অলসতার অধিকার, নাকি কাজের দাসত্ব?
My two cents on The Right To Be Lazy by Paul Lafargue (Author), Charles H. Kerr (Translator)
লেখক বসে লিখছে। আঙুল চলছে। কিন্তু মাথার ভেতরে আরেকটা ছোট্ট টিকটিকি ফিসফিস করছে; এই লেখাটা কি শেষ লেখা? পরের বার কি আমাকে ডাকা হবে, নাকি “রবার্ট”-এর জায়গায় “ক্লদ” বসে যাবে? নামটা শুনে মনে হয় ফরাসি দার্শনিক, কাজটা করে অ্যালগরিদম। আহা, সভ্যতার কী মজার কৌতুক; একদিন লেখকের নাম ছিল, এখন ব্র্যান্ড নামই যথেষ্ট।
এই ভয়ে গোটা আমেরিকা একটু কাঁপা কাঁপা গলায় ভাবছে; এই যে AI উঠছে, এটা কি চাকরি খাবে? পিউ রিসার্চ বলছে, বেশিরভাগ মানুষ ইতিমধ্যে ধরে নিয়েছে, ভবিষ্যৎটা একটু কম বেতন আর একটু বেশি উদ্বেগে ভরা হবে। আর আশ্চর্য, AI-কে “ক্লদ” বলে ডাকলেও, কেউ খুব আশ্বস্ত হচ্ছে না। নামটা মানবিক, কিন্তু মেশিনের মুখে হাসি আঁকা মানেই তো মানুষ হওয়া নয়; মোমের পুতুলেরও চোখ থাকে, তবু সে তাকায় না।
ফরাসি মার্কসবাদী পল লাফার্গ যিনি থাকলে হয়তো আজকের LinkedIn-এ নিয়মিত পোস্ট দিতেন; “Work is a scam, embrace laziness.” এবং নিচে হাজার লোক তর্ক করত, “Sir, kindly elaborate.” লাফার্গ কিন্তু মজা করে বলতেন না। তিনি সিরিয়াস ছিলেন, এবং সেই সিরিয়াসনেসটাই আজকের পৃথিবীতে প্রায় কমেডি শোনায়।
কিউবায় জন্ম, প্যারিসে ডাক্তারি পড়া, তারপর সব ছেড়ে বিপ্লব। কারণ, শ্বশুরবাড়ি ছিল একটু আলাদা; কার্ল মার্ক্স। এমন শ্বশুর পেলে অনেকে বিয়ের আগে ভাবত, লাফার্গ বিয়ের পরেই পুরোপুরি ঝাঁপ দিলেন। ডাক্তারি করে স্থির জীবন কাটানোর বদলে তিনি বেছে নিলেন দারিদ্র্য, পুলিশি নজরদারি, আর জেলে বসে লেখা। একদিন তো পুলিশ ধরল যখন তিনি স্ত্রীর জন্য সালাদ নিয়ে ফিরছিলেন। ভাবা যায়? ইতিহাসে কেউ কেউ বিপ্লব করে, কেউ কেউ সালাদ ডেলিভারি করতে গিয়ে ধরা পড়ে।
জেলের ভেতরে বসে তিনি লিখলেন; The Right to Be Lazy। নামটা শুনলেই আজকের কর্পোরেট HR-এর গায়ে কাঁটা দেবে। কিন্তু এই বইয়ের মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর প্রশ্ন আছে, যা আজও টিকে আছে: কাজ কি সত্যিই আমাদের মুক্তি দেয়, নাকি কাজই আমাদের দাস বানায়?
লাফার্গের সময়ে শিল্পবিপ্লব চলছে। স্টিম ইঞ্জিন, কারখানা, গ্লোবাল ট্রেড; সব মিলিয়ে পৃথিবী নতুন করে সাজছে। আগে ছিল কারিগর, এখন শ্রমিক। আগে ছিল হাতের কাজ, এখন মেশিনের শব্দ। ইতিহাসবিদ হবসবম বলেছিলেন; পুরনো দেবতা আর রাজারা হার মানল ব্যবসায়ী আর ইঞ্জিনের কাছে। শোনায় যেন পুরাণ বদলে গেছে; ইন্দ্র সরে গিয়ে জায়গা দিলেন ফ্যাক্টরি মালিককে।
সেই সময় শ্রমিকরা লড়ছে; কম সময় কাজ চাই। ১২ ঘণ্টার বদলে একটু কম। লাফার্গ বললেন; না, এটা ভুল দাবি। এইখানেই তিনি সবাইকে বিভ্রান্ত করলেন।
তিনি বললেন, “কম কাজ চাই” মানে আপনি এখনও কাজকে মেনে নিচ্ছেন। আপনি আসলে শিকলটা একটু ঢিলা করতে চাইছেন, কিন্তু শিকলটাই ভাঙতে চাইছেন না। তাঁর যুক্তি ছিল; মেশিন যদি এত কাজ করতে পারে, তাহলে মানুষ কেন এত কাজ করবে? তিনি এক অদ্ভুত ভবিষ্যৎ কল্পনা করলেন; মেশিন কাজ করবে, মানুষ বাঁচবে।
কিন্তু বাস্তবটা হলো উল্টো। মেশিন এলো, কাজ কমল না। বরং মানুষ আরও বেশি কাজ করতে শুরু করল। লাফার্গ বললেন, এর কারণ অর্থনীতি না, মতাদর্শ। “কাজ” একটা ধর্ম হয়ে গেছে। এমন এক ধর্ম, যেখানে অলসতা পাপ, আর ক্লান্তি পুণ্য। বসরা শুধু কাজ দেয় না, তারা কাজের প্রতি ভালোবাসাও শেখায়। যেন এক ধরনের ব্রেনওয়াশ; তুমি কাজ করছো, মানে তুমি ভালো মানুষ।
