ও’ফ্যারেলের কল্পকাহিনি 'হ্যামনেট'
এক শিশুর মৃত্যু, যার উৎস দুর্বোধ্য, তীব্র সংক্রামক মহামারী; আর সেই শোক কীভাবে এক দম্পতিকে ভিতর থেকে ভেঙে দেয়, যে দাম্পত্য আগেই প্রায় অসহনীয় টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল। কাহিনির সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত বাঁকটা হলো, স্ত্রীর বহু বছরের শোক-ভার এমন এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত বিষণ্নতা তৈরি করে, যা তাকে প্রায় অচল করে দেয়; স্বামীও কাজের অজুহাতে, থিয়েটার আর লেখালেখির দিকে পালিয়ে গিয়ে ঘরের মানুষ হতে ক্রমে দূরে সরে যায়; তবু আশ্চর্যভাবে সেই সম্পর্ক ভেঙে না পড়ে কালক্রমে আবার দাঁড়ায়, পুনরুদ্ধার এবং এক অর্থে আরও দৃঢ় হয়। ম্যাগি ও’ফ্যারেলের সংবেদনশীল ঐতিহাসিক উপন্যাস Hamnet-এর মূলত গল্প এটাই। স্ত্রী-স্বামীরা হলেন অ্যান হ্যাথাওয়ে, বা অ্যাগনেস, আর উইলিয়াম শেক্সপিয়ার।
স্ট্র্যাটফোর্ডের ষোড়শ শতকের শেষভাগ আর সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকের নথিপত্রে হ্যামনেট আর হ্যামলেট আসলে একই নামের দুটি চলতি রূপ, পুরোপুরি অদলবদলযোগ্য। অর্থাৎ আজ আমরা যে ভাবে বানানকে পরিচয়ের সিলমোহর ভাবি, তখন ব্যাপারটা তেমন ছিল না: একই ব্যক্তিকে এক জায়গায় ‘Hamnet’ লেখা হচ্ছে, আরেক জায়গায় ‘Hamlet’। এই ছোট্ট নথিগত সত্যই পরে বিশাল সাহিত্যিক অনুমানের দরজা খুলে দেয়, কারণ তখন ‘হ্যামলেট’ নাটকের নাম আর ‘হ্যামনেট’ শিশুপুত্রের নামের মধ্যে যে যোগসূত্র আজ আমাদের কাছে খটকা লাগে, তা সে সময়ের বাস্তবতায় আরও স্বাভাবিক, আরও দৈনন্দিন।
উপন্যাসের শুরু হয় স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভনের প্রাদেশিক বাজারে, যেখানে এগারো বছরের হ্যামনেট, শেক্সপিয়ার দম্পতির একমাত্র ছেলে, তার যমজ বোন জুডিথের শরীরে আচমকা দেখা দেওয়া অদ্ভুত লক্ষণ দেখে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। জুডিথের গলার কাছে আর কাঁধের পাশে চামড়ার তলায় যেন দুটি ডিম্বাকৃতি ফোলা জিনিসটির দিকে হ্যামনেট তাকিয়ে থাকে, যেন ত্বকের নিচে কোয়েল পাখির ডিম বসে আছে, ফোটার অপেক্ষায়। এই ফোলা গ্রন্থি, ‘বিউবো’, আসলে বুবোনিক প্লেগের ভয়াবহ চিহ্ন। কিন্তু ও’ফ্যারেল এটাকে হঠাৎ বলে ছাড়তে নারাজ; তিনি এক অসম্ভব দক্ষতায় সংক্রমণের কতগুলো অদৃশ্য গতিপথ কীভাবে প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়া Yersinia pestis শেষ পর্যন্ত হেনলি স্ট্রিটের শেক্সপিয়ার-ঘরে এসে পৌঁছাতে পারে, সেই পথটা তিনি গল্পের ভিতরেই বানিয়ে দেন।
