এক বন্ধু তার জীবনে ঘটে যাওয়া এক অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যের কথা বলে শেষেই দাবি করল, “এমন ঘটনা আমার জীবনে আর কখনো ঘটবে না”। তার নিজের কথা নিজেই বাতিল করার এই অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। যে ঘটনা তার অতীত অভিজ্ঞতা বা অনুমানের তোয়াক্কা না করে ঘটে গেল, তার পরপরই আবার ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করা মানুষের এক আশ্চর্য প্রবণতা; যার বাইরে আমিও নই।
আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর কোনো আগাম বার্তা ছিল না। অগণিত অমূল্যানুমান বা দুশ্চিন্তার বহু কিছুই ঘটেনি, অথচ কল্পনাতীত ঘটনাগুলো ঠিকই এসে দরজায় কড়া নেড়েছে। আকস্মিক যোগাযোগ, বিচ্ছেদ কিংবা একটি ছোট্ট সিদ্ধান্তই অনায়াসে জীবনের গতি বদলে দেয়।
আমরা গাণিতিক সম্ভাবনাকে সম্ভাব্যতা ভেবে ভুল করি। লাখে একটি ঘটনার সম্ভাবনা গাণিতিকভাবে নগণ্য হলেও, যার জীবনে ঘটে তার কাছে তা শতভাগ সত্য। এমনকি আমাদের নিজস্ব অস্তিত্বই অসংখ্য দৈব ঘটনা ও সিদ্ধান্তের এক জটিল সমীকরণ। তা সত্ত্বেও আমরা বলি “এমনটা হওয়া অসম্ভব”, আর জীবন হয়তো আমাদের এই নিশ্চিতির অহংকার দেখে অলক্ষ্যে হাসে।
তবু অনিশ্চয়তার ভয় থেকেই মানুষ চিরকাল অজানাকে জানার চেষ্টা করে এসেছে। বন্ধ দরজার ওপারে কী আছে তা দেখার এই প্রবল লোভ আর দুর্বলতা আমাদের সহজাত।
পঁয়তাল্লিশ পার করে পেছন ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর কোনো পূর্বসংকেত থাকে না। দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা ও অমূল্যানুমান প্রায়ই সত্যি হয় না; অথচ অভাবনীয় ঘটনাগুলোই অনায়াসে জীবনের দরজায় কড়া নাড়ে।
অপ্রত্যাশিত আগমন-প্রস্থান, ফোন কল কিংবা সঠিক-ভুল সময়ের সামান্য উপস্থিতিই জীবনের গতি বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট—যার কোনো নির্দিষ্ট হিসাব রাখা অসম্ভব!
আমরা probability-কে possibility ভেবে বসি। সম্ভাবনার অঙ্ককে জীবনের মানচিত্র বলে ভুল করি। ধরা যাক, কোনও ঘটনার সম্ভাবনা এক লক্ষে এক। কথাটা শুনে যে কেউ বলবে প্রায় অসম্ভব। অথচ যার জীবনে সেটি ঘটে, তার কাছে সম্ভাবনা এক লক্ষে এক নয়। তার জীবনে সেটি শতভাগ ঘটেছে।
আমাদের অস্তিত্বই অসংখ্য কাকতালীয় ঘটনা ও সিদ্ধান্তের জটিল ফল। অগণিত মানুষের সাক্ষাৎ, বেঁচে থাকা, রোগমুক্তি, স্থানান্তর বা যুদ্ধ এড়ানোর পর একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে উপস্থিত থাকা—এই সব পেরিয়েই আমার আজ এখানে থাকা। নিজের জন্মের গাণিতিক সম্ভাবনা হিসাব করতে গেলে হিসাবের যন্ত্রও স্তব্ধ হয়ে যাবে ।
তারপরও আমরা বলি, “এটা হওয়ার কোনও chance নেই।” জীবন এই ধরনের কথা শুনে সম্ভবত মুচকি হাসে।
ভবিষ্যৎ অনিয়ন্ত্রিত জেনেও মানুষের তা জানার আকাঙ্ক্ষা প্রবল। কারণ অনিশ্চয়তা ও বন্ধ দরজার পিছনের রহস্য মানুষ সহ্য করতে পারে না। মানুষ আবহমান কাল ধরে নানা উপায়ে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস খোঁজার চেষ্টা করে আসছে। গ্রহ-নক্ষত্র, হাতের রেখা, স্বপ্ন বা ট্যারো কার্ড—সবই সেই চেষ্টার অংশ ।
সভ্যতার ইতিহাসের একটা মজার অংশ আসলে ভবিষ্যৎকে ঘুষ দিয়ে খবর বের করার ইতিহাস।
