I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.
ধরুন, আপনি একটা বই পড়লেন। পড়ে আপনার মনে হলো, ধুর, কী সব ছাইপাঁশ লিখেছে! কোথাও অকারণ বাগাড়ম্বর, কোথাও লেখকের বিদ্যেবুদ্ধি জাহির করার প্রাণান্ত চেষ্টা, কোথাও এমন সব কায়দাকানুন যে মনে হচ্ছে ভদ্রলোক উপন্যাস লিখতে বসে সাহিত্যিক সার্কাস খুলেছেন। বইটা বন্ধ করে আপনি একটু হাঁফ ছাড়লেন। তারপর শুনলেন, ওই বইখানাই নাকি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। পৃথিবীর তাবড় সমালোচক, অধ্যাপক, লেখক, সাহিত্যতাত্ত্বিক সকলে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। কেউ বলছেন, আধুনিক সাহিত্যের বিপ্লব। কেউ বলছেন, উপন্যাসের ইতিহাসে যুগান্তর। কেউ এমন ভাব করছেন, যেন এই বই পড়ার আগে মানবসভ্যতা উপন্যাস নামক বস্তুটার প্রকৃত অর্থই বুঝত না।
তখন আপনার কী কর্তব্য?
আপনি কি নিজের রুচির প্রতি আস্থা রাখবেন? নাকি ভাববেন, এতগুলো বিদ্বান লোক যখন এত প্রশংসা করছেন, নিশ্চয়ই আমার মাথার মধ্যে কোথাও একটা স্ক্রু আলগা?
এই সমস্যাটা সাধারণ পাঠকের হলে বিশেষ চিন্তার কিছু ছিল না। বড়জোর পরবর্তী সাহিত্যসভায় একটু চুপচাপ বসে থাকা যেত। কিন্তু সমস্যাটা যখন ভার্জিনিয়া উলফের, আর বইটার নাম জেমস জয়েসের ইউলিসিস, তখন ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে।
কারণ উলফ নিজেও আধুনিক উপন্যাসের অন্যতম নির্মাতা। জয়েস যে পুরোনো কথাসাহিত্যের কাঠামো ভেঙে মানুষের চেতনার মধ্যে ঢুকতে চাইছেন, উলফও প্রায় সেই কাজেই ব্যস্ত। অথচ জয়েসের এই বিরাট কীর্তি পড়ে তিনি এমন বিরক্ত হলেন যে ডায়েরিতে লিখলেন, বইটা একটা ব্যর্থ প্রচেষ্টা। প্রতিভা আছে বটে, তবে নিম্নমানের।
মজাটা এখানেই। যাঁর নিজের সাহিত্যিক প্রকল্পের সঙ্গে জয়েসের এত মিল, তিনিই জয়েসের উপন্যাসে এমন সব দোষ দেখতে পেলেন, যা অন্য সমালোচকদের চোখে তার মহত্ত্বের প্রমাণ।
সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা কম ঘটেনি। কিন্তু উলফের ক্ষেত্রে আমরা একটা বাড়তি সুবিধা পেয়েছি। তিনি ডায়েরি লিখতেন। আর ডায়েরিতে মানুষ সাধারণত সেই কথাগুলো লেখে, যেগুলো সভাসমিতিতে বললে পাশের চেয়ারে বসা ভদ্রলোকের চা বিষম খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
১. প্রতিভা আছে, তবে প্রতিভাটা বিশেষ সুবিধের নয়
১৯২২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্যারিসে প্রকাশিত হলো জেমস জয়েসের ইউলিসিস। বইয়ের ঘটনাকাল ১৯০৪ সালের ১৬ জুন, স্থান ডাবলিন। মোটামুটি একটা দিনের গল্প। লিওপোল্ড ব্লুম, স্টিফেন ডেডালাস, মলি ব্লুম এবং তাঁদের চারপাশের মানুষের জীবন নিয়ে প্রায় সাড়ে সাতশো পাতার এক বিপুল সাহিত্যিক অভিযান।
উপন্যাসের নাম হোমারের ওডিসি থেকে নেওয়া। গ্রিক মহাকাব্যের নায়ক ওডিসিউসের দীর্ঘ যাত্রার সঙ্গে ডাবলিনের এক সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাফেরাকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন মহাকাব্যের বীরত্ব এসে মিশেছে আধুনিক মানুষের পেটের সমস্যা, যৌনচিন্তা, দাম্পত্য, শোক, বিজ্ঞাপন, ধর্ম, রাজনীতি, স্মৃতি এবং একাকিত্বের সঙ্গে।
কাহিনির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কাহিনি বলার পদ্ধতি। এক অধ্যায়ে একরকম ভাষা, পরের অধ্যায়ে আরেকরকম। কোথাও সংবাদপত্রের শিরোনাম, কোথাও নাটকের সংলাপ, কোথাও ভাষার ঐতিহাসিক বিবর্তনের অনুকরণ, কোথাও মানুষের মাথার মধ্যে চলতে থাকা চিন্তার অবিরাম প্রবাহ।
সোজা কথায়, জয়েস উপন্যাসের প্রচলিত নিয়মকানুনগুলোকে ধরে বেশ খানিকটা ঝাঁকিয়েছেন। কিছু ফেলে দিয়েছেন, কিছু উল্টে দিয়েছেন, কিছু দিয়ে এমন সব কাণ্ড করেছেন যে পাঠককে মাঝেমধ্যে অভিধান, পুরাণ, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব এবং নিজের ধৈর্যের সাহায্য নিতে হয়।
এবার ভার্জিনিয়া উলফের প্রতিক্রিয়া শুনুন।
১৯২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তিনি ডায়েরিতে লিখলেন:
“I finished Ulysses, & think it is a mis-fire. Genius it has I think; but of the inferior water.”
অর্থাৎ, ইউলিসিস শেষ করলাম। আমার মনে হয়, ব্যর্থ প্রচেষ্টা। প্রতিভা অবশ্য আছে, তবে বেশ নিচু মানের।
এরপর আরও কয়েকটা বিশেষণ প্রয়োগ করলেন। Diffuse, brackish, pretentious.
