I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.
একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করুন।
মানবসভ্যতা এই মুহূর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বানাচ্ছে। মেশিনকে কবিতা লিখতে দিচ্ছে, প্রোটিনের গঠন বুঝতে বলছে, রোগ শনাক্ত করাচ্ছে, মহাকাশে দূরবীন পাঠাচ্ছে, গাড়িকে নিজে নিজে চালাতে শেখাচ্ছে। মোটামুটি ঈশ্বরের পুরনো চাকরির বিজ্ঞাপনগুলো একে একে নিজেদের নামে ট্রান্সফার করার বন্দোবস্ত চলছে।
আর একই সময়ে মানুষ বইয়ের তিন পাতা পড়ে হাঁফিয়ে উঠে ফোন দেখছে। এই দৃশ্যটার মধ্যে একটা উপযুক্ত ঠাট্টা রয়েছে।
আমরা এমন যন্ত্র বানিয়েছি, যা এক সেকেন্ডে কোটি কোটি তথ্য ঘেঁটে ফেলতে পারে। আর নিজেদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে ট্রেনিং দিচ্ছি যে আট মিনিটের প্রবন্ধের নিচে লেখা চাই, ‘TL;DR’।
একদিকে মেশিনকে বলছি, আরও গভীর হও। নিজেরা বলছি, ভাই, শর্টসে দাও।
ঠিক এখান থেকেই ব্রিটিশ সাংবাদিক ও কলামিস্ট জেমস ম্যারিয়ট তাঁর The New Dark Ages গ্রন্থে একটি বেশ ভাবিয়ে তোলার মতো প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। স্মার্টফোনের ক্রমাগত ব্যবহার, নিরবচ্ছিন্ন বিনোদন আর স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওর এ যুগে আমাদের কেবল মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে? নাকি এর ফলে মানবজাতির শতাব্দীকাল ধরে অর্জিত এক বিশেষ মানসিক দক্ষতা—’গভীরভাবে পাঠ করার ক্ষমতা’—ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে?
প্রশ্নটা ‘আজকালকার ছেলেপুলে বই পড়ে না’ গোছের বুড়োটে দীর্ঘশ্বাস ভেবে উড়িয়ে দিলে সুবিধে আছে। আপনি সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক হয়ে গেলেন। তার পর রিল খুলে দেখতে পারেন এক বেড়াল ফ্রিজের উপর থেকে পড়ে গিয়ে কী করল।
কিন্তু গোলমাল হল, পড়া মানুষের স্বাভাবিক ক্ষমতা নয়। কথা বলা স্বাভাবিক। পড়া শেখা সভ্যতার তৈরি কাণ্ড। আর সেই কাণ্ডটা মানুষের মাথার ভিতরে কী বদলেছিল, সেটা না বুঝলে ফোন আমাদের কাছ থেকে কী নিচ্ছে, সেটাও বোঝা মুশকিল।
মানবতার সুবিশাল ইতিহাস বিবেচনা করলে লেখার উদ্ভাবন ঘটে অতি সম্প্রতি, মাত্র গুটিকয়েক স্থানে—যেমন প্রাচীন প্রাচ্য, মিশর, চীন ও মধ্য আমেরিকায়। লেখার সূচনা কিন্তু সাহিত্য বা কবিতার জন্য হয়নি; এর প্রাথমিক ও মূল উদ্দেশ্য ছিল সুনির্দিষ্ট হিসাব রক্ষা করা। উদাহরণস্বরূপ:
কারও থেকে ছাগল ধার নেওয়ার হিসাব।
কার কাছে কত শস্য পাওনা রয়েছে তা নির্ধারণ।
রাজার প্রাপ্য কর ও রাজস্বের পরিমাণ।
জমিজমার সুনির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিতকরণ।
মৌখিকভাবে কোনো চুক্তির কথা বললে তা নিয়ে মতবিরোধের সুযোগ থাকে (যেমন হরু তিনটি ছাগল নিয়ে দুটি দাবি করলে বিপদ)। কিন্তু মাটির ফলকে তা খোদাই করা থাকলে আর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ থাকে না।
লেখার আসল বিপ্লব এখানেই—এটি মানুষের মস্তিষ্কের বাইরে এক চিরস্থায়ী বহিরাগত স্মৃতি গঠন করে। মানুষের স্মৃতিশক্তি ক্ষয়িষ্ণু হলেও লিখিত লিপি অবিনশ্বর, যতক্ষণ না তা বলপূর্বক ধ্বংস করা হচ্ছে। এই সুবিধার ওপর ভিত্তি করেই সমাজের কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে, জটিল হয়েছে বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কাঠামো, চালু হয়েছে করব্যবস্থা এবং সংরক্ষিত হয়েছে আইন। যুগ যুগ ধরে তথ্য স্থানান্তরের এই ব্যবস্থার ফলেই শহর, রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের বিকাশ সম্ভব হয়েছে।
তাই বলে ‘শিক্ষিত সভ্যতা’ শুনে কলেজ স্ট্রিট কল্পনা করবেন না।
প্রাচীন শহরে হয়তো কয়েকজন মাত্র লিখতে-পড়তে জানতেন। বাকিরা তাঁদের উপরে ভরসা করতেন।
তার পর এল ছাপাখানা, এবং মানুষ হঠাৎ বইয়ের মধ্যে ঢুকে গেল।
ঈশ্বরকে উপলব্ধির জন্য পুরোহিতের দ্বারে দ্বারে ঘোরার প্রয়োজন নিয়ে প্রশ্ন উঠল—সোজা বই খুলে পড়াটাই গুরুত্ব পেল। ফলে মোক্ষ বা স্বর্গের পথের শর্ত হিসেবেও যুক্ত হয়ে গেল এই পড়ার অভ্যাস।
