বিপ্লব মানেই কি নতুন কিছু? নাকি জনতার উন্মাদ শাসন
বিপ্লব আসলে ক্ষমতার ভাষা নিয়ে লড়াই। প্রতিটি শাসন নিজের ভিতরেই পচনের বীজ বহন করে
বিপ্লব মানেই কি সামনে এগোনো, নাকি অনেক সময় পিছনে হাঁটা? আমরা অভ্যাসবশত বিপ্লব শব্দটাকে ভবিষ্যৎ, প্রগতি, নতুনত্বের সঙ্গে বেঁধে ফেলেছি। যেন বিপ্লব মানে কাল থেকে আজ আলাদা হওয়া, আজ থেকে কালকে লাথি মারা। অথচ ইতিহাস একটু মন দিয়ে পড়লে দেখা যায়, বহু বিপ্লবই আসলে পুরনো কিছুর পুনরুদ্ধার। রাজাকে ফেলে দেওয়া নয়, বরং আসল রাজনীতি ফিরিয়ে আনার দাবি। ঈশ্বরকে অস্বীকার নয়, “খাঁটি বিশ্বাসে” ফিরে যাওয়ার ডাক। সংবিধান বদলানো নয়, বরং বলা যে এই সংবিধানই তো আসল, আমরা এতদিন ভুল পথে ছিলাম। অর্থাৎ বিপ্লব অনেক সময় নতুন রাস্তা না খুঁজে, পুরনো মানচিত্র ঝেড়ে মুছে আবার বের করে।
এইখানেই প্রশ্নটা আর দার্শনিক না থেকে, পুরোপুরি রাজনৈতিক হয়ে যায়। কারণ যদি বিপ্লব মানে হয় অতীতে ফিরে যাওয়া, তাহলে কে ঠিক করবে কোন অতীত? কোন স্মৃতি বিপ্লবী, আর কোনটা প্রতিক্রিয়াশীল? এক জনের কাছে পুরনো মানে ন্যায়, অন্য জনের কাছে সেই একই পুরনো মানে নিপীড়ন। যে বলছে “আগে যেমন ছিল”, সে আদৌ কাদের কথা বলছে? কার আগে? কার জন্য? তাই বিপ্লবকে শুধুই পরিবর্তনের সমার্থক ধরলে ভুল হয়। বিপ্লব আসলে ক্ষমতার ভাষা নিয়ে লড়াই। ভবিষ্যৎ দেখানোর ক্ষমতা যেমন রাজনৈতিক, অতীত বেছে নেওয়ার ক্ষমতাও তেমনই। আর এই লড়াইয়ে বিপ্লব কখনও সামনে হাঁটে, কখনও পিছনে। প্রশ্নটা হচ্ছে যদি পিছিয়ে যাই তাহলে পিছিয়ে যাওয়াটা কার স্বার্থে।
এই প্রশ্নটাকেই খুঁটিয়ে, প্রায় জেদ করেই ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন The Revolution to Come বইয়ের লেখক Dan Edelstein। তাঁর যুক্তি এক কথায় বলা যায় না, আর বললেও ঠিক বোঝা যায় না। তিনি দেখাতে চান, আমরা আজ যে বিপ্লব শব্দটা শুনে ভবিষ্যৎ, অগ্রগতি, নতুন মানুষ, নতুন সমাজ ভাবি, একসময় তা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো অর্থের বাহক। বিপ্লব মানে ছিল ঘূর্ণন, চক্র, ফিরে আসা। রাজনীতির ভাষায় তার মানে ছিল শিকড়ে ফেরা, আদিতে প্রত্যাবর্তন।
এই ধারণাটা গ্রিক ও রোমানদের কাছে ছিল খুবই স্বাভাবিক। সময় সেখানে সোজা লাইনে এগোয় না, সে ঘুরে ঘুরে আসে। ঋতুর মতো, শাসনের মতো। রাজতন্ত্র ভাঙে, আসে অত্যাচার। অত্যাচার ভেঙে আসে অভিজাত শাসন, সেখান থেকে অলিগার্কি, তারপর গণতন্ত্র, শেষে জনতার উন্মাদ শাসন। এই দোলাচলই ইতিহাস। এই দোলাচলের ভাষাই ছিল Revolution। অগ্রগতি নয়, চক্র।