লেখাটা ছড়ানোছিটোনো। স্বাদ বিস্বাদ। আড়ম্বরপূর্ণ, ভানসর্বস্ব।
অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল জয়েসের সাহিত্যিক কসরত। উলফের ধারণা, একজন প্রথম সারির লেখক নিজের শিল্পকে এতটা শ্রদ্ধা করেন যে পাঠককে চমকে দেওয়ার জন্য অহরহ কায়দা দেখিয়ে বেড়ান না। জয়েসের ক্ষেত্রে তিনি সেই কায়দা দেখানোর প্রবণতাই দেখছিলেন।
এখানে প্রশ্নটা বেশ জরুরি। একজন লেখক ভাষা নিয়ে কতখানি পরীক্ষানিরীক্ষা করতে পারেন? যতখুশি? নিশ্চয়ই। কিন্তু সেই পরীক্ষানিরীক্ষার ফলে সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা কতটা গভীর হলো, সেটাও কি বিচার্য?
ধরুন, একজন পিয়ানোবাদক এমন গতিতে বাজাচ্ছেন যে তাঁর দশ আঙুল দেখে মনে হচ্ছে কুড়িটা। দর্শক বিস্ময়ে হতবাক। কিন্তু বাজনা শেষ হওয়ার পরে যদি কারও মনে হয়, ভদ্রলোকের আঙুলের ক্ষমতা সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান অর্জন করলাম, সংগীতটা বিশেষ হৃদয়ে লাগল না, তাহলে সেই শ্রোতাকে কি সংগীতের শত্রু ঘোষণা করা যায়?
উলফের আপত্তিটা অনেকটা এই ধরনের। তাঁর সন্দেহ, জয়েসের সাহিত্যিক দক্ষতা মাঝেমধ্যে এত প্রকট হয়ে উঠছে যে উপন্যাসের জীবনটাই আড়ালে চলে যাচ্ছে। অবশ্য উলফের এই অভিযোগ সঠিক কি না, সেটা আরেক বিতর্ক। কারণ জয়েসের সমর্থকেরা বলবেন, ওই ভাষাগত কসরতের মধ্য দিয়েই তিনি মানুষের চেতনার বিচিত্র প্রকৃতি প্রকাশ করেছেন। একটা মানুষের চিন্তা কখনও সুশৃঙ্খল প্রবন্ধের মতো চলে না। তার মধ্যে শব্দের খেলা থাকে, অপ্রাসঙ্গিক স্মৃতি থাকে, অশ্লীলতা থাকে, উচ্চাঙ্গ দর্শনের পাশে হঠাৎ দুপুরের খাবারের চিন্তা থাকে।
ফলে জয়েসের ভাষার বিশৃঙ্খলাটাই হয়তো জীবনের বিশ্বস্ত প্রতিরূপ। কিন্তু উলফের প্রশ্ন থেকেই যায়। শিল্পী তাঁর ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে কখন দর্শককে মুগ্ধ করছেন, আর কখন নিজের প্রতিভার প্রদর্শনী বসাচ্ছেন, সেই সীমারেখাটা কোথায়?
সমস্যা হলো, ওই রেখাটা মাপার কোনও সাহিত্যিক থার্মোমিটার আজও আবিষ্কৃত হয়নি।
২. ভদ্রমহিলার রুচির মধ্যে শ্রেণিবিদ্বেষও ছিল
এবার উলফের সমালোচনার অস্বস্তিকর অংশে যাওয়া যাক। তিনি ইউলিসিসকে বলেছিলেন underbred। অর্থাৎ, যথাযথ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিশীলনের অভাব রয়েছে। জয়েসকে বর্ণনা করেছিলেন একজন অহংকারী, স্বশিক্ষিত শ্রমজীবী মানুষ হিসেবে।
শুনে যতটা সাহিত্যসমালোচনা মনে হচ্ছে, আসলে তার মধ্যে শ্রেণিগত অবজ্ঞার একটা বেশ স্পষ্ট গন্ধ রয়েছে। উলফের নিজের সামাজিক অবস্থানটা মনে রাখা দরকার। তিনি ইংল্যান্ডের শিক্ষিত, উচ্চমধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী পরিবেশে বড় হয়েছেন। ব্লুমসবেরি গোষ্ঠীর সদস্য। চারপাশে শিল্পী, লেখক, দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সমালোচক। সংস্কৃতি সেখানে দৈনন্দিন জীবনেরই অঙ্গ।
জয়েস এসেছেন আয়ারল্যান্ড থেকে। আর্থিক অনিশ্চয়তা, নির্বাসিত জীবন, প্রকাশনার সমস্যা, ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। তবে তাঁকে স্বশিক্ষিত শ্রমজীবী বলে ছোট করা তথ্যগতভাবেও ভুল। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, ইউরোপীয় সাহিত্য, ভাষা, ধর্মতত্ত্ব এবং দর্শন নিয়ে বিস্তর অধ্যয়ন করেছেন।
উলফের মন্তব্যে যে শ্রেণিবিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আর এইখানে সাহিত্যি রুচির একটা পুরোনো সমস্যা মাথা তোলে। আমরা যখন বলি, অমুক লেখকের ভাষায় রুচির অভাব, তখন ঠিক কী বোঝাই? তিনি সত্যিই শিল্পের বিচারে দুর্বল? নাকি তিনি এমন একটা জীবনের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করছেন, যেটাকে আমাদের সামাজিক শিক্ষা ইতিমধ্যে অরুচিকর বলে চিহ্নিত করে রেখেছে?
ধরুন, একজন লেখক মানুষের যৌনতা, শারীরিক ক্রিয়া, নোংরামি, দুর্গন্ধ, অসংলগ্ন চিন্তা নিয়ে লিখছেন। অন্যজন বললেন, এসব সাহিত্যিক বিষয় হতে পারে না।
কেন হতে পারে না? মানুষের মাথার মধ্যে প্রেমের চিন্তা থাকে, মৃত্যুভয় থাকে, ঈর্ষা থাকে। আবার কোষ্ঠকাঠিন্যও থাকে। উপন্যাসে প্রথম তিনটি ঢুকতে পারবে, চতুর্থটিকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, এই বিধান কে দিলেন?
