দশ হাজার বই, ছশো বর্গফুট, এবং সভ্যতার অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র
সক্রেটিস বিষ খেয়েছিলেন, গ্যালিলিও হাঁটু গেড়েছিলেন, মেন্ডেলকে বই কমাতে বলা হয়েছে। প্রত্যেক যুগ তার বুদ্ধিজীবীকে যুগোপযোগী শাস্তি দেয়।






মেন্ডেল উমিনার নিজেকে বই-জমানো রোগী মনে করেন না। তাঁর বাড়িওয়ালা অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেছেন। গণতন্ত্রে মতের অমিল থাকেই। কেউ মনে করেন বই মানুষের আত্মার জানালা, কেউ মনে করেন একই বই যথেষ্ট সংখ্যায় জড়ো হলে তা অগ্নিকাণ্ডের প্রাক্-প্রস্তুতি। নিউ ইয়র্কের বাড়িওয়ালারা দ্বিতীয় দর্শনের অনুগামী। সক্রেটিস বিষ খেয়েছিলেন, গ্যালিলিও হাঁটু গেড়েছিলেন, মেন্ডেলকে বই কমাতে বলা হয়েছে। প্রত্যেক যুগ তার বুদ্ধিজীবীকে যুগোপযোগী শাস্তি দেয়।
মেন্ডেল উমিনার তখন একত্রিশ বছরের যুবক। ইহুদি পণ্ডিত, লেখক, হিব্রু অনুবাদক, পত্রিকা-সম্পাদক, ধূমপায়ী এবং এককক্ষের মধ্যে দশ হাজার বই ঢোকানোর কারিগর। ম্যানহাটনের আপার ইস্ট সাইডে, সেন্ট্রাল পার্ক থেকে এক ব্লক দূরে, ছশো বর্গফুটের একটি স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট পেয়ে তিনি ভাবলেন, অবশেষে জীবন তাঁকে তার প্রাপ্য সম্মান দিয়েছে। অন্য মানুষ ওই আকারের ঘরে খাট, সোফা, খাবার টেবিল, জুতোর তাক, হয়তো একটি গাছ রাখে। মেন্ডেল সেখানে সভ্যতার সংক্ষিপ্ত সংস্করণ বসালেন।
মোট দশ হাজার বই।
দেয়াল বরাবর উঠে গেল জুডাইকা। বাথরুমে স্থান পেল চলচ্চিত্র-সমালোচনা ও অপেরার ইতিহাস। জানালার সামনে নাটক এবং কবিতা এমনভাবে দাঁড়াল যে সূর্যালোককে ঢুকতে হলে প্রথমে ব্রেখট, ইবসেন ও সম্ভবত ইয়েটসের অনুমতি নিতে হয়। মেঝেতে পুরনো উপন্যাসের মধ্যে তিনি একটি ম্যাট্রেস পাতলেন। মানুষ সাধারণত বই পড়ে ঘুমায়। মেন্ডেল বইয়ের মধ্যে ঘুমাতেন। তাঁর শোবার জায়গা দেখে মনে হতে পারে, কোনও গ্রন্থাগার ভূমিকম্পে পড়ে গেছে এবং ধ্বংসস্তূপের নীচে একজন পাঠক স্বেচ্ছায় বসবাস শুরু করেছেন।
তাঁর জীবন ভালোই চলছিল। দুপুর নাগাদ ঘুম ভাঙত। তারপর রোদে ভেজা শেজলংয়ে বসে ইদ্দিশ লেখক খাইম গ্রাদে, সাহিত্যসমালোচক এডমন্ড উইলসন এবং যাঁদের নাম উচ্চারণ করতেই সাধারণ পাঠকের দুপুরের ঘুম এসে যায়, তাঁদের পড়তেন। বাইরে নিউ ইয়র্ক হর্ন বাজাচ্ছে, শেয়ারবাজার উঠছে, মানুষ প্রেম করছে, ভাড়া বাড়ছে, ট্যাক্সি গালি দিচ্ছে। ভিতরে মেন্ডেল কোনও মৃত লেখকের তৃতীয় খণ্ডের পাদটীকা থেকে জীবন উদ্ধার করছেন।
তিনি বলেছেন, তিনি সারাক্ষণ পড়েন। জ্ঞান নিষ্কাশনের জন্য পড়েন। তাঁর মালিকানাধীন প্রত্যেকটি বই তাঁর দরকার। তাঁর গ্রন্থাগার তাঁর জীবন-পরিচালিকা।
সাধারণ মানুষের জীবন-পরিচালিকা চার পাতার হয়: কম খাও, একটু হাঁটো, ট্যাক্স দাও, ঘুমাও। মেন্ডেলের ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল দশ হাজার খণ্ডের। সেখানে কুর্দি প্রশ্ন থেকে স্তালিন-পরবর্তী রুশ থিয়েটার, আব্রাহাম রাইজেনের কবিতা থেকে অষ্টাদশ শতকের পোলিশ ইহুদির ঘোড়া, সবই আছে। কারণ জীবন কখন কোন প্রশ্ন করবে বলা যায় না। সকালে দাঁত মাজতে মাজতে হঠাৎ যদি জানতে ইচ্ছে করে, রুশ থিয়েটার স্তালিনের পরে কী করেছিল, তখন গুগলের ওপর নির্ভর করে একজন আত্মসম্মানী মানুষ কতদিন বাঁচবে?
