কালচারাল হেজিমনি
মানুষ নিজেরাই যেন বলে ওঠে, হ্যাঁ, এটাই ঠিক। এটাই স্বাভাবিক। এটাই বাস্তব। এই স্তরটাই সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা হেজিমনি।
ক্ষমতাবান শাসকরা নাকি ফুলের আড়ালে লাঠি নিয়ে ঘোরে। লাঠিটা পেছনের ঘরে থাকে। ফুলটা সামনে। আর আমরা ফুলের গন্ধ নিতে নিতে ভুলে যাই, পেছনের ঘরে কী ঝোলানো আছে। মার্ক্স যদি ঠিক হন, যদি পুঁজিবাদ সত্যিই শোষণ, বৈষম্য, পুনরাবৃত্ত সংকট আর বিচ্ছিন্নতার উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তা হলে প্রশ্নটা ওঠে: এত মানুষ এই ব্যবস্থাকে মেনে নেয় কেন? কেন এই সামাজিক কাঠামো, যা একদিকে কয়েকজনের জন্য ট্রিলিয়ন ডলার আর অন্যদিকে অগণিতের জন্য ফাঁকা পকেট? কেন তাকে আমরা স্বাভাবিক বলে ভাবি? কেন মনে হয়, এর বাইরে আর কিছু নেই?
আমার এক বন্ধু বলেছিল উত্তর দুটি। এক, মানুষ অজ্ঞ। দুই, মিডিয়া ব্রেনওয়াশ করছে। যেন গোটা পৃথিবী এক বিশাল টেলিভিশন, রিমোট হাতে কর্পোরেট বোর্ডরুমে বসে কেউ চ্যানেল বদলে দিচ্ছে। উত্তরগুলোতে একটু স্বস্তি আছে। কারণ তাতে আমরা ভাবতে পারি, সমস্যাটা আমাদের না। কেউ আমাদের ঠকাচ্ছে। আমরা নিরীহ। কিন্তু শাসন যদি এতই সরল হত, তা হলে ইতিহাস অনেক আগেই অন্যরকম হত।
এখানে এসে হাজির হন আমার খুব প্রিয় একজন দার্শনিক Antonio Gramsci। বিশ শতকের শুরুর দিকে ইতালিতে বসে তিনি একটা প্রশ্ন তুলেছিলেন। কেন পশ্চিম ইউরোপে বিপ্লব হল না? কেন উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে শ্রমিকরা রাষ্ট্র ভাঙল না? কেন সংকট এলেও সিস্টেম ভেঙে পড়ল না? তিনি উত্তর খুঁজলেন জেলের ভেতর থেকে। তাঁর বিখ্যাত কারাগারের নোটবইগুলোতে। আর সেখানে তিনি বললেন, শাসন দুই রকম। এক, জবরদস্তি। দুই, নৈতিক ও বৌদ্ধিক নেতৃত্ব। তিনি লিখেছিলেন, এক সামাজিক গোষ্ঠীর আধিপত্য প্রকাশ পায় ‘ডমিনেশন’ আর ‘ইন্টেলেকচুয়াল অ্যান্ড মোরাল লিডারশিপ’; এই দুই পথে।
প্রথমটা আমাদের চেনা। পুলিশ, আদালত, কারাগার, সেনাবাহিনী। দ্বিতীয়টা বেশি সূক্ষ্ম। সম্মতি। মানুষ নিজেরাই যেন বলে ওঠে, হ্যাঁ, এটাই ঠিক। এটাই স্বাভাবিক। এটাই বাস্তব। এই দ্বিতীয় স্তরটাই সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা হেজিমনি। পশ্চিমা পুঁজিবাদী সমাজে প্রতিদিন রাস্তায় ট্যাঙ্ক নামাতে হয় না। লাঠি দেখাতে হয় না। কারণ মানুষ নিজেই বিশ্বাস করে, এই ব্যবস্থাই যুক্তিযুক্ত। এই বিশ্বাসটাই শাসনের মূলধন। এখানে একটা বড় ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। অনেক মার্ক্সবাদী ভেবেছিলেন, অর্থনৈতিক সংকট এলেই মানুষ সচেতন হয়ে উঠবে। বেকারত্ব বাড়বে, মজুরি কমবে, মানুষ রাস্তায় নামবে। যেন সংকট একধরনের