার সব সম্ভাব্য অবস্থার সেট) ভিতর পা ফেলে পা ফেলে এগোয়। GPT এগোয় টোকেনের হাই-ডাইমেনশনাল probability landscape-এর (কোথাও সম্ভাবনা বেশি (উঁচু), কোথাও কম (নিচু)) ভিতর দিয়ে। একটার পদচিহ্ন আপনি চোখে দেখতে পান, অন্যটার পদচিহ্ন আপনি কেবল আউটপুটে আন্দাজ করেন। কিন্তু স্টেপিংটা দুই ক্ষেত্রেই আছে।
দুই, form-এর constraint.
ক্লার্ক হার্ডওয়্যারের ভিতরেই ছন্দ আর ব্যাকরণ ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। GPT হার্ড-কোড করে না, কিন্তু ট্রেনিং ডেটা আর ডিকোডিং স্ট্র্যাটেজি তাকে এমনভাবে শিখিয়ে দেয় যে সে সিনট্যাক্স, রেজিস্টার, ঘরানা, টোন; এই সব নিয়মকে ধরে রাখে, অনেক সময় এমনভাবে যেন সেটা তার স্বভাব। Eureka নিয়মকে দেখায়। GPT নিয়মকে ঢেকে ফেলে।
তিন, অর্থের প্রতি অন্ধত্ব.
Eureka জানে না “Martial encampments foreshadow many oppositions abroad” কথাটার অর্থ কী। সে শুধু জানে, লাইনটা বৈধ: ব্যাকরণ মানছে, মিটার মানছে। GPT-ও, এত সাবলীলতা সত্ত্বেও, কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিতর দাঁড়িয়ে নেই। তার শরীর নেই, ইন্দ্রিয় নেই, কোনো সত্যিকারের শিবিরের ধোঁয়া তার নাকে ঢোকেনি, কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের মাটিতে তার জুতো লেগে নেই। সে জানে এই অর্থে যে ভাষার ভিতরের সহাবস্থানের প্যাটার্ন সে অসাধারণভাবে ধরতে পারে, কিন্তু ভাষার বাইরে জগতের সঙ্গে তার সংযোগ নেই।
মজাটা হচ্ছে ক্লার্কের যন্ত্র বোঝে এমন ভান করত না। তার কাঠ, তার জানালা, তার ক্র্যাঙ্ক, সব মিলিয়ে দর্শককে সারাক্ষণ মনে করিয়ে দিত: এটা একটা ট্রিক। দারুণ ট্রিক, কিন্তু ট্রিক। GPT সেটা করে না। তার কথাবার্তা এত মসৃণ, এত প্রাসঙ্গিক, এত মানুষের মতো যে আমরা নিজেরাই ভুলে যাই, এখানে একটা যান্ত্রিকতা চলছে। ভাষার পেশিশক্তি আমাদের কাছে বুদ্ধির মতো মনে হয়।
সেই কারণেই GPTর চালাকি “চিন্তার ভ্রম”কে চিন্তা থেকে আলাদা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে যায়। এবং যত কঠিন হয়, ততই এটা জাদু মনে হয়।
ক্লার্ককে নিয়ে একটা মজার ভুল ধারণা আছে। আমরা ধরে নিই, তিনি বুঝি যন্ত্রের প্রেমে পড়া এক নিখাদ টেকনো-উৎসাহী ছিলেন। আদতে তা নয়। ল্যাটিন কবিতা লেখার জন্য যন্ত্র বানাতে গিয়ে তিনি আসলে ঢুকে পড়েছিলেন এক বহু পুরনো ঐতিহ্যের ভেতর, যেখানে কবিতা আর বিধিনিষেধ চিরকাল একসঙ্গে হেঁটেছে।
এই ঐতিহ্যের শিকড় অনেক দূরে। Ramon Llull-এর ঘূর্ণায়মান চাকা, যেখানে যান্ত্রিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে সত্যে পৌঁছনোর চেষ্টা। John Peter-এর Artificial Versifying বিষয়ক গ্রন্থ, যেটাকে ক্লার্ক নিজেই তাঁর চিন্তার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। আরও পরে, Oulipo এবং Raymond Queneau-র Hundred Thousand Billion Poems, যেখানে কঠোর ফর্মাল নিয়ম থেকেই জন্ম নেয় আশ্চর্য রকমের পদ্য।