এই অ্যাপার্টমেন্ট থেকেই মেন্ডেল চালাতেন তাঁর নতুন সাহিত্যপত্রিকা, নোটারিকন রিভিউ। পত্রিকাটি ভিন্নমতের লেখকদের লেখা ছাপবে। আজকের পৃথিবীতে এটি প্রায় পর্নোগ্রাফিক উচ্চাশা। কারণ আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে আমরা সাধারণত এমন লোককেই পড়ি, যার সঙ্গে আগেই একমত। ভিন্নমতকে পড়া হয় তাকে ভুল প্রমাণ করার জন্য, বোঝার জন্য নয়। মেন্ডেলের ইচ্ছা, তর্ক হবে, মতভেদ থাকবে, অনুবাদ থাকবে, সাহিত্য থাকবে, ইতিহাস থাকবে, এবং প্রত্যেক লেখক অন্য লেখকের নাম শুনে পুলিশ ডাকবেন না।
তাঁর ঘরে পার্টিও হত। নিউ ইয়র্কের সাহিত্যিক নিম্নবর্গ, অর্থাৎ যাঁদের প্রতিভা আছে কিন্তু স্বাস্থ্যবিমা নেই, তাঁরা এসে বিয়ার খেতেন। টলতে থাকা বইয়ের স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে বিদেশনীতি, গ্রিক কবিতা, শিল্প, রাজনীতি নিয়ে তর্ক করতেন। কারও কনুই যদি অসাবধানে একটি স্তূপে লেগে যেত, সম্ভবত বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ত। তারপরও তর্ক চলত। সভ্যতা অনেক সময় এমনভাবেই টিকে থাকে। নিচে একটি ভারী বই পড়ে, উপরে একজন বলে, “কিন্তু হেগেলকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে দেখুন।”
মেন্ডেলের বই ক্রয় অবশ্য চলতেই থাকল। থ্রিফট শপ, পুরনো বইয়ের দোকান, বই-বিক্রেতা, ইবে। ডাকপিয়ন সম্ভবত তাঁর ঠিকানা দেখলেই পরিবারের কথা ভাবতেন। বই ঢুকছে। স্তূপ বাড়ছে। ঘরের জ্যামিতি বদলাচ্ছে। মাধ্যাকর্ষণ চিন্তিত। বাড়ির ব্যবস্থাপনা আরও চিন্তিত।
মেন্ডেল বলেছেন, তিনি নিজেকে হোর্ডার ভাবেন না। ভবনটি বোধ হয় ভাবত।
এইখানে একটি মৌলিক সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব আছে। পাঠকের চোখে বই মানে জ্ঞান, স্মৃতি, মানুষ, ইতিহাস, কল্পনা, মুক্তির রাস্তা। দমকল বিভাগের চোখে বই মানে চাপা কাঠ। বিমা কোম্পানির চোখে বই মানে দাহ্য বস্তু। বাড়িওয়ালার চোখে বই মানে সম্ভাব্য মামলা। আর বই বিক্রেতার চোখে বই মানে মেন্ডেল নামের একজন আশীর্বাদপ্রাপ্ত গ্রাহক।
শীতকালে ভবন কর্তৃপক্ষ তাঁকে চিঠি দিল। ভাষাটি আইনি, শুষ্ক, যা পড়লেই মনে হয় ইংরেজি ভাষা মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।
চিঠির বক্তব্য: আপনি ভাড়াটে হিসেবে গুরুতর দায়িত্ব লঙ্ঘন করছেন। ঘর অতিরিক্ত জিনিসে ঠাসা। বইয়ের অস্বাভাবিক সঞ্চয় ঘটেছে। দাহ্য বই জমিয়ে অগ্নিবিপদ সৃষ্টি হয়েছে।
দশ হাজার বই পড়ে মানুষ জীবনের হাজার রকম ভাষা শেখে। শেষ পর্যন্ত উচ্ছেদের নোটিশ আসে তিনটি বাক্যে।