আঠারো শতকের মধ্যভাগে ইউরোপ সাক্ষী হলো এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের, ইতিহাসবিদদের ভাষায় যা ‘রিডিং রেভোলিউশন’ বা পঠন বিপ্লব। চারপাশের দৃশ্যপট রাতারাতি বদলে গেল—গৃহপরিচারিকা থেকে দোকানদার, কিংবা পথচলতি মানুষ, সবাই বুঁদ হয়ে রইল বইয়ে। রান্নাঘরে পত্রিকা পড়ার মগ্নতায় সকালে নাশতা পরিবেশনেও বিলম্ব হতে শুরু করল।
আজকের দিনে রাস্তা পার হওয়ার সময় মুঠোফোনে মগ্ন কাউকে দেখলে যেমন দুর্ঘটনার আশঙ্কায় আক্ষেপ করা হয়, সেদিনও পথ চলতে চলতে উপন্যাস পড়তে দেখে সামাজিক অবক্ষয় ও সভ্যতার অন্তিম লগ্ন ঘোষণা করা হয়েছিল। যুগের সঙ্গে প্রযুক্তি পাল্টালেও বয়োজ্যেষ্ঠদের উদ্বেগ প্রকাশের ধরনটি কিন্তু অবিকল রয়ে গেছে। তবে এই আশঙ্কার অন্তরালে সত্য এটাই যে, পঠনচর্চা তখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিকড় গেড়েছিল।
উনিশ শতকের শেষের দিকে এই চিত্রপট লাভ করল এক নতুন মাত্রা। মূলত ব্রিটেনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসার, সুলভ মুদ্রণ প্রযুক্তি, সংবাদপত্র ও লোকশিক্ষার জোয়ারে ‘গণসাক্ষরতা’ এক বাস্তব রূপ নিল। শ্রমজীবী মানুষের কাছে বই তখন আর কেবল বিনোদনের মাধ্যম রইল না, বরং তা পরিণত হলো নিজেদের অধিকার ও ক্ষমতা অর্জনের এক শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্রে ।
কারণ কয়েক হাজার বছর ধরে জ্ঞান ছিল ক্ষমতাবানদের সম্পত্তি।
আইন নিজে পড়তে না জানলে, শাসক কোন আইনের মাধ্যমে আপনাকে শাসন করছে তা কখনই বোঝা সম্ভব নয়। ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ থাকলে, শাসকের শিখিয়ে দেওয়া সুবিধাজনক গল্পকেই একমাত্র সত্য বলে ধরে নিতে হবে। আবার নিজের যুক্তি সাজিয়ে লিখতে না জানলে, সংসদের শিক্ষিত ও অভিজাত ব্যক্তিটি কয়েকটি ভারী ল্যাটিন শব্দ ছুড়ে আপনাকে খুব সহজেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দেবে।
ঠিক এই কারণেই উনিশ শতকের বহু কারখানা শ্রমিক, রাজনৈতিক ভাবনায় র্যাডিক্যাল ও স্বশিক্ষিত সাধারণ মানুষ কাজ শেষে গভীর রাত পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছেন। কারখানা থেকে ফিরে, হাত-মুখ ধুয়ে তাঁরা সরাসরি অর্থনীতি, দর্শন কিংবা ইতিহাসের মতো গূঢ় বিষয়ে পড়াশোনা করতেন। যেখানে আজ আমরা সারাদিনের কাজের পর ক্লান্ত হয়ে সোফায় এলিয়ে পড়ি আর মাথা কাজ করছে না অজুহাতে ইউটিউব দেখে সময় কাটাই, সেখানে তাঁরা বারো ঘণ্টার কঠোর পরিশ্রম শেষে জন স্টুয়ার্ট মিলের কঠিন গ্রন্থ খুলে বসতেন। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের চরিত্রের অভ্যন্তরীণ মানসিকতারও যে কীভাবে পরিবর্তন ঘটেছে, এটি তারই এক প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
এই আত্মশিক্ষার পেছনে কাজ করত সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসম্মান অর্জনের তীব্র তাগিদ। সমাজের উচ্চবিত্তের মুখোমুখি বসে সমকক্ষ হয়ে যুক্তি দিতে হলে, প্রথমে তাদের একচেটিয়া জ্ঞানের প্রাধান্যকে চুরমার করতে হতো—আর সেই অসাধ্য সাধন করেছিল বই।
মানুষ যে আবহমানকাল ধরে বই পড়ে আসছে, তা একেবারেই একটি ভুল ধারণা। কারণ, গণসাক্ষরতার ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। জেমস ম্যারিয়টের মতে, বিশ শতকের সূচনা পর্বটিই ছিল সম্ভবত বইপড়ার এক অনন্য স্বর্ণযুগ। সে সময় বৃহৎ জনগোষ্ঠী পড়তে শিখেছিল, ছাপানো বই ও সংবাদপত্র নাগালের মধ্যে ছিল, আর বিনোদনের বিকল্প মাধ্যমও ছিল অতি সীমিত।
কিন্তু দ্রুতই দৃশ্যপট বদলে যেতে শুরু করল। প্রথমে রেডিও এবং পরবর্তীতে ঘরে ঘরে টেলিভিশন প্রবেশ করল। বিশেষ করে টেলিভিশনের আগমনে মানুষের অবসর যাপনের ধারা এক নিমেষে পাল্টে গেল। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট পাটনাম তাঁর Bowling Alone গ্রন্থে তুলে ধরেছেন কীভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকানদের অবসর সময় বাড়লেও, তার এক সিংহভাগই টেলিভিশনের পর্দায় হারিয়ে গেল।