আমাদের বাংলাতেও গণৎকার, কোষ্ঠী, পঞ্জিকা, শুভদিন, অশুভক্ষণ নিয়ে আগ্রহ কম ছিল না। এখনও বিয়ের দিন ঠিক করার সময় বহু শিক্ষিত মানুষ গ্রহ-নক্ষত্রের সঙ্গে যথেষ্ট কূটনৈতিক আলোচনা করেন। অফিসে project deadline নির্ধারণের সময় অবশ্য শনির অবস্থান দেখা হয় না। সেখানে management-এর অবস্থানই যথেষ্ট ভয়াবহ।
তবে এসব নিয়ে উপহাস করলে মানুষের মূল প্রয়োজনকে অস্বীকার করা হয়। আমরা অজানার ভয়েই ভবিষ্যৎ জানতে চাই—সন্তান, সম্পর্ক, অসুস্থতা বা ব্যর্থতার শঙ্কা থেকে মুক্ত হতে চাই। মানুষ এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের কাছে নয়, বরং নিজের ভয়ের কাছ থেকেই খোঁজে ।
তাই ভবিষ্যৎ গণনার প্রাচীন পদ্ধতিগুলো আমার কাছে সম্পূর্ণ অর্থহীন মনে হয় না। ভবিষ্যৎ দেখানোর ক্ষমতা না থাকলেও, এগুলো মানুষকে মূলত নিজের ভেতরের মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়।
দুটো অনিশ্চিত বিকল্প থেকে একটি বাছতে coin toss করলে, মুদ্রা মাটিতে পড়ার আগেই মানুষ বুঝে ফেলে সে আসলে কোন ফলটি চাইছে। মুদ্রা ভবিষ্যৎ না জানালেও নিজের আসল ইচ্ছা চিনতে সাহায্য করে।
ট্যারো কার্ডের ক্ষেত্রেও একই ঘটে। কার্ড আগামী মুহূর্তের খবর জানে না; বরং প্রতীক দেখে আমরা যে গল্প বাঁধি, তাতে উঠে আসে নিজেরই আতঙ্ক, ইচ্ছা ও স্মৃতি। তাই কার্ডের চেয়ে পাঠকের মনই আসল।
ডি. এইচ. লরেন্সের মতে, গভীর মনোযোগ প্রায়শই সমাধান এনে দেয়। আমরা যেসব প্রশ্নকে উত্তরহীন ভাবি, সেগুলোতে আসলে মনোযোগ দিই না। মনের কোণে অজস্র চিন্তা, নোটিফিকেশন আর দুশ্চিন্তার ভিড়ে তড়িঘড়ি কোনো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর মিলবে—এমন দ্রুত সেবা পাওয়ার অভ্যাস মানুষের মনের নেই।
Alejandro Jodorowsky-র The Way of Tarot পড়তে গিয়ে এই ব্যাপারটি আরও স্পষ্ট হয়েছিল। তিনি ভবিষ্যৎ গণনার ধারণাটাকেই প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর আপত্তি শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক নয়, নৈতিকও। যদি আমার জন্মের মুহূর্তেই আমার সমস্ত জীবন কোনও অদৃশ্য খাতায় লেখা থাকে, তা হলে চেষ্টা, সিদ্ধান্ত, অনুশোচনা, শিক্ষা, সাহস, পরিবর্তন, এসবের অর্থ কী? প্রশ্নটি পুরনো।
গ্রিক নাটকে ভাগ্য থেকে পালাতে গিয়ে মানুষ প্রায়ই ভাগ্যের কাছেই পৌঁছে যায়—যেমন ঈডিপাসের ক্ষেত্রে হয়েছিল। গল্প হিসেবে এটি দারুণ, তবে জীবন চলার নির্দেশনা হিসেবে বেশ জটিল।
বিজ্ঞানের একসময় ধারণা ছিল মহাবিশ্বের সব কণার গতি ও অবস্থান জানলে ভবিষ্যৎ গণনা সম্ভব। মানুষ ধর্মযাজকদের হাত থেকে ভবিষ্যৎ জানার ভার গণিতবিদদের হাতে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এ বৈজ্ঞানিক স্বপ্ন মানুষের সেই চিরন্তন আশারই প্রকাশ—ভবিষ্যৎকে জয় করার আকাঙ্ক্ষা।
তবে ব্যক্তিগত জীবনে এ ধরনের মহাতত্ত্ব কাজে আসে না। আগামী বছর কোথায় থাকব, কে পাশে থাকবে কিংবা কোন ফোনকল দিন বদলে দেবে—তার কোনো গাণিতিক সমীকরণ আমার জানা নেই।
হোডোরোভ্স্কির রূপকটির মতোই আমি ভাবি—আমি আজ অসংখ্য খোলা রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। একটি সিদ্ধান্ত, অন্যের ক্রিয়া বা আকস্মিক ঘটনা—সবই জীবনের পথ বদলে দিতে পারে।
