ওডেসি: ঘরে ফেরার রাস্তা সমুদ্রের চেয়েও দীর্ঘ
ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন ছবি দ্য ওডেসি দেখে আমার রিভিউ।
এক দিন আগের প্রিভিউ শোতে ক্রিস্টোফার নোলানের দ্য ওডেসি দেখে এলাম। এক বাক্যে অভিজ্ঞতাটি প্রকাশ করতে হলে বলতে হয়:
মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর মেটাফর।
আরও অন্তত চারটি মেটাফর বাদ পড়ে গেছে। সম্ভবত আইম্যাক্স পর্দার কোনও কোণে তারা এখনও ঢেউ খাচ্ছে। পরের শোর দর্শক ঢোকার সময় তাদের মাথায় টুপটাপ পড়বে।
হোমারের মহাকাব্যটি পড়ার পর কেউ যখন সিনেমা দেখতে যায়, তার একটি অসুবিধা হয়। সে ছবি দেখার পাশাপাশি গোপনে হাজিরা নেয়। সাইক্লোপস এসেছে? সির্সি আছে? ক্যালিপসোকে কত মিনিট দেওয়া হল? সাইরেনদের গান শোনা গেল? পেনেলোপির তাঁত কোথায়? টেলেমাকাস যথেষ্ট বিষণ্ন কি না? দেবী অ্যাথেনা মানুষ সেজে ঘুরছেন, নাকি হলিউড তাঁকে সরাসরি দেবীর পোশাক দিয়ে দিয়েছে?
মনে হয়, দর্শক সিনেমা দেখতে আসেনি, গ্রিক পুরাণের মাধ্যমিক পরীক্ষা নিতে এসেছে। একটু পরেই খাতা খুলে লিখবে, “পরিচালক মূল কাহিনির প্রতি মোটামুটি বিশ্বস্ত, তবে তৃতীয় প্রশ্নের ‘খ’ অংশে দুই নম্বর কাটা গেল।”
নোলান সেই পরীক্ষকের খাতা প্রথম দশ মিনিটের মধ্যেই সমুদ্রে ফেলে দিয়েছেন।
তিনি হোমারের কাহিনি নিয়েছেন, চরিত্র নিয়েছেন, যুদ্ধশেষে দীর্ঘ ঘরে ফেরার কাঠামো নিয়েছেন, তারপর পুরো ব্যাপারটিকে নিজের বহুদিনের প্রিয় কয়েকটি প্রশ্নের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। সময় মানুষের সঙ্গে কী করে, স্মৃতি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা সম্ভব কি না, একজন মানুষের পরিচয় তার নামের মধ্যে থাকে নাকি তার করা কাজের মধ্যে, এবং বহু বছর ধরে যে বাড়িতে ফেরার স্বপ্ন দেখা হয়েছে, সেখানে পৌঁছে গেলে সেই বাড়ি মানুষটিকে গ্রহণ করবে কি না।
এই প্রশ্নগুলোর কোনওটির উত্তর তিনি সংক্ষেপে দেননি। নোলান সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলে সম্ভবত তাঁর পরিচালনা-লাইসেন্স বাতিল হয়ে যায়।
মহাকাব্যের গল্প, মানুষের দুর্ভোগ
গল্পটি বহু পরিচিত। ট্রয়ের যুদ্ধ শেষ হয়েছে। ইথাকার রাজা ওডিসিউস বাড়ি ফিরবেন। দূরত্ব খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। বর্তমান যুগে হলে গুগল ম্যাপ বলত, যানজট স্বাভাবিক, আনুমানিক পৌঁছানোর সময় সন্ধ্যা সাতটা বেয়াল্লিশ। মাঝখানে হয়তো একটি ফেরি ধরতে হবে।
কিন্তু গ্রিক দেবতারা ট্রাফিক বিভাগ পরিচালনা করলে যে কোনও বারো ঘণ্টার যাত্রা দশ বছরে গিয়ে দাঁড়াতে পারে।