সংক্রমণের এই যাত্রাপথে একটি ক্ষুদ্র, প্রায় অদৃশ্য এক পোকা, যা আলেকজান্দ্রিয়ার এক বানর থেকে এসেছে; বানরটি এক ইঁদুরের সাথে মেলামেশার আগে ছিল এক রাঁধুনির গায়ে, যে আলেপ্পোর কাছে মারা গিয়েছিল। তারপর সেই পোকাটি মুরানোর এক বালকের গা থেকে লাফ দিয়ে পড়ে যায় এক কাঁচ-কারিগরের হাতায়, ধীরে ধীরে উঠে যায় তার বাম কানের কাছে, আর কানের লতির পেছনে কামড় দেয়। তারপর ঘটনা গড়াতে গড়াতে, অবশেষে ১৫৯৬ সালে ওয়ারউইকশায়ার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই ধারাবিবরণী আসলে একটি নির্মম সত্য মনে করিয়ে দেয়: বড় বিপর্যয় কখনও কখনও শুরু হয় ক্ষুদ্রতম যোগসূত্র দিয়ে, যাকে আমরা ঘটনা ঘটার আগে দেখতেই পাই না।
কোভিড, যে ভাইরাস দূরের এক বাজার থেকে শহরের কাছের নার্সিংহোম পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল, তাদের কাছে এই উপন্যাসের সময়োচিত ভয়াবহতা অনিবার্য। তবু একটা তিক্ত সান্ত্বনা আছে: চতুর্দশ শতক থেকে ইউরোপে যে বুবোনিক প্লেগ বারবার ফিরে এসেছে, তার প্রাণঘাতী ক্ষমতা ছিল অনেক বেশি। ও’ফ্যারেল ঘরের ভিতরে প্লেগের ধ্বংস কীভাবে নেমে আসে, তা দেখাতে জানেন: একেকটা পরিবারের নিত্যদিনের শব্দ, অভ্যাস সবকিছু কীভাবে বদলে যায়, আর একই সঙ্গে পুরো কমিউনিটির মধ্যে কীভাবে ভয় ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাস আমাদের বলে না ১৫৯৬ সালে শেক্সপিয়ারের ছেলে ঠিক কীসে মারা গিয়েছিল; প্রমাণ নেই! কিন্তু প্লেগকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরা যুক্তিসংগত, কারণ তখন রোগটা বারবার ফিরে আসত। ১৫৬৪ সালে, শেক্সপিয়ারের জন্মবর্ষে, স্ট্র্যাটফোর্ডে এক প্রাদুর্ভাবে জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মারা গিয়েছিল, এবং শতাব্দীজুড়ে রোগটি বার বার ফিরে এসে এক ধরনের নিত্য-দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠেছিল।
শেক্সপিয়ারের জীবনের দলিলপত্র অল্প; তাঁর স্ত্রীর ক্ষেত্রে আরও কম। এতটুকু জানা যায়: আঠারো বছর বয়সে তিনি তাঁকে বিয়ে করেন, যে তাঁর চেয়ে আট বছরের বড়; একুশের মধ্যে তিন সন্তানের বাবা হন। এরপর যা ঘটেছে, তা প্রায় অনুমান আর ফাঁকফোকরের ইতিহাস: তিনি পরিবারকে স্ট্র্যাটফোর্ডে রেখে লন্ডনে চলে যান। তিনি মাঝেমধ্যে ফিরে আসতেন, স্ত্রী, বড় মেয়ে সুসান্না, যমজ জুডিথ ও হ্যামনেট, এবং বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখতে; আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আয় বাড়লে তিনি টাকা পাঠান, পরিবারকে বড় ইট-কাঠের বাড়ি তৈরি করে দেন, স্থানীয় জমিজমা ও পণ্যে বিনিয়োগ করেন।