আমার স্বাধীনতা অসীম নয়। কিন্তু শূন্যও নয়। আমার জন্ম কোথায় হবে, কোন পরিবারে হবে, কোন ইতিহাসের মধ্যে চোখ খুলব, এগুলি আমি ঠিক করিনি। আমার শরীর, ভাষা, প্রথম দিককার ভয়, পারিবারিক অভ্যাস, সামাজিক শ্রেণি, সময়ের রাজনীতি, অনেক কিছুই আমাকে দেওয়া হয়েছে। এই উত্তরাধিকার কখনও পুঁজি, কখনও বোঝা।
তারপরও প্রতিটি জীবনে কিছু ছোট ছোট মোড় আসে যেখানে মানুষকে নিজের পা তুলতে হয়। সেখানেই সম্ভবত স্বাধীনতার সামান্য জায়গা।
ভবিষ্যৎ জানার আগ্রহ প্রায়ই বর্তমানের কাজের প্রতি আস্থা কমার ইঙ্গিত দেয়—Jodorowsky-র এই অস্বস্তিকর বক্তব্যটি আমি নিজের জীবনেও সত্য প্রমাণিত হতে দেখেছি।
নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকলে ভবিষ্যৎ জানার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু দ্বিধা থাকলে নিশ্চিতকরণের লোভ বাড়ে। তখন জ্যোতিষী, ট্যারোট রিডার, বন্ধু বা থেরাপিস্ট—যে-কেউ এসে “ঠিক করছ” বললে সাময়িক শান্তি মেলে।
আমাদের মূল আকাঙ্ক্ষা প্রায় একই—কেউ যেন অনিশ্চয়তার ভারটা ভাগ করে নেয়। প্রার্থনার ধর্মতত্ত্ব না জানলেও অভিজ্ঞতায় দেখি, তা আশা-ভয় প্রকাশের পথ। “কাউকে বাঁচাও”, “কাজটি হোক” বা “ক্ষমা করো” বলার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভয়, আকাঙ্ক্ষা ও অপরাধবোধ স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে। প্রার্থনা আসলে অন্তরের অন্ধকারে আলো ফেলে—ট্যারোও সে কাজ করতে পারে।
নিজের দিকে তাকানো সহজ নয়। আমরা স্বরচিত গল্পে নিজেদের উদার, যুক্তিপূর্ণ ও নির্দোষ প্রমাণ করি, কারণ এখানে লেখক ও প্রকাশক একই ব্যক্তি হওয়ায় কোনো তথ্য-যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না।
কোনো কার্ড, কবিতা, স্বপ্ন, থেরাপি বা বন্ধুর সৎ মন্তব্য আমাদের স্বরচিত মনগড়া ধারণায় লাল পেন্সিল চালিয়ে গোপন সত্য প্রকাশ করে—উদারতায় অনুমোদনের লোভ, দায়িত্বে নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা, ভালোবাসায় অধিকারবোধ, স্বাধীনতায় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়, আর ক্ষমার ভেতরে প্রাধান্য বিস্তার।
এখানেই Jodorowsky-র বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ: পরিবার, সমাজ, সংস্কার, পুরনো ট্রমা ও অহংয়ের মতো স্তরগুলো সরিয়ে মানুষ যদি নিজের কিছুটা কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, তবে সেটাই পরম লাভ।
“আমি আসলে কে?” প্রশ্নটি শুনতে সহজ। উত্তরটি খুব একটা সহজ নয়। কারণ আমার মধ্যে কত অংশ আমার নিজের, আর কত অংশ আমাকে দেওয়া হয়েছে, তার হিসাব রাখা কঠিন।
পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রত্যাশা এবং নানা বিধি-নিষেধ শৈশব থেকেই অলক্ষ্যে আমাদের মানসপটে গেঁথে যায়। ফলে সময়ের সঙ্গে এসব বাহ্যিক প্রভাবকেই আমরা নিজেদের নিজস্ব চিন্তা ও কণ্ঠস্বর বলে ভুল করতে শুরু করি। তাই ভবিষ্যৎ জানার চেয়ে নিজেকে জানা সম্ভবত কঠিনতর কাজ। এবং বেশি প্রয়োজনীয়ও।
আমার বন্ধুর “এমন আর ঘটবে না” ধারণাকে সেদিন শুধরে দিইনি। আনন্দে দার্শনিক বাণী দেওয়া অনুচিত মনে করে সংযম রেখেছিলাম। তবে ভেবেছিলাম, জীