বই মরে যাচ্ছে, এই খবরটি জানাতে বই লেখার রেওয়াজ বেশ পুরনো।
ব্যাপারটা খানিকটা সেই ডাক্তারের মতো, যিনি রোগীকে বলছেন, আপনার কথা বলার ক্ষমতা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে, আর রোগী সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠছেন, কী বললেন!
১৯৮৫ সালে নিল পোস্টম্যান লিখলেন Amusing Ourselves to Death। তাঁর দুশ্চিন্তা ছিল টেলিভিশন। টিভির ঝলমলে, চটপটে, মিনিটে মিনিটে হাততালি-চাওয়া সংস্কৃতি নাকি মুদ্রিত শব্দের ধীর, মনোযোগী, চিন্তাশীল সভ্যতাকে খেয়ে ফেলছে। ১৯৯৪ সালে স্ভেন বার্কার্টস এলেন The Gutenberg Elegies নিয়ে। এবার বিপদ ইলেকট্রনিক মিডিয়া। মানুষের সেই নিভৃতে বসে বইয়ের ভিতরে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতাটি বুঝি গেল গেল।
এখন জেমস ম্যারিয়ট লিখেছেন The New Dark Ages: The End of Reading and the Dawn of the Post-Literate Society।
এবার ভিলেন স্মার্টফোন।
মানবসভ্যতা আশ্চর্য জিনিস। প্রত্যেক যুগেই তার একজন নতুন খলনায়ক প্রয়োজন। একসময় উপন্যাস পড়লে মেয়েদের চরিত্র নষ্ট হবে বলে ভয় ছিল, পরে সিনেমা যুবসমাজকে গোল্লায় পাঠাবে, তার পরে টেলিভিশন, ভিডিও গেম, ইন্টারনেট, মোবাইল। আগামী পঞ্চাশ বছর পরে কেউ হয়তো বই লিখবেন, The Last Human Thought, এবং অভিযোগ করবেন যে মস্তিষ্কে বসানো নিউরাল-চিপের জন্য মানুষ আর আগের মতো শান্ত হয়ে স্মার্টফোনে তিন ঘণ্টা বসে থাকতে পারে না।
ম্যারিয়টের ভয় অবশ্য একেবারে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তাঁর বক্তব্য, ছাপা বইয়ের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে গেলে আধুনিক আলোকায়নের গোটা বাড়িটাই নড়ে উঠবে। মানুষ কম পড়লে পৃথিবী কম যুক্তিবাদী হবে, বেশি বিশৃঙ্খল হবে। জ্ঞান আবার চলে যাবে অল্প কিছু শিক্ষিত মানুষের হাতে। উদার গণতন্ত্রের যে সাক্ষর ভিত্তি, তাতেও ফাটল ধরবে।
শুনলে ভয় লাগে।
বিশেষত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে যদি দেখা যায় দশজন মানুষের আটজন মাথা নিচু করে ফোনের দিকে তাকিয়ে চলেছেন, একজন ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা খেলেন, আর নবম জন সেই ধাক্কাটা ভিডিও করছেন, তখন সভ্যতার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর আশাবাদ বজায় রাখা কঠিন।
ম্যারিয়ট মনে করেন, ছোট ছোট নির্বোধ ভিডিও আমাদের মনোযোগের বারোটা বাজাচ্ছে। এমনকি লেখাভিত্তিক ইন্টারনেটও নাকি মারা যাচ্ছে। কারণ একই সময়ে ইন্টারনেটের আরেক বিপদ হচ্ছে লেখার পাহাড়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পৃথিবীকে এমন পরিমাণ শব্দে ভাসিয়ে দিয়েছে যে এখন সমস্যাটা কেবল মানুষ লেখে না নয়, বহু ক্ষেত্রে কে যে লিখছে, মানুষ না মেশিন, সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। লেখার মৃত্যু হলেও মৃতদেহটি বেশ বাকপটু।
তবু ম্যারিয়টের মূল বক্তব্য পরিষ্কার। তাঁর ধারণা, আমাদের সময়ের অনেক বোকামি, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, রাজনৈতিক উন্মাদনা, বিজ্ঞানবিরোধিতা, বাস্তবতার সঙ্গে আড়াআড়ি সম্পর্ক, এগুলোর পিছনে লিখিত শব্দের পতন এবং পর্দার উত্থান বড় কারণ। দাবিটা আকর্ষণীয়। সমস্যা হচ্ছে, আকর্ষণীয় দাবি আর প্রমাণিত দাবি একই টেবিলে বসে চা খেলেও তাদের পদবি এক নয়।
ম্যারিয়ট এমনকি ভয় পাচ্ছেন, পরের প্রজন্ম হয়তো শেক্সপিয়র, মিল্টন, জেন অস্টেন পড়বেই না। প্রমাণ হিসেবে তিনি একটি গবেষণার কথা বলেন, যেখানে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীরাও চার্লস ডিকেন্সের Bleak House-এর প্রথম অনুচ্ছেদ বুঝতে হিমশিম খেয়েছে।
শুনলে মনে হয় হার্ভার্ড থেকে ইউসিএলএ পর্যন্ত হাজার হাজার ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ডিকেন্স খুলে সম্মিলিত ভাবে বলেছে, বাবা রে, এ আবার কী!