মেন্ডেল চিঠি খুলে জানতে পারলেন, তাঁর বই আগুনের ঝুঁকি এবং বই না সরালে তাঁকেও সরে যেতে হবে। তিনি প্রথমে সতর্কতা মানলেন না। তারপর উচ্ছেদের মামলা শুরু হল। তিনি আদালতে লড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
গ্রন্থাগারের ইতিহাসে বহু আক্রমণ হয়েছে। আলেকজান্দ্রিয়ায় আগুন লেগেছে। নালন্দা পুড়েছে। নাৎসিরা বই পুড়িয়েছে। মেন্ডেলের ক্ষেত্রে সভ্যতা কিছুটা উন্নতি করেছে। বইগুলো পুড়িয়ে দেয়নি, শুধু বলেছে, দয়া করে এগুলো অন্যত্র নিয়ে যান, কারণ ভবিষ্যতে পুড়ে যেতে পারে।
গত মাসের এক বিকেলে মেন্ডেল তাঁর হেলে থাকা বইয়ের মিনারের মধ্যে দাঁড়িয়েছিলেন। ফোনে ক্লেজমার সংগীত বাজছিল। তিনি বইয়ের মলাটে হাত বোলাচ্ছিলেন। দ্য রাশিয়ান থিয়েটার আফটার স্তালিন। দ্য কুর্দিশ কোয়েশ্চন ইন ইরাক। তারপর আব্রাহাম রাইজেনের কবিতার বই তুলে ধরলেন এমন স্নেহে, যে ভঙ্গিতে অন্য কেউ সদ্যোজাত সন্তান দেখায়।
তিনি জানেন, তাঁর গ্রন্থাগার অন্যদের চোখে বাড়াবাড়ি। কিন্তু তাঁর বক্তব্য, রব্বিনিক পরিবারে এমন গ্রন্থাগার দেখে কেউ দুবার তাকাত না। পাঠ তাঁর সংস্কৃতির অংশ।
কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশৃঙ্খলার সংজ্ঞাও সাংস্কৃতিক। কোনও মধ্যবিত্ত ড্রয়িংরুমে কাচের আলমারির ভিতর পঁচিশটি দামি শো-পিস শোভা পেলে, কেউ জিজ্ঞেস করে না, এতগুলি মৃত রাজহাঁসের মূর্তি কেন। শোবার ঘরে চল্লিশ জোড়া জুতো থাকলে তাকে রুচি বলা হয়। রান্নাঘরে বারো রকম ছুরি থাকলে শেফসুলভ আবেগ। গ্যারেজে তিনটি গাড়ি থাকলে সাফল্য। ঘরে দশ হাজার বই থাকলে অস্বাভাবিকতা। পুঁজিবাদ বস্তু জমাতে আপত্তি করে না। শুধু বস্তুটি যেন পড়তে হয়, এই জায়গায় সে একটু নার্ভাস।
মেন্ডেলের বইয়ের ভিতর তাঁর ধর্মীয় অতীতও আছে, তাঁর বিদ্রোহও আছে। তিনি ক্রাউন হাইটসের হাসিদিক সমাজে বড় হয়েছেন। বাড়িতে ইদ্দিশ ভাষা, দাড়িওয়ালা লুবাভিচার রাব্বি মামাদের ধর্মীয় উপদেশ, ভোজসভায় ট্রোইকা নাচ। তাঁর বাবা আইজ্যাক ছিলেন ধার্মিক রিয়েল এস্টেট ব্রোকার। বাবার সঙ্গে তোরা পড়তেন। কিন্তু ছেলেটি ধর্মগ্রন্থের পাশাপাশি সাহিত্যে ঝুঁকল। বারো বছর বয়সে দস্তয়েভস্কি পড়ছিল।
বারো বছরের বাঙালি শিশুকে আমরা তখনও জিজ্ঞেস করি, বড় হয়ে ডাক্তার হবে না ইঞ্জিনিয়ার। মেন্ডেল বারো বছর বয়সে রুশ আত্মার অন্ধকার গলিতে ঘুরছেন। অবশ্য দস্তয়েভস্কি পড়ে কেউ দ্রুত সুখী হয়েছে এমন প্রমাণ নেই। তবে দ্রুত বড় হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
