এআইয়ের চারখানা নিয়ম, আর পঞ্চম নিয়মটা মানুষ নিজেই ভুলে যায়
এআই নিয়ে আমার একটা মুশকিল হয়েছে। জিনিসটা যত বুদ্ধিমান হচ্ছে, মানুষ ততই তার সামনে একটু বোকা হয়ে বসছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে আমি এক অদ্ভুত সমস্যায় পড়েছি; প্রযুক্তিটি যত বেশি চতুর হয়ে উঠছে, মানুষ যেন তার সামনে ততটাই নিষ্ক্রিয় বা বোকা হয়ে পড়ছে!
সফটওয়্যার ও এআই-এর আচরণসংক্রান্ত আমার দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, নতুন কোনো প্রযুক্তি বাজারে এলেই আমরা সেটিকে কেবল একটি যন্ত্র না ভেবে ‘ত্রাতা’ বা ‘মসিহা’ বানিয়ে ফেলি! আমাদের ধারণা জন্মায় যে সে এসে কোম্পানির খরচ কমাবে, সংকট মেটাবে, কোড বা প্রেমপত্র লিখবে, মিটিংয়ের সারসংক্ষেপ করবে, সন্তানের পড়া বুঝিয়ে দেবে, এমনকি ব্যবসায়িক কৌশল তৈরি করার পাশাপাশি সম্ভব হলে দুপুরের রান্নাটাও সামলে দেবে! শেষের কাজটা এখনও সম্ভব না হলেও, যেভাবে প্রচারণা চলছে তাতে মনে হয় আগামী মঙ্গলবারের মধ্যেই সেটাও হয়তো হয়ে যাবে!
পেশাগত আগ্রহের কারণেই নতুন প্রযুক্তি এলে তা পরীক্ষা করে দেখা, ভাঙাগড়া করা এবং এর সুবিধা ও সীমাবদ্ধতাগুলো বোঝার চেষ্টা করা আমার অভ্যাস। এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি; আর এটি ব্যবহার করতে গিয়ে চারটি মূল শিক্ষা বা নিয়ম আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে গেছে।
এই নিয়মগুলো কিন্তু মোটেও নতুন কিছু নয়। প্রযুক্তির বিবর্তনে এর আগেও এগুলো বারবার ঘুরেফিরে এসেছে, কিন্তু প্রতিবার নতুন যন্ত্রের চকচকে মোড়কে আমরা সেই পুরোনো শিক্ষাগুলো ভুলে যাই।
নিয়ম এক: এআই যন্ত্র, কর্তা নয়
আমাদের পাড়ায় মাছ কাটায় এক অত্যন্ত দক্ষ ভদ্রলোক ছিলেন। পাঁচ মিনিটে বিশাল একটি রুই মাছ কেটে ফেলা তাঁর জন্য কোন ব্যাপারই ছিল না। তবে তাঁর স্ত্রী রান্না করতেন ধীরে-সুস্থে। এখন মাছ কাটার লোকটি যদি মনে করতেন যে তাঁর কাজের গতি দশগুণ বাড়ায় পরিবারের রান্নার গতিও দশগুণ বেড়ে যাবে, তাহলে দুপুরের খাবার মিলত রাত আটটায়! সত্যি বলতে, কোনো শিকলের একটি আংটা একশো গুণ শক্তিশালী হলেই পুরো শিকলটি একশো গুণ শক্তিশালী হয়ে যায় না। বর্তমানে বহু প্রতিষ্ঠান বেশ বড় মূল্য চুকিয়ে এই সহজ সত্যটা শিখছে।
প্রতিষ্ঠানে AI agent, chatbot, developer copilot, meeting assistant কিংবা customer support automation; সবই হয়তো বসানো হয়েছে। কিন্তু কাজের ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, মানুষ এখন AI-এর তৈরি জিনিস পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই করতেই বেশি সময় নষ্ট করছে।
ব্যাপারটা দাঁড়ায় এ রকম: আগে চিঠি আমি নিজেই লিখে ফেলতাম। এখন AI চিঠি লিখে দেয়, আর আমি বসে সেটা ঠিকঠাক করি। তারপর AI-কে বলি লেখাটা কিছুটা ছোট করতে। কিন্তু ছোট করতে গিয়ে AI আসল দরকারী কথাটিই বাদ দিয়ে ফেলে! বাধ্য হয়ে আমি সেটা আবার যোগ করি। দিনশেষে দেখা যায়, যে কাজ নিজে করলে ১০ মিনিটে হতো, এখন সেটায় আধঘণ্টা কেটে গেল। অর্থনীতিবিদরা একে উৎপাদিকা শক্তি বা productivity বলবেন কিনা জানি না, তবে আমি একে নতুন এক ধরণের কসরত বলি!