ওডিসিউসের জাহাজ পথে পড়ে সমুদ্রের ক্রোধে, দৈত্যের গুহায়, মাদকতাময় দ্বীপে, দেবতার অভিশাপে, নারীর প্রলোভনে, সহযাত্রীদের মূর্খতায় এবং নিজের অপরিসীম আত্মবিশ্বাসে। শেষেরটিই সম্ভবত সবচেয়ে ভয়ংকর। সাইক্লোপসের চোখ ফাঁকি দেওয়া যায়, নিজের অহংকারকে পাশ কাটানো কঠিন।
ইথাকায় বসে পেনেলোপি অপেক্ষা করছেন। তাঁর চারপাশে জড়ো হয়েছে একদল পাত্র, যারা ধরে নিয়েছে ওডিসিউস মারা গেছেন এবং একজন স্বামী যুদ্ধ থেকে না ফিরলে তাঁর বাড়ি, সিংহাসন, সম্পদ ও স্ত্রী সবই নিলামে উঠবে। গ্রিক সভ্যতার মধ্যেও সম্পত্তি-ব্যবসার এই আধুনিক বোধটি বেশ উন্নত ছিল।
ছেলে টেলেমাকাস বাবাকে প্রায় চেনেই না। তার জীবনে পিতা একজন মানুষের চেয়ে গল্প, গুজব, বীরত্বের পুরোনো পোস্টার এবং মায়ের দীর্ঘ নীরবতার মধ্যে বেশি উপস্থিত। যে পিতা বাড়িতে নেই, সে অনেক সময় উপস্থিত পিতার চেয়েও বিশাল হয়ে ওঠে। কারণ অনুপস্থিত মানুষ বাসন মাজে না, ভুল কথা বলে না, পরীক্ষার ফল দেখে মুখ গম্ভীর করে না। সে কেবল কিংবদন্তি হয়ে দেয়ালে ঝুলে থাকে।
নোলান এই দুই যাত্রাকে পাশাপাশি রেখেছেন। সমুদ্রে বাবার ফিরে আসা, স্থলে ছেলের বাবাকে খুঁজে পাওয়া। মাঝখানে অপেক্ষা করছেন পেনেলোপি, যিনি কাহিনির স্থির কেন্দ্র হলেও তাঁর চারপাশে সময়, রাজনীতি ও পুরুষদের লোভ সমুদ্রের মতোই তোলপাড় করছে।
ম্যাট ডেমনের ওডিসিউস
ম্যাট ডেমন ওডিসিউসের চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
তাঁর ওডিসিউস চকচকে পৌরাণিক বীর নন। মুখে যুদ্ধের ক্লান্তি, চোখে ঘুমের অভাব, শরীরে এমন একটি ভার, যা বর্ম খুলে রাখলেও নামে না। মানুষটি বহু লোককে নেতৃত্ব দিয়েছেন, বহু মানুষকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে গেছেন, বহুবার বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। প্রতিবার বেঁচে যাওয়ার সঙ্গে আরেকটু অপরাধবোধ তাঁর শরীরে জমেছে।
ডেমনের অভিনয়ের সবচেয়ে ভালো জায়গা তাঁর নীরবতা। নোলানের ছবিতে মানুষ সাধারণত দ্রুত এবং গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে। যেন সবাই জানে পৃথিবী আর সতেরো মিনিট টিকবে, এর মধ্যে কোয়ান্টাম মেকানিকস, পিতৃবেদনা এবং রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র বুঝিয়ে শেষ করতে হবে। এখানে ডেমনকে অনেক সময় শুধু তাকিয়ে থাকতে দেওয়া হয়েছে।
সেই তাকানোর মধ্যে ওডিসিউসের পুরোনো বীরত্ব, বর্তমান ক্লান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় একসঙ্গে থাকে। তিনি ঘরে ফিরতে চান। আবার ভেতরে ভেতরে বুঝতে পারেন, বাড়ি ছেড়ে যাওয়া মানুষটির সঙ্গে ফিরে যাওয়া মানুষটির খুব সামান্য মিল রয়েছে।