কৈশোরে তিনি রাব্বিনিক্যাল সেমিনারিতে ভর্তি হলেন। সকাল সাতটায় পড়াশোনা শুরু। আরামাইক, হিব্রু, ইদ্দিশে ধর্মীয় পাঠ। রাত শেষ হত রাব্বিদের সঙ্গে ভদকা-চালিত তর্কে। কোনও কোনও বছর প্রায় কোনও নারীর মুখ দেখেননি। এই তথ্যটি শুনে আধুনিক যুবক হয়তো সেমিনারির শিক্ষাক্রমের চেয়ে ওয়াই-ফাইয়ের অবস্থা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হবে।
মেন্ডেল নিজেকে অবাধ্য এবং সংশোধনাতীত বলেছেন। কর্তৃপক্ষ যা পড়তে বলত, তা পড়তেন। তার বাইরেও নিজের ইচ্ছেমতো পড়তেন। তাঁর ধারণা, মানুষ নিজের মত প্রতিষ্ঠা করে সেখানেই। অন্যের দেওয়া পাঠের ভিতর নিজের গোপন রাস্তা কেটে। পৃথিবীকে নিজের মতো বোঝার চেষ্টা করে।
তাঁর জ্ঞানতত্ত্বটি বেশ কঠিন। কোনও বিষয়ে মত গড়লে, তার বিপক্ষে যত বই আছে, সেগুলোও পড়া দরকার। তবেই বোঝা যাবে মতটি ন্যায্য কি না। বিপরীত যুক্তি তাঁকে রাজি করাতে পারলে নিজের বিশ্বাস ছেড়ে দেবেন।
এই অভ্যাস বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত প্রাণী। এখন মতামত আগে জন্মায়, তথ্য পরে গৃহশিক্ষকের চাকরি নেয়। আমাদের বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে এমন তথ্যকে বলি প্রমাণ। না মিললে বলি প্রচার। মেন্ডেল বিপক্ষের সব বই পড়তে চান। এর মধ্যে বিনয় আছে, বাতিকও আছে। বিনয় বলে, আমি ভুল হতে পারি। বাতিক বলে, ভুল হতে পারি বলে আরও আটশো পৃষ্ঠা কিনে ফেলি।
বিশের কোঠায় তিনি ওভিড ও রুশোতে ডুবে গেলেন। গ্রিনিচ ভিলেজের ক্যাফে রেজিওতে লেখকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হল। দক্ষিণ ব্রুকলিনের জুডাইকা দোকানের চেয়ে স্ট্র্যান্ড বুকস্টোরে বেশি সময় কাটাতে শুরু করলেন। অভিষেকের এক বছর আগে বুঝলেন, তিনি যতটা বিশ্বাসী ভেবেছিলেন, ততটা নন।
দাদু-দিদা কষ্ট পেতে পারেন জেনেও তিনি ধর্মীয় পথ ছাড়লেন। আধুনিক উদার সাংস্কৃতিক নিউ ইয়র্কে ঢুকতে চাইলেন। মধ্যযুগীয় ধার্মিকতায় মাতাল হয়ে থাকতে ইচ্ছে করল না।
এই বাক্যের ভিতর একটি সম্পূর্ণ অভিবাসন আছে। ভূগোলের নয়, চেতনার। একই শহরে থেকেও একজন মানুষ শতাব্দী বদলাতে পারে। সকালে তালমুদ, বিকেলে রুশো, রাতে সিনেমা। মাথার ভিতর ধর্মতত্ত্ব ও আধুনিকতা এমনভাবে লড়ে, যেন দুজনেই একই সাবওয়ে আসনের দাবিদার।
মা ডিনা উমিনার ছেলের ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যাওয়ায় বিস্মিত হননি। ছোটবেলা থেকেই মেন্ডেল তর্ক করে অন্যকে বোঝাতে চাইত। সামান্য জ্ঞানে তার কাজ হত না।
কিছু শিশুকে একটি উত্তর দিলে তারা শান্ত হয়। কিছু শিশু দ্বিতীয় প্রশ্ন করে। তারপর তৃতীয়। তারপর বড়রা বলে, যাও বাইরে খেলো। মেন্ডেলের মতো শিশুরা বাইরে গিয়েও খেলার বদলে সম্ভবত জানতে চায়, বলের গোলাকারতা কি প্লেটোনিক আদর্শের প্রতিফলন।