এই ঘটনাটা অদ্ভুতভাবে আজকের পৃথিবীর সঙ্গে মিলে যায়। আজ কেউ বলে না “আমি বেঁচে আছি”, সবাই বলে “আমি ব্যস্ত।” ব্যস্ততা এখন স্ট্যাটাস সিম্বল। লাফার্গের বক্তব্য ছিল সরল; জীবনের জন্য যতটুকু কাজ দরকার, ততটুকুই হওয়া উচিত। বাকিটা সময়? সেটাই আসল জীবন।
এখানে তিনি আরেকটা ভয়ানক কথা বলেন; অতিরিক্ত কাজ শুধু মানুষকে ক্লান্ত করে, এবং অর্থনীতিকেও অসুস্থ করে। অতিরিক্ত উৎপাদন, অতিরিক্ত পণ্য, তারপর বাজার ভেঙে পড়ে। ১৮৭৩ থেকে শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বারবার অর্থনৈতিক সংকট; যেন প্রাচীন কোনো দেবতার অভিশাপ ভেবে ভুল হয়, বরং অতিরিক্ত কাজের ফল।
এখন প্রশ্ন হলো; কাজ কমলে মানুষ করবে কী? মার্ক্স বলেছিলেন; সকালে শিকার, বিকেলে মাছ ধরা, রাতে সমালোচনা। শোনায় কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো; চিন্তায় সুন্দর, বাস্তবে একটু কষ্টকর।
লাফার্গ বরং কল্পনা করলেন এক উল্টোপাল্টা পৃথিবী; যেখানে প্রাক্তন জেনারেলরা নাটক করে, প্রাক্তন শিল্পপতিরা কৌতুকাভিনয় করে, আর সাধারণ মানুষ খায়-দায়, হাসে। একটা কার্নিভাল সমাজ।
এই বইয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ শব্দ আছে; otium। এটা অলসতা না, আবার কাজও না। এটা হলো থাকা।
কিছু না করার আনন্দ। চেক লেখক কারেল চাপেক বলেছিলেন; idleness মানে যেখানে তুমি কোন কিছুতেই ব্যস্ত না। না আনন্দে, না দুঃখে, না কাজে, না বিনোদনে। শুধু থাকা।
ভাবুন তো, আমরা কি সেটা পারি? আমরা Netflix চালিয়ে ফোন স্ক্রল করি, “relax” করার সময়ও কাজের মতো ব্যস্ত থাকি। কিছু না করা আমাদের কাছে প্রায় আতঙ্কের মতো।
লাফার্গ কিন্তু নিজের জীবনও নিজের মতো শেষ করলেন। ৬৯ বছর বয়সে, স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আত্মহত্যা। কারণ? বৃদ্ধ বয়স তাকে ধীরে ধীরে জীবনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করছিল। একজন মানুষ, যিনি অলসতার পক্ষে লিখেছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত বেছে নিলেন এক ধরনের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ; সময়কে নিজে থামানো।
দেখুন এখানে দর্শন আর জীবন একসাথে এসে দাঁড়ায়। এখন আবার ফিরে আসি শুরুতে; লেখক আর AI। যদি মেশিন লিখতে পারে, কাজ করতে পারে, ভাবতেও পারে, তাহলে মানুষ করবে কী?
আমরা কি তখন সত্যিই “অলস” হব? না কি নতুন ধরনের কাজ খুঁজে নেব; নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য?
হয়তো লাফার্গের আসল প্রশ্নটা এখানেই; সমস্যা কাজ না, সমস্যা কাজের প্রতি আমাদের আসক্তি। আমরা কাজ ছাড়তে ভয় পাই। কারণ তখন আমাদের মুখোমুখি হতে হয় নিজের সঙ্গে। এবং নিজের সঙ্গে বসে থাকা; এটাই হয়তো সবচেয়ে কঠিন কাজ।
আমার মনে হয়, একটু থামা দরকার। কাজ থেকেও, বিনোদন থেকেও। কারণ হয়তো, এই পুরো AI-আতঙ্কের মধ্যে, সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রশ্নটা খুব ইজি গোয়িং; যদি সব কাজ মেশিন করে দেয়,
তাহলে আমরা কীভাবে বাঁচতে শিখব? এই প্রশ্নটার উত্তর এখনো কেউ লেখেনি। না রবার্ট, না ক্লদ, না জিপিটি।
এপ্রিল ৬, ২০২৬