আসল গবেষণাটি হয়েছিল ২০১৫ সালে কানসাসের দুটি কলেজে। ছাত্র ছিল পঁচাশি জন। তাদের মধ্যে ঊনপঞ্চাশ জন প্রথম অনুচ্ছেদটি বুঝতে সমস্যায় পড়েছিল।
ঊনপঞ্চাশ জনের সমস্যা নিশ্চয়ই চিন্তার বিষয়। কিন্তু সেখান থেকে শেক্সপিয়রের আসন্ন শ্রাদ্ধের দিনক্ষণ ঘোষণা করে ফেললে মাঝখানে দু-চারটে সিঁড়ি টপকে যাওয়া হয়।
পড়াশোনা কমছে কি না, সেই প্রশ্নে সংখ্যার অভাব নেই। বরং সমস্যা উল্টো। সংখ্যা এত যে আপনি চাইলে মানবসভ্যতার মৃত্যু এবং মানবসভ্যতার সুস্বাস্থ্য, দুটোই প্রমাণ করে ফেলতে পারেন।
ম্যারিয়ট ২০২৪ সালের OECD-র একটি গবেষণা উদ্ধৃত করেন। সেখানে বলা হয়েছিল, গত দশকে অধিকাংশ উন্নত দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের সাক্ষরতার দক্ষতা হয় কমেছে, নয়তো থমকে আছে।
এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
তার পরে ছোট অক্ষরের অংশটুকুও পড়তে হয়। কারণ কিছু দেশে, ইংল্যান্ড-সহ, দক্ষতা বেড়েছে। যেখানে কমেছে, সেখানে বড় পতন ঘটেছে প্রধানত সবচেয়ে দুর্বল পাঠকদের মধ্যে। কয়েকটি দেশে বিদেশে জন্মানো মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিও সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
অর্থাৎ একই রিপোর্ট থেকে “মানুষ পড়তে ভুলে যাচ্ছে” বলা যায়, আবার “সাক্ষরতার বৈষম্য বাড়ছে” কথাটিও বলা যায়। দুই বাক্যের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষাগত তাৎপর্য এক নয়।
পড়ার অভ্যাসের ইতিহাস আরও গোলমেলে।
গবেষণাগুলো সাধারণত দেখায়, পড়াশোনার বড় পতন স্মার্টফোন আসার পরে শুরু হয়নি। টেলিভিশনের উত্থানের সময়েই তার অনেকখানি ঘটে গেছে। মেয়েরা পুরুষদের তুলনায় বেশি বই পড়ে। দেশভেদে বিরাট পার্থক্য। একই দেশের মধ্যেও শ্রেণি, শিক্ষা, বয়স, আয় এবং পারিবারিক পরিবেশ অনুযায়ী তফাত ভয়ানক।
১৯৯০-এর দশকের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, গত এক বছরে বাড়িতে অন্তত একটি বই পড়েছেন এমন মানুষের হার পর্তুগালে মাত্র ১৫ শতাংশ, সুইডেনে ৭২ শতাংশ।
এখানে সঙ্গে সঙ্গে সুইডেনের জন্য নোবেল এবং পর্তুগালের জন্য সাক্ষরতা-শোকসভা আয়োজন করার আগে আরেকটি বিপদ মনে রাখা দরকার। এ ধরনের সমীক্ষায় মানুষ কী বলে এবং সত্যিই কী করে, তার মধ্যে সেই পুরনো বিবাহিত দম্পতির দূরত্ব থাকতে পারে।
“আপনি নিয়মিত বই পড়েন?”