ঠিক এই কারণেই অভিজ্ঞ মানুষের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অভিজ্ঞতার বড় একটি অংশ কোনো বই বা নথিপত্র পড়ে শেখা যায় না। Stack Overflow, documentation, training data, textbook কিংবা conference paper; সব একত্র করলেও তা জীবন্ত সিস্টেম থেকে পাওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতার বিকল্প হতে পারে না। শুক্রবার রাত দশটায় কোন সার্ভারটি ডাউন হতে পছন্দ করে, কোন ক্লায়েন্ট “urgent” লিখলেও বাস্তবে তিন সপ্তাহের সময় থাকে, কিংবা কে “no rush” লিখে ঠিক ১০ মিনিট পরই ফোন দেবে; এসব তথ্য কোনো ডেটাসেটে থাকে না; একজন অভিজ্ঞ মানুষই কেবল তা জানেন!
নিয়ম দুই: মানুষের বুদ্ধি থেকেই কাঁচামাল আসে
কোড থেকে শুরু করে কনফিগারেশন; সবই হয়তো নিখুঁত। ডকুমেন্টেশনেও সব সংকেত সবুজ। অথচ সিস্টেম হঠাৎ বেঁকে বসে বলে, “আজ আর চলব না।”
ঠিক সেই মুহূর্তে, দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ব্যবস্থাটিকে আগলে রাখা অভিজ্ঞ কর্মীটি বলে ওঠেন, “একটু দাঁড়ান, ২০২২ সালে ঠিক এমন একটি সমস্যা হয়েছিল।” তারপর অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত কোনো একটি জায়গায় হাত দেবেন তিনি, যা দেখে মনে হবে এর সঙ্গে মূল ঘটনার কোনো সম্পর্কই নেই। নিমেষেই আবার সচল হয়ে উঠবে পুরো সিস্টেম। সংস্থাকেন্দ্রিক এই সঞ্চিত অভিজ্ঞতাই হলো প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি (institutional memory)।
কিন্তু কর্মদক্ষতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর অজুহাতে যদি সেই অভিজ্ঞ মানুষদের ছেঁটে ফেলে এআই-এর ওপর সব দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তা হবে বাড়ির প্রবীণদের বিদায় জানিয়ে অ্যালেক্সার কাছে পারিবারিক ইতিহাস শোনার মতো। এআই কিছুটা তথ্য হয়তো দেবে, কিন্তু পুরোপুরি জানতে পারবে না। আর সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, নিজের কোন কোন সীমাবদ্ধতা রয়েছে; সেটুকু বোঝার ক্ষমতাও তার থাকবে না।
কর্পোরেট জগতের এই নির্বিচার ছাঁটাই নিয়ে আমার উদ্বেগ এখানেই। বহু প্রতিষ্ঠানই কর্মীসংখ্যাকে কেবল খরচের খাত হিসেবে গণ্য করে। তারা অনুধাবন করে না যে কর্মীদের মস্তিষ্কেই গড়ে ওঠে কোম্পানির অলিখনীয় কর্মপদ্ধতি ও অদৃশ্য দক্ষতার ভিত্তি। কাউকে ছাঁটাই করলে শুধু বেতনের খরচই কমে না, সাথে হারিয়ে যায় সেই অমূল্য ও অলিখিত জ্ঞান। আর্থিক বিবরণী বা ব্যালেন্স শিটে সেই ক্ষতির হিসেব হয়তো ওঠে না, কিন্তু ঠিকই টের পাওয়া যায় কোনো ঘোর বিপদের বা ব্ল্যাকআউটের রাতে।
নিয়ম তিন: আপনার data-ই আপনার পরিখা
একটি জীবন্ত workflow থেকে প্রতিনিয়ত জন্ম নেয় নিত্যনতুন মূল্যবান signal। বিষয়টিকে আমি বলি surgical advantage।
অতীতের competitive moat ছিল দুর্গের চারপাশের সুবিশাল পরিখার মতো। কিন্তু বর্তমান যুগে এই moat হয়ে উঠেছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর।