স্বয়ংক্রিয় বিপ্লব-যন্ত্র। কিন্তু সংকট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিপ্লব ঘটায় না। বরং প্রায়শই সংকটের ব্যাখ্যা কে দিচ্ছে, সেটাই বড় প্রশ্ন। যখন অর্থনীতি ধসে, তখন বলা হয়, তুমি যথেষ্ট পরিশ্রম করোনি। রাষ্ট্র বলবে, কৃচ্ছ্রসাধনই দায়িত্ব। মিডিয়া বলবে, সমস্যাটা নৈতিক অবক্ষয়ের। সিস্টেমিক ত্রুটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতায় রূপান্তরিত হয়। এইখানেই হেজিমনির কাজ। এটা এমন এক মানসিক কাঠামো, যার মধ্যে দাঁড়িয়েই আমরা চাপকে বুঝি।
গ্রামশি বলেছিলেন, প্রত্যেক শ্রেণি তার নিজের মধ্যেই ‘বুদ্ধিজীবী’ তৈরি করে। এখানে বুদ্ধিজীবী মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নন। ম্যানেজার, সাংবাদিক, শিক্ষক, পুরোহিত, কর্পোরেট কনসালট্যান্ট, ইউটিউব মোটিভেশনাল গুরু; সবাই। তারা সমাজকে ব্যাখ্যা করে। অর্থ দেয়। মানে তৈরি করে। এই মানে তৈরির মধ্য দিয়েই শাসন স্থায়ী হয়। হেজিমনি মিথ্যার উপর দাঁড়াতে পারে না। বরং বাস্তব অভিজ্ঞতাকে এমনভাবে সাজায়, যাতে শেষ পর্যন্ত তা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। তুমি পরিশ্রম করছ, কিছু সাফল্য পাচ্ছ; তাই মনে হচ্ছে সিস্টেম কাজ করছে। তোমার ব্যর্থতা হলে বলা হচ্ছে, তুমি যথেষ্ট চেষ্টা করোনি। ফলে সিস্টেম প্রশ্নাতীত থাকে।
গ্রামশি ‘কমন সেন্স’ নিয়ে লিখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সাধারণ বোধ কোনও সুসংহত দর্শন নয়। এটা নানা যুগের টুকরো টুকরো ধারণার জটলা। সেই জটলার মধ্যেই পুঁজিবাদ ঢুকে পড়ে। কিছু ধারণা সেখানে এমনভাবে বসে যায়, যেন চিরন্তন সত্য। যেমন: বাঁচতে হলে শ্রম বিক্রি করতেই হবে। কঠোর পরিশ্রমের পুরস্কার নিশ্চিত। দরিদ্রতা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা। প্রতিযোগিতা মানব-স্বভাব। বাজার নিরপেক্ষ। এই কথাগুলো শুনতে নিরীহ। কিন্তু এগুলোই সামাজিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক করে তোলে। মার্ক্স লিখেছিলেন, শাসক শ্রেণির ধারণাই প্রতিটি যুগে শাসক ধারণা। হেজিমনি সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে এই ধারণাগুলো ‘স্বাভাবিক’ হয়ে ওঠে।
এখানেই শেষ নয়। হেজিমনি শুধু ভাবনার স্তরে কাজ করে না। আবেগেও কাজ করে। সাফল্যের সঙ্গে মর্যাদা জুড়ে যায়। নির্ভরতার সঙ্গে লজ্জা। বেকারত্ব মানে শুধু কাজের অভাব নয়, আত্মমূল্যের সংকট। ক্লান্তি ব্যক্তিগত দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত নবউদারবাদ এই জায়গায় অসাধারণ দক্ষ। সে আমাদের বলে, তুমি একটা ছোট কোম্পানি। তোমার জীবন একটা ব্র্যান্ড। তোমার সিভি একটা প্রোডাক্ট। অনিশ্চয়তা স্বাধীনতা। প্রিকারিয়াস জীবন মানে নমনীয়তা। শোষণ অদৃশ্য হয়ে যায়, কারণ ঝুঁকি তোমার কাঁধে সরে আসে। এই স্ব-উদ্যোক্তা পরিচয়টা খুব মাদকতাময়। মনে হয়, আমি নিজের মালিক। বাস্তবে আমি নিজের ওপরই নজরদারি চালাচ্ছি নিজের ওপরই বিনিয়োগ করছি। নিজের ব্যর্থতার বিচারকও আমি নিজেই।