যুদ্ধ মানুষকে প্রায়ই এমন একটি সংস্করণে বদলে দেয়, যাকে তার নিজের পরিবার চিনতে প্রস্তুত থাকে না। যিনি যুদ্ধে বীর, তিনি সংসারে ভয়াবহ অপরিচিত হতে পারেন। রাষ্ট্র তাঁর জন্য পদক তৈরি করে। ছেলে তাঁর সঙ্গে কী কথা বলবে, রাষ্ট্র সে বিষয়ে কোনও নির্দেশিকা প্রকাশ করে না।
পেনেলোপি এবং অপেক্ষার রাজনীতি
অ্যান হ্যাথাওয়ের পেনেলোপিকে ছবিটি কেবল ধৈর্যশীলা স্ত্রী হিসেবে রাখেনি। তিনি এই কাহিনির রাজনৈতিক মস্তিষ্ক। তাঁর অপেক্ষার মধ্যে ভালোবাসা আছে, কৌশল আছে, সন্দেহ আছে, রাগ আছে এবং প্রতিদিন বেঁচে থাকার হিসাব আছে। হ্যাথাওয়ে, টম হল্যান্ড, জেন্ডায়া ও রবার্ট প্যাটিনসন যথাক্রমে পেনেলোপি, টেলেমাকাস, অ্যাথেনা এবং অ্যান্টিনাসের চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
অপেক্ষাকে আমরা খুব সহজে রোম্যান্টিক করে ফেলি। জানালার পাশে একজন নারী বসে আছেন, বাইরে বৃষ্টি, হাতে অসমাপ্ত সোয়েটার, পেছনে বেহালা। অপেক্ষার দশ বছরকে দুই মিনিটের গানে চমৎকার দেখায়।
বাস্তবে অপেক্ষা একটি পূর্ণকালীন মানসিক চাকরি। বেতন নেই, ছুটি নেই, অবসর নেই। প্রতিদিন সকালে উঠে ঠিক করতে হয়, মানুষটি বেঁচে আছে বলে বিশ্বাস করবেন, নাকি নিজের জীবন নতুন করে শুরু করবেন। আশা ধরে রাখলে তাঁকে নির্বোধ বলা হবে। আশা ছাড়লে বিশ্বাসঘাতক। পেনেলোপি এই দুই অভিযোগের মাঝখানে বেঁচে থাকেন।
হ্যাথাওয়ে তাঁর মধ্যে কোনও নিষ্ক্রিয় পবিত্রতা আনেননি। তাঁর পেনেলোপি হিসাব করেন, মানুষ পড়েন, সময় কেনেন, প্রতিপক্ষকে ভুল বোঝান। তাঁত বোনা এবং রাতে খুলে ফেলার পুরোনো কৌশল এখানে শুধু স্বামীভক্তির প্রতীক হয়ে থাকে না। সেটি ক্ষমতাহীন মানুষের রাজনৈতিক অস্ত্র। যার হাতে সেনাবাহিনী নেই, সে সময়কে অস্ত্র বানায়।
তবে ছবিটির নারীদের নিয়ে আপত্তির জায়গাও রয়েছে। বিশাল আয়োজনের মধ্যেও নারীদের ভূমিকা অনেক সময় ওডিসিউসের মানসিক বিবর্তনের উপকরণে পরিণত হয়েছে এবং মহাকাব্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নারীচরিত্র যথেষ্ট জায়গা পায়নি। আমার মনে হয়েছে নোলান মহাকাব্যের পুরুষটির আত্মা, যুদ্ধ এবং অপরাধবোধের দিকে যতটা নিবিড়ভাবে তাকিয়েছেন, নারীদের নিজস্ব জগতে ক্যামেরা ততক্ষণ বসে থাকেনি। তবে অ্যান হ্যাথাওয়ে যতটুকু জায়গা পেয়েছেন, তার মধ্যে অপেক্ষাকে দুর্বলতার বদলে এক ধরনের নির্মম রাজনৈতিক দক্ষতায় পরিণত করেছেন।
টেলেমাকাস: কিংবদন্তির ছেলে হওয়ার দুর্ভোগ
টম হল্যান্ডের টেলেমাকাস ছবির আবেগের আরেকটি কেন্দ্র।
বিখ্যাত মানুষের সন্তান হওয়ার মধ্যে একটি বিশেষ বিপদ আছে। বাবা উপস্থিত থাকলে তাঁর ছায়ায় বাঁচতে হয়। অনুপস্থিত থাকলে ছায়াটি আরও বড় হয়। কেউ ছেলেটিকে নিজের মতো বড় হতে দেয় না। সবাই প্রশ্ন করে, বাবার মতো সাহসী হয়েছ? বাবার মতো বুদ্ধিমান? বাবার মতো রাজা?