বিষয়টি গভীরভাবে তলিয়ে দেখার মতো—সভ্যতার ক্রমবিকাশের মাধ্যমে মানুষ তার দৈনিক শ্রম থেকে যে অতিরিক্ত চার ঘণ্টা সময় বাঁচাতে পারল, তা সানন্দে তুলে দিল টিভির হাতে। প্রমিথিউস মানবজাতিকে আগুন এনে দিয়েছিলেন, আর আমরা সেই আগুনে ম্যাগি চাপিয়ে সামনে টিভি খুলে বসলাম।
টিভির পর ফোন: শিকার নিজেই ফাঁদ পকেটে নিয়ে ঘুরছে। টেলিভিশন অন্তত বসার ঘরে থাকত।
এখানে স্মার্টফোনের ব্যবসায়িক মডেলের ভূমিকাও অত্যন্ত সংবেদনশীল।
অধিকাংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মূল উপার্জন আসে ব্যবহারকারীর মনোযোগের ওপর ভর করে। আপনি যতটা বেশি সময় কাটাবেন, তত বেশি কনটেন্ট ও বিজ্ঞাপন দেখবেন, এবং আপনার ব্যবহারপ্রবণতা সম্পর্কিত প্রচুর ডেটা তৈরি হবে।
তাই অ্যাপগুলোর ডিজাইনের মূল লক্ষ্যই হয়ে ওঠে আপনাকে স্ক্রিনে আটকে রাখা।
অতীতে হয়তো আপনার মা ডেকে বলতেন, ‘আর কতক্ষণ ফোন ঘাঁটবি?’ কিন্তু অ্যাপ অবিরত বলতে থাকে, ‘আর একটা মাত্র ভিডিও!’
ভিডিও শেষ হতেই আবার নতুন প্রলোভন—
কোথাও একটি কুকুর স্কেটবোর্ড চালাচ্ছে।
কোথাও কেউ বলছে সকালে খালি পেটে লবঙ্গ খেলে লিভারের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।
আবার কোথাও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে রোমান সাম্রাজ্য পতনের আসল কারণ।
আপনি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে ভাবলেন নতুন কিছু শিখছেন। কিন্তু ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আড়াইটে—রোমান সাম্রাজ্য তো ধ্বংস হয়েছেই, সেই সাথে আপনার আগামীকালের দিনটাও ধ্বংসের মুখে!
একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে অবসরে বই পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ম্যারিয়টের উল্লেখ করা পরিসংখ্যানে এই পতনের পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ। তবে উদ্বেগটি কেবল বই পড়ার সময় কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
পড়ার দক্ষতারও বিভিন্ন স্তর রয়েছে—সাক্ষরতা কোনো স্রেফ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বিষয় নয়, এটি একটি ধারাবাহিক স্কেল। দোকানের সাইনবোর্ড কিংবা সংক্ষিপ্ত খবরের কাগজের টুকরো বুঝতে পারা আর জটিল আয়কর আইন কিংবা দর্শনের দীর্ঘ যুক্তি অনুসরণ করতে পারা এক কথা নয়। একাধিক জটিল ধারণা মাথায় ধারণ করা, লেখার অন্তর্নিহিত যুক্তি বোঝা এবং লেখকের বক্তব্যের দুর্বলতা চিহ্নিত করার মতো উচ্চতর সাক্ষরতার দক্ষতা বহু উন্নত দেশেই স্থবির বা নিম্নমুখী হচ্ছে, যা OECD-র সাম্প্রতিক মূল্যায়নগুলোতে ফুটে উঠেছে।
বাস্তবতা হলো, আমাদের অর্থনীতি, কম্পিউটার ও স্মার্টফোন ক্রমশ সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে; অথচ মানুষের জটিল লেখা পঠন-পাঠন ও অনুধাবনের ক্ষমতা ক্ষেত্রবিশেষে পিছিয়ে পড়ছে। সভ্যতা যেন লিফটে করে ওপরে উঠছে, আর মানুষ নেমে যাচ্ছে সিঁড়ি দিয়ে।
যুক্তি নিখুঁত করা, একটা বাক্যকে বারবার লেখা, পছন্দ না হলে মুছে ফেলা বা ছিঁড়ে ফেলে পুনরায় লেখা—এই সমস্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই লেখকের দীর্ঘ এক বছরের চিন্তা শেষ পর্যন্ত মাত্র দুশো পৃষ্ঠায় রূপ নেয়। এরপর একজন পাঠক সেই দুশো পৃষ্ঠা সাথে নিয়ে লেখকের পুরো বছরের ভাবনার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পান।
এই কারণেই পড়া কোনো নিষ্ক্রিয় প্রক্রিয়া হতে পারে না। কেবল চোখে অক্ষর দেখে মাথায় তথ্য প্রবেশ করানোর বিষয় এটি নয়। একজন সচেতন পাঠক প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তোলেন: যুক্তিটি কতটা গ্রহণযোগ্য? আগের বিষয়ের সাথে এর সঙ্গতি আছে কি? লেখক কি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিচ্ছেন নাকি নিজের মতামত প্রকাশ করছেন? কেন বিশেষ এই শব্দটির প্রয়োগ করা হলো, কিংবা এর বিপরীত উদাহরণটি কী হতে পারত?