কিপা সরিয়ে রেখে তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র ও দর্শন পড়লেন। ট্যাবলেট পত্রিকায় ইন্টার্নশিপ করলেন। সাতাশ বছর বয়সে স্নাতক হওয়ার পর প্যারিসের এক তরুণীর প্রেমে পড়লেন এবং প্যারিস গেলেন। প্রেমটি টিকল না। তরুণী তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। মেন্ডেল শেষ ডলার খরচ না হওয়া পর্যন্ত প্যারিস ছাড়লেন না।
প্রেম ভেঙেছে, থাকার জায়গা গেছে, টাকা ফুরিয়েছে। তিনি মারাই এলাকায় জিতান সিগারেট টেনেছেন, মেট্রোয় লুট হয়েছেন, সাহিত্যপত্র পড়েছেন। তাঁর উপসংহার, প্যারিস তাঁকে বদলে দিয়েছে।
এই হল প্রকৃত সাহিত্যিক রোমান্স। সাধারণ মানুষের প্রেম ভাঙলে সে দেশে ফিরে আসে। লেখক প্রেম ভেঙে প্যারিসের রাজনৈতিক জার্নালের বাঁধাই নিয়ে কথা বলে।
সেন নদীর ধারের বইয়ের স্টলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতেন। নুভেল রেভ্যু ফ্রঁসেজ, কনেসাঁস দেজ আর পড়ে তাঁর নিজের কাজের দিশা স্পষ্ট হল। ফরাসি পত্রিকায় মানুষ এমনভাবে যুক্তি দিচ্ছে, যেন যুক্তিটির সত্যিই কোনও মূল্য আছে। বিতর্কে স্বচ্ছন্দতা, মতের নির্ভুলতা, ইতিহাসবোধ। আমেরিকায় সবাইকে বলা হয় নিজের নির্দিষ্ট লেন বেছে নিতে। সাহিত্য করো সাহিত্য, রাজনীতি করো রাজনীতি, শিল্প নিয়ে লিখলে ধর্মতত্ত্বে ঢুকবে না, সিনেমা নিয়ে লিখলে রুশোর নাম তুলবে না। জ্ঞানের মহাসড়কে লেন বদলানো বিপজ্জনক।
মেন্ডেল সেই বিভাজন পছন্দ করেননি। তাই নোটারিকন রিভিউ। সেখানে একমত না হওয়া মানুষও পাশাপাশি ছাপা হবে। যাঁরা আগে সমাজমাধ্যমে তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন, তাঁদেরও ডেকেছেন। প্রথম মুদ্রিত সংখ্যায় জুলিয়া কর্নবার্গের গল্প, আনা ওয়েয়ান্টকে নিয়ে হেইলি জিন ক্লার্কের প্রবন্ধ, আব্রাহাম রাইজেনের একটি ইদ্দিশ গল্পের অনুবাদ থাকবে। প্রথম সম্পাদকীয় সভা হয়েছিল তাঁর স্টুডিওর মেঝেতে, পিৎজা ও বিয়ারের সঙ্গে।
পৃথিবীর বহু আন্দোলন ড্রয়িংরুমে শুরু হয়েছে। বহু পত্রিকা ক্যাফেতে। এই পত্রিকার শুরু মেঝেতে, কারণ চেয়ার রাখার জায়গা বই দখল করেছে।
মেরিন পার্কের মিজরাহি বুকস্টোরে ঢুকলে দোকানের মালিক ইসরায়েল মিজরাহি তাঁকে “মেন্ডি” বলে ডাকেন। চারদিকে প্রাচীন ইহুদি গ্রন্থ, চামড়ায় বাঁধানো তোরা। মিজরাহির মতে, ইহুদিদের বই ও জ্ঞানের সঙ্গে প্রায় রহস্যময় সম্পর্ক আছে। অতীতকে বারবার জীবিত করা, জ্ঞানের জন্য তৃষ্ণা তৈরি করা, ঘরে গ্রন্থাগার রাখা এই সংস্কৃতির অংশ।
তবু মেন্ডেল আলাদা। তাঁর কৌতূহল অতৃপ্ত। মিজরাহি দেখেছেন, তিনি অষ্টাদশ শতকের পোলিশ ইহুদিরা কী ধরনের ঘোড়া ব্যবহার করত, সেই বিষয়ে অপরিচিত কারও সঙ্গে তিন ঘণ্টা আলাপ করতে পারেন।