“অবশ্যই।”
“শেষ কোন বই?”
“এই তো… ওই যে… নীল মলাট… লেখকের নামটা জিভের ডগায়…”
বিশেষ করে ছাত্রদের পড়ার ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি তুলনা করা আরও কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ে কারা ঢুকছে বদলেছে, পাঠক্রম বদলেছে, শিক্ষার লক্ষ্য বদলেছে, মূল্যায়নের পদ্ধতি বদলেছে। ১৯৬০ সালের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আর ২০২৬ সালের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রকে পাশাপাশি বসিয়ে শুধু Bleak House ধরিয়ে দিয়ে সভ্যতার গ্রাফ আঁকা বেশ সাহসী কাজ।
ম্যারিয়ট অবশ্য একটি বড় ঐতিহাসিক সত্য ধরেছেন। গুটেনবার্গের ছাপাখানার পর যে “মুদ্রণের মহাযুগ” তৈরি হয়েছিল, আমরা আর সেই জগতে বাস করি না। প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার, ব্যক্তিগত বাইবেলপাঠ, সংবাদপত্র, প্যামফ্লেট, উপন্যাস, বৈজ্ঞানিক পত্রিকা, রাজনৈতিক বিতর্ক, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, এসবের সঙ্গে ছাপার অক্ষরের সম্পর্ক গভীর।
কিন্তু এখানেই একটা মজার প্রশ্ন আসে।
বর্বরতা ঠেকাতে ঠিক কতখানি পড়া প্রয়োজন?
এবং কী পড়া?
কান্টের Critique of Pure Reason দিনে চল্লিশ পাতা পড়লে গণতন্ত্র বাঁচবে? আগাথা ক্রিস্টি কি অর্ধেক নম্বর পাবেন? রান্নার বই? ক্রিকেটের আত্মজীবনী? গোয়েন্দা গল্প? সংবাদপত্র? সাবটাইটেল? আইন? বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র?
আর অডিয়োবুক? ম্যারিয়ট অডিয়োবুকের প্রসঙ্গ প্রায় তোলেনই না, যদিও তাদের জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে তারা ই-বুককে ছাড়িয়ে গেছে। ইউটিউবের দীর্ঘ বক্তৃতা? পডকাস্ট? বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন লেকচার?
একজন মানুষ যদি হাঁটতে হাঁটতে আট ঘণ্টার দস্তয়েভস্কি শোনেন, তিনি পড়লেন না শুনলেন? তাঁর মস্তিষ্ক কি আলোকায়নের খাতায় উপস্থিত বলে গণ্য হবে, না অনুপস্থিত?