জয়েসের সাহিত্যে শরীরের উপস্থিতি প্রবল। তাঁর মানুষেরা খায়, হজম করে, মলত্যাগ করে, যৌনকল্পনায় ডুবে যায়। উচ্চাঙ্গ চিন্তা এবং শারীরিক অভিজ্ঞতা পাশাপাশি চলতে থাকে। উলফ এই প্রকাশভঙ্গির অনেকখানিই অস্বস্তিকর বলে মনে করেছিলেন। তাঁর সমালোচনায় তাই দুটো জিনিস মিশে আছে। শিল্প সম্পর্কে প্রকৃত প্রশ্ন এবং নিজের সামাজিক অবস্থান থেকে তৈরি কিছু পূর্বধারণা।
আমাদেরও সেই দুই উপাদান আলাদা করে দেখতে হবে। কারণ বড় শিল্পী হলেই মানুষের সমস্ত বিচার নির্ভুল হয়ে যায় না। রবীন্দ্রনাথের কবিতা অসাধারণ বলে তাঁর প্রতিটি রাজনৈতিক মতামত অভ্রান্ত হয়ে যায় না। শেক্সপিয়র মানুষের মন বোঝেন বলে তাঁর যুগের সমস্ত সামাজিক ধারণাকে আজও অনুসরণ করতে হবে, এমন কোনও চুক্তি নেই। উলফের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম।
তাঁর শিল্পবোধ থেকে আমরা শিখতে পারি। তাঁর শ্রেণিগত ঔদ্ধত্যের সমালোচনাও করতে পারি। একজন মানুষের প্রতিভা এবং সীমাবদ্ধতা একই মানুষের মধ্যে অবস্থান করতে পারে। সাহিত্যিক প্রতিভার সার্টিফিকেটে চরিত্রের সমস্ত অপরাধ মাফ হয়ে যায়, এমন ব্যবস্থা এখনও চালু হয়নি।
৩. অথচ জয়েসের কাজটা তিনি খুব ভালো বুঝেছিলেন
এখানে গল্পটা আরও আকর্ষণীয়। উলফ কিন্তু জয়েসের সাহিত্যিক পরীক্ষানিরীক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পারেননি, এমন নয়। বরং জয়েস ঠিক কোন সমস্যাটার সমাধান খুঁজছেন, সে সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি ছিল গভীর।
উনিশ শতকের প্রচলিত ইংরেজি উপন্যাসে মানুষের জীবনের ঘটনাবলি অনেক সময় সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো থাকত। চরিত্রের পরিচয়, পারিবারিক পরিস্থিতি, সামাজিক সম্পর্ক, ঘটনার সূচনা, সংঘাত, পরিণতি। পাঠককে একটা মোটামুটি গোছানো পৃথিবীর মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো।
কিন্তু আমাদের মনের মধ্যে জীবন কি সত্যিই সেইভাবে ঘটে?
ধরুন, আপনি সকালবেলা চা খাচ্ছেন। জানলার বাইরে একটা কাক ডাকল। আপনার মনে পড়ল ছোটবেলার বাড়ির কথা। তারপর মনে হলো, সেই বাড়ির সামনের পুকুরটা আর আছে কি না। সেখান থেকে মনে পড়ল এক বন্ধুর কথা। সে এখন কোথায়? হঠাৎ টেবিলে রাখা খবরের কাগজে যুদ্ধের খবর চোখে পড়ল। যুদ্ধ থেকে মৃত্যু, মৃত্যু থেকে বাবার স্মৃতি, বাবার স্মৃতি থেকে একটা পুরোনো গানের কলি।
এই গোটা ঘটনাটা হয়তো ঘটল পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ডে। কোনও নাটকীয় ঘটনা ঘটল না। অথচ আপনার চেতনার মধ্যে বিরাট একটা যাত্রা সম্পন্ন হয়ে গেল। উলফ এবং জয়েস দুজনেই সাহিত্যে এই অভিজ্ঞতাকে ধরতে চাইছিলেন।
উলফ তাঁর Modern Fiction প্রবন্ধে বলেছেন, সাধারণ একটা দিনে মানুষের মনে অসংখ্য ছাপ পড়ে। তুচ্ছ, অদ্ভুত, ক্ষণস্থায়ী, গভীর। চেতনার উপর অনবরত ঝরে পড়তে থাকে অসংখ্য অনুভূতির কণা। উপন্যাসের কাজ সেই অভিজ্ঞতার গতিপ্রকৃতিকে অনুসরণ করা।
জয়েসের ইউলিসিস পড়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, লেখক প্রচলিত কাহিনি নির্মাণের যন্ত্রপাতি সরিয়ে মানুষের ভেতরের জগতে প্রবেশ করতে চাইছেন। বিশেষ করে ইউলিসিস-এর ষষ্ঠ পর্ব, Hades, তাঁর প্রশংসা পেয়েছিল।
এখানে লিওপোল্ড ব্লুম একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন। মৃত্যু, স্মৃতি, জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, অন্য মানুষের প্রতি মনোভাব, নানা বিচ্ছিন্ন চিন্তা তাঁর চেতনার মধ্যে ঘুরছে। এই অংশের সাহিত্যিক দীপ্তি উলফ স্বীকার করেছিলেন। এমনকি প্রথম পাঠেই একে মাস্টারপিস বলে স্বীকার করতে ইচ্ছে হয়, এমন কথাও লিখেছিলেন।
এবার ভাবুন।
একই মানুষ একটা উপন্যাসের নির্দিষ্ট অংশকে মাস্টারপিস বলছেন, আবার গোটা উপন্যাসকে ব্যর্থ প্রচেষ্টা ঘোষণা করছেন। এটা কি স্ববিরোধিতা? হতেই পারে। আবার এর মধ্যে সাহিত্যবিচারের একটা জরুরি স্বাধীনতাও রয়েছে। একটা উপন্যাসের কয়েকটা অধ্যায় অসাধারণ হতে পারে, অথচ সামগ্রিক রচনাটি পাঠককে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হতে পারে। একটা ছবির অভিনয়, চিত্রগ্রহণ, সংগীত আলাদাভাবে অনবদ্য হতে পারে, অথচ গোটা ছবিটা দেখে মনে হতে পারে, পরিচালকের কাণ্ডজ্ঞান মাঝপথে কোথাও হারিয়ে গেছে।
শিল্পের উপাদানগুলোর সাফল্য এবং সামগ্রিক শিল্পের সাফল্য একই বিচারের অধীন হলেও সব সময় একই ফল দেয় না। উলফের প্রতিক্রিয়ায় এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটা রয়েছে। তিনি জয়েসের কিছু আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সেই স্বীকৃতি তাঁকে সমস্ত উপন্যাসের সামনে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেনি।
৪. দুই লেখক, এক সাহিত্যিক ভূখণ্ড
এবার একটা প্রশ্ন করা যাক। উলফ কি জয়েসকে খানিকটা হিংসেও করতেন? প্রশ্নটা অমূলক নয়।
১৯২০ সালে টি. এস. এলিয়ট যখন জয়েসের সাহিত্যিক কৃতিত্বের কথা উচ্ছ্বসিতভাবে বলছিলেন, উলফ নিজের ডায়েরিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি নিজে সাহিত্যে যা করার চেষ্টা করছেন, জয়েস হয়তো সেই কাজটাই তাঁর চেয়ে ভালোভাবে করে ফেলছেন।
বাক্যটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ এখানে একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের নিজের শিল্প সম্পর্কে অনিশ্চয়তা প্রকাশ পাচ্ছে।
