জীবনকে আমরা খুব সহজে মূল্যবান বলে মেনে নিই, যতক্ষণ না তার মূল্য আমাদের সামনে কোনও হাসপাতালের সাদা দেয়ালে, কোনও মৃত্যুসংবাদের নীরবতায়, কিংবা হঠাৎ থেমে যাওয়া একটি ফোনকলের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুখে আমরা বলি, জীবনই সবচেয়ে বড় সম্পদ। কাজে তার প্রমাণ খুব কমই দিই। জীবনের অধিকাংশ সময় আমরা ভবিষ্যৎ কোন দিনের জন্য জমিয়ে রাখি, যে দিনটির অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের কোনও নিশ্চয়তা নেই।
আমি নিজেও এই অপরাধ থেকে মুক্ত নই। বরং বহু বছর ধরে ভবিষ্যৎকে জীবনের প্রধান ঠিকানা মনে করে বসে আছি। কাজ শেষ হলে পড়ব, কিছুটা অবসর পেলে লিখব, দায়িত্ব কমলে বেড়াতে যাব, শরীর ভালো থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা দেব, আর্থিক নিশ্চয়তা এলে নিজের পছন্দমতো জীবন কাটাব। এই “হলে” শব্দটির মধ্যে আমার বহু বছর বন্দি ছিল। একটির পর একটি কাজ শেষ করেছি, কিন্তু কাজের তালিকা শেষ হয়নি। বরং তালিকাটি এমন এক প্রাণী, তাকে যত খাওয়াই সে তত বড় হয়।
সকালে ঘুম ভাঙার পর আমার প্রথম কাজ সাধারণত ফোন দেখা। পৃথিবীর নানা প্রান্তে রাতের মধ্যে কী ঘটেছে, কোন ই-মেইলের উত্তর দিতে হবে, কাজের কোনও সিস্টেমে সমস্যা হয়েছে কি না, কারও পাঠানো বার্তায় জরুরি কোনও অনুরোধ আছে কি না, এইসব দেখে দিনের শুরু করি। পাশে কফির কাপ থাকে। কফি ঠান্ডা হয়ে যায়, আমি টের পাই না। জানালার বাইরে আলো বদলে যায়, সেটিও খেয়াল করি না। অথচ সেই আলোটি প্রতিদিন একই রকম থাকে না। শরতের সকালে তার রং একরকম, গ্রীষ্মের দুপুরে আরেকরকম, বৃষ্টির দিনে আরও অন্যরকম। আমি বহু বছর ধরে পৃথিবীর এই ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলি উপেক্ষা করে এমন একটি দিনের জন্য অপেক্ষা করেছি, যে দিনটি শেষ পর্যন্ত আমার হাতে ধরা দেয়নি।
কাজের পৃথিবীতে সময়ের মূল্য বোঝার অভিনয় আমরা খুব ভালো জানি। ক্যালেন্ডারে মিটিং, রিমাইন্ডার, ডেডলাইন, স্ট্যাটাস আপডেট, সাপ্তাহিক পরিকল্পনা, মাসিক ক্লোজিং। জীবনের জন্যও যেন একটি সফটওয়্যার বানানো যায়, যেখানে প্রতিটি অনুভূতির পাশে একটি টিক চিহ্ন থাকবে। আজ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো হয়েছে। আজ সন্তানের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। আজ নিজের শরীরের কথা ভাবা হয়েছে। আজ কোনও বই পড়া হয়েছে। আজ কোনও কারণ ছাড়াই জানালার পাশে বসা হয়েছে।
কিন্তু জীবনের সঙ্গে এই হিসাব মেলে না। শিশুর সঙ্গে দশ মিনিট কথা বলার সময় সে হয়তো এমন একটি প্রশ্ন করে, যার উত্তর দিতে আমাদের দশ বছর লাগে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি নীরব দুপুর কখনও কখনও দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়ে বেশি স্মৃতি রেখে যায়। প্রিয় মানুষের পাশে বসে থাকা, অথচ কোনও গুরুত্বপূর্ণ কথা না বলা, বহু সময়ে সম্পর্কের সবচেয়ে গভীর প্রকাশ। আমরা অবশ্য সেই মুহূর্তগুলির মূল্য বুঝতে পারি পরে, যখন মুহূর্তটি অতীতের সম্পত্তি হয়ে গেছে।
আমার ছেলের সঙ্গে এমন অনেক সন্ধ্যা কেটেছে যখন সে তার দিনের গল্প বলতে চেয়েছে, আর আমি কম্পিউটারের পর্দায় চোখ রেখে “হুঁ”, “ঠিক আছে”, “তারপর?” বলে গেছি। কথাগুলি যথাস্থানে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মনটি ছিল অন্যত্র। সে হয়তো স্কুলে কোনও বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়ার কথা বলছিল, কোনও শিক্ষক কী বলেছেন তা বোঝাচ্ছিল, অথবা ফুটবল খেলতে গিয়ে কীভাবে গোল করেছে তা জানাচ্ছিল। তখন আমার কাছে ঘটনাগুলি ছোট মনে হয়েছে। এখন বুঝি, তার শৈশবের প্রতিটি ছোট ঘটনা তার নিজের কাছে একটি মহাদেশ ছিল। আমি সেই মহাদেশের উপকূলে দাঁড়িয়ে অনেকবার ই-মেইল পড়েছি।