ম্যারিয়টের যুক্তির শক্ত জায়গাটি হচ্ছে দীর্ঘ এবং জটিল চিন্তার সঙ্গে পড়ার সম্পর্ক। কান্টের দর্শন তিনি উদাহরণ হিসেবে আনেন। দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণিত, আইন, জটিল রাজনৈতিক তত্ত্ব, এসব বোঝার সময় লিখিত ভাষার এক ধরনের সুবিধা আছে। বাক্যের কাছে ফিরে যাওয়া যায়। থামা যায়। পাশে দাগ দেওয়া যায়। আগের অনুচ্ছেদের সঙ্গে পরের অনুচ্ছেদ মিলিয়ে দেখা যায়। লেখকের যুক্তির হাড়গোড় আলাদা করে পরীক্ষা করা যায়।
এই ক্ষমতা খুব মূল্যবান।
কিন্তু সেখান থেকে “গভীর চিন্তার জন্য বই ছাড়া উপায় নেই” বললে ইতিহাস একটু কাশে।
অ্যারিস্টটলের ছাত্ররা আধুনিক অর্থে বইয়ের দোকান থেকে Metaphysics, Revised Edition কিনে ক্লাসে ঢুকত না। ত্রয়োদশ শতকের প্যারিসে টমাস অ্যাকুইনাসের ছাত্রদের কাছেও আজকের ছাত্রদের মতো বইয়ের সহজলভ্যতা ছিল না। মানুষের বিমূর্ত চিন্তার ইতিহাস ছাপাখানার চেয়ে বহু পুরনো।
সক্রেটিস তো নিজে কোনও বই লিখেই যাননি।
আজ যদি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির আবেদন করতেন, প্রকাশনার তালিকা দেখে মানবসম্পদ বিভাগ সম্ভবত প্রথম রাউন্ডেই বাদ দিত।
ম্যারিয়ট বর্তমান সময়কে “Disenlightenment”, এক ধরনের বিপরীত-আলোকায়নের যুগ হিসেবে দেখতে চান। কথাটা পুরোপুরি বাতুল নয়। অদ্ভুত বিশ্বাস, বিজ্ঞানের প্রতি অবিশ্বাস, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, অর্ধসত্য, মিথ্যা, আজ আগের তুলনায় দ্রুত ছড়াতে পারে।
তিনি টাকার কার্লসনের একটি সাক্ষাৎকারের উদাহরণ দেন, যেখানে কার্লসন দাবি করেছিলেন, তাঁর শোবার ঘরে এক দৈত্য তাঁকে আক্রমণ করেছিল।
শুনে আধুনিক সভ্যতার জন্য মায়া হয়।
আবার যাঁদের বয়স যথেষ্ট, তাঁরা সুপারমার্কেটের পুরনো ট্যাবলয়েডের কথা মনে করতে পারেন। সেখানে এলভিসকে চাঁদে দেখা যেত, এলিয়েন কোনও মহিলাকে বিয়ে করত, তিন মাথাওলা শিশু জন্মাত, আর পৃথিবীর শেষ দিন প্রায় মাসে দুবার নির্ধারিত হত।
মানুষের আজগুবি বিশ্বাসের জন্ম স্মার্টফোনের সঙ্গে হয়নি। সম্ভবত আজ তাদের মাইক্রোফোন বড় হয়েছে।
এখানেও একটা পরিমাপের সমস্যা আছে। কোনও পাগলাটে ধারণা খুব জোরে শোনা যাচ্ছে মানেই কি অনেক মানুষ তা বিশ্বাস করছে? পাঁচজন লোক পাড়ার মোড়ে চেঁচালে দূর থেকে মনে হতে পারে মিছিল হচ্ছে।
আর মতামত জরিপে কেউ যদি বলে সে ভূতে বিশ্বাস করে, এলিয়েন সরকার চালাচ্ছে বলে মনে করে, বা পৃথিবী চ্যাপ্টা, সে সত্যিই বিশ্বাস করছে, মজা করছে, প্রশ্নকর্তাকে বিরক্ত করছে, না নিজের রাজনৈতিক গোত্রের কোনও সংকেত দিচ্ছে, সেটাও সবসময় বোঝা যায় না।
তবু বিপদটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মিথ্যা এখন দ্রুত ছড়াতে পারে। বিপজ্জনক মিথ্যাও। বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান এবং প্রমাণভিত্তিক নীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ বাস্তব। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কিছু অংশের সঙ্গে বিজ্ঞানের বিরোধ এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যাকে ম্যারিয়ট যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ বলে মনে করেন।