আজকের দিনে আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে কিছু নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ উপাদানে:
স্বকীয় feedback loop এবং অভ্যন্তরীণ workflow
বিশেষায়িত tagging system এবং domain-specific correction history
স্পষ্ট decision trail ও exception database
গ্রাহকের সাথে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক
বাইরে থেকে প্রতিযোগী বা অন্য কারো পক্ষে এগুলো অনুকরণ করা প্রায় অসম্ভব। চাইলেই তো যেকোনো website, product feature কিংবা pricing page হুবহু copy করে ফেলা যায়। এমনকি AI-generated marketing content-ও এখন সবাই একই উৎস থেকে তৈরি করে নিচ্ছে। কিন্তু বিগত ১০ বছরের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা আর decision history কীভাবে কেউ নকল করবে?
ঠিক এখানেই আধুনিক ব্যবসাগুলোকে চরম সতর্ক হতে হবে। আজ AI দিয়ে খরচ কমানোর অন্ধ দৌড়ে সামিল হয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের মূল human workflow নষ্ট করে ফেলছে, তারা মূলত নিজেদের সুরক্ষা প্রাচীর বা moat-কেই বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। পরিণতিতে পরবর্তীতে তারাই হতবাক হয়ে ভাববে, প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো হুট করে এত দ্রুত কীভাবে সামনে এগিয়ে গেল!
নিয়ম চার: আমরা AI-র সংক্ষিপ্ততার যুগে ঢুকছি
কতজন গ্রাহক সত্যি তা মনোযোগ দিয়ে পড়ল?
উদাহরণস্বরূপ, একটি প্রোডাক্ট টিম হয়তো ২০০টি নতুন ফিচারের আইডিয়া বের করল—চমৎকার কথা! কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর মধ্যে ঠিক কোন পাঁচটি বিষয় গ্রাহকেরা প্রকৃতপক্ষে চাচ্ছেন?
একইভাবে, একটি সফটওয়্যার টিম এআই ব্যবহার করে তিন গুণ বেশি কোড লিখে ফেলল—অভিনন্দন! কিন্তু এর ফলে বাগ কতটা বাড়ল? সেই কোডের দেখভাল কে করবে? আর মূল কথা হলো, এত কোড লেখার আদতে কোনো প্রয়োজন ছিল কি?
উৎপাদনশীলতার প্রধান বাধা অনেক সময় কাজের ধীরগতি নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন। অতীতে মানুষের উৎপাদন সীমিত ছিল বলে বাছাই করার জটিলতাও কম ছিল। তবে জেনারেটিভ এআই-এর যুগে সরবরাহের কোনো সীমা নেই, যা অপ্রতুলতার ধরনটাই বদলে দিয়েছে:
কন্টেন্ট বনাম মনোযোগ: আগে কন্টেন্টের অভাব ছিল, এখন অভাব মানুষের মনোযোগের।
খসড়া বনাম বিচারবুদ্ধি: আগে ড্রাফট বা খসড়া তৈরি করা কঠিন ছিল, এখন সঠিক বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করাই দুষ্প্রাপ্য।
উৎপাদন ক্ষমতা বনাম সূক্ষ্ম বিবেচনা: আগে উৎপাদন ক্ষমতার সীমা ছিল, আর এখন অভাব দাঁড়িয়েছে কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ, কোনটা জরুরি, কোনটা পরে করলেও চলবে, কিংবা কোনটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়—তা সঠিকভাবে বেছে নেওয়ার ক্ষমতায়।
Generative AI কি তাহলে শেষ?