বই পড়ার এ অভিজ্ঞতা মূলত লেখকের সাথে পাঠকের এক ধরনের নীরব দ্বন্দ্ব বা কুস্তির মতো। যেখানে কোনো বিচারক বা রেফারি থাকেন না, তবে নিজের সুবিধামতো ধীরগতিতে চিন্তা করা এবং প্রয়োজনে পৃষ্ঠা উল্টে আবার দেখে নেওয়ার সুযোগ পুরো প্রক্রিয়াতেই বজায় থাকে।
প্রত্যক্ষ বক্তব্যে একজন বক্তা নানা কৌশল ও সুবিধা কাজে লাগাতে পারেন। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, সুরেল কণ্ঠ, আবেগপূর্ণ প্রকাশ কিংবা ভয় ও হাসির আবহ তৈরি করে শ্রোতাকে প্রভাবিত করা সেখানে সহজ; সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড সঙ্গীত বা পতাকার মতো বাহ্যিক উপাদানও যুক্ত হতে পারে, যেখানে শব্দের চেয়ে পরিবেশটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
তবে লিখিত রূপের ক্ষেত্রে এই বাড়তি সুবিধাগুলোর সুযোগ থাকে না। কাগজে চোখ রাঙিয়ে বা আবেগের আকুতি জানিয়ে পাঠককে প্রভাবিত করার উপায় নেই; প্রতিটি বাক্যকে নিজের যুক্তির শক্তিতেই টিকে থাকতে হয়। ফলে লেখার ভেতরে নিহিত মূল বক্তব্যটি স্পষ্ট ও অনাবৃত হয়ে প্রকাশিত হয়, যা একে দান করে এক ধরনের বস্তুনিষ্ঠ ও কঠোর দৃঢ়তা।
ঠিক এই কারণেই সাক্ষরতার বিকাশ যুক্তিচর্চা, বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, আধুনিক বিজ্ঞান, আইন ব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো, ইতিহাস লিখন এবং রাজনৈতিক আলোচনার গভীর ভিত্তি হিসেবে গড়ে উঠেছে।
দোকানপাট থেকে শুরু করে রেস্তরাঁ এমনকি বইয়ের বিজ্ঞাপন—সবকিছুই এখন ভিডিওনির্ভর।
এই গণজোয়ারকে মার্কিন লেখক ডেরেক থম্পসন যথার্থই সংজ্ঞায়িত করেছেন: ‘Everything is television.’
বাস্তবতাই তা—আমাদের চারপাশে এখন যেন কেবলই টেলিভিশনের ছড়াছড়ি।
পকেটে, দেওয়ালে, গাড়িতে—সবখানেই পর্দা; এমনকি হাতের ঘড়িটিও এখন টেলিভিশন হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় রত।
এই মাধ্যমটি একাধারে দ্রুতগতির ও তীব্র আবেগপ্রবণ।
এখানে শব্দ, মুখের অবয়ব, সংগীত, দ্রুত কাট, রং, লেখা আর প্রতিক্রিয়া—সব একসঙ্গে মিলেমিশে একাকার।
মানুষের মস্তিষ্ক স্বভাবতই এই সংমিশ্রণ খুব পছন্দ করে।
কারণটা স্পষ্ট—আমাদের মস্তিষ্ক অ্যারিস্টটলের Metaphysics গাঢ় অনুধাবনের জন্য তৈরি হয়নি, হয়েছিল বাঘ দেখে আত্মরক্ষার্থে ভেগে যাওয়ার জন্য।
আকস্মিক শব্দ, ত্বরিত নড়াচড়া, মুখের ভঙ্গি, ভয়, যৌনতা, ক্ষোভ, কিংবা হাসির মতো বিষয়গুলো ক্ষণিকের মধ্যেই আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়।
স্মার্টফোন আসলে আমাদের সেই আদিম মস্তিষ্ককেই বার বার নাড়া দিচ্ছে।
সুতরাং, দুই হাজার বছরের বই পড়ার অভ্যাসের বিপরীতে যদি লড়াইটা হয় দুই লক্ষ বছরের বাঁদর-মস্তিষ্কের আদিম স্বভাবের, তবে আপনি কার পক্ষে বাজির দর হাঁকবেন?
