কার্ল মার্কস ম্যানচেস্টার থেকে বিশ্বের মানচিত্র
The Story of Capital: What Everyone Should Know About How Capital Works by David Harvey - বইটি অবলম্বনে।
কার্ল মার্কস তাঁর পুঁজির তত্ত্ব নির্মাণ করেছিলেন উনিশ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশ শিল্পপুঁজিবাদের প্রেক্ষাপটে। ১৮৪০ থেকে ১৮৬০-এর দশক, বিশেষত ল্যাঙ্কাশায়ারের শিল্পাঞ্চল, তাঁর বিশ্লেষণের পরীক্ষাগার। তাঁর বিশ্বাস ছিল, যে দেশ শিল্পে অগ্রসর, সে অনুন্নত দেশগুলিকে তাদের ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি দেখায়। এই বিশ্বাস কতটা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক, তা বিতর্কসাপেক্ষ। জীবনের শেষদিকে রাশিয়াসহ নানা সমাজ নিয়ে গভীর নৃবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান করতে গিয়ে মার্কস নিজেই এই সরল রেখার ধারণা নিয়ে সংশয়ে পড়েন। তবু একটি বিষয় অস্বীকার করা যায় না: মধ্য উনিশ শতকের ব্রিটিশ শিল্পপুঁজির অবস্থা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল বিস্ময়কর গভীর ও বিস্তৃত।
মার্কস সৌভাগ্যবান ছিলেন এই কারণে যে, ব্রিটিশ রাষ্ট্র নিয়মিতভাবে ফ্যাক্টরি ইন্সপেক্টর, জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং পার্লামেন্টারি তদন্ত কমিশন নিয়োগ করত। শিশু শ্রম থেকে ব্যাংকিং অনুশীলন পর্যন্ত। সবকিছুর উপর তৈরি হয়েছিল বিপুল তথ্যভান্ডার। এই উপকরণের গুরুত্ব তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। অন্য দেশগুলির তথ্যের “দুর্দশা” নিয়ে তাঁর হতাশাও ছিল স্পষ্ট।
ফ্যাক্টরি ইন্সপেক্টর লিওনার্ড হর্নার, জনস্বাস্থ্য প্রতিবেদকরা, এবং পার্লামেন্টারি তদন্তকারীরা না থাকলে Capital–এর প্রথম খণ্ড অনেকটাই প্রাণহীন হতো। তার সঙ্গে যোগ হয় সমকালীন সংবাদপত্র, পুস্তিকা, অ্যান্ড্রু ইউর ও চার্লস ব্যাবেজের মতো প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের লেখা। আর ছিলেন Friedrich Engels। ম্যানচেস্টারে পারিবারিক কারখানায় কাজ করতে করতে শ্রমজীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে যিনি The Condition of the Working Class in England লিখেছিলেন। আইরিশ শ্রমজীবী সঙ্গিনী মেরি বার্নসের চোখ দিয়ে এঙ্গেলস যে দারিদ্র্য দেখেছিলেন, তা মার্কসীয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মাটিকে আরও শক্ত করে।
এই মাটির গন্ধই মার্কসের লেখায় নির্ভুলতা ও সত্যতার আবহ এনে দেয়। একই সঙ্গে এখানেই প্রশ্ন ওঠে; ম্যানচেস্টারের বিশেষ অভিজ্ঞতা কি তাঁর তত্ত্বকে আংশিকভাবে অ্যাংলো-কেন্দ্রিক বা ইউরোকেন্দ্রিক করে তুলেছিল?
পুঁজিবাদ নিজেই ইউরোপীয় উৎপত্তির। শিল্পরূপে তার জন্ম ব্রিটেনে, সেখান থেকে বিশ্বে বিস্তার। কিন্তু বিস্তার মানেই অভিযোজন। কোথাও প্রোটো-পুঁজিবাদী গঠন, কোথাও বিকাশরুদ্ধ অঞ্চল। মার্কসকে ভাবতে হয়েছে আমেরিকার দক্ষিণের দাসপ্রথা, ইতালির দক্ষিণের পশ্চাদপদতা, কিংবা উপনিবেশিক বাজারের প্রশ্ন।
তিনি মধ্য উনিশ শতকের ব্রিটেনের বিশেষত্ব থেকে পুঁজির সার্বজনীন চরিত্র নির্যাস করেছেন। Adam Smith ও David Ricardo-এর মতোই তাঁর প্রশ্ন ছিল কীভাবে বিচিত্র সামাজিক বাস্তবতা থেকে কয়েকটি সর্বজনীন ধারণা তৈরি করা যায়, যা পুঁজির “laws of motion” ব্যাখ্যা করতে সক্ষম?
আজও প্রশ্ন রয়ে গেছে চীন, বাংলাদেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা যুক্তরাষ্ট্রে এই আইন সমানভাবে কাজ করে কি?