উলফ তখন Jacob’s Room লিখছেন। পরে লিখবেন Mrs Dalloway, To the Lighthouse, The Waves। মানুষের চেতনা, সময়, স্মৃতি এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে উপন্যাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসবেন।
জয়েসও সেই সাহিত্যিক ভূখণ্ডে কাজ করছেন। তবে তাঁর পদ্ধতি আলাদা। উলফের গদ্যে অনেক সময় চেতনার প্রবাহ সংগীতের মতো এগোয়। অনুভূতি, স্মৃতি, বাইরের দৃশ্য এবং অন্তর্জগতের মধ্যে সূক্ষ্ম চলাচল ঘটে।
জয়েসের গদ্য অনেক বেশি ভাষিক দুঃসাহসে ভরপুর। শব্দের ইতিহাস, ব্যাকরণ, ধ্বনি, ব্যঙ্গ, অশ্লীলতা, পুরাণ, বিজ্ঞাপন, সংবাদপত্র, লোকভাষা, সবকিছু তিনি উপন্যাসের উপাদান করে তোলেন।
দুজনেই মানুষের অভিজ্ঞতার প্রচলিত সাহিত্যিক উপস্থাপনাকে বদলে দিচ্ছেন। অথচ দুজনের কাছে সেই পরিবর্তনের সৌন্দর্য আলাদা।
বিষয়টা অনেকটা এমন, দুই চিত্রশিল্পী একই শহর আঁকছেন। একজন আলো এবং ছায়ার সূক্ষ্ম পরিবর্তন ধরতে চান। অন্যজন শহরটাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে একসঙ্গে দেখাতে চান। দুজনেরই উদ্দেশ্য বাস্তবতাকে নতুনভাবে প্রকাশ করা। কিন্তু একজনের চোখে অন্যজনের কাজ বাড়াবাড়ি মনে হতেই পারে। তার সঙ্গে যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুভূতি যুক্ত হয়, তাহলে বিচার আরও জটিল হয়ে ওঠে।
অবশ্য উলফের বিরূপ মন্তব্যের পুরোটাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে এসেছে, এমন দাবি করার প্রমাণ নেই। তাঁর সাহিত্যিক আপত্তিগুলো যথেষ্ট বাস্তব এবং ধারাবাহিক। কিন্তু নিজের কর্মক্ষেত্রে অন্য একজনের বিরাট সাফল্য দেখে অস্বস্তি হওয়াটাও মানবিক। বিশেষত যখন আশপাশের লোকেরা সেই সাফল্যের কথা ক্রমাগত শোনাচ্ছেন। আর সেই আশপাশের লোকেদের মধ্যে যদি টি. এস. এলিয়ট থাকেন, তাহলে মুশকিল আরও বাড়ে।
৫. এলিয়টের প্রশংসা এবং উলফের বিরক্তি
টি. এস. এলিয়ট ইউলিসিস সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত ছিলেন। তিনি উপন্যাসটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝেছিলেন। হোমারের মহাকাব্যের কাঠামো ব্যবহার করে আধুনিক জীবনের বিশৃঙ্খলাকে সংগঠিত করার পদ্ধতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এলিয়টের প্রশংসার সঙ্গে War and Peace-এর তুলনাও জড়িয়ে ছিল। উলফ এই উচ্ছ্বাসে বিরক্ত হয়েছিলেন।
একবার ভেবে দেখুন, আপনি একটা বই পড়তে বসেছেন। পড়ার আগেই আপনার পরিচিত একজন বিদ্বান মানুষ জানিয়ে দিয়েছেন, এ বই পড়লে আপনার সাহিত্যবোধের নবজন্ম হবে। এমন অবস্থায় পাঠকের মনে দুটো বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
প্রথমটি, আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি। যেহেতু এত বড় বই, এত বড় লেখক, এত বড় প্রশংসা, তাই নিশ্চয়ই প্রতিটি বাক্যের মধ্যে গভীর তাৎপর্য লুকোনো আছে। বুঝতে পারছি না মানেই আমার বিদ্যার অভাব।
দ্বিতীয়টি, প্রতিরোধ। দেখি তো, এত কী লিখেছে!
উলফের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রবণতাটা কাজ করেছিল বলে তাঁর নিজের স্বীকারোক্তিতেই বোঝা যায়। তিনি পরে মেনে নিয়েছিলেন, বইটার বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে একটা প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নিয়েছিলেন। এলিয়টের অতিরিক্ত প্রশংসা তাঁর প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছিল। এই স্বীকারোক্তিটা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ আমরা সাধারণত ভাবতে ভালোবাসি, আমাদের রুচি সম্পূর্ণ স্বাধীন। আমি যে বই ভালোবাসি, সেটি আমার নিজের বিচারেই ভালোবাসি। যে বই অপছন্দ করি, সেটাও আমার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। বাস্তবে আমাদের রুচির চারপাশে অসংখ্য অদৃশ্য প্রভাব কাজ করে।
কোন বইয়ের নাম কতবার শুনেছি, কে সুপারিশ করেছেন, কোন অধ্যাপক সেটাকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন, আমাদের পছন্দের লেখক কী মত দিয়েছেন, বইটা না পড়লে বুদ্ধিজীবী মহলে অস্বস্তিতে পড়তে হবে কি না, এসব বিষয় পাঠের অভিজ্ঞতায় ঢুকে পড়ে।
বইটা খোলার আগেই আমরা অনেক সময় বইটার সম্পর্কে একটা মানসিক রায় লিখে রেখেছি। তারপর পড়তে বসে সেই রায়ের পক্ষে সাক্ষ্য সংগ্রহ করি। উলফের ক্ষেত্রে এলিয়টের প্রশংসা সেই পূর্বনির্ধারিত বিচারের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছিল। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, ১৯২২ সালের আগে থেকেই উলফের সঙ্গে ইউলিসিস-এর পরিচয় ছিল।
১৯১৮ সালে হ্যারিয়েট শ’ উইভার উপন্যাসটির প্রথম চারটি অধ্যায় নিয়ে উলফ এবং তাঁর স্বামী লেনার্ডের কাছে এসেছিলেন। তাঁদের হোগার্থ প্রেস থেকে বইটি প্রকাশের সম্ভাবনা ছিল। ছোট প্রকাশনা সংস্থাটির পক্ষে বিশাল বইটির মুদ্রণসংক্রান্ত সমস্যাও ছিল, আর উলফের কাছে লেখাটির কিছু অংশ অশ্লীল এবং বিরক্তিকর মনে হয়েছিল। অর্থাৎ, তাঁর আপত্তির ইতিহাস বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশের আগেই শুরু। পরবর্তী সময়ে এলিয়টের প্রশংসা সেই পুরোনো বিরক্তিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
৬. বইটা শেষ করেছিলেন তো?