ডিজিটাল মাধ্যমে পড়াশোনার সুযোগ এখন অশেষ—ফোনে The Times বা New Yorker চোখ বোলানো যায়, কিন্ডলে পড়া যায় দস্তয়েভস্কি, এমনকি PDF-এ কান্টও পড়ে ফেলা সম্ভব (যদিও কান্টের মতো জটিল দর্শনে ডিভাইসের বদলে পাঠকের নিজের মগজই রিবুট মারার দশা হয়)।
তবে গবেষণার তথ্য বলছে, স্ক্রিন আর কাগজের পাতার মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা এক নয়। স্ক্রিনে চোখ অনবরত ছোটে—কী-ওয়ার্ড খোঁজা, প্যারাগ্রাফ ডিঙানো, লিংকে ক্লিক করা আর ‘আমাকে একটু খুলবি না?’ বলে অনবরত তাগাদা দেওয়া নোটিফিকেশনের ভিড়ে পড়ার মনোযোগ টুকরো টুকরো হয়ে যায়। দ্রুত স্ক্যান করাই তখন স্ক্রিনের অভ্যাসে দাঁড়ায়। উল্টোদিকে, জটিল বা দীর্ঘ রচনার ক্ষেত্রে ছাপা কাগজে পড়ার গতি ধীর হলেও তা স্থানিক স্মৃতি ও বিষয়বস্তু গভীরভাবে অনুধাবনে সাহায্য করে।
সেই তুলনায় একটা ছাপা বই বেশ আত্মকেন্দ্রিক ও নির্মম; তার একটাই ইন্টারফেস—বই। আপনি হয়তো Middlemarch পড়া শুরু করলেন, পাঁচ মিনিট পর হঠাৎ করে লেখক জর্জ এলিয়ট এসে আপনাকে বলবেন না, ‘অধ্যায়ের মাঝে একটু মজার বিড়ালের ভিডিও দেখে নাও!’
কাগজ যদি নিজে গিয়ে মামলা করতে পারত, তবে নির্ঘাৎ জিতে যেত—কারণ বইয়ের পাতায় ইতিহাসজুড়ে কম বাজে জিনিস লেখা হয়নি! ফলে, লেখা মাত্রই সত্য আর ভিডিও মানেই মিথ্যে, এমন নির্বোধ দাবি কেউ করছে না।
মূল বিষয় হলো মাধ্যমের নিজস্ব প্রকৃতি। ভিডিওর দুনিয়ায় সাকুল্যে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে দর্শককে আটকে রাখতে হয়, যার ফলে বক্তব্যের ধাঁচটাই বদলে যায়। তখন প্রাধান্য পায়—
উত্তেজনা ও ক্ষোভ, চমক ও আতঙ্ক;
অপমান, রসবোধ কিংবা নিখাদ বিস্ময়;
এমন সব চটকদার সুর: “আপনি যা ভাবছেন তা মোটেও সত্যি নয়…”, “আপনার কাছ থেকে যে রহস্য গোপন রাখা হয়েছিল…”, কিংবা “সরিয়ে ফেলার আগেই ঝটপট দেখে নিন…”।
এমন এক প্ররোচনামূলক পরিবেশে হেগেলের Phenomenology of Spirit-এর গভীরতা ফিট করা প্রায় অসম্ভব। যদি কৌতূহল জাগাতে ক্যাপশন লেখাও হয়—
“রাষ্ট্রের ধারণার দ্বান্দ্বিক বিকাশ সম্পর্কে জানতে ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত দেখুন”—
তবু দিনশেষে ভিউ মিলবে বড়জোর তিনটি:
দুজন হয়তো নিছক ভুল করে ক্লিক করেছেন;
আর তৃতীয়জন খোদ হেগেল নিজে—যিনি নিজেও কিছুক্ষণ দেখে লিভ নিয়েছেন!