এইসব দেখে বলা যায়, সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি; কিন্তু সংযুক্ত-থাকা আর একত্র-থাকা এক জিনিস নয়। লক্ষণীয় যে, অ্যাগনেস ও উইলের আর কোনো সন্তান হয়নি; আর কোথাও এমন প্রমাণও নেই যে ব্যস্ত নাট্যকার তাঁর অন্তর্গত জগতটিকে স্ত্রীর সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন, বা সন্তানদের দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে সক্রিয় জড়িয়েছিলেন। এই অনুপস্থিতি কেবল শারীরিক নয়, মানসিকও; একই শহরে থেকেও দুজন মানুষ কখনও কখনও একে অন্যের কাছে পৌঁছাতে পারে না।
নথি ঘেঁটে দেখা যায় যে, গ্রাম থেকে আসা অভিনেতারা প্রায়শই পরিবারকে লন্ডনেই এনে রাখতেন। আর যদি শেক্সপিয়ারের সনেটগুলোর মধ্যে সামান্যতম সত্যও থেকে থাকে, তাহলে বোঝা যায় তাঁর তীব্রতম আবেগ ও কামনা দাম্পত্যের সীমার বাইরে ছিল। হেনলি স্ট্রিটের পরিবার আর সিলভার স্ট্রিটের ভাড়াঘরের কবির মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, যা প্রায় অতিক্রম-অযোগ্য মানসিক দূরত্ব।
শেক্সপিয়ারের জীবনীকাররা ধরে নেন, ১৫৯৬ সালে একাদশ বর্ষীয় হ্যামনেট গুরুতর অসুস্থ হলে শেক্সপিয়ার নিশ্চয় তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরেছিলেন; কিন্তু এটাও নিশ্চিত নয়। ছেলে মারা যায় আগস্টে; স্ট্র্যাটফোর্ড থেকে লন্ডন ছিল দুই দিনের পথ; খবর পৌঁছাতে পৌঁছাতে হয়তো দেরি হয়ে গিয়েছিল। সতর্ক সংকেত ছিল কি? চিঠিতে খবর এসেছিল? না কেউ মুখে বলে দিয়েছিল? নাকি সেই বাক্যের মতো যা The Winter’s Tale-এ শোনা যায়: ‘তোমার ছেলে... চলে গেছে।’ ‘কীভাবে ‘চলে গেছে’?’ ‘মারা গেছে।’
যদি এই বাক্যগুলো কোনোভাবে ১৫৯৬ সালের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্তও হয়, তবু তা সরাসরি আত্মজীবনী হয়ে ওঠে না; তা অন্য কাহিনির মধ্যে ঢুকে যায়, লেওন্টিসের মতো চরিত্রের ঘাড়ে এসে বসে। তৎকালীন লেখালেখিতে নিজের অভিজ্ঞতা সরাসরি লিখতে বাধা ছিল না; বরং উল্টো। বুবোনিক প্লেগে সাত বছরের ছেলেকে হারিয়ে শেক্সপিয়ারের বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী বেন জনসন একটি বারো পঙক্তির কবিতায় শোকবার্তা লিখেছিলেন; সেখানে সন্তানের মৃত্যু, বাবার অপরাধবোধ, নিজেকে দোষ দেওয়া, এবং শেষ পর্যন্ত কবিতাকে ‘সন্তানের স্মৃতিস্তম্ভ’ বানিয়ে তোলার এক ধরনের নির্মোহতা আছে। এই তুলনায় শেক্সপিয়ার সম্পর্কে যা চোখে পড়ে তা হলো: যতদূর জানা যায়, তিনি এমন কোন সরাসরি পিতৃশোকের লেখালেখি রেখে যাননি। অথচ এই লেখক, যিনি ‘যুবক’ ও ‘ডার্ক লেডি’র উদ্দেশে বিস্ময়করভাবে অন্তরঙ্গ কবিতা লিখেছেন, এবং সমসাময়িকরা বলেছে, তিনি ব্যক্তিগত বন্ধুদের মধ্যে এই ‘মিষ্টি সনেট’ ঘুরিয়ে দিতেন। তবু পরিবারের ক্ষেত্রে তিনি যেন একটা অভেদ্য পর্দা নামিয়ে রেখেছিলেন, অনুভূতি থাকুক বা না থাকুক, তা বাইরে আসেনি।