এই অবস্থা কি স্থায়ী? আজকের রাজনৈতিক উন্মাদনা কি আগামী একশো বছরের মানবসভ্যতার স্থায়ী চরিত্র? পৃথিবীর সব দেশ কি একই পথে যাবে? এবং মুক্তির একমাত্র উপায় কি সবাইকে ফোন ফেলে দিয়ে ডিকেন্স ধরানো? ইতিহাস সাধারণত এত বাধ্য ছাত্র নয়। সে একই অধ্যায় অনন্তকাল পড়ে না।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার, ম্যারিয়ট নিজে স্মার্টফোন ত্যাগ করেছেন। বইয়ের শেষ দিকে এসে তিনিও কিছু আশার লক্ষণ দেখতে পান। নানা সরকার স্কুলে এবং শিশু-কিশোরদের জীবনে অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারের ক্ষতি নিয়ে চিন্তা করছে। আরও আশ্চর্য তথ্য, স্মার্টফোন নিয়ে বড় হওয়া প্রথম আমেরিকান প্রজন্মের প্রায় অর্ধেকই জরিপে জানিয়েছে, TikTok, Snapchat এবং Twitter/X আবিষ্কার না হলেই তারা খুশি হত।
আমার কাছে এই জায়গাটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ যে প্রযুক্তি বানায়, তার দাস হয়ে চিরকাল একইভাবে বসে থাকে, ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব বেশি নেই। প্রথমে আমরা নতুন খেলনাকে নিয়ে মাতি, পরে তার দাম বুঝি, তার পরে নিয়ম বানাই, ব্যবহার বদলাই, কিছুটা ফিরি, কিছুটা এগোই।
বইও সম্ভবত মরবে না। কারণ বইয়ের মৃত্যু ঘোষণা করার জন্য এখনও বই লিখতে হচ্ছে।
আর যে সভ্যতা নিজের পড়ার অভ্যাস নিয়ে এত উদ্বিগ্ন যে তার পতন নিয়ে তিনশো পাতার গ্রন্থ লেখে, প্রকাশক সেটি ছাপে, সমালোচক পড়ে, পাঠক কিনে, তারপর অন্য কেউ বসে তার যুক্তির ভুল ধরে, সে সভ্যতার অন্তত নাড়ি এখনও চলছে।
তবে ম্যারিয়টের ভয়টিকে বিদ্রুপ করে পুরোপুরি সরিয়ে রাখাও বোকামি। মনোযোগের ক্ষমতা ক্ষয় হতে পারে। দীর্ঘ লেখা পড়ার অভ্যাস হারাতে পারে। জটিল যুক্তি সহ্য করার ধৈর্য কমতে পারে। এমন সমাজ তৈরি হতে পারে যেখানে অল্প কিছু মানুষ দীর্ঘ বই, গবেষণা, আইন, ইতিহাস, দর্শন পড়বে এবং বাকিরা তাদের ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করবে। জ্ঞানের সেই অসমতা গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়।
কিন্তু বইকে ধর্মগ্রন্থ বানালেও লাভ নেই। মানুষ হাজার বছর ধরে গল্প শুনে, বক্তৃতা শুনে, বিতর্ক করে, মুখে মুখে জ্ঞান চালিয়ে, পাণ্ডুলিপি পড়ে, ছাপা বই পড়ে, রেডিও শুনে, সিনেমা দেখে, ইন্টারনেটে পড়ে চিন্তা করেছে। মাধ্যম পাল্টেছে। কিছু ক্ষমতা ক্ষয় হয়েছে, নতুন কিছু তৈরি হয়েছে।
আসল বিপদ সম্ভবত ফোনের স্ক্রিন নিজে নয়। বিপদ সেই সংস্কৃতি, যা মনোযোগকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে; জটিলতার বদলে চটজলদি নিশ্চয়তা চায়; কোনও বিষয়ে না জেনেও প্রবল মতামত রাখতে শেখায়; এবং পাঁচ মিনিটে বোঝা যায় না এমন চিন্তাকে সন্দেহজনক বলে ধরে নেয়।
বই এই রোগের একটি প্রতিষেধক হতে পারে। একমাত্র প্রতিষেধক হওয়ার দায়িত্ব তার ঘাড়ে চাপালে বইও ঘাবড়ে যাবে। আর যে তরুণরা ইতিমধ্যেই বলছে, এই যন্ত্রটা আমাদের বড্ড বেশি খেয়ে ফেলছে, তাদের কথাটাও শুনতে হবে।
আপাতত একটা বই খুলে বসা যেতে পারে। বিশেষ করে বইটা যদি বলে বই আর কেউ খুলে বসবে না।