আবেগের রাজনীতির শিকড় বেশ গভীরে। ম্যারিয়টের মূল বক্তব্যটি আরও ব্যাপক।
মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম যখন দীর্ঘ লিখিত যুক্তির পরিমণ্ডল ছেড়ে মুখভঙ্গি, উচ্চারণ, আবেগ, নাটকীয়তা ও ব্যক্তিত্ব নির্ভরতার দিকে ধাবিত হয়, তখন রাজনীতিতেও ব্যক্তির ভূমিকা মুখ্য হয়ে ওঠে।
এখানে বক্তব্যের সত্যতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় বক্তার পরিচয় ও প্রকাশভঙ্গি—
মানুষটির চেহারা বা উপস্থিতি কেমন,
তিনি কতটা আত্মবিশ্বাস ফোটাতে পারছেন,
তাঁর ক্ষোভের তীব্রতা কতখানি,
তিনি কতটা হাসাতে পারছেন,
অন্যকে কতটা কটু কথা বলতে পারছেন,
কিংবা তাঁর ভিডিও কতটা ছড়িয়ে পড়ছে।
এমন পরিবেশে জনমানসের আবেগ সংহত করা বেশ সহজ হয়ে ওঠে।
বর্তমান সময়ের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর রাজনৈতিক ভাষার মূল জোর দীর্ঘ নীতি নির্ধারণে নয়, বরং সংক্ষিপ্ত বাক্য, আকর্ষণীয় ডাকনাম, নাটকীয় পুনরাবৃত্তি, সরাসরি সদ্ব্যবহার ও টিভি-উপযোগী মুহূর্ত তৈরির মধ্যে।
তবে এই ধারার একচ্ছত্র একক কোনো রাজনৈতিক সত্ত্বা নেই।
বামপন্থী ধারাও সমানভাবে ছোট ভিডিও, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, আবেগঘন দৃশ্যপট, ভাইরাল বার্তা ও ক্ষিপ্র যোগাযোগের ওপর ভরসা রাখছে।
এই মাধ্যম সবার জন্যই উন্মুক্ত,
এবং এর প্রাপ্তিও সবপক্ষের জন্য এক।
যে দ্রুত নজর কাড়তে সক্ষম হবে, সে-ই এগিয়ে যাবে।
এর সঙ্গে ভূত-প্রেতের কী সম্পর্ক?
এই প্রসঙ্গেই ম্যারিয়ট এক আকর্ষণীয় পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বজনীন চর্চায় Antichrist, demon কিংবা supernatural attack-এর মতো শব্দগুলোর পুনরাবির্ভাব বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
যেমন, টাকার কার্লসন প্রকাশ্যেই দাবি করেছেন যে তিনি অলৌকিক সত্তার আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
একইভাবে, প্রযুক্তি ও রাজনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব পিটার থিয়েলকেও Antichrist নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখতে দেখা গেছে।
ম্যারিয়টের ধারণা, অতিপ্রাকৃত বা রহস্যবাদী ব্যাখ্যার এই নতুন উত্থান বর্তমান যোগাযোগব্যবস্থার প্রকৃতির সঙ্গেই গভীরভাবে যুক্ত—যেখানে বিচার-বিশ্লেষণের চেয়ে অনুভূতি ও নাটকীয় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বেশি প্রাধান্য পায়।
তবে বিষয়টি মূল্যায়নে কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন।
বই পড়ার সংস্কৃতি যখন তুঙ্গে ছিল, তখনও মানুষের মধ্যে অলৌকিক বিশ্বাস ছিল।
এমনকি আইজ্যাক নিউটনের মতো বিজ্ঞানী গণিতচর্চার পাশাপাশি আলকেমি নিয়েও গবেষণা করেছেন।
অর্থাৎ, প্রখ্যাত চিন্তাবিদদের মনেও যুক্তি ও অবান্তর বিশ্বাসের সহাবস্থান ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তা সত্ত্বেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়।
যে সংস্কৃতিতে বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যার চেয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতি বেশি গুরুত্ব পায়, সেখানে ‘আমি অনুভব করেছি’—এই দাবির রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কি অনেক বেড়ে যায়?
এমনটি হওয়া মোটেও অসম্ভব নয়।
ম্যারিয়টের বেড়ে ওঠা এমন এক পরিবারে, যেখানে বইকে প্রায় দেবতার আসনে বসানো হতো।
ইংরেজি শিক্ষক বাবার সুবাদে ছুটির দিনে তাঁদের সফর থাকত ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘ডোভ কটেজ’-এ, আর স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভনে গিয়ে শেক্সপিয়রকে অর্ঘ্য দেওয়া ছিল প্রায় এক ধর্মীয় আচার।
এমনকি প্রতি বছর শেক্সপিয়রের জন্মদিনে তাঁর বাবা কেক কাটতেন—যা দেখে খোদ শেক্সপিয়রও হয়তো সসংকোচে বলতেন, ‘এত আয়োজনের দরকার নেই, কটি সনেট পড়লেই চলবে!’
ম্যারিয়ট নিজেও মানেন, তাঁর শৈশব আর দশটা সাধারণ শিশুর মতো ছিল না।
তিনি সাহিত্যকে সম্মান করেন, কারণ ছোটবেলা থেকেই তাঁকে এটি শেখানো হয়েছে।
এই সত্যিটা স্বীকার করা জরুরি, কারণ বইপ্রেমীদের এক অদ্ভুত অহংবোধ থাকে—তারা মনে করে যারা বই পড়ে না, তারা বুঝি কোনো বড় নৈতিক অপরাধ করছে।
কিন্তু সবার রুচি তো এক হবে না!