এই পুরনো ধারণাটা মোটামুটি আঠারো শতক পর্যন্ত দিব্যি টিকে ছিল। ইতিহাস তখন ঘড়ির কাঁটার মতো ঘুরে ঘুরে আসে। রাজনীতি মানে ছিল ভুল পথে চলে যাওয়া সমাজকে আবার ঠিক জায়গায় ফেরানো। কিন্তু হঠাৎ করে দৃশ্যপট বদলে গেল। এনলাইন্মেন্ট যুগ এসে হাজির হল, সঙ্গে প্রগতির দর্শন। ইতিহাসকে এবার আর বৃত্ত মানা হল না। তাকে সোজা রাস্তা বানানো হল। শুরু থেকে শেষ, অন্ধকার থেকে আলো, বর্বরতা থেকে সভ্যতা।
এই বদলটা আমরা সবাই জানি। ইতিহাসবিদরাও জানেন। কিন্তু ঠিক কখন, ঠিক কেন এই অর্থবদল ঘটল, সেটা নিয়ে বিতর্ক। কেউ বলেন কোপার্নিকাস, টেলিস্কোপ, মহাবিশ্বের কেন্দ্রচ্যুতি। কিন্তু এডেলস্টাইনের আগ্রহ রাজনীতিতে। তিনি বলেন, এই বদলটা ঘটেছে অনেক ধীরে, অনেক দ্বিধা নিয়ে, মোটামুটি সতেরো শতকের শেষ থেকে আঠারো শতকের শেষের মাঝখানে। এবং সব বিপ্লব একই ভাবে এই নতুন সময়বোধকে নেয়নি।
এই জায়গাতেই আমেরিকার বিপ্লব, তাঁর মতে, আধুনিক অর্থে বিপ্লব নয়। কারণ তারা নতুন সমাজ গড়তে চায়নি। তারা পুরনো ব্যবস্থাকেই ঠিক করতে চেয়েছিল। তারা ছিল শেষ Polybian, শেষ চক্রবিশ্বাসী। এই Polybius কে? হেলেনিস্টিক যুগের গ্রিক ইতিহাসবিদ। তাঁর ধারণা ছিল anacyclosis, শাসনের ঘূর্ণন। তাঁর মতে প্রতিটি শাসন নিজের ভিতরেই পচনের বীজ বহন করে। একমাত্র উপায় এই চক্র থামানোর, মিশ্র সংবিধান। রোমান মডেল। যেখানে রাজা, অভিজাত, সাধারণ মানুষ, সবাই একটু একটু করে ক্ষমতায়।
এডেলস্টাইন দেখান, এই Polybius থেকেই anacyclosis ঘুরে ঘুরে হয়ে উঠল revolutio, rivoluzione, révolution, revolution। ভাষার ভিতর দিয়ে ধারণার যাত্রা। তিনি একে বলেন genetic markers। শব্দের ডিএনএ ধরে ধরে চিন্তার বিস্তার। এই চিন্তা লক, মন্টেস্কিয়ু হয়ে পৌঁছল আমেরিকায়। ম্যাডিসন, অ্যাডামস, সবাই Polybius পড়েছেন। তাই আমেরিকার বিপ্লব মানে ছিল restore করা, rupture নয়। তারা দাসপ্রথা তুলে দিতে চায়নি, বৈষম্য মুছে ফেলতে চায়নি। তারা রাষ্ট্র বাঁচাতে চেয়েছিল। ঠিক ১৬৬৬ সালের ইংল্যান্ডের মতো। এই যুক্তি দিয়ে এডেলস্টাইন আসলে গর্ডন উডের মতো ঐতিহাসিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। উড বলেছিলেন, সংবিধান রচনা মানে ক্লাসিকাল রাজনীতির শেষ। এডেলস্টাইন বলেন, না।