AI মোটেই হারিয়ে যাচ্ছে না। বরং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আরও গভীরভাবে শিকড় গাড়ছে। তবে, কোনো কিছু “AI-generated” হওয়া মানেই যে সেটি মানসম্মত, সেই ধারণা আর টিকছে না।
প্রযুক্তির এই বিবর্তন নতুন কিছু নয়:
একসময় একটি নিজস্ব website থাকা ছিল আভিজাত্যের প্রতীক, যা পরবর্তীতে অতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়।
একইভাবে, mobile app থাকাটা একসময় আধুনিকতার মাপকাঠি হলেও পরে মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করে—নিছক একটা অ্যাপের জন্য ফোনে অহেতুক জায়গা ছাড়ব কেন?
আজ AI-এর ক্ষেত্রটিও ঠিক একই মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে বলেই কোনো feature বানিয়ে ফেলা এক জিনিস, কিন্তু গ্রাহক বা মানুষ আদৌ সেটা চাচ্ছে কি না—এখন সেটাই আসল প্রশ্ন।
আমাদের চারপাশে এখন এমন অপ্রয়োজনীয় AI feature-এর পাহাড় জমেছে, যার বাস্তব চাহিদা কারো ছিল না:
Email লেখার AI
Email পড়ার AI
Meeting করার AI
Meeting-এ না যোগ দিয়ে তার summary এবং সেই summary-এর ওপর আরও একটা summary বানানোর AI
আমি আসলে এমন একটা বুদ্ধিমান AI-এর অপেক্ষায় আছি, যা সোজা বলে দেবে—“এই meeting-টা করারই কোনো দরকার নেই।” সত্যি বলতে, আসল productivity বা কার্যকারিতা তো সেদিনই শুরু হবে!
পঞ্চম নিয়মটা লেখা নেই
কাকে বিশ্বাস স্থাপন করা যায়, কোন ঝুঁকি নেওয়া সমীচীন, কোন ভুল মেনে নেওয়া সম্ভব, কিংবা কার ক্ষতির মুখোমুখি হলে ক্ষান্ত হওয়া প্রয়োজন—এগুলো সাধারণ হিসেব-নিকেশের বিষয় নয়। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার হাতে কোন দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া যাবে আর কোন কাজ মানব মস্তিষ্কের জন্যেই সংরক্ষিত থাকা আবশ্যক, তা সম্পূর্ণটাই বিচারবুদ্ধিসাপেক্ষ বিষয়। এই মানবিক বিচারবোধ এক দিনে গড়ে ওঠে না; বাস্তব অভিজ্ঞতার কষাঘাত, অতীত ইতিহাস, বারংবার ভুল ও ব্যর্থতা, সম্পর্ক এবং অর্পিত দায়িত্বের সমষ্টিই এই ধারণাকে জন্ম দেয়।
আমি প্রযুক্তির সুবিধা পুরোপুরি গ্রহণ করার পক্ষপাতি—সময় বাঁচাতে, নিখুঁত বিশ্লেষণের প্রয়োজনে কিংবা একঘেয়ে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমি ব্যবহার করি এবং ভবিষ্যতেও করব। তবে মূল নিয়ন্ত্রণ কিংবা চালকের আসনটি মানুষের হাতেই থাকা কাম্য। গাড়ি যতই প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত কিংবা বুদ্ধিমান হোক না কেন, চূড়ান্ত গন্তব্য নির্দিষ্ট করার দায়িত্ব মানুষেরই থাকে।
যেদিন গাড়ি নিজেই নিজের গন্তব্য ঠিক করতে শুরু করবে, সেদিন আমাকে আগেই নামিয়ে দেওয়া শ্রেয়। বাকি পথটুকু আমি না হয় পথ হেঁটেই পার করে দেব। এতে অন্তত রাস্তায় চলতে চলতে অন্য মানুষদের সঙ্গে দু-দণ্ড কথা বলার সুযোগ মিলবে—যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই আধুনিক যুগে হয়তো একদিন মহামূল্যবান এক সুযোগ হয়ে দাঁড়াবে।