কেউ জিজ্ঞেস করে না, ছেলেটি বাবার মতো হতে চায় কি না।
হল্যান্ড এখানে তারুণ্যের অনিশ্চয়তা এবং জমে থাকা ক্ষোভ ভালোভাবে ধরেছেন। তাঁর টেলেমাকাস বাবাকে খুঁজছে, আবার বাবার উপর রাগও করছে। যে মানুষ দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে, সে নিজের ছেলের শৈশবে ছিল না। ইতিহাস তাকে বীর বলবে। শিশুটি তাকে অনুপস্থিত বলতেই পারে।
বাবা এবং ছেলের সম্পর্কের জায়গাগুলোতেই ছবিটি তার দৈত্য, ঝড়, জাহাজ ও যুদ্ধের আয়োজন পেরিয়ে মানুষের কাছে আসে। বড় পর্দায় সমুদ্র দেখা বিস্ময়কর। বহু বছর পরে দুজন অপরিচিত আত্মীয়ের পরস্পরের দিকে তাকানো কখনও কখনও তার চেয়েও বিশাল।
রবার্ট প্যাটিনসনের অ্যান্টিনাস
রবার্ট প্যাটিনসনের অ্যান্টিনাস ছবিটির সবচেয়ে আনন্দদায়ক দুষ্ট চরিত্রগুলোর একটি। তাঁর অভিনয় প্রশংসিত । তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি কোনও ঘরে ঢুকেই ধরে নেন ঘরটি তাঁর। বাড়ির মালিক অনুপস্থিত, অতএব চেয়ার তাঁর, মদ তাঁর, চাকর তাঁর, স্ত্রীও শিগগির তাঁর হবে। আধুনিক করপোরেট অধিগ্রহণের ভাষা আবিষ্কারের বহু আগে গ্রিক পাত্ররা ব্যাপারটি বেশ ভালো বুঝত।
প্যাটিনসন চরিত্রটিকে কেবল হিংস্র করেননি। তাঁর মধ্যে সৌন্দর্য, রসবোধ এবং আত্মবিশ্বাস রেখেছেন। ফলে বিপদ আরও বাড়ে। প্রকাশ্য বদমাশকে শনাক্ত করা সহজ। সুদর্শন, শিক্ষিত, মৃদুভাষী বদমাশ সমাজে বহুদূর যায়। মাঝে মাঝে সে নির্বাচনে দাঁড়ায়। 😜
অ্যাথেনা, দেবতা এবং পরিচালকের ঈশ্বরসুলভ সমস্যা
জেন্ডায়ার অ্যাথেনা ছবিতে দেবী, পথপ্রদর্শক এবং মানুষের ভাগ্যে নাক গলানো এক মহাজাগতিক কৌশলী। গ্রিক দেবতারা মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি যে পরিমাণ আগ্রহ দেখাতেন, বর্তমানের পাড়ার আত্মীয়রাও তাঁদের কাছে শিক্ষানবিশ।
তাঁরা সাহায্য করেন, আবার শাস্তি দেন। বিপদ থেকে বাঁচান, তারপর অন্য বিপদ পাঠান। একজন দেবতা ওডিসিউসকে বাড়ি পৌঁছাতে চান। আরেকজনের মনে হয় লোকটিকে আরও তিন বছর সমুদ্রে ভাসানো শিক্ষামূলক হবে।
জেন্ডায়ার উপস্থিতিতে এক ধরনের দূরত্ব আছে। তিনি মানুষের দুঃখ বোঝেন, কিন্তু মানুষের মতো দুঃখ পান না। দাবার খেলোয়াড় ঘুঁটির প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারে, তবু প্রয়োজনে ঘুঁটি উৎসর্গ করে।
এই জায়গায় নোলান নিজেও প্রায় অ্যাথেনার মতো। চরিত্রগুলোকে তিনি ভালোবাসেন, তাদের জন্য ভয়ংকর পরীক্ষা তৈরি করতেও তাঁর দ্বিধা নেই। সমুদ্রে ফেলেন, দৈত্যের সামনে দাঁড় করান, সময় ভেঙে দেন, স্মৃতি গুলিয়ে দেন, তারপর দূরে ক্যামেরা রেখে দেখেন মানুষ কতটা সহ্য করতে পারে।