তাহলে আধুনিক বিপ্লব কোথায়? ফ্রান্সে। ফরাসি বিপ্লবেই, তাঁর মতে, চক্র ভেঙে লাইন তৈরি হয়। সময় এগোয়। মিশ্র সংবিধান বাদ পড়ে। আসে একমাত্রিক সত্য। যারা সঙ্গে নেই, তারা শত্রু। ভবিষ্যতের শত্রু। এখান থেকেই সন্ত্রাস, গিলোটিন, একনায়কতন্ত্র। এই জায়গায় এডেলস্টাইনের ভাষা বদলায়। Polybius নিয়ে তিনি কৌতূহলী। ফরাসি বিপ্লব নিয়ে তিনি বিচারক। এখানে তিনি ফুরে আর আরেন্টের কাছাকাছি। তাঁর মতে প্রগতির ধারণাই বিপজ্জনক, কারণ তা ইতিহাসকে অনিবার্য করে তোলে। যেন বিপ্লবীরা ভবিষ্যতের প্রতিনিধি। তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে ইতিহাসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
এই যুক্তি আকর্ষণীয়। কিন্তু বিপজ্জনকও। কারণ এতে মনে হয়, খারাপ ধারণা থেকেই খারাপ ইতিহাস জন্মায়। প্রগতি মানেই সন্ত্রাস। কিন্তু তাহলে প্রশ্ন ওঠে, আমরা পরিবর্তন চাইব কেন? অত্যাচার বন্ধ করাকে কি উন্নতি বলা যাবে না? এডেলস্টাইন মার্কসবাদ নিয়েও অস্বস্তিতে ভোগেন। তিনি সমাজবিজ্ঞানের কাজকে গুরুত্ব দেন না। মনে করেন, ওরা ভাবনাকে পাত্তা দেয় না। কিন্তু মার্কসকে শুধু বস্তুবাদী বলে উড়িয়ে দেওয়া নিজেই এক ধরনের সরলীকরণ।
শেষ পর্যন্ত তাঁর এই বইটা দাঁড়িয়ে থাকে দুই বিপ্লবের মধ্যে। একটায় চক্র, আরেকটায় প্রগতি। একটায় সংযম, অন্যটায় উন্মাদনা। যেন আমাদের সামনে শুধু দুটো পথ, হয় মিলিট্যান্সি নয়তো আত্মতুষ্টি।
কিন্তু ইতিহাস কোনও সোজাসাপ্টা শিক্ষক নয় যে বোর্ডে দুটো অপশন লিখে বলবে, একটাই ঠিক। সে আমাদের এমন কোনও আলটিমেট চয়েসের সামনে দাঁড় করায় না। ইতিহাস বরং একটু কূট, একটু ধূর্ত। সে জানে, মানুষ চরম সিদ্ধান্তে স্বস্তি খোঁজে। তাই সেই স্বস্তিটাই সে দেয় না। বিপ্লবও তাই একরঙা নয়। সব সময় নতুন মানে ধ্বংস নয়, সব সময় পুরনো মানে নস্টালজিয়া নয়। অনেক সময় বিপ্লব কোনও দিকেই পুরোপুরি যায় না। সে মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। একটু পিছনে তাকায়, একটু সামনে ইঙ্গিত করে। যেন বলছে, দেখো, তুমি কোথা থেকে এসেছো, সেটা ভুলে যেও না। আবার এটাও ভুলে যেও না, তুমি এখানেই আটকে থাকার জন্য জন্মাওনি। এই স্মরণ করিয়ে দেওয়াটাই বিপ্লবের সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক। কারণ এতে কোনও চটজলদি মুক্তি নেই। না নিখাদ ভবিষ্যৎ-উন্মাদনা, না আরামদায়ক অতীত-প্রীতি। শুধু একটা প্রশ্ন ঝুলে থাকে। আমরা যা ছিলাম, তা কি আবার হতে চাই। আর যা হতে পারি, তার জন্য কী কী ছাড়তে রাজি। ইতিহাস এখানে নির্দেশ দেয় না, আয়না ধরে। আর বিপ্লব সেই আয়নাটা হঠাৎ আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়, পালানোর সুযোগ না দিয়ে।