মানুষের সভ্যতা এমন লোকের কারণেই একদিকে এগোয়, অন্যদিকে ট্রেন মিস করে। কারণ পৃথিবীর কোথাও একজন দাঁড়িয়ে বলছে, “আচ্ছা, ঘোড়াগুলোর জাত কী ছিল?” এবং তারপর দুপুর কেটে যাচ্ছে।
মিজরাহির বিশ্বাস, শারীরিক বইয়ের মাধ্যমেই জ্ঞান সত্যিকারভাবে ধরে রাখা যায়। তাঁর মতে, সব নেশার মধ্যে বই সবচেয়ে কম বিপজ্জনক। বাড়িওয়ালার অগ্রাধিকার হয়তো অন্য দিকে। বাইরের চোখে গ্রন্থাগার বিশৃঙ্খলা মনে হতে পারে, কিন্তু মেন্ডেল প্রত্যেক বই কোথায় আছে বলতে পারবেন।
এই দাবি প্রত্যেক বই-সঞ্চয়কারী করেন। বইটি কোথায়? ওই যে, ডান দিকের তৃতীয় স্তূপের পিছনে, নীল বইটির নীচে, যার উপর গত শীতে কফির কাপ রেখেছিলাম। তারপর বই খুঁজতে তিন দিন লাগে। বই না পাওয়ার মধ্যে বইমালিকের একধরনের নৈতিক আনন্দ আছে। তিনি জানেন, বইটি হারায়নি। সভ্যতার ভিতরে সাময়িকভাবে আত্মগোপন করেছে।
মামলা কয়েক মাস চলল। ধীর আইনি কুস্তি। শেষে মেন্ডেল ৬ ইস্ট ৬৫তম স্ট্রিটের অ্যাপার্টমেন্ট ছাড়তে রাজি হলেন। ভবনটির মালিক হাকিম অর্গানাইজেশন, নিউ ইয়র্কের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী কামরান হাকিম প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি। কোম্পানি ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ মন্তব্য করেনি।
মেন্ডেলের বক্তব্য ছিল, যেখানে তাঁকে চায় না, সেখানে তিনি থাকতে চান না।
বাক্যটি প্রেম, ধর্ম, শহর, প্রতিষ্ঠান, বাড়ি, সবখানেই প্রযোজ্য। শুধু ভাড়া-নিয়ন্ত্রিত ম্যানহাটন অ্যাপার্টমেন্টের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা কঠিন। কারণ আত্মমর্যাদা বড় জিনিস, কিন্তু সেন্ট্রাল পার্ক থেকে এক ব্লকের দূরত্বও ছোট নয়।
এক গরম শুক্রবার কয়েকজন বন্ধু বই গোছাতে এলেন। যে স্তূপগুলো এতদিন সাহিত্যিক ভূপ্রকৃতির অংশ ছিল, সেগুলো বাক্সে ঢুকতে শুরু করল। মেন্ডেল গরমে ক্ষুব্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ঈশ্বর কেন তাঁদের এই তাপে অভিশাপ দিয়েছেন।
চলচ্চিত্রকার জুলিয়ান কসমা বললেন, ঈশ্বর অভিশাপ দেন না, মানুষ নিজেই নিজেকে অভিশাপ দেয়।
মেন্ডেল সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার করলেন, তিনি স্পিনোজীয় অর্থে কথাটি বলেননি। শুধু বলতে চেয়েছেন, বই সরানোর জন্য দিনটি গরম।
দশ হাজার বইয়ের সঙ্গে বসবাসের উপকার এই যে, সাধারণ বিরক্তিও দর্শনের সিলেবাস পেয়ে যায়। অন্য কেউ বলত, “ধুর, কী গরম।” মেন্ডেলকে আগে ঈশ্বরের দায়, স্পিনোজার ঈশ্বর এবং আবহাওয়ার ভাষাতত্ত্ব আলাদা করতে হয়।