১৬১৬ সালে, বায়ান্ন বছর বয়সে মৃত্যুশয্যায় শেক্সপিয়ার কাঁপা কাঁপা হাতে একটি উইলে সই করেন। তাতে নানা বণ্টন: ছোট বোন জোয়ানকে ২০ পাউন্ড এবং নিজের পোশাকপত্র, সঙ্গে হেনলি স্ট্রিটের বাড়ির এক অংশে নামমাত্র ভাড়ায় থাকার অধিকার; গ্লোব থিয়েটারের সহঅভিনেতা ও শেয়ারহোল্ডার জন হেমিংস, হেনরি কনডেল, এবং রিচার্ড বারবেজকে আংটি কেনার জন্য ২৬ শিলিং ৮ পেন্স করে; একই অঙ্ক তাঁর আজীবন বন্ধু হ্যামনেট স্যাডলারকেও ‘একটা আংটি কেনার জন্য’; আর ব্যবসায়িক পরিচিতের আত্মীয়, সাতাশ বছরের থমাস কম্বকে একটি তলোয়ার, যা সম্ভবত হ্যামনেট বেঁচে থাকলে ছেলেরই হতো। উইলের এইসব ধারা, স্ট্র্যাটফোর্ডের গরিবদের জন্য ১০ পাউন্ডসহ, এমন এক মানুষের ছবি আমরা দেখতে পাই যে অনেক সম্পত্তি জমিয়েছিল, আর শেষ সময়ে তা সযত্নে গুছিয়ে দিতে চাইছিল: বড় বাড়ির রূপার বাটি থেকে শুরু করে শহর ও আশপাশের গ্রামে ছড়িয়ে থাকা খামারঘর, আস্তাবল, বাগান, জমিজমা, ভাড়াবাড়ি সবকিছু। তিনি স্পষ্টভাবে চাইছেন, জুডিথের স্বামী থমাস কুইনি যেন মেয়ের উত্তরাধিকারী অর্থ সহজে হাতিয়ে না নিতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বড় মেয়ে সুসান্না, তাঁর স্বামী ডা. জন হল, এবং তাঁদের পুরুষ উত্তরাধিকারীদের দিকেই সম্পত্তির ভার বেশি করে ঠেলে দিচ্ছেন। কিন্তু উইলের সবচেয়ে আলোচিত অবাঞ্ছিত হলো চৌত্রিশ বছরের দাম্পত্যসঙ্গী অর্থাৎ স্ত্রী, যার জন্য তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য দান নেই। ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, বিধবা হিসেবে তিনি আইন বা প্রথা অনুযায়ী জীবদ্দশায় সম্পত্তির একটি অংশ ভোগ করার অধিকার পেতেন, কাজেই আলাদা করে লিখতে হয়নি। তবু অন্যান্য বন্ধুদের উইলগুলো দেখলে চোখে পড়ে, কী যেন নেই। বন্ধু হেনরি কনডেল তাঁর ‘প্রিয় স্ত্রী এলিজাবেথ’-কে প্রায় সবকিছু দেন; রিচার্ড বারবেজ তাঁর স্ত্রীকে ‘একমাত্র নির্বাহক’ করেন; ফিলিপ হেন্সলো তাঁর ‘ভালোবাসার স্ত্রী’কে জমিজমা দেন; আরও অভিনেতাদের উইলেও একই ধরনের লেখা চোখে পড়ে, ‘দিয়েছি, রেখে গেলাম, প্রিয় স্ত্রী’র প্রতি। তালিকা বড়; কিন্তু শেক্সপিয়ারের ক্ষেত্রে সেই ভাষার উষ্ণতা নেই। অনুপস্থিতির বোধ আরও