সন্তানরা আমাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে খুব ধীরে, আবার খুব দ্রুত। প্রতিদিনের চোখে পরিবর্তন ধরা পড়ে না। একই মুখ, একই কণ্ঠ, একই জুতো, একই স্কুলব্যাগ। তারপর একদিন দেখি, সে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে বই পড়ছে, নিজের পছন্দের গান শুনছে, কিংবা এমন কোনও বিষয়ে মতামত দিচ্ছে যার সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। তখন মনে হয়, এত দিন কোথায় ছিলাম? উত্তরটি অস্বস্তিকর। আমি ছিলাম, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে ছিলাম না।
“বর্তমান মুহূর্তে বাঁচো” কথাটি শুনলে আমার একসময় বিরক্তি লাগত। কথাটি এত বেশি ব্যবহৃত হয়েছে যে তার শরীর থেকে অর্থের গন্ধ অনেকটাই উবে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই উপদেশের পাশে পাহাড়, সমুদ্র, সূর্যাস্ত এবং হাসিমুখের ছবি বসানো থাকে। মনে হয়, বর্তমানকে উপভোগ করতে হলে প্রথমে একটি সুন্দর দৃশ্য, দ্বিতীয়ত যথেষ্ট টাকা, তৃতীয়ত কয়েক দিনের ছুটি এবং চতুর্থত একটি ভালো ক্যামেরা দরকার। সাধারণ রান্নাঘর, অফিসের ক্লান্তি, বাচ্চার হোমওয়ার্ক, ট্রাফিক, বাসন ধোয়া, ওষুধ খাওয়া, বিল দেওয়া, এসবের মধ্যে বর্তমান মুহূর্তের কোনও মর্যাদা নেই যেন।
অথচ জীবনের অধিকাংশ অংশ এই সাধারণ জায়গাগুলিতেই পড়ে থাকে। বড় ভ্রমণের ছবি অ্যালবামে জমা হয়, কিন্তু ভোরে ঘুম ভাঙার পর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা কফির গন্ধও আমাদের জীবনের অংশ। কোনও প্রিয় বইয়ের মলাটে হাত বোলানোর অনুভূতি, শীতের সকালে গাড়ির কাচে জমে থাকা শিশির, দীর্ঘ অফিস-দিনের পর বাড়ির দরজা খোলার শব্দ, সন্তানের ঘুমন্ত মুখ, সঙ্গীর অকারণ অভিমান, বাজারের ব্যাগ নামিয়ে রাখার পর এক গ্লাস ঠান্ডা জল, এগুলির কোনওটির জন্য আলাদা স্মারক তৈরি হয় না। অথচ জীবন গড়ে ওঠে এদের সমবায়ে।
আমি বহু বছর ধরে বই পড়েছি, বই কিনেছি, বইয়ের তাক ভরেছি। বই আমার কাছে আনন্দ, আশ্রয়, কখনও কখনও আত্মপ্রবঞ্চনাও। একটি বই খুলে বসে মনে হয়েছে, আজ পৃথিবীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক স্থগিত থাকুক। এই ইচ্ছা পুরোপুরি অন্যায় নয়। পাঠ আমাদের নিজের ভিতরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বইয়ের মধ্যেও কখনও কখনও বাস্তব জীবন থেকে পালানোর ব্যবস্থা করে ফেলি। ঘরের মানুষ কথা বলছে, ফোন বাজছে, জানালার বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, আর আমি এমন এক মৃত লেখকের সঙ্গে তর্ক করছি যিনি আমার উপস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।
বই আমাকে জীবন বুঝতে সাহায্য করেছে, কিন্তু বই পড়ে জীবন যাপন করা যায় না। জীবনের পাতাগুলি অনেক সময় অসম্পাদিত, ব্যাকরণবিরোধী এবং পুনর্মুদ্রণ অযোগ্য। সেখানে ভুল বাক্য থাকে, অসমাপ্ত অনুচ্ছেদ থাকে, এমন চরিত্র থাকে যাদের বাদ দিতে চাইলেও বাদ দেওয়া যায় না। কোনও কোনও দিন নিজের জীবনকেই সম্পাদনা করতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, এই ব্যর্থতা মুছে দিই, এই অপমানটি কেটে দিই, এই সম্পর্কের অধ্যায়টি নতুন করে লিখি। পরে বুঝি, মুছে ফেলার ক্ষমতা মানুষের হাতে নেই। কেবল পরের বাক্যটি একটু সচেতনভাবে লেখা যায়।
শরীরও আমাদের এই সত্যটি মনে করিয়ে দেয়। শরীরের যন্ত্রণা শুরু হলে আমরা বুঝতে পারি, এত দিন যে শরীরটি আমাদের নির্বিঘ্নে বহন করেছে তাকে কত সামান্য ধন্যবাদ দিয়েছি। কাঁধে ব্যথা থাকলে জামা পরা কঠিন হয়ে যায়, চুল আঁচড়ানো কঠিন হয়ে যায়, ঘুমের ভঙ্গি বদলে যায়। তখন বুঝি, স্বাধীনতা কোনও বিমূর্ত রাজনৈতিক শব্দমাত্র নয়। নিজের হাতটি মাথার ওপর তুলতে পারা, সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারা, দীর্ঘক্ষণ বসে না থেকে উঠে দাঁড়াতে পারা, ব্যথাহীনভাবে ঘুম থেকে জাগা, এগুলিও স্বাধীনতার দৈনন্দিন রূপ।