এ কারণেই বিকল্প কল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ আমরা নিজেদের প্রথমে প্রতিযোগী হিসেবে দেখি, নাগরিক হিসেবে নয়। সহকর্মী নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী। গ্রামশি রাষ্ট্রের চেয়ে ‘সিভিল সোসাইটি’-কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, পশ্চিমে সিভিল সোসাইটি এক শক্তিশালী দুর্গের মতো। পরিবার, স্কুল, মিডিয়া, চার্চ, কর্মক্ষেত্র; সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা। রাষ্ট্রের জবরদস্তি পেছনে থাকে, সামনে থাকে সম্মতি। তিনি আধুনিক রাষ্ট্রকে বলেছিলেন, ‘হেজিমনি প্রোটেক্টেড বাই দ্য আর্মার অফ কোয়ার্শন’। সম্মতি আছে, কিন্তু তার পেছনে শক্তির বর্মও আছে। যখন সম্মতি ভাঙে, তখন লাঠি দৃশ্যমান হয়।
তবে হেজিমনি কখনও সম্পূর্ণ নয়। কারণ পুঁজিবাদ নিজেই এমন অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যা তার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বৈষম্য বাড়ে, অনিশ্চয়তা বাড়ে, সম্পর্ক ভাঙে। কমন সেন্সের মধ্যে তাই একই সঙ্গে আনুগত্য ও ক্ষোভ থাকে। এই দ্বন্দ্বই সম্ভাবনার জায়গা। কাউন্টার-হেজিমনি তাই শুধুই তত্ত্ব দিয়ে তৈরি হয় না। সংগঠন লাগে। প্রতিষ্ঠান লাগে। স্মৃতি ও কৌশল লাগে। দৃশ্যমান প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়। প্রতিদিনের ভাষা, প্রতিদিনের ব্যাখ্যা, প্রতিদিনের আবেগ। সব জায়গায় বিকল্প নির্মাণ করতে হয়।
গ্রামশির কাছে রাজনীতি মানে শুধু নির্বাচনে জেতা ছিল না। আগে জিততে হয় অর্থের লড়াই। কমন সেন্সের ফাটল ধরাতে হয়। মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত ব্যাখ্যা দিতে হয়। পুঁজিবাদ টিকে আছে শুধু পুলিশি শক্তিতে এমনটা নয়। সে টিকে আছে কারণ সে আমাদের জীবনের গল্প লেখে। আমরা সেই গল্পে নিজেদের খুঁজে পাই। গল্প বদলানো তাই রাজনৈতিক কাজ। যে শাসন সম্মতির উপর দাঁড়ায়, তাকে প্রতিদিন সম্মতি পুনর্নির্মাণ করতে হয়। তাই সে অমর নয়। তার নিরাপত্তা যত বড়, ততটাই ভঙ্গুর। কারণ মানুষ যদি একদিন বলে, এ গল্পটা আমার নয়, তখন থেকেই ফাটল শুরু। বিজয় কখনও কেবল ব্যালট বাক্সে হয় না। হয় তখন, যখন সাধারণ বোধ বদলাতে শুরু করে। যখন মানুষ নিজের অভিজ্ঞতাকে অন্য ভাষায় পড়তে শেখে। সেই কাজটাই আসল কাজ। জয় পাওয়ার আগেই জিততে শেখা।