সমুদ্রের অভিনয়
ছবিটির সবচেয়ে বড় তার সম্ভবত সমুদ্র।
হয়তে ভ্যান হয়টেমার ক্যামেরায় সমুদ্র কখনও পথ, কখনও দেয়াল, কখনও কবরস্থান, কখনও ঈশ্বরের রাগ, কখনও মানুষের মনের ভিতরের অন্ধকার। সম্পূর্ণ ছবিটি নতুন আইম্যাক্স প্রযুক্তিতে ধারণ করা হয়েছে। নির্মাতাদের ভাষায়, এটি হোমারের কাহিনিকে প্রথমবারের মতো আইম্যাক্স ফিল্ম পর্দায় নিয়ে এসেছে।
আইম্যাক্সে কিছু দৃশ্য দেখার সময় মনে হয় পর্দা সামনে নেই, আপনি নিজেই জাহাজের সঙ্গে বাঁধা। জল মাথার উপর উঠে আসছে, বাতাস বুকের মধ্যে ঢুকছে, কাঠের জাহাজের প্রতিটি কড়কড় শব্দ শরীরের কোনও হাড়ে গিয়ে লাগছে।
নোলান যতটা সম্ভব বাস্তব লোকেশন, বাস্তব সেট এবং ব্যবহারিক কৌশলের দিকে গেছেন। ট্রোজান হর্সের দৃশ্যের জন্যও বড় কাঠামো নির্মাণ করে অভিনেতা ও নির্মাতারা তার ভেতরে ঢুকে শুটিংয়ের উপায় বের করেছিলেন।
এই বাস্তবতার ফলে দৈত্যেরাও পুরোপুরি কম্পিউটার থেকে জন্মানো চকচকে খেলনা মনে হয় না। তাদের শরীর আছে, ওজন আছে, দুর্গন্ধ থাকার সম্ভাবনাও অনুভব করা যায়। আধুনিক ব্লকবাস্টারে অনেক সময় বিপুল ধ্বংস দেখা যায়, কিন্তু কোনও বস্তু ভারী মনে হয় না। এখানে একটি দড়ি টানতেও মানুষের শরীরের শ্রম বোঝা যায়।
জাহাজটি যখন ঢেউয়ের উপর পড়ে, দর্শক বোঝে কাঠ, মানুষ ও দেবতার ইচ্ছার মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। ফলাফল সম্পর্কে কাঠের আত্মবিশ্বাস সবচেয়ে কম।
শব্দ এবং লুডভিগ গোরানসনের সংগীত
লুডভিগ গোরানসনের সংগীত ছবিটিকে মহাকাব্যিক উচ্চতা দিয়েছে। তাঁর সুর কখনও যুদ্ধের আগে শরীরের স্পন্দন, কখনও দূরের কোনও প্রাচীন ধর্মীয় আচার, কখনও সমুদ্রের নিচে ঘুমিয়ে থাকা অতিকায় প্রাণীর নিঃশ্বাসের মতো শোনায়।
নোলানের ছবির শব্দ নিয়ে পুরোনো অভিযোগ আছে। চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছে, পেছনে সংগীত, ঢেউ, যুদ্ধের শিঙা, জাহাজ ভাঙার আওয়াজ এবং সম্ভবত পরিচালকের ব্যক্তিগত বজ্রপাত একসঙ্গে চলছে। দর্শক সংলাপ বুঝতে না পেরে ভাবেন, নিশ্চয়ই গভীর কিছু বলা হয়েছে।
ওডেসিতেও শব্দ মাঝে মাঝে এত বড় হয়ে ওঠে যে মানুষ ছোট হয়ে যায়। তবে এই ছবিতে সেটি অনেকাংশে বিষয়টির সঙ্গে যায়। সমুদ্র মানুষের বক্তব্য শোনার জন্য ভলিউম কমায় না। দেবতার ক্রোধের মাঝখানে পরিষ্কার উচ্চারণ আশা করাও হয়তো বাড়াবাড়ি।
তবে সাবটাইটেল থাকলে ব্যবহার করুন। হোমারও আপত্তি করতেন না।
মেটাফরের মহামারি