উলফ ডায়েরিতে লিখেছিলেন, তিনি ইউলিসিস শেষ করেছেন। কিন্তু সত্যিই কি শেষ করেছিলেন? ডার্টমাউথ কলেজের অধ্যাপক জেমস হেফারনান ইয়েলের Modernism Lab-এ প্রকাশিত গবেষণায় এই প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ ১৯২২ সালের আগস্টের শেষদিকে উলফের ডায়েরি থেকে জানা যায়, তিনি তখনও বইটির প্রায় দুশো পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়েছিলেন। অথচ সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই জানালেন, পড়া শেষ।
হেফারনানের সন্দেহ, উলফ হয়তো বইটির সঙ্গে নিজের সম্পর্কটাই শেষ করেছিলেন। পুরো উপন্যাস পাঠ সম্পন্ন করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত নয়।
এখানে সাবধান থাকা দরকার। উলফ যে শেষ পর্যন্ত পড়েননি, সেটাও প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী তিনি বই শেষ করেছিলেন। গবেষকের বিশ্লেষণ সেই দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে সন্দেহটি সাহিত্যবিচারের একটা জরুরি বিষয় সামনে নিয়ে আসে। একটা বইয়ের কতটা পড়লে সেটার বিচার করার অধিকার জন্মায়? প্রথম পঞ্চাশ পাতা? দুশো পাতা? গোটা বই? দুবার পড়া? নাকি দশ বছর ধরে পড়াশোনা করার পরে? কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম নেই।
প্রথম পঞ্চাশ পৃষ্ঠাতেই একটা বইয়ের ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং নির্মাণপদ্ধতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া সম্ভব। আবার অনেক উপন্যাসের সামগ্রিক তাৎপর্য শেষ অধ্যায় পর্যন্ত না পৌঁছলে স্পষ্ট হয় না। বিশেষ করে ইউলিসিস-এর মতো বইয়ে সমস্যা আরও বড়। কারণ এর বিভিন্ন অধ্যায়ের ভাষা এবং নির্মাণপদ্ধতি এত আলাদা যে প্রথম কয়েকটি অধ্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে শেষের অংশগুলোর চরিত্র অনুমান করা কঠিন।
ফলে উলফের বিচারকে গুরুত্ব দিতে হলে তাঁর পাঠের সীমাবদ্ধতার সম্ভাবনাটাও মাথায় রাখতে হবে। বড় লেখক বলে তাঁর মন্তব্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চূড়ান্ত সাহিত্যিক রায় হয়ে যায় না। আবার বইটি সম্পূর্ণ না পড়ে থাকলেও তাঁর প্রত্যক্ষ পাঠ-অভিজ্ঞতার মূল্য শূন্য হয়ে যায় না। এই দুই সত্য একসঙ্গে মেনে নিতে পারলেই আলোচনা এগোবে।
৭. প্রুস্ত পড়ে মুগ্ধ, জয়েস পড়ে শহিদ
উলফের সাহিত্যিক রুচি বোঝার জন্য আরেকটি তুলনা বেশ কার্যকর। মার্সেল প্রুস্ত।
১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে শিল্পসমালোচক রজার ফ্রাইকে লেখা একটি চিঠিতে উলফ প্রুস্তের In Search of Lost Time সম্পর্কে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। প্রুস্ত কীভাবে অধরা অভিজ্ঞতাকে ভাষার মধ্যে স্থায়ী রূপ দিচ্ছেন, তা দেখে তিনি অভিভূত। পাঠের আনন্দ তাঁর কাছে প্রায় শারীরিক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল। সূর্যালোক, মদ, আঙুর, প্রশান্তি এবং জীবনীশক্তির সম্মিলিত অনুভূতির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন সেই আনন্দকে। তারপর জয়েসের প্রসঙ্গ।
ইউলিসিস পড়তে তিনি নিজেকে যেন শহিদের মতো খুঁটির সঙ্গে বেঁধেছিলেন। শেষ পর্যন্ত পড়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছেন, এই ভেবে স্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি বইটি বিক্রি করে দেওয়ার ইচ্ছাও জানিয়েছিলেন। প্রুস্ত এবং জয়েস দুজনেই সময়, স্মৃতি, চেতনা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জটিলতা নিয়ে কাজ করছেন। দুজনের কাছেই প্রচলিত কাহিনির কাঠামোর চেয়ে মানুষের অন্তর্জগত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ একজন উলফকে আনন্দ দিচ্ছেন, অন্যজন প্রায় অত্যাচার করছেন। কারণ বিষয়ের মিল থাকলেই শিল্পের অভিজ্ঞতা এক হয় না।
প্রুস্ত স্মৃতি এবং সময়ের মধ্য দিয়ে মানুষের চেতনাকে বিস্তার দেন। তাঁর দীর্ঘ বাক্যের মধ্যে অনুভূতির সূক্ষ্ম পরিবর্তন ধরা পড়ে। জয়েস চেতনার বিচিত্রতাকে ভাষার নানা রূপ, ব্যাকরণভাঙা পরীক্ষা, হাস্যরস, ব্যঙ্গ এবং দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য উপাদানের মধ্যে ছড়িয়ে দেন।