ঘনীভূত হয় একটি মাত্র লাইনে, যা নথি তৈরি হওয়ার পর যোগ করা হয়েছিল বলে মনে হয়: “স্ত্রীকে বিছানা ও তার আসবাবপত্র”। এই এক লাইন। কোনো ‘ভালোবাসার’, ‘দিয়ারলি বিলাভড’, ‘ওয়েল-বিলাভড অ্যান্ড কনস্ট্যান্ট’ নেই। এমনকি তাঁর বন্ধু জন হেমিংস যেভাবে ‘আমার ভালোবাসার স্ত্রী রেবেকা’র কাছে সমাধিস্থ হওয়ার নির্দেশ দেন, তেমন কোনো সুরও নেই। শেক্সপিয়ার নিজের কবর নিয়ে বরং অনুরোধ করে যান: “তাঁর হাড় যেন কেউ নাড়াচাড়া না করে”; শান্তির জায়গাটুকু তিনি অক্ষুণ্ণ রাখতে চান।
এই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দলিল থেকে যে ‘অসুখী দাম্পত্য’ অনুমান করা যায়, ও’ফ্যারেল সেখান থেকে সম্পূর্ণ অন্য গল্প নির্মাণ করেন। তাঁর কাহিনিতে, অনুপস্থিত বাবা সত্যিই হ্যামনেটের অসুস্থতার সময়ে সময়মতো স্ট্র্যাটফোর্ডে পৌঁছান না; তিনি আসেন মৃত্যুর পরে, দেহ সাজানো আর কঠোর অন্ত্যেষ্টির সময়। তারপর, স্ত্রীকে শোকের মধ্যে ফেলে রেখে, থিয়েটার কোম্পানি, নাটকের প্রস্তুতি ইত্যাদি অপ্রতুল অজুহাতে তিনি আবার লন্ডনে ফিরে যান। কিন্তু এই যাওয়াকে ও’ফ্যারেলের এক দীর্ঘ ভালোবাসার কাহিনির ভেতরেই বসিয়ে দেন, যেখানে মানুষ ভেঙে পড়েও আবার ফিরে আসে। এই ব্যাখ্যা একেবারে নতুনও নয়। উনিশ শতক থেকেই অনেকে বলেছেন, ঘরের সবচেয়ে ভালো বিছানাটি অতিথিদের জন্য রাখা হতো, আর দ্বিতীয় ভালো বিছানা দাম্পত্যের স্মৃতিতে ভেজা, ব্যক্তিগত। Hamnet উপন্যাসে তাই দেখা যায়, বড় মেয়ে সুসান্না মায়ের কাজকর্মে হাত লাগায়, বাবার অনুরোধে নতুন আসবাব আনে, কিন্তু অ্যাগনেস নিজের বিছানা ছাড়তে চান না: সেই বিছানাতেই তাঁর বিয়ে হয়েছিল, তিনি অন্য বিছানা নেবেন না; নতুন বড় বিছানাটা অতিথিঘরে তোলা হয়।
উইলে আদুরে শব্দ না থাকার ব্যাখ্যাও উপন্যাসে আছে: এগুলো সামাজিক রীতি মাত্র; আর যিনি ভাষার কারিগর, তিনি কি সত্যিই এই ধরনের পরিচিত বাক্যের ধার নেবেন? কখনও কখনও সবচেয়ে গভীর বন্ধনই ভাষার বাইরে থাকে, উচ্চারণের বাইরে। ও’ফ্যারেলের শেক্সপিয়ার পরিবারে কথা খুব অল্প করে বলেন; উপন্যাসে তাঁর নামও প্রায় আসে না, তিনি ‘সে’, ‘তার স্বামী’, ‘বাবা’ এইভাবে উপস্থিত থাকেন। এমনকি প্রেমালাপেও তিনি যেন শব্দ-সঙ্কোচে ভোগেন: বাক্য শুরু হয়, থামে; ‘আমি...’, ‘তুমি কি...’ এইসব আধা-উচ্চারণ আর নীরবতার ফাঁকে সম্পর্ক দাঁড়ায়। ও’ফ্যারেল জানান, তাঁর কল্পনা অনেকটা ঋণী জার্মেইন গ্রিয়ারের ২০০৭ সালের বই Shakespeare’s Wife-এর কাছে। গ্রিয়ারের যুক্তি ছিল: অ্যাগনেস হ্যাথাওয়ে শেক্সপিয়ারকে ঘিরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাস রচনা যে ভাবে তুচ্ছ, হেয়, এবং চরিত্রহনন করেছে, তা অন্যায়; ‘শেক্সপিয়ার-ভক্ত’ গবেষকেরা নিজেদের মতো করে এক ‘বার্ড’ বানিয়ে নিয়েছেন, তারপর যে নারী জীবনভর তাঁর পাশে ছিল তাকে দোষী বানিয়েছেন, যেন কবিকে নির্দোষ করা যায়। এখানে লেখক নিজের অবস্থানও বলেন: তিনি কখনও ভাবেননি শেক্সপিয়ার নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে অক্ষম ছিলেন; কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের দূরত্ব চোখে পড়ার মতো; তবু স্ত্রীর ‘দোষ’ খোঁজার প্রবণতা তাঁর ছিল না।
গ্রিয়ার রেকর্ড ঘেঁটে অ্যাগনেসকে দক্ষ, বিশ্বস্ত স্ত্রী হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন; যদিও গবেষকরা তাঁর এই দাবি গ্রহণ করেননি। কিন্তু ও’ফ্যারেল গ্রিয়ারের ইচ্ছাটা গ্রহণ করেন: নথির ফাঁকে যে মানুষটি হারিয়ে গেছে, তার শরীর-মন-ভয়-ক্ষমতা-দুর্বলতা কল্পনায় ফিরিয়ে আনা। ফলে অ্যাগনেস এখানে হয়ে ওঠেন শক্ত, ভঙ্গুর, একাকী, এবং নিজের সিদ্ধান্তে স্থির এক নারী; এমন নারী, যাকে ‘স্ট্র্যাটফোর্ডের সাহসী মেয়ে’ বলে হেয় করার বদলে একটা পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখা যায়।
ও’ফ্যারেল অ্যাগনেসকে আরও এক ধাপ এগিয়ে ‘wisewoman’ হিসেবে আঁকেন, রেনেসাঁর ভাষায় এক ধরনের লোকচিকিৎসক, যিনি গাছগাছালি ও ভেষজের গুণ জানেন; কিন্তু তাঁর মধ্যে কিছু ‘অলৌকিকতাও আছে। প্রথম দেখায়, যখন কিশোর শেক্সপিয়ার গ্রামে এসে সৎভাইদের ল্যাটিন পড়াচ্ছে; অ্যাগনেস তার হাত ধরে, বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাঝের মাংস চেপে ধরে, যেন হাতে লেখা কোনও গোপন মানচিত্র পড়ছেন, আর তার ভেতরের প্রকৃতিটা বুঝে ফেলছেন। সেখানে তিনি এমন এক স্তরবিন্যাস আবিষ্কার করেন, যেন ভূদৃশ্যের মতো গভীর, ফাঁকফোকর, গুহা, ওঠানামা, এমন এক অন্তর্গত দেশ, যা তিনি পুরো ধরতে পারবেন না, কারণ তা দুজনের থেকেও বড়। বাক্যটি পরিচিত শোনালেও, এতে ইঙ্গিতটা স্পষ্ট: শেক্সপিয়ারের ভিতরের জগৎ সাধারণ জীবনের আয়তনে মাপা যায় না। এই ভেতরের জগতই ও’ফ্যারেলের মতে শেক্সপিয়ারকে অ্যাগনেসের দিকে টেনেছিল, আবার তাকেই লন্ডনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। উপন্যাসে তাঁর বাবা এক ক্রুদ্ধ, মদ্যপ, রুক্ষ কারিগর; মা সংকীর্ণ রীতির ভিতর আটকে থাকা; ঘর থেকে বেরোনো তাই প্রয়োজন। কিন্তু শেক্সপিয়ার চান অ্যাগনেসও যাবেন; অ্যাগনেসই বারবার সময় পিছিয়ে দেন: বসন্ত এলে, গ্রীষ্ম কাটলে, শরৎ পেরোলে, বরফ গললে। কারণ তাঁর কাছে শহর মানে রোগ, মৃত্যু, অনিশ্চয়তা; সন্তানের নিরাপত্তার জন্য তিনি নিজের ভালোবাসাকেও দ্বিতীয় স্থানে রাখেন। এই ‘মাতৃত্ববোধ’ উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে: প্রেম আছে, কিন্তু সন্তানের জীবনরক্ষার তাগিদ সেই প্রেমকে নিয়ন্ত্রণ করে।
এখানে ও’ফ্যারেলের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগে। তাঁর স্মৃতিকথায় দীর্ঘ শৈশব-অসুস্থতা, এবং আরও ভয়াবহভাবে শিশুকন্যার রোগের বর্ণনা আছে, যেখানে শরীরের ভিতরে বিপর্যয় যেন চোখের সামনে ঘটে। সেই অভিজ্ঞতার তীব্রতা তিনি এখানে অ্যাগনেসের উপর বসান: জুডিথকে বাঁচাতে তার মরিয়া চেষ্টা, তার দায়িত্ববোধ, আর সেই দায়িত্ববোধেরই উল্টো পিঠ, অপরাধবোধ। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস জানে, জুডিথ বেঁচেছিল, মারা যায় হ্যামনেট। উপন্যাসে এখানে একটি অতিলৌকিক বাঁক আছে: হ্যামনেট যেন নীরবে নিজের জায়গা বদলে দেয়, বোনের বদলে মৃত্যুকে ডেকে নেয়; ফলে জুডিথ সেরে ওঠে, এমনভাবে যেন মায়ের ভেষজ সত্যিই কাজ করেছে। কিন্তু বেঁচে যাওয়াটা অ্যাগনেসের জন্য স্বস্তি নয়; বরং নতুন যন্ত্রণা। কারণ তাঁর মনে হয়, ছেলে হ্যামনেটের দিকে তিনি যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারেননি; শোকের সঙ্গে যোগ হয় স্বামীর অনুপস্থিতির প্রতি ক্ষোভ। এই ক্ষোভ আরও বাড়ে যখন হ্যামনেটকে কবর দিয়ে শেক্সপিয়ার লন্ডনে ফিরে যেতে চায়। অ্যাগনেস জানে, তাকে আটকানো কঠিন, কারণ শেক্সপিয়ারের টানটা একটি শহরের দিকে নয়, তার মাথার ভিতরের লেখালেখির দিকে। তিনি তাকে বলেন: তুমি লন্ডনে নও, তুমি তোমার মাথার ভিতরে আটকে; সেখানেই তুমি চলে গেছো, সেটাই তোমার কাছে সবচেয়ে বাস্তব; সন্তানের মৃত্যুও তোমাকে থামাতে পারবে না।
স্বামী চলে গেলে অ্যাগনেস ভেঙে পড়ে, আজকের ভাষায় যাকে ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন বলা যায়। আর যদি কেউ মনে করে, তখনকার মানুষেরা শিশুমৃত্যুতে অভ্যস্ত ছিল, তাই এমন অবসাদ অতিশয়োক্তি, তবে তাদের ইতিহাসটা আবারও একটু পড়তে হবে। রিচার্ড ন্যাপিয়ারের ডায়েরি থেকে জানা যায়, কত মা-বাবা সন্তানের মৃত্যুর পরে শোকার্থ থাকত। ১৫৮৬ সালে উইনচেস্টারের মারকুইস লিখেছিলেন: মা সন্তানের প্রেম এমন শক্তিশালী, সন্তান মাটির নিচে গেলেও সে তাকে হৃদয়ের মধ্যে জীবিত রাখে। ও’ফ্যারেলের অ্যাগনেস সেই ভারই বহন করে, বছরের পর বছর।
এই অবসাদ আরও তীব্র হয় যখন তিনি জানতে পারেন, শেক্সপিয়ার এক নাটক লিখেছেন, যে নাটকের নাম তার ছেলের নামের সঙ্গে মিলে যায়। অ্যাগনেসের কাছে এটা খুব নিষ্ঠুর মনে হয়: ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে জনতার বিনোদনে বদলে দেওয়ার মতো। উপন্যাসের চূড়ান্ত দৃশ্যে তিনি স্বামীর মুখোমুখি হতে লন্ডনে যান। সেখানে তিনি প্রথমে আবিষ্কার করেন, স্বামীর ঘর একেবারে নিঃসঙ্গ: প্রেমিক-প্রেমিকার কোনো চিহ্ন নেই, শুধু লেখকের একাকীত্বের চিহ্ন আছে; টেবিলে আছে তাঁর উদ্দেশে এক অসমাপ্ত চিঠি। আর দ্বিতীয় আবিষ্কারটি ঘটে গ্লোবে থিয়েটারের ভিতরে, ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে, যখন তিনি মঞ্চে দেখেন স্বামী সাদা মেকআপে, ভূতের চরিত্রে; চারদিকে মানুষের মুখে মুখে তখন ‘হ্যামলেট’ ‘হ্যামলেট’ ‘হ্যামলেট’ ‘হ্যামলেট’।
‘হ্যামলেট’ নামটি মৃত রাজার নাট্যগল্পের নাম হয়ে জনতার মুখে ঘুরছে, এ দৃশ্য অ্যাগনেসকে বিরক্ত করে, তিনি বেরিয়ে যেতে চান; কিন্তু হঠাৎ তিনি দেখেন এক তরুণ অভিনেতা, যে হাঁটে, কথা বলে, এমনভাবে যেন তার মৃত ছেলে হ্যামনেটই ফিরে এসেছে তরুণ হয়ে। মুহূর্তে বিভ্রান্তি, তারপর উপলব্ধি: মঞ্চের ‘হ্যামলেট’ যেন একসঙ্গে দুই মানুষ, জীবিত ছেলে আর মৃত বাবা; একসঙ্গে জীবিত ও মৃত। শেক্সপিয়ার নিজের পক্ষে যেটুকু সম্ভব, সেই উপায়েই ছেলেকে ফিরিয়ে এনেছেন: শিল্পের মধ্যে। এই উপলব্ধির সঙ্গে আরেকটি স্তরও যোগ হয়: ভূতের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে শেক্সপিয়ার যেন সন্তানের মৃত্যুকে নিজের শরীরে টেনে নিয়েছেন; তিনি নিজেকে মৃত্যুর হাতে সঁপে দিয়ে ছেলেকে তার স্থানে জীবিত করেন। পাঠক জানে, এতে এক ধরনের প্রতিধ্বনি আছে: ছেলে যেমন বোনের জন্য নিজের জায়গা বদলেছিল, বাবাও তেমনি শিল্পের ভিতরে নিজেকে বদলে দিয়ে ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে চায়। অ্যাগনেস অন্তত এটুকু বুঝতে পারে যে এই নাটকের মধ্যে নিষ্ঠুরতা আছে, আবার মুক্তিও আছে; ক্ষয় আছে, আবার উদ্ধারও আছে।
এখন আমাদের ভাবতে হয় বাস্তবে কি সত্যিই এমন ঘটেছিল? আমি বলবো অবশ্যই না। তাদের দাম্পত্যজীবন কি সত্যিই রক্ষা করা গিয়েছিল? সন্দেহ তো থেকেই যায়। কিন্তু একটি ধারণা খুব জোরালো: শেক্সপিয়ারের শোক ও শূন্যতা, তাঁর রূপান্তরিত শিল্পে ঢুকে পড়েছিল; আর সেই শোক থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক বিস্ময়কর নাটক, যে নাটক ছেলের নামকে বহন করে। ও’ফ্যারেলের কল্পকাহিনি তাই কেবল অ্যাগনেসের জীবন্ত ছায়াচিত্র নয়; বরং এটি একটি গভীর প্রশ্ন সামনে আনে: সাহিত্য কীভাবে ব্যক্তিগত বেদনাকে জনতার ভাষায় রূপ দেয়, এবং সেই রূপান্তর কি শেষ পর্যন্ত সান্ত্বনা হয়ে উঠতে পারে?
Hamnet by Maggie O’Farrell - অবলম্বনে।