কেউ হয়তো গেম খেলবে, কেউ মাঠে ফুটবল ম্যাচ দেখবে, কেউ রান্না করবে, আবার কেউবা একটানা তিন ঘণ্টা ট্রেনের ভিডিও দেখেই আনন্দ পাবে।
মানুষের বৈচিত্র্য এখানেই; সবাইকে হাত ধরে জোর করে ‘আন্না কারেনিনা’ পড়িয়ে সভ্য করার কোনো প্রয়োজন নেই।
সবকাজ কেবল আনন্দের জন্য করা হয় না; কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বলেই আমরা চর্চা করি। ব্যায়াম বা অঙ্ক শেখা যেমন সবসময় উপভোগ্য মনে নাও হতে পারে, কিংবা কোনো বাদ্যযন্ত্র শেখার প্রথম ছয় মাস প্রতিবেশীর জন্য বিরক্তির কারণ হতে পারে—তবুও মানুষ এসবের সাধনা করে, কারণ কঠোর অনুশীলনের পরেই অর্জন করা সম্ভব হয় এমন কিছু বিশেষ দক্ষতা, যা অন্য কোনোভাবে পাওয়া যায় না।
মনোযোগ দিয়ে দীর্ঘ বই পড়া বা গভীর পাঠচর্চাও ঠিক তেমনই একটি অভ্যাস। বইয়ের পাতায় সংরক্ষিত থাকে মানবসভ্যতার অমূল্য সব জ্ঞান—ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, দীর্ঘ যুক্তি, জটিল অভিজ্ঞতা, কোনো মানুষের দীর্ঘ চল্লিশ বছরের চিন্তাভাবনা এবং গোটা একটি সভ্যতার সঞ্চিত স্মৃতি!
আজকাল হয়তো এসব গভীর বিষয় মাত্র তিন মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে সংক্ষেপে জেনে নেওয়া সম্ভব। যেমন ধরুন, কালজয়ী উপন্যাস Crime and Punishment-এর মূল গল্প পাঁচ মিনিটেই শুনে বলে দেওয়া যায়, ‘এক ছাত্র এক বৃদ্ধাকে হত্যা করে এবং পরবর্তীতে অপরাধবোধে ভোগে’—ব্যস, মূল ঘটনা এটুকুই! তবে এমন সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ আর মূল সৃষ্টির প্রকৃত উপলব্ধি কখনোই এক জিনিস হতে পারে না!
তবে কি ফোন ছুড়ে ফেলে দিতে হবে? ম্যারিয়ট নিজে স্মার্টফোন ব্যবহার বন্ধ করেছেন।
কিন্তু তাঁর বইয়ের শেষদিকে তিনি কোনও সাত-ধাপের মুক্তির ফর্মুলা দিতে চাননি।
কারণ প্রযুক্তিগত বিপ্লব খুব কমই পিছিয়ে যায়।
ছাপাখানা এসে যাওয়ার পর কেউ যদি বলত, এই যন্ত্র সমাজ বদলে দিচ্ছে, চলুন আবার হাতে বই কপি করি, তাকে লোকে সসম্মানে পাগল বলত।
স্মার্টফোনও চলে যাবে বলে মনে হয় না।
ছোট ভিডিওও সম্ভবত থাকবে।
মানুষ যা একবার আবিষ্কার করেছে এবং যা বিপুল অর্থ উপার্জন করে, সেটাকে ‘খারাপ লাগছে’ বলে উঠিয়ে দেওয়া মানবসভ্যতার পরিচিত অভ্যাস নয়।
তাহলে বাকি থাকে ইচ্ছাকৃত প্রতিরোধ।
কিছু সময় ফোন ছাড়া।
কিছু সময় দীর্ঘ লেখা।
নোটিফিকেশন বন্ধ।
বই সামনে।
মন পালাবে।
ধরতে হবে।
আবার পড়তে হবে।
আজকাল গভীর পড়া সম্ভবত স্বাভাবিক অবসর নয়।
অনুশীলন।
এবং এখানেই একটা ভয়ংকর শ্রেণিগত ব্যাপার ঢুকে পড়ে।
মানুষের লেখাপড়ার চর্চা যে আগামী মঙ্গলবারই হুট করে বন্ধ হয়ে যাবে, বিষয়টি তা নয়। আজও লাইব্রেরিগুলো টিকে আছে, নতুন নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে, এবং মানুষ তা পড়ছেও। এমনকি বেশ কিছু দারুণ দীর্ঘ লেখাও নিয়মিত রচিত হচ্ছে।
জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে ইন্টারনেট নিজেই এক অভূতপূর্ব ও বিস্ময়কর সংযোজন। মাত্র পঞ্চাশ বছর আগে যা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকের নাগালের বাইরে ছিল, আজ ঘরে বসেই আপনি সেই সব দুর্লভ বই, প্রবন্ধ, ডিজিটাল আর্কাইভ, বক্তৃতা ও পাণ্ডুলিপি অনায়াসে পেতে পারেন। একটিমাত্র যন্ত্রেই একই সাথে প্লেটো, বোরহেস, শেক্সপিয়র এবং গুগল স্কলারের অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে।
তবে একই যন্ত্রে আরেকজন লোক হয়তো বলে উঠছেন, “পাঁচ সেকেন্ডে শসা কাটার কৌশল দেখুন”। মূল সমস্যা ফোন সেটটিতে নয়, ফোনটি একেবারেই নিরীহ; আসল লড়াইটা চলছে আমাদের মনোযোগ কে কতটুকু কেড়ে নিতে পারে তা নিয়ে। প্লেটো পড়তে হলে আপনাকে নিজ উদ্যোগে বইটি খুলতে হবে, কিন্তু শসা কাটার ভিডিওটি নিজে থেকেই ভেসে উঠে আপনাকে আকৃষ্ট করবে। আর এখানেই সব সুবিধা শসার দিকে হেলে পড়ে।
দীর্ঘপাঠের প্রকৃত গুরুত্ব লুকিয়ে রয়েছে জ্ঞান ও মনোযোগের সেই বিশেষ পদ্ধতির ভেতর, যা এটি আমাদের মানসে গড়ে তোলে।
অন্যদিকে, ডিজিটাল মাধ্যমকে সরাসরি কোনো মহা অপরাধ বলা চলে না। বরং এর অর্থনৈতিক কাঠামো, ব্যবহারের ধরন এবং এটি যেভাবে আমাদের মনযোগ দাবি করে, তা সঠিকভাবে বুঝতে হবে।
আসল সংকটটি কেবল হাতে ফোন থাকা নিয়ে নয়; আসল সংকট হলো আমাদের বর্তমান জীবনযাত্রায়, যেখানে নীরবতা বা অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্তই কোনো না কোনো স্ক্রিন সাথে সাথে দখল করে নেয়।
দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট নিস্তব্ধ মুহূর্তগুলো—যেমন বাসের জন্য বা ডেন্টিস্টের চেম্বারে অপেক্ষা করা, কারো দেরিতে পৌঁছানো, ঘুম না আসা, রেস্তোরাঁয় খাবারের অপেক্ষা, কিংবা বন্ধুর শৌচাগার থেকে ফেরার অপেক্ষার সময়।
একসময় এই বিরতিগুলোতে মানুষ সাধারণ দৃশ্য দেখত, জানালার বাইরে তাকাত, পারিপার্শ্বিক মানুষ পর্যবেক্ষণ করত, কিংবা কেবল চিন্তা ও কিছুটা বিরক্ত বোধ করত। আর সেই একঘেয়েমি থেকেই হয়তো মাথায় নতুন কোনো ধারণার জন্ম হতো।
কিন্তু বর্তমানে সামান্য বিরক্তি কাটানোর হাতিয়ারটি সর্বদা আমাদের পকেটেই তৈরি থাকে। অথচ এই বিরক্তি বা একঘেয়েমির সঙ্গেই হয়তো মানুষের গভীর চিন্তাশক্তির এক সূক্ষ্ম, গোপন যোগাযোগ ছিল।
বাস্তবে কিন্তু আমাদের দৃষ্টিশক্তি লোপ পাচ্ছে না; সারাক্ষণই চোখ দুটি খোলা থাকছে স্ক্রিনের পানে।
আমরা হয়তো প্রচুর দেখছি—প্রতি নিয়ত ও প্রতি ঘণ্টায় অসংখ্য চেহারা, প্রতিচ্ছবি, সংবাদ, দৃষ্টিভঙ্গি, বিপর্যয়, কৌতুক, প্রলোভনময় বিজ্ঞাপন, কাম, সামাজিক ক্ষোভ, সংঘাত, রান্না, জীবনাবসান, বেড়াল কিংবা স্কিনকেয়ার সামগ্রীর মেলা। অথচ আমাদের পূর্বপুরুষেরা পুরো জীবনকালেও এর সিকিভাগ দেখতেন না।
তবে মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়—এই অপরিসীম দেখার ভিড়ে আমরা আসলে কতটুকু গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করছি?
এত পড়াশোনার মাঝে কতটুকু অনুধাবন করছি?
আর তথ্যের এই পাহাড়প্রমাণ জোয়ারে কতটা হৃদয় দিয়ে ভাবছি?
সুদীর্ঘ হাজার বছর ধরে মানবজাতি বর্ণ আবিষ্কার করল, গ্রন্থ রচনা করল, প্রেস প্রতিষ্ঠা করল, বিদ্যালয় ও পাঠাগার গড়ে তুলল। মেহনতি মানুষ প্রদীপ জ্বালিয়ে ইতিহাস অনুধাবন করল, নারীসমাজ শিক্ষালাভ করল, আর লাঞ্ছিত মানুষ বইকে হাতিয়ার বানিয়ে শক্তিশালীদের মুখোমুখি যুক্তি দাঁড় করাতে শিখল—সমাজ ঘোষণা দিল যে জ্ঞান সর্বজনীন।
অথচ সবশেষে আমরা কেবল পকেট থেকে মুঠোফোন বের করে স্ক্রল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম—একটার পর একটা... আবার আরেকটা... অনবরত ঠেলে যাচ্ছি।
হয়তোবা আগামী দিনের নতুন আঁধারময় যুগে চারপাশটা অমাবস্যার মতো অন্ধকার হবে না, বরং আমাদের স্ক্রিনের আলোটাই তীব্রভাবে জ্বলতে থাকবে।