উলফের সংবেদনশীলতা প্রুস্তের পদ্ধতির সঙ্গে বেশি সাড়া দিয়েছিল। এখান থেকে একটা বড় কথা বোঝা যায়। শিল্পের গুরুত্ব সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক উপলব্ধি এবং শিল্পের প্রতি ব্যক্তিগত ভালোবাসা সব সময় পাশাপাশি চলে না। আপনি বুঝতে পারেন, একটা উপন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার নির্মাণপদ্ধতি সাহিত্যের ইতিহাসে নতুন পথ খুলেছে। তার প্রভাব পরবর্তী লেখকদের উপর পড়েছে। তারপরও বইটা আপনার ভালো লাগতে না-ও পারে। এই অপছন্দকে যথাযথ যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। আবার কখনও তার একটা অংশ ব্যাখ্যার বাইরে থেকে যায়। শিল্পের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মধ্যে এই ব্যক্তিগত উপাদানটুকু থাকবেই।
৮. বুঝলাম, কিন্তু অভিভূত হলাম না
উলফের এই গোটা অভিজ্ঞতার মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাটা ঘটল যখন তিনি ইউলিসিস সম্পর্কে অন্য একজন সমালোচকের ব্যাখ্যা পড়লেন। সেই ব্যাখ্যায় উপন্যাসটির নানা তাৎপর্য এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছিল যে বইটি তাঁর আগের বিচারের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো। অর্থাৎ, তিনি স্বীকার করলেন, প্রথম পাঠে অনেক কিছু তাঁর চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। এইখানে একজন বড় পাঠকের পরিচয় রয়েছে।
আমরা অনেক সময় নিজের প্রথম প্রতিক্রিয়াকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরি, যেন সেটা আমাদের ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কেউ দেখিয়ে দিলে যে বইটার মধ্যে আরও কিছু রয়েছে, আমরা উল্টে বিরক্ত হই। মনে হয়, লোকটা আমার রুচি সংশোধন করতে এসেছে! উলফ অন্তত সেই ভুলটা পুরোপুরি করেননি।
তিনি নতুন ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছিলেন। বইটা আবার পড়ার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। তবে নিজের প্রথম প্রতিক্রিয়াও পুরোপুরি বাতিল করেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল, সমসাময়িক পাঠকেরা হয়তো কোনও সাহিত্যকর্মের চূড়ান্ত সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারেন না। কিন্তু তবুও সেই সাহিত্যিক কীর্তির অভিঘাতে তাঁদের অভিভূত হওয়ার কথা। তারপর সেই বিখ্যাত স্বীকারোক্তি:
“they ought, I think, to be bowled over; and this I was not.”
অর্থাৎ, তাঁদের অভিভূত হওয়ার কথা। কিন্তু আমি হইনি।
এই ছোট্ট বাক্যের মধ্যে সাহিত্যিক স্বাধীনতার বিরাট একটা দাবি রয়েছে।
উলফ বলছেন, আমি তোমার ব্যাখ্যা শুনলাম। তোমার যুক্তির গুরুত্ব বুঝলাম। আমার আগের বিচারেও কিছু সংশোধন আনলাম। তবু যে অভিজ্ঞতাটা আমার হয়নি, সেটা হয়েছে বলে ঘোষণা করতে পারব না। খুব সহজ কথা।
অথচ সাহিত্যিক সংস্কৃতিতে এই সহজ কথাটা বলার সাহস অনেক সময় আমাদের থাকে না। কারণ মাস্টারপিসের সামনে দাঁড়িয়ে অভিভূত না হওয়ার মধ্যে একধরনের সামাজিক লজ্জা রয়েছে। আপনি যদি বলেন, হ্যামলেট পড়ে বিশেষ কিছু অনুভব করিনি, তাহলে অনেকের চোখে আপনার মানসিক উচ্চতা মুহূর্তে কয়েক ইঞ্চি কমে যাবে। যদি বলেন, কাফকার The Trial পড়ে বিরক্ত হয়েছি, তাহলে আপনাকে অস্তিত্ববাদ, আমলাতন্ত্র এবং আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা সম্পর্কে বক্তৃতা শোনানো হবে।
আর ইউলিসিস সম্পর্কে যদি বলেন, অনেক কিছু বুঝলাম, তবু পড়ার অভিজ্ঞতাটা বিশেষ আনন্দদায়ক হলো না, তখন কেউ কেউ এমনভাবে তাকাবেন যেন আপনি নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রে অনাস্থা প্রকাশ করেছেন।
এখানেই সমস্যা। বৈজ্ঞানিক সত্য এবং নান্দনিক অভিজ্ঞতার বিচারপদ্ধতি এক নয়। কোনও উপন্যাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, ভাষাগত অভিনবত্ব এবং সাহিত্যিক প্রভাব সম্পর্কে যুক্তিনির্ভর আলোচনা করা সম্ভব। সেই আলোচনা থেকে কিছু সিদ্ধান্তে পৌঁছনোও সম্ভব। কিন্তু কোনও সাহিত্যকর্ম আমাকে কতখানি নাড়া দিয়েছে, সে বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতাকে অন্যের অভিজ্ঞতার সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। কোনও বইয়ের গুরুত্ব স্বীকার করার জন্য তাকে ভালোবাসতেই হবে, এমন শর্ত সাহিত্যের কোথাও লেখা নেই।
৯. প্রথম প্রতিক্রিয়া কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
অবশ্য এখানে উলফের অবস্থানকে একেবারে বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়াও ঠিক হবে না।
কারণ তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, এলিয়টের প্রশংসা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর মধ্যে আগে থেকেই প্রতিরোধ ছিল। শ্রেণিগত এবং নৈতিক পূর্বধারণাও ছিল। তাহলে তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়াকে কতখানি গুরুত্ব দেওয়া যায়? এই প্রশ্নটা প্রত্যেক পাঠকের নিজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ধরুন, আপনি একটা উপন্যাস পড়ে বিরক্ত হলেন। এবার নিজেকে কয়েকটা প্রশ্ন করা দরকার। বিরক্তির কারণ কি লেখকের দুর্বলতা? নাকি যে ধরনের সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে আপনি পরিচিত, বইটা তার বাইরে চলে গেছে? ভাষাটা কি সত্যিই অকারণ জটিল? নাকি সেই জটিলতার মধ্যে এমন একটা অভিজ্ঞতা ধরা রয়েছে, যেটা সরল ভাষায় প্রকাশ করলে হারিয়ে যেত? বইটার বিষয়বস্তু কি দুর্বল? নাকি সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ব্যাপারেই আপনার আপত্তি রয়েছে? আরও একটা প্রশ্ন আছে। আপনি কি বইটা পড়ার আগে থেকেই তাকে অপছন্দ করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন? এই প্রশ্নগুলো করা জরুরি। কারণ রুচি যত ব্যক্তিগতই হোক, রুচিরও ইতিহাস রয়েছে।
আমরা যে পরিবারে বড় হয়েছি, যে ভাষায় পড়েছি, যে ধরনের বইকে ভালো সাহিত্য বলে চিনতে শিখেছি, যে সামাজিক পরিবেশে রুচি তৈরি হয়েছে, সবই আমাদের বিচারে প্রভাব ফেলে। বেশিরভাগ সময় সেই প্রভাব সম্পর্কে আমরা সচেতন থাকি না।
একজন পাঠক কোনও উপন্যাসকে অশ্লীল বলেন। আরেকজন একই উপন্যাসে মানুষের শারীরিক অভিজ্ঞতার বিশ্বস্ত উপস্থাপনা দেখতে পান। একজন বলেন, লেখাটা অসংলগ্ন। আরেকজন বলেন, মানুষের চেতনার গতিপ্রকৃতি ধরতে এই অসংলগ্নতা অপরিহার্য।
একজনের কাছে কৌশল, অন্যজনের কাছে শিল্প। তাই প্রথম প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটাই শেষ কথা হতে পারে না। ভালো পাঠক হওয়ার একটা শর্ত নিজের প্রতিক্রিয়াকে সন্দেহ করতে শেখা। উলফের বিশেষত্ব এখানেই যে তাঁর ডায়েরিতে সেই আত্মসন্দেহের চিহ্ন রয়েছে। তিনি জয়েসের উপর বিরক্ত হয়েছেন। আবার নিজের বিরক্তির কারণও পরীক্ষা করেছেন। এই আত্মপরীক্ষাই তাঁর পাঠকে এখনও আলোচনার যোগ্য করে রেখেছে।
১০. মাস্টারপিসের সামনে আত্মসমর্পণের বাধ্যবাধকতা
আমাদের সাহিত্যিক সংস্কৃতিতে একটা বিচিত্র প্রবণতা রয়েছে। কোনও বইকে একবার মাস্টারপিস ঘোষণা করা হলে তার প্রতি ব্যক্তিগত বিরাগ প্রকাশ করাটা প্রায় ধর্মদ্রোহের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সাহিত্যের ইতিহাসে তার অবদান সম্পর্কে আলোচনা হওয়ার বদলে বইটাকে ঘিরে একটা আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি হয়। পাঠকের কাজ তখন বইটার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক তৈরি করা নয়, প্রতিষ্ঠিত রায়ের যথার্থতা অনুভব করার চেষ্টা করা।
এতে দুটো ক্ষতি হয়।
প্রথমত, পাঠের আনন্দ কমে যায়। বই পড়া একটা পরীক্ষায় পরিণত হয়। পাঠক সারাক্ষণ ভাবতে থাকেন, যে মহত্ত্বের কথা এত শুনেছি, সেটা ঠিক কোন পাতায় পাওয়া যাবে?
দ্বিতীয়ত, সাহিত্যসমালোচনা দুর্বল হয়ে পড়ে।
কারণ সমালোচনার কাজই হলো প্রশ্ন তোলা। কোনও সাহিত্যকর্ম কী অর্জন করেছে, কোথায় তার সীমাবদ্ধতা, তার নির্মাণপদ্ধতি কতটা কার্যকর, কোন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে তার গুরুত্ব তৈরি হয়েছে, এসব নিয়ে বিচার করা। মাস্টারপিসকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তুলে দিলে সমালোচনার দরজাটাই বন্ধ হয়ে যায়।
তবে বিপরীত বিপদও আছে।
কেউ কেউ প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক কীর্তির বিরোধিতা করাটাকেই স্বাধীন চিন্তার প্রমাণ বলে মনে করেন। সবাই জয়েসের প্রশংসা করছে? আমি বলব, জয়েস বাজে। সবাই প্রুস্ত পড়ছে? আমি বলব, প্রুস্তের বাক্য বড়। সবাই কাফকার কথা বলছে? আমি বলব, কাফকার গল্পে কিছুই ঘটে না। এই ধরনের বিরোধিতায়ও স্বাধীনতার চেয়ে প্রতিক্রিয়াশীলতার পরিমাণ বেশি। কারণ নিজের বিচার তৈরি করতে হলে আগে শিল্পকর্মটির সঙ্গে প্রকৃত সংলাপে প্রবেশ করতে হয়। পড়তে হয়। বুঝতে হয়। প্রয়োজন হলে আবার পড়তে হয়। অন্যের ব্যাখ্যা শুনতে হয়। নিজের পূর্বধারণাগুলো পরীক্ষা করতে হয়। তারপরও অপছন্দ থেকে গেলে সেই অপছন্দের অধিকার রয়েছে। উলফের পাঠ আমাদের এই শিক্ষাটাই দেয়। তাঁর প্রতিক্রিয়ায় অহংকার ছিল, শ্রেণিবিদ্বেষ ছিল, প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্বস্তি ছিল। কিন্তু সেইসঙ্গে ছিল গভীর সাহিত্যিক অনুসন্ধান, কিছু অর্জনের প্রতি অকুণ্ঠ স্বীকৃতি এবং নিজের বিচার সংশোধনের ক্ষমতা।
এই জটিলতার জন্যই তাঁর ইউলিসিস পাঠ গুরুত্বপূর্ণ।
১১. উলফ ও জয়েস: শেষ পর্যন্ত কে জিতলেন?
এখানে এসে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে শেষ বিচারে কার মতামত ঠিক প্রমাণিত হলো?
উলফের, নাকি জয়েসের প্রশংসকদের?