আমরা সুস্থ থাকাকালে শরীরকে একটি স্বাভাবিক অধিকার বলে ধরে নিই। শরীর আমাদের সঙ্গে কোনও চুক্তি করেনি, তবু আমরা মনে করি সে চিরকাল একইভাবে কাজ করবে। তার ক্ষুদ্র সংকেতগুলি উপেক্ষা করি, বিশ্রামকে অলসতা ভাবি, ক্লান্তিকে চরিত্রের দুর্বলতা বলি। তারপর একদিন শরীর আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে না, সরাসরি নোটিশ পাঠায়। তখন ক্যালেন্ডারের সমস্ত পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। বিছানা, ওষুধ, জল, ঘুম এবং জানালার বাইরের আকাশই দিনের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা যাদের হয়েছে, তাঁরা প্রায়ই বলেন, জীবনের প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। কথাটি সত্যি হতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হয় কি না, সে বিষয়ে আমার কিছু সংশয় আছে। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে মানুষ আবার রাগ করে, অহংকার করে, অন্যায়ভাবে কষ্ট দেয়, নিজের কষ্টকে পৃথিবীর একমাত্র কষ্ট বলে মনে করে। আমিও করেছি। কোনও গভীর উপলব্ধি মানুষের পুরোনো অভ্যাসকে এক দিনে পরাজিত করতে পারে না। জীবনকে মূল্যবান মনে করলেই মানুষ ধৈর্যশীল, কোমল এবং সুবিচারী হয়ে ওঠে না। আমরা জ্ঞান অর্জন করি, তারপর সেটি ভুলে যাই; আবার কোনও সকাল আমাদের মনে করিয়ে দেয়।
সেই সকালটি কখনও হতে পারে হাসপাতালের পর্দা সরিয়ে দেখা নীল আকাশ। কখনও সন্তানের হাত। কখনও বহুদিন পরে পড়া একটি বাক্য। কখনও এমন একজন মানুষের মৃত্যু, যার সঙ্গে শেষবার কথা বলার সময় আমরা ব্যস্ততার অজুহাতে কথাটি সংক্ষিপ্ত করেছিলাম। কখনও রান্নাঘরের জানালা দিয়ে দেখা এক টুকরো আলো, যা মেঝের ওপর এসে পড়ে এবং কয়েক মিনিটের জন্য ধুলিকণাগুলিকে দৃশ্যমান করে তোলে। পৃথিবী তখন আমাদের কোনও দার্শনিক শিক্ষা দেয় না। কেবল বলে, তুমি এখানে আছ।
এই “এখানে থাকা”র মধ্যে গভীর কোনও কৌশল নেই। ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে, কাজ করতে হবে, অর্থ সঞ্চয় করতে হবে, সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের নিরাপত্তা, নিজের দায়িত্ব, সবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানের নামে ভবিষ্যৎকে অবহেলা করলে জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্মাণের কাজে বর্তমানকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিলে আমরা এমন এক বাড়ি তৈরি করি যেখানে প্রবেশ করার সময় আর থাকে না।
আমি এখনও ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করি। এখনও ভাবি, কিছু কাজ শেষ হলে একটু নিশ্চিন্ত হব। এখনও কখনও কফি ঠান্ডা করে ফেলি, জানালার আলো দেখতে ভুলে যাই, প্রিয় মানুষের কথা অর্ধেক শুনি। পার্থক্য কেবল এই যে, এখন মাঝেমধ্যে নিজের অনুপস্থিতি টের পাই। তখন বই বন্ধ করি, ফোনটি উল্টো করে রাখি, ঘরের দিকে তাকাই। দেখি, জীবন কোনও দূরবর্তী অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে না। জীবন ইতিমধ্যে টেবিলের ওপর রাখা, ব্যবহারে ক্ষয়ে যাওয়া কাপটির মতো, সন্তানের ছড়িয়ে রাখা জুতোর মতো, বিকেলের ক্লান্ত শরীরের মতো, জানালায় এসে থেমে থাকা আলোর মতো।
আমরা তার দিকে তাকাই বা না তাকাই, সে তার পূর্ণতা নিয়ে উপস্থিত থাকে। আমাদের কাজ সম্ভবত তাকে আরও সুন্দর করে তোলা নয়, বরং তার উপস্থিতি একেবারে শেষ হয়ে যাওয়ার আগে মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাকানো।