এখন ছবিটির প্রধান প্রসঙ্গে আসা যাক।
মেটাফর।
একটি ঢেউ উঠছে। এটি শুধু ঢেউ নয়, ওডিসিউসের অপরাধবোধ।
একটি জাহাজ ভাঙছে। এটি যুদ্ধশেষের সভ্যতা।
একটি চোখ বন্ধ হচ্ছে। এটি জ্ঞান ও অন্ধত্বের দ্বন্দ্ব।
একটি দরজা খুলছে। এটি ঘর, স্মৃতি, মৃত্যু, জন্ম, পরিচয় এবং সম্ভবত দ্বিতীয় সপ্তাহের বক্স অফিস।
কেউ আগুনের সামনে দাঁড়িয়েছে। মানুষটি নিজের ইতিহাসের মুখোমুখি।
কেউ জল পান করছে। সে বিস্মৃতির প্রলোভন গ্রহণ করছে।
কেউ জল পান করছে না। সে স্মৃতি আঁকড়ে ধরেছে।
দর্শক কোক খাচ্ছে। সে পুঁজিবাদের সামনে আত্মসমর্পণ করেছে।
পাশের দর্শক কোক কেনেনি। সে বাইশ ডলার বাঁচিয়েছে।
নোলান একটি প্রতীককে একা থাকতে দেন না। তার পাশে আরেকটি প্রতীক বসান। তারপর তাদের মাথার উপর আলো ফেলেন। পেছনে সংগীত দেন। কয়েক মিনিট পরে বোঝা যায় আগের আলোটিও আরেকটি প্রতীক ছিল।
এই মেটাফরগুলো মাঝেমধ্যে ক্লান্তিকর। প্রতিটি দৃশ্যকে দর্শনের মৌখিক পরীক্ষায় বসানো হলে গল্পের স্বাভাবিক শ্বাস কিছুটা কমে যায়। তবু এই বাড়াবাড়ির মধ্যেই ছবির ব্যক্তিত্ব। নোলান ছোট করে ভাবতে রাজি নন। তাঁর কাছে হোমারের মহাকাব্য মানে কয়েকটি সুন্দর দ্বীপ, কিছু দৈত্য এবং বাড়ি ফেরা নয়। তিনি এর মধ্যে যুদ্ধোত্তর মানসিক ক্ষত, পুরুষের অহংকার, স্মৃতির প্রতারণা, পরিবারে অনুপস্থিতির মূল্য, ক্ষমতার উত্তরাধিকার এবং ঘর নামের ধারণাটির অস্থিরতা ঢুকিয়েছেন।
সব মশলা প্রয়োজন ছিল কি না, এ নিয়ে আলোচনা চলবে। রান্নাটি যে বড় আয়োজনের, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
যারা বইটি পড়েননি
যাঁরা হোমারের ওডেসি পড়েননি, তাঁদের ভয় পাওয়ার কারণ নেই।
পরীক্ষার আগে নোটস মুখস্থ করার মতো তাড়াহুড়ো করে উইকিপিডিয়া পড়ে হলে ঢোকারও দরকার নেই। মূল আবেগটি খুব সহজ। একজন মানুষ বাড়ি ফিরতে চাইছে। একজন স্ত্রী অপেক্ষা করছেন। একজন ছেলে বাবাকে খুঁজছে। পথে মানুষের লোভ, ভয়, কামনা, বুদ্ধি, অহংকার এবং ভাগ্য তাকে ঘুরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এই গল্প বুঝতে প্রাচীন গ্রিক ভাষা লাগে না।
রাতের শেষ ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর বিমানবন্দরের মেঝেতে বসে থাকা যে কোনও মানুষ ওডিসিউসকে বুঝতে পারে। পার্থক্য শুধু, তার সামনে সাইক্লোপস নেই। এয়ারলাইনের কাস্টমার সার্ভিস আছে।
ছবিটি নিজের দৃশ্যভাষায় প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেয়। চরিত্রগুলোর সম্পর্ক বুঝতে অসুবিধা হয় না। পুরাণের সব সূত্র চিনতে না পারলেও অভিযানের উত্তেজনা, ভয় এবং আবেগ কাজ করবে।