প্রশ্নটার মধ্যে একটা ভুল প্রত্যাশা রয়েছে। সাহিত্যের ইতিহাস কোনও কুস্তি প্রতিযোগিতা নয়, যেখানে শেষ পর্যন্ত একজনকে চিত হয়ে পড়ে থাকতে হবে। জয়েসের ইউলিসিস আধুনিক কথাসাহিত্যের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছে। তার ভাষাগত পরীক্ষানিরীক্ষা, চেতনার উপস্থাপনা, পুরাণ ও দৈনন্দিন জীবনের সংযোগ এবং উপন্যাসের কাঠামো নিয়ে দুঃসাহসী কাজ পরবর্তী সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে। এই ঐতিহাসিক মূল্যায়ন উলফের ব্যক্তিগত বিরক্তির কারণে বাতিল হয়নি।
আবার উলফের নিজের সাহিত্যিক কৃতিত্বও জয়েসের সাফল্যের ছায়ায় হারিয়ে যায়নি। Mrs Dalloway, To the Lighthouse, The Waves আধুনিক উপন্যাসকে নিজস্ব পথে সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষ করে চেতনার প্রবাহ, স্মৃতি, সময় এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রকাশে উলফ এমন সব সাহিত্যিক সম্ভাবনা নির্মাণ করেছেন, যেগুলো জয়েসের থেকে স্বতন্ত্র।
দুই লেখকের সাহিত্যিক পথের মধ্যে মিল আছে, পার্থক্য আছে, পারস্পরিক প্রভাবের প্রশ্ন আছে। সাহিত্যের ইতিহাস তাঁদের দুজনকেই ধারণ করেছে। অথচ পাঠের মুহূর্তে উলফের কাছে জয়েস বিরক্তিকর ছিলেন, প্রুস্ত ছিলেন আনন্দের উৎস। এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে ইতিহাসের রায় দিয়ে মুছে ফেলার কোনও প্রয়োজন নেই। বরং ভাবা যাক, সাহিত্যিক মহত্ত্বের ধারণাটা কতখানি বহুমাত্রিক।
একটা বই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নির্মাণের বিচারে অভিনব হতে পারে। সমালোচনার ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তবু কোনও একজন পাঠকের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি না-ও হতে পারে। সেই পাঠকের অভিজ্ঞতা ব্যর্থতা বলে গণ্য হবে কেন?
১২. মুগ্ধ না হওয়ার অধিকার
শেষ পর্যন্ত ভার্জিনিয়া উলফের ইউলিসিস পাঠের ঘটনাটা আমাদের একটা সত্যের সামনে দাঁড় করায়। আমরা বই পড়ি নিজের অভিজ্ঞতাকে প্রসারিত করার জন্য। অথচ পড়তে বসে অনেক সময় অন্যের অভিজ্ঞতাকে নিজের বলে গ্রহণ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি। বড় লেখকের বই পড়ে মুগ্ধ হওয়ার একটা সামাজিক প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে আমরা কখনও কখনও নিজের পাঠের অভিজ্ঞতাটাকেই অস্বীকার করি।
ভাবি, আমার নিশ্চয়ই আরও বিদ্যা অর্জন করা দরকার। আরও সমালোচনা পড়া দরকার। আরও প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। অনেক সময় সত্যিই দরকার। কিন্তু সমস্ত প্রস্তুতির পরেও যদি বইটা আমাদের স্পর্শ করতে না পারে?
তাহলে?
তাহলে সেই অভিজ্ঞতাকে স্বীকার করতে হবে। সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, নিজের অপছন্দের কারণ নিয়ে প্রশ্ন করার দায়িত্ব আমাদের রয়েছে। কারণ যে বই ভালো লাগেনি, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকতে পারে। যে শিল্পীকে বিরক্তিকর মনে হয়েছে, তাঁর কাছ থেকেও শেখার জিনিস থাকতে পারে। উলফ এই দুটো সম্ভাবনাই দেখিয়েছেন।
তিনি জয়েসের প্রতিভা স্বীকার করেছেন। তাঁর পরীক্ষানিরীক্ষার গুরুত্ব বুঝেছেন। নির্দিষ্ট অধ্যায়ের প্রশংসা করেছেন। অন্য সমালোচকের ব্যাখ্যা পড়ে নিজের বিচারের অসম্পূর্ণতা উপলব্ধি করেছেন। তারপরও বলতে পেরেছেন, আমি অভিভূত হইনি।
এই স্বীকারোক্তির মধ্যে একটা সাহিত্যিক সততা রয়েছে। আবার তাঁর অন্যান্য মন্তব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সততার দাবিও আত্মসমালোচনার বিকল্প হতে পারে না। আমার মনে হয়, উলফের ইউলিসিস পাঠ থেকে শেখার প্রধান বিষয় এখানেই।
একজন পাঠককে নিজের রুচির উপর আস্থা রাখতে হবে। সেই রুচি কীভাবে তৈরি হয়েছে, তাও বুঝতে হবে। নতুন অভিজ্ঞতার সামনে নিজের বিচার সংশোধনের সাহস রাখতে হবে। আর সমস্ত বিচার-বিবেচনার পরেও যদি একটা মাস্টারপিস তাঁকে অভিভূত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই সত্যটা স্বীকার করতে হবে।
জয়েসের ইউলিসিস বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। তার জন্য ভার্জিনিয়া উলফের মুগ্ধতার সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয়নি।
উলফও নিজের সাহিত্যিক জীবন সম্পন্ন করেছেন। তার জন্য জয়েসের সামনে আত্মসমর্পণ করার প্রয়োজন পড়েনি।
এই দুটো ঘটনা পাশাপাশি রেখে দেখলেই সাহিত্যিক স্বাধীনতার একটা চমৎকার ছবি পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত একটা বই পড়ে আমরা কী অনুভব করব, সেটা কোনও সমালোচক, অধ্যাপক, সাহিত্যসভা বা ইতিহাসের বই নির্ধারণ করে দিতে পারে না। তাঁরা আমাদের বোঝাতে পারেন, কেন একটা রচনা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের চোখে পড়েনি এমন কিছু দেখিয়ে দিতে পারেন। ভুল ধারণা সংশোধন করতে পারেন। কিন্তু আমাদের হয়ে মুগ্ধ হতে পারেন না। সেই কাজটা একান্তই পাঠকের। আর পাঠক যদি শেষ পর্যন্ত মুগ্ধ না হন, তাহলে তাঁর কর্তব্য বইটার প্রতি অন্যায় না করা, নিজের প্রতিও না।
সাহিত্যিক স্বাধীনতার শর্ত এটুকুই। এবং সম্ভবত এই স্বাধীনতার কারণেই কোনও মাস্টারপিসকে আমরা যুগের পর যুগ নতুন করে পড়ি, বিচার করি, ভালোবাসি, বিরক্ত হই, আবার পড়ি। কারণ মহৎ সাহিত্য যতদিন পাঠকের সঙ্গে তর্ক চালিয়ে যেতে পারে, ততদিনই তার জীবন রয়েছে।
তথ্যসূত্র ও পাঠ-সংক্রান্ত টীকা: উলফের ডায়েরি, চিঠি এবং সমালোচনামূলক রচনাগুলো: Woolf’s Reading of Ulysses, 1918–1920 এবং Woolf’s Reading of Ulysses, 1922–1941।
উলফের ১৬ আগস্ট ১৯২২-এর ডায়েরি: The Morgan Library & Museum: Virginia Woolf Responds।




Agreed. I preferred to be moved and stunned but I don’t like to be stunned only, applicable to any form of art, book, movie, painting etc