ভূত
জিল ব্লেইন। বাইশ বছরের সদ্যবিবাহিতা, কার বোমায় মারা গেছে, আর মৃত্যুর পর ঢুকে পড়েছে নিজের খুনির মাথার ভেতর।
ভূতকে আমরা সাধারণত ভয় পাই, অন্ধকার ঘর, হিমেল বাতাস, আচমকা শব্দের সঙ্গে তাকে জুড়ে দিই। কিন্তু সাহিত্যে ভূত অনেক সময় ভয় নয়, আয়না। এমন আয়না, যেখানে তাকালে নিজের মুখটা একটু বেঁকে যায়, একটু বেশি স্পষ্ট হয়, আর চোখ সরাতে ইচ্ছে করলেও সরানো যায় না। George Saunders এই আয়নাটা বারবার তুলে ধরেন। নতুন উপন্যাস Vigil-এও তাই। যেমনটা হয়েছিল Lincoln in the Bardo-তে। দুটোই ভূতের গল্প, অথচ দুটোই জীবনের গল্প। আর দুটোই ঘোরে সেই প্রশ্নটার চারপাশে, যেটা আমরা বেঁচে থাকতে যতটা পারি এড়িয়ে চলি। শেষে কী থাকে। কে থাকে। কীভাবে থাকে।
Vigil-এর কেন্দ্রে এক তেল-সম্রাট, KJ Boone। সারাজীবন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ধামাচাপা দেওয়া, রিপোর্ট কিনে নেওয়া, সন্দেহ ছড়ানো, সময় কেনা। মৃত্যুশয্যায় এসে তাঁর সামনে হাজির হয় একের পর এক আত্মা। তারা চিৎকার করে না, ভয় দেখায় না, প্রতিশোধের ভাষাও ব্যবহার করে না। তারা আসে হিসাব চাইতে। কে কী জানত, কখন জানত, আর জানার পরেও কীভাবে স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যেতে পেরেছিল।
এইখানেই স্যান্ডার্সের ভূত অন্যরকম। ভূত মানে সময়ের নিয়ম ভাঙার সুযোগ। তিনি নিজেই বলেন, ভূত আসলে আমাদের মধ্যেই থাকে। আমরা যাদের হারিয়েছি, তারা নিউরনের ভেতরে দিব্যি সক্রিয়। স্মৃতি, অপরাধবোধ, অসমাপ্ত কথা, সব মিলিয়ে তারা বর্তমানের ভেতরেই বাস করে। আজ, গতকাল, আর মৃতদের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে মিশলে জীবনের আসল গঠনটা দেখা যায়। এই কারণে তাঁর লেখায় মৃত্যু প্রায় এক ধরনের পদ্ধতি। বয়স যত বাড়ছে, মৃত্যু তত ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠছে, কথাটা তিনি হালকাভাবে বলেন, কিন্তু ভিতরের ভয়টা গোপন থাকে না।
এই ভয় একদিন প্রায় শরীরে লেগে গিয়েছিল। শিকাগো থেকে বিমানে উড়ছেন, আচমকা গিজের ধাক্কা, ইঞ্জিনে আগুন, কালো ধোঁয়া, কেবিনে চিৎকার, জানালার বাইরে দ্রুত কাছে আসা শহরের আলো। সেই মুহূর্তে তাঁর মনে হয়েছিল, এই বুঝি শেষ। তখন তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধ্যান করা এক তিব্বতি বৌদ্ধ। অথচ কোনও দর্শন, কোনও অনুশীলন, কোনও শেখা বাক্য কাজে আসেনি। ছিল শুধু একেবারে খাঁটি আমিত্ব। লেখক নয়, শিক্ষক নয়, বাবা নয়, স্বামী নয়, শুধু হারিয়ে যেতে বসা এক আমি। আর ঠিক তখনই পাশের কিশোরের প্রশ্ন, স্যার, ইজ ডিস সাপোজড টু বি হ্যাপেনিং, আর তাঁর মুখে বেরিয়ে আসা পিতৃসুলভ মিথ্যে সাহস, ইয়েস, অফ কোর্স।
এই হাসিটাই স্যান্ডার্সের অস্ত্র। গুরুগম্ভীর প্রশ্নের মাঝখানে হঠাৎ কৌতুক ঢুকিয়ে দেওয়া, যেন তিনি জানেন, বেশি ভারী হলে মানুষ পালাবে। বিমান নিরাপদে নামার পর কয়েকদিন তিনি পার্টি করে কাটান। বৌদ্ধ দর্শনে যাকে বলে মৃত্যুচেতনা। শেষ জানা থাকলে আনন্দ বাড়ে। অনন্ত পার্টি আসলে একঘেয়ে। এই অনুভূতিটাকেই তিনি লেখায় ধরতে চান।
তাঁর গল্পে বারবার ফিরে আসে বিকৃত আমেরিকা। থিম পার্ক, মল, জেলখানা, ভবিষ্যৎ-কারাগার। সব জায়গায় এক ধরনের হাস্যকর নিষ্ঠুরতা। কিন্তু এই নিষ্ঠুরতা কখনও শীতল হয় না। কারণ তিনি সহমর্মিতায় বিশ্বাস করেন। তাঁর কাছে লেখা মানে অন্যের জীবনে ঢুকে পড়া, নিজেকে একটু বড় করা। তিনি বলেন, সবাই আসলে আমি, শুধু আলাদা দিনে, আলাদা জীবনে।