আমরা অভ্যাসবশত মনে করি, যন্ত্র মানেই সৃজনশীলতার শত্রু। কিন্তু ইতিহাস বলছে উল্টো কথা। নিয়ম, ছাঁচ, কাঠামো; এইসব প্রায়শই সৃষ্টিশীলতাকে উসকে দেয়। সনেট, গজল, লিপোগ্রাম; এগুলো প্রত্যেকটাই একেকটা ছোটখাটো যন্ত্র। প্রোগ্রামযোগ্য ফর্ম। এগুলো লেখককে আটকে দেয়, আবার সেই আটকে দেওয়ার মধ্যেই তাকে চালনাও করে। ক্লার্ক এই রূপকটাকে একেবারে আক্ষরিক করে তুলেছিলেন। কবিতার যন্ত্র, সত্যিই যন্ত্র। কাঠ আর তারে বাঁধা ছন্দ। GPT একই প্যারাডক্সকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, শুধু অন্য মাত্রায়।
GPT সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হয়, যখন মানুষ তাকে লেখকের বিকল্প না বানিয়ে সীমা তৈরির সঙ্গী হিসেবে ব্যবহার করে। বীজ-টেক্সট দেওয়া, স্টাইল ঘোরানো, আউটলাইন বদলানো, একটা বাক্যকে কুড়ি রকমে ফেরানো; এই জায়গাগুলোতেই তার শক্তি। সবচেয়ে কাজের, সবচেয়ে নান্দনিক ব্যবহারগুলো যেখানে থিম আর নৈতিক অভিপ্রায় মানুষের হাতে থাকে, আর GPT থাকে এক ধরনের অবিশ্বাস্য দ্রুত ফর্মাল ইঞ্জিন হিসেবে।
এই চোখে দেখলে, ক্লার্কের Eureka আর GPT; দুটোই আসলে একই যন্ত্র। সীমার ভেতর সম্ভাব্য উচ্চারণের জগতটা ঘেঁটে দেখা। কী কী বলা যায়, কী কী বলা সম্ভব ছিল কিন্তু বলা হয়নি; সেই মানচিত্র আঁকা। পার্থক্য একটাই। GPT শুধু সম্ভাবনার ইঞ্জিন নয়, সে এমন ভানও করতে পারে যেন উদ্দেশ্যটা তার নিজের। আর এই ভানটাই তাকে আগের সব যন্ত্রের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়, আবার বেশি বিপজ্জনক করে তোলে।
ভিক্টোরিয়ান ব্রিটেন এমনিতেই যন্ত্রের ভয়ে ভূতুড়ে হয়ে উঠছিল। স্টিম লুম, মেকানিক্যাল শিয়ার, স্বয়ংক্রিয় নিটিং ফ্রেম; লুডাইটরা যন্ত্র ভাঙছিল প্রযুক্তি বলে ঘৃণা থেকে নয়। তারা বুঝেছিল, এই যন্ত্রগুলো নিরপেক্ষ নয়। এগুলো একেকটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বস্তুগত রূপ। কারিগরির বদলে মুনাফা, স্বায়ত্তশাসনের বদলে উৎখাত।
এই স্রোতেই অনায়াসে ঢুকে পড়ে ক্লার্কের যন্ত্র। যা কবিতা লেখে, অনিবার্যভাবেই প্রশ্ন তোলে: যদি যন্ত্র এটা পারে, তাহলে কবির কী হবে? উনিশ শতকে এই প্রশ্নটা নিরাপদে রাখা গিয়েছিল। বলা হয়েছিল, ল্যাটিন হেক্সামিটার নিছক কৌতুক। আসল কবিতা, আসল সাহিত্য, আসল কবি; সবই সুরক্ষিত। যন্ত্রটা ড্রয়িংরুমের খেলনা, প্রদর্শনীর বস্তু, কাঠামোগত হুমকি নয়।
GPT সেই অঙ্কটাই বদলে দেয়। কারণ; এটা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের খেলনা নয়, সর্বব্যাপী। খুব কম খরচে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে; কপিরাইটিং, ছাত্রদের প্রবন্ধ, ফর্মাল রিপোর্ট, কোড ডকুমেন্টেশন। আর সবচেয়ে বড় কথা, এটা আলাদা করে কোথাও দাঁড়িয়ে থাকে না। ইন্টারনেটের কারণে সার্চে ঢুকে যায়, অফিস স্যুটে ঢুকে যায়, কোড এডিটরের ভেতরে বসে পড়ে। Eureka যেখানে ছিল একখানা ক্যাবিনেট, GPT সেখানে সব কিছুর ভেতরের এপিআই।
তবু রাজনীতির পাঠটা বদলায়নি। ক্লার্কের সময়ে কিংবা আজ; সবখানেই মূল প্রশ্নটা একই: কে যন্ত্রটা চালাচ্ছে, কী শর্তে চালাচ্ছে, কোন প্রণোদনায়। শত্রু, যদি ভাবি, তা কাঠের বা ডিজিটাল ইঞ্জিন নয়। শত্রু সেই সামাজিক ব্যবস্থা, যা ঠিক করে কার কাজ অপ্রয়োজনীয় হবে, কার কণ্ঠ স্বয়ংক্রিয় হবে, কার সময় মুক্ত হবে, আর কার সময় পণ্য হয়ে যাবে।
ক্লার্কের যন্ত্র ল্যাটিনবিদদের কাজ কেড়ে নেয়নি। কিন্তু GPT-র যে স্কেল, সত্যিই অনেক স্তরের অনিশ্চিত ভাষাশ্রমকে ক্ষয় করতে পারে; যেমন ঘোস্টরাইটার, ফর্মুলাভিত্তিক প্রবন্ধ যাচাই করা অ্যাডজাঙ্ক্ট শিক্ষক, কনটেন্ট ফার্মের কর্মী, চুক্তিভিত্তিক টেকনিক্যাল রাইটার। এই দুই যুগেই যন্ত্রের ভেতরের ভূতটা হলো ক্ষমতা। কে লাভবান হবে, কে বাদ পড়বে; এই সিদ্ধান্তের ছায়াই যন্ত্রের ভেতর দিয়ে কথা বলে।
GPT-র যুগে ক্লার্কের Eureka-কে নতুন করে পড়লে প্রশ্ন ওঠে। দেহগত অভিজ্ঞতা ছাড়া ফর্ম আমাদের কতদূর নিয়ে যেতে পারে। কেবল নিয়ম, সংকেত, ছন্দ ঠিক থাকলেই আমরা কাকে সাহিত্য বলবো, যদি সেই লাইনের পেছনে কোনো বেঁচে-থাকার টানাপোড়েন না থাকে। ক্লার্কের যন্ত্র আমাদের সহজ একটা সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ব্যাকরণে শুদ্ধ, এমনকি সুন্দর লাইনও এমন সত্তা ছাড়া তৈরি হতে পারে, যে কখনো সেই লাইনের ইঙ্গিত করা অনুভূতিটা উপলব্ধি করে দেখেনি। GPT এই কথাটাকেই চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। সে শোক নিয়ে লিখতে পারে, আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লিখতে পারে, শোষণ বা আনন্দ নিয়ে লিখতে পারে। এমন কি এক প্রবন্ধটাও লিখে ফেলতে পারে। পড়লে মনে হয়, ঠিকঠাক। বিশ্বাসযোগ্য। অথচ সে হারানোর কষ্ট জানে না, কাউকে ভালোবাসেনি, কোনো ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে হাঁটেনি, কিন্তু জায়গাগুলোর বর্ণনা সে খুব সাবলীলভাবে দেয়। কিন্তু এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে তার লেখা অকার্যকর, বা স্পর্শহীন। কিন্তু এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পড়ার কাজটা এখনও খুব মানবিক । আমরা লেখার ভেতর ঢুকিয়ে দিই স্মৃতি, যন্ত্রণা, রাজনীতি, শরীরের অভিজ্ঞতা। আমরা ঠিক করি কোনটা অন্তর্দৃষ্টি, কোনটা ক্লিশে, কোনটা অর্জিত মনে হয়, কোনটা ফাঁপা লাগে। ক্লার্কের সময়ে যন্ত্রটা নিজে কিছু ধরে রাখতে পারত না। চাকা ঘুরলেই লাইন মুছে যেত। তাই দরকার হতো একজন মানুষের, যে লাইনগুলো কপি করে নেবে, তারপর আবার যন্ত্র ঘোরানো যাবে। আজ GPT লিখে রাখে, নকল করে, ছড়িয়ে দেয়, প্লাবন নামায়। সেই ক্ষণস্থায়ীত্ব আর নেই। কিন্তু একটা জায়গায় মিলটা রয়ে গেছে। অর্থ দেওয়ার কাজটা এখনও মানুষের। কী রাখব, কী ফেলব, কোনটার বিরোধিতা করব, কোনটার সামনে দাঁড়াব। আমরা ভাবতেই পারি জন ক্লার্কের Eureka GPT-র পূর্বপুরুষ, কিন্তু সেটা আমাদের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। যন্ত্র সব সময়ই টুকরোগুলো জোড়া লাগানোয় আমাদের চেয়ে দক্ষ হবে। কিন্তু প্রশ্নটা দক্ষতার নয়। প্রশ্নটা হলো উদ্দেশ্য। কার শর্তে, কার স্বার্থে, আর কোন জীবনগুলোর জন্য এই জোড়াতালি। সেখানেই আসল লেখকত্ব। যন্ত্রে নয়। আমাদের সিদ্ধান্তে।