তিনি ধূমপান করতে গেলে কসমা বই বাক্সে ভরছিলেন। কসমার চোখে মেন্ডেলের জীবনে এক ধরনের নিউ ইয়র্কীয় ট্র্যাজেডি আছে। ব্রুকলিনের ইয়েশিভা থেকে আসা একটি ছেলে আপার ইস্ট সাইডে নিজের কল্পিত জগৎ বানাল, তারপর সেই জগৎ তাকে প্রত্যাখ্যান করল।
আজকের নিউ ইয়র্ক পেশাদারিত্ব ও একরূপতার দিকে বাঁধা। মেন্ডেলের মতো কাউকে দেখে শহরের একটি অংশ ভাবে, লোকটির মধ্যে নিশ্চয় গোলমাল আছে। বৌদ্ধিক জীবন যে ধরনের বিচিত্রতা থেকে জন্মায়, শহর সেই বিচিত্রতার প্রতিই ক্রমশ বিরূপ।
শহর একসময় পাগল, কবি, বিপ্লবী, নির্বাসিত, ছোট পত্রিকার সম্পাদক, সারারাত ক্যাফেতে তর্ক করা লোক, ভাড়া না-দেওয়া শিল্পী এবং অসমাপ্ত উপন্যাসের লেখককে সহ্য করত। এখন শহর চায় ক্রেডিট স্কোর, পরিচ্ছন্ন লবি, নীরব প্রতিবেশী, প্যাকেজ রুম এবং যথেষ্ট কম জিনিসপত্র। বোহেমিয়ানিজম ব্রোশিওরে থাকবে, ভবনের ভিতরে নয়।
বন্ধুরা আসতে থাকল। বই সরাতে সরাতে দেয়াল দেখা গেল। একটি গ্রন্থাগার ভাঙার সময় দেয়াল যেভাবে বেরিয়ে আসে, তা কিছুটা দেহ শুকিয়ে গেলে হাড় দেখা যাওয়ার মতো। ঘরটি ক্রমে স্বাভাবিক হচ্ছিল। সেই স্বাভাবিকতা ছিল বিষণ্ণ।
বাইরে ভ্যানে বই তুলতে হবে। আকাশ কালো হল। প্রবল বৃষ্টি নামল। মেন্ডেল শর্টস ও টেভা স্যান্ডেল পরে মধ্যযুগীয় ইতালীয় নাটকের বাক্স হাতে বৃষ্টির মধ্যে দৌড়ালেন। বন্ধুরা তাঁর পিছু নিল। সবাই ভিজে বই ভ্যানে তুলল।
দৃশ্যটি খানিকটা নোয়ার সিনেমা, খানিকটা নোয়ার নৌকা। সভ্যতার কপি সরানো হচ্ছে, আকাশ যেন প্রুফরিডার হয়ে লাল কালির বদলে জল ঢালছে।
ভিজে ফিরে এসে মেন্ডেল রাশিয়ান সামোভার রেস্তোরাঁ থেকে পিয়েরোগি এবং স্ট্রোগানফ ব্লিনি আনালেন। বই গোছাতে গোছাতে রাত নামল। ঘরটি আবার সেলুনে পরিণত হল। তর্ক চলল নবোকভের প্রথম দিকের রুশ কবিতা নিয়ে, লেবাননের বিদেশনীতি নিয়ে, ফরাসি রোমান্টিক লেখক শার্ল নোদিয়ে নিয়ে।
মানুষের বাসা ভেঙে যাচ্ছে, তবু আলোচনা থামে না। সম্ভবত এটিই বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের একমাত্র নির্ভরযোগ্য লক্ষণ। ছাদ সরে যেতে পারে, চেয়ার চলে যেতে পারে, বই বাক্সে ঢুকতে পারে, কেউ তবু বলবে, “নবোকভের রুশ কবিতায় সমস্যাটা অন্য জায়গায়।”
কলাম্বিয়ার শিল্প-ইতিহাসের ছাত্রী কাটিয়া ড্যানজিগার বললেন, মেন্ডেল নিজের মনের মধ্যে বাস করেন। সেই মন তিনি যেখানেই যান, সঙ্গে নিতে পারবেন।
এটি সান্ত্বনার কথা। আবার খানিকটা বাড়িওয়ালাবান্ধবও। কারণ মানুষ যদি নিজের মনের মধ্যে বাস করে, তাহলে ম্যানহাটনের বাজারদরে তার আলাদা অ্যাপার্টমেন্টের দরকার কী?
শোনা গেছে, মেন্ডেল আরও বড় একটি অ্যাপার্টমেন্ট পেয়েছেন।
এর মানে, আরও বই।
এখানে গল্পটি শেষ হতে পারত একজন অদ্ভুত বইপাগলের মজার সংবাদ হিসেবে। কিন্তু বিষয়টি একটু অসুবিধাজনক। কারণ মেন্ডেলের দশ হাজার বই দেখে আমরা একই সঙ্গে মুগ্ধ হই, ভয় পাই এবং ঘরের বোঝা বহনক্ষমতা হিসাব করতে বসি। তাঁর পাঠপিপাসাকে সম্মান করি, আবার ভাবি বাথরুমে অপেরা ইতিহাস রাখা জরুরি কি না। বাড়িওয়ালার সতর্কতা যুক্তিহীন নয়। আগুন, ওজন, চলাচলের পথ, জানালা বন্ধ হয়ে থাকা, উদ্ধারকাজ, সবই বাস্তব প্রশ্ন। বই জ্ঞানের আধার হলেও আগুন তাদের সাহিত্যিক মর্যাদা দেখে পাশ কাটায় না।
তবু ভবনের চিঠির মধ্যে আরেকটি যুগের ভাষাও শোনা যায়। অতিরিক্ত বই, অতিরিক্ত কৌতূহল, অতিরিক্ত বিতর্ক, অতিরিক্ত নিজস্বতা। আধুনিক নগরজীবন সবকিছুর একটি পরিমিত, বিমাযোগ্য, মানসম্মত রূপ চায়। বই থাকবে, তবে সাজানো। মত থাকবে, তবে পেশাদার। পত্রিকা হবে, তবে অর্থায়ন-পরিকল্পনা সহ। পার্টি হবে, তবে শব্দের সীমা মেনে। মানুষ বিচিত্র হতে পারে, যতক্ষণ সেই বিচিত্রতা প্রতিবেশীর বিমা প্রিমিয়াম বাড়ায় না।
মেন্ডেলও পুরোপুরি রোমান্টিক নন। তিনি বলেছেন, কিছুদিন হয়তো গ্রন্থাগার বাড়ানো বন্ধ রাখতে হবে। “কিছুদিন” শব্দটি বইপাগলের মুখে সেই অর্থ বহন করে, যা রাজনীতিকের মুখে “অস্থায়ী ব্যবস্থা।” কতদিন, কেউ জানে না।
তাঁর মনে হয়, তাঁকে সবসময় শিখতে হবে। শেখাটুকুই পৃথিবীকে দেওয়ার মতো তাঁর সম্পদ।
একজন মানুষ পৃথিবীকে কী দিতে পারে? টাকা, ক্ষমতা, প্রযুক্তি, সন্তান, স্মৃতিস্তম্ভ, যুদ্ধ, ব্যবসা, গান, খাবার, চিকিৎসা, কর। মেন্ডেলের উত্তর, শেখা। পড়ে যাওয়া। বিপক্ষের যুক্তি পড়া। মৃত ভাষার গল্প অনুবাদ করা। এমন একটি পত্রিকা বের করা যেখানে সবাই একমত নয়। বন্ধুরা এসে তর্ক করবে। কেউ আব্রাহাম রাইজেন পড়বে। কেউ জানবে অষ্টাদশ শতকের পোলিশ ইহুদিরা কোন ঘোড়ায় চড়ত। জ্ঞানের বিশাল বাজারে এগুলো সামান্য পণ্য। কিন্তু সভ্যতা মাঝে মাঝে এই সামান্য পণ্যেই টিকে থাকে।
বাড়িওয়ালা বলতে পারেন, বই সরান।
আগুনের আইন বলতে পারে, পথ খালি রাখুন।
মাধ্যাকর্ষণ বলতে পারে, আর একটি বাক্স রাখলে আমি দায়ী নই।
মেন্ডেল তবু হয়তো পরদিন পুরনো বইয়ের দোকানে ঢুকবেন। একটি পাতলা, দুর্লভ, অপ্রয়োজনীয়, অপরিহার্য বই হাতে নেবেন। দাম দেখবেন। মলাটে হাত বোলাবেন। ভাববেন, এই বইটি ছাড়া তাঁর জীবন অসম্পূর্ণ।
তারপর কিনবেন।
মানুষের জীবন এভাবেই বিপদে পড়ে। এভাবেই কখনও কখনও অর্থও পায়।