এই ধারণাটাই Vigil-এ চূড়ান্ত রূপ নেয়। উপন্যাসের এক বর্ণনাকারী জিল ব্লেইন। বাইশ বছরের সদ্যবিবাহিতা, কার বোমায় মারা গেছে, আর মৃত্যুর পর ঢুকে পড়েছে নিজের খুনির মাথার ভেতর। তার কাজ মরতে থাকা মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়া। তার দর্শন কঠিন। আমরা যা হয়েছি, তার বাইরে আর কিছু হওয়ার সুযোগ ছিল না। তেলের সম্রাট বুনকে সে বলে, তুমি ভাবতে যে তুমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছ, আসলে সব আগেই ঠিক ছিল। মন, শরীর, প্রবৃত্তি মিলিয়ে এক ধরনের জেল।
এই কথাটা ঠিক কি না, স্যান্ডার্স নিজেও জানেন না। তিনি উত্তর দিতে চান না। তাঁর কাজ প্রশ্নটাকে এমনভাবে সাজানো, যেন পাঠকের মাথায় একটা অস্বস্তিকর আলো জ্বলে ওঠে। তিনি নিজেকে রোলারকোস্টার ডিজাইনার বলেন। থিম পরে আসবে।
এই অনিশ্চয়তার বীজ তাঁর শৈশবেই। কেউ তাঁকে ভালো ছেলে বললে তাঁর মনে হতো, আমি যেমন, তেমনই। আবার ছোটবেলায় বোনের গায়ে গরম কফি পড়ে যাওয়া, সেটা ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, এই প্রশ্ন তাঁকে ছাড়েনি। তিনি নিজেকে চঞ্চল মনের মানুষ বলেন। লেখালেখি তাঁর মানসিক চিকিৎসা।
চিকাগোর দক্ষিণে বড় হওয়া। বাবা কখনও কয়লার ব্যবসায়, কখনও ফ্রায়েড চিকেন। ঘরে পড়ে থাকত Machiavelli আর Michael Harrington। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে Ayn Rand তাঁর একমাত্র প্রিয় ঔপন্যাসিক। পরে সুমাত্রায় তেল অনুসন্ধান দলে কাজ, ফাঁকে ফাঁকে Ernest Hemingway হওয়ার চেষ্টা। তিনি বলেন, অযোগ্যতা সত্ত্বেও লেগে থাকলে একসময় সমস্যাই ক্লান্ত হয়ে যায়।
Syracuse এসে জীবন বদলায়। ট্রাকে ঘুম, তারপর পলা রেডিক। তিন সপ্তাহে এনগেজমেন্ট, দ্রুত বিয়ে। আলাদা অফিস, একসঙ্গে লাঞ্চ, একে অপরের প্রথম পাঠক। পলা না পড়লে লেখা প্রস্তুত নয়। কেবল বুদ্ধিদীপ্ত বা সার্কাস্টিক হলেই চলবে না, আধ্যাত্মিক ওজন চাই।
শুরুতে তিনি ভেবেছিলেন সিরিয়াস লিটারেচার লিখতে হবে। ফল হয়েছিল নিষ্প্রাণ লেখা। পরে বুঝলেন, হাসি ঢোকাতে হবে। সেখান থেকেই CivilWarLand in Bad Decline। সেখান থেকেই শিক্ষকতা। তিনি বলেন, খুব ভালো আর মহান লেখার পার্থক্য হল, যেটা তুমি ভয় বা লজ্জায় ঢোকাওনি, সেটাই ঢোকানো।
আজ তিনি স্টোরি ক্লাব চালান। লক্ষ লক্ষ পাঠক। সেখানে তিনি উদারতা খুঁজে পান। এই উদারতাই তাঁকে টিকিয়ে রাখে, যখন বাইরে ইমিগ্রেশন পুলিশের ধরপাকড়, রাজনীতির ভাষা আরও হিংস্র। ব্যক্তিগত কথায় তিনি রাজনীতি এড়িয়ে চলেন। লেখার ভেতরে তিনি ধীর হন, সন্দেহ করেন, বিচার করতে দেরি করেন। এই অভ্যাসই তাঁকে আশা দেয়।
Vigil লেখার পেছনে তাঁর কৌতূহল ছিল, যারা জলবায়ু পরিবর্তন লুকিয়েছে, তারা এখন কী ভাবছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাদের কি অনুশোচনা হয়। তাঁর চ্যালেঞ্জ ছিল বোঝা, বোঝানো নয়। কেন একজন মানুষের কাছে ভয়ানক কাজটাও সঠিক মনে হয়। সহজ সহানুভূতি নয়, জটিল মানবিকতা।
আপাতত তাঁর সিদ্ধান্ত কল্পজগত বানাতে থাকো। চিন্তা আর সহমর্মিতার মান বাড়াও। বাকিটা পরে দেখা যাবে। কারণ মৃত্যু আসছে। কিন্তু তারও আগে আছে গল্প।