ম্যানচেস্টারের তুলা নির্ভর করত আমেরিকার দাসশ্রমের উপর। বাজার ছিল ভারত ও চীনে। ১৮৫৭-৫৮ সালের সিপাহী বিদ্রোহ দমন, দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ , এসবই ব্রিটিশ পুঁজির বাজার রক্ষার কৌশল। মার্কস দেখেছেন, কীভাবে রেলপথ নির্মাণ ভারতকে “উৎপাদনশীল” উপনিবেশে রূপান্তরিত করে, দেশীয় হস্ততন্তু শিল্প ধ্বংস করে ব্রিটিশ বস্ত্রপণ্যে বাজার প্লাবিত করে।
এই বিশ্বায়নের ভাষা তিনি ও এঙ্গেলস লিখেছিলেন The Communist Manifesto-তে; বুর্জোয়া বিশ্ববাজার সৃষ্টি করে উৎপাদন ও ভোগকে বিশ্বজনীন চরিত্র দেয়, জাতীয় সীমা ভেঙে দেয়, এবং বিশ্বসাহিত্যের জন্ম ঘটায়।
যদি মার্কস ম্যানচেস্টারের বদলে বার্মিংহামকে কেন্দ্রে রাখতেন, তবে তাঁর তত্ত্বের ভাষা ভিন্ন হতে পারত। বার্মিংহাম ছিল ধাতু ও যন্ত্রনির্মাণের কেন্দ্র, অস্ত্রশিল্পের ঘাঁটি। এখানে দক্ষ শ্রমিকের মূল্য ছিল বেশি, জাতিগত বিভাজনের চেয়ে দক্ষতার গুরুত্ব বড়। শিল্পের সঙ্গে রাষ্ট্রের সামরিক চুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যয়, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। সব মিলিয়ে ভিন্ন এক পুঁজিবাদী গতি।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে “military-industrial complex”, বা রেগান আমলের “military Keynesianism”—এসব এমন বাস্তবতা, যা মার্কসের সময়ে কল্পনার বাইরে ছিল। ফলে প্রশ্ন ওঠে: শিল্পপুঁজির আইন কি বাণিজ্যিক, আর্থিক, বা সামরিক পুঁজির ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত থাকে?
ম্যানচেস্টারের কারখানায় দক্ষতা স্থানান্তরিত হয় যন্ত্রে। ফল ডি-স্কিলিং। আইরিশ অভিবাসী ও নারীরা কম মজুরিতে কাজ করে মজুরি কাঠামোকে নিচে নামায়। শুরুতে মার্কস আইরিশদের কঠোর সমালোচনা করলেও পরে বুঝেছিলেন শ্রেণিসংগ্রামের শর্ত হল শ্রমশক্তির সমন্বিত উন্নতি। শ্রমিক শ্রেণির ভেতরে লিঙ্গ, জাতি, জাতীয়তা ও ধর্মভিত্তিক বিভাজন পুঁজির জন্য সুবিধাজনক। এই অন্তর্দৃষ্টি আজও প্রাসঙ্গিক।
২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধস, শেনঝেনের ফক্সকন কারখানায় শ্রমিক আত্মহত্যা, অ্যামাজন গুদাম, সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিশ্রম। আমারএসবের মধ্যে কি আমরা উনিশ শতকের প্রতিধ্বনি শুনি না? উৎপাদন বিশ্বায়িত, কিন্তু শ্রমের শর্তে অদ্ভুত ধারাবাহিকতা।
পুঁজির ভৌগোলিক অসমতা তত্ত্বকে প্রভাবিত করে। যেমন মার্কসের সময়ে হেনরি কেরির প্রোটেকশনিজম আমেরিকার “infant industry”-র স্বার্থ রক্ষা করেছিল, তেমনি লাতিন আমেরিকায় ইসিএলএ-র আমদানি-বিকল্প শিল্পনীতি বা পরবর্তীকালে নব্যউদার ফ্রি-ট্রেড নীতিও ছিল ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক বাস্তবতার ফল।
মার্কসের কাছে সমাজতন্ত্র ছিল ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ভিত্তিতে নির্মিত নেগেশন; যা তৎকালীন শোষণ ও বিচ্ছিন্নতার প্রতিক্রিয়া। আজকের সমাজতান্ত্রিক কল্পনাও ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় ও পরিবর্তনশীল হতে হবে। স্থির ইউটোপিয়া নয়, বাস্তব বিশ্লেষণ দরকার; আজকের “ফ্যাক্টরি ইন্সপেক্টর”-দের সমতুল্য তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান।
আজ তথ্যের অভাব নেই, বরং প্রাচুর্য। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ওওসিডি; সবাই রিপোর্ট দিচ্ছে। কিন্তু তথ্যের ভিড়ে বিশ্লেষণের স্পষ্টতা হারিয়ে যায়। ভুয়া খবর, মতাদর্শগত ধোঁয়াশা, বিশেষজ্ঞের বিভ্রান্তি, সব মিলিয়ে সামগ্রিক চিত্র ধরা কঠিন।
মার্কস ইউরোকেন্দ্রিক ছিলেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু পুঁজিবাদ নিজেই ইতালীয় নগররাষ্ট্র থেকে নেদারল্যান্ডস, সেখান থেকে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র; ক্রমে বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তার করেছে। আজ চীন কি নতুন কেন্দ্র? প্রশ্ন থাকে।
তবু আমরা এখনো পুঁজির শাসনে বাস করি। শ্রমশক্তির পুনরুৎপাদন থেকে মূলধনের সঞ্চয়; এই সমগ্র প্রক্রিয়ার ভেতরে বিচ্ছিন্নতা যখন সর্বত্র, তখন ঐতিহাসিক বস্তুবাদী পদ্ধতি এখনও কার্যকর অনুসন্ধানের হাতিয়ার।
সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি যদি গড়তে হয়, তবে তা শ্রমক্ষমতার পূর্ণ সঞ্চালন ও পুঁজি সঞ্চয়ের ছেদবিন্দুতে জন্ম নেওয়া দ্বন্দ্বকে বুঝে। অন্যথায়, সমকালীন অর্থনীতির “so-called analysis” আমাদের চোখে ধুলো দিতেই থাকবে।