যারা বইটি পড়েছেন
যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা আলাদা হবে।
পরিচিত ঘটনাগুলো নতুন বিন্যাসে আসবে। কোথাও মূল কাহিনি অনুসরণ করা হয়েছে, কোথাও চরিত্রের নৈতিক অবস্থান বদলেছে, কোথাও আধুনিক যুদ্ধোত্তর মানসিকতার আলো ফেলা হয়েছে। ছবিটি এমিলি উইলসনের ২০১৭ সালের ইংরেজি অনুবাদ থেকেও অনুপ্রেরণা নিয়েছে বলে আলোচনা হয়েছে।
হোমারের ওডিসিউস বুদ্ধিমান, সাহসী, প্রতারক, নিষ্ঠুর, আকর্ষণীয় এবং ভয়ংকরভাবে আত্মমুগ্ধ। আধুনিক জনপ্রিয় কাহিনি প্রায়ই তাঁর অস্বস্তিকর বৈশিষ্ট্যগুলো পালিশ করে বীরের মূর্তি বানায়। নোলান অন্তত কিছু জায়গায় সেই মূর্তির ফাটল দেখিয়েছেন।
ওডিসিউস বাড়ি ফিরতে চান। পথে বহু মানুষের ঘর ধ্বংস করেছেন। তিনি নিজের পরিবারের কাছে বিশ্বস্ততা প্রত্যাশা করেন। নিজের যাত্রাপথের সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে তাঁর মানবিক হিসাব যথেষ্ট নমনীয়। তিনি দেবতাদের অন্যায় নিয়ে ক্ষুব্ধ হন। নিজের সিদ্ধান্তে যারা মারা যায়, তাদের জন্য তাঁর অনুশোচনা আছে, কিন্তু সেই অনুশোচনার মধ্যেও নিজের কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকার একটি প্রবল অভ্যাস আছে।
এই দ্বন্দ্বগুলো ছবিটিকে সমৃদ্ধ করেছে।
একটি যুদ্ধ কখন শেষ হয়
ছবিটির সবচেয়ে শক্তিশালী ভাবনাটি যুদ্ধ নিয়ে।
রাষ্ট্রের ক্যালেন্ডারে যুদ্ধের শেষদিন থাকে। চুক্তি সই হয়। পতাকা নামে। সৈন্যরা বাড়ি ফেরে। সংবাদপত্র বড় অক্ষরে লেখে, যুদ্ধ শেষ।
যে মানুষটি যুদ্ধ করে ফিরছে, তার শরীরে যুদ্ধটি চলতে পারে আরও বহু বছর।
ওডিসিউসের ঘরে ফিরতে দশ বছর লাগে শুধু সমুদ্রের জন্য নয়। যুদ্ধ তার ভিতরে এমন একটি দূরত্ব তৈরি করেছে, যা মাইল দিয়ে মাপা যায় না। সে ট্রয় থেকে ইথাকার দিকে এগোয়, আবার নিজের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। প্রতিটি বিপদ তাকে বাঁচতে শেখায়, প্রতিটি বেঁচে থাকা তাকে আরও এমন একজন মানুষ বানায়, যার পাশে শান্ত সংসারে বসা কঠিন।
বীরত্বের গল্প সাধারণত যুদ্ধ পর্যন্ত বলা হয়। যুদ্ধের পরে বীরটি রাতে ঘুমাতে পারে কি না, ছেলের সঙ্গে কথা বলতে পারে কি না, স্ত্রীর স্পর্শে শান্ত হয় নাকি চমকে ওঠে, এসব নিয়ে মহাকাব্যের বাজার কিছুটা কম।
নোলান সেই পরবর্তী অংশেই আগ্রহী।
ঘর কোথায়
ওডেসি শেষ পর্যন্ত ঘর নিয়ে একটি গল্প।
ঘর কি একটি দ্বীপ? একটি প্রাসাদ? স্ত্রী ও সন্তান? রাজসিংহাসন? পরিচিত বিছানা? নিজের নামটি অন্যের মুখে শোনা?
মানুষ বহু বছর বাইরে থাকলে ঘর তার স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকে। সেই স্মৃতির ঘরে কোনও দেয়াল ভাঙে না, কেউ বুড়ো হয় না, সম্পর্ক বদলায় না। বাস্তব ঘর তখন নিজের জীবন চালিয়ে যায়। সেখানে মানুষ অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়, শিশু বড় হয়, ক্ষমতার নতুন দাবিদার জন্মায়, ভালোবাসার ভিতরে রাগ জমে।
ফিরে আসা মানুষটি ভাবে, সে পুরোনো জায়গায় ফিরে যাবে।
ঘরটি ভাবে, এই অপরিচিত লোকটি কে?
এই অস্বস্তিই ছবিটির হৃদয়। বাড়ি পৌঁছানো এবং ঘরে ফেরা একই মুহূর্তে ঘটে না। কখনও তাদের মধ্যে আরও একটি সমুদ্র পড়ে থাকে।
শেষ কথা
দ্য ওডেসি নিখুঁত ছবি নয়। এর উচ্চাকাঙ্ক্ষা মাঝে মাঝে এর শরীরের চেয়ে বড় হয়ে যায়। কিছু চরিত্রকে আরও সময় দেওয়া যেত। নারীদের অভিজ্ঞতা আরও গভীরভাবে দেখা যেত। কয়েকটি প্রতীককে সামান্য বিশ্রাম দিলে দর্শক নিজে ভাবার জায়গা পেত। দৃশ্যের মহিমা মাঝেমধ্যে আবেগকে আড়াল করে। ছবিটির কাঠামোগত অমসৃণতা এবং দৃশ্যবৈভবের নিচে আবেগ চাপা পড়েছে।
তারপরও ছবিটি দেখার অভিজ্ঞতা বিরাট। বড় পর্দার জন্য বানানো, সমুদ্রের গর্জন শরীরে অনুভব করার জন্য বানানো, পরিচিত একটি কাহিনিকে আবার নতুন করে বিব্রতকর প্রশ্ন করার জন্য বানানো।
যাঁরা ওডেসি পড়েননি, তাঁদের ভালো লাগবে।
যাঁরা পড়েছেন, তাঁরাও নতুনত্বের স্বাদ পাবেন নিঃসন্দেহে।
আর যাঁরা মেটাফর অপছন্দ করেন, তাঁরা সতর্ক থাকুন। সিনেমা হল থেকে বেরোনোর সময় নিজের গাড়ির চাবিকেও জীবনের হারানো নিয়ন্ত্রণের প্রতীক মনে হতে পারে।
আমি হল থেকে বেরিয়ে পার্কিং লটের দিকে হাঁটছিলাম। পেছনে সিনেমা হল, সামনে গাড়ি। মাঝখানে কয়েকশো ফুট অ্যাসফল্ট।
হঠাৎ মনে হল, এ-ও এক ধরনের ইথাকা।
তারপর নিজেকে সামলালাম।
নোলান যথেষ্ট মেটাফর দিয়েছেন। দর্শকেরও কিছু সংযম থাকা উচিত।




,,,,,বলার ভাষা খুজে পাইনাত,,,,কি বলবো,,,,অসাধারন,,,,love,,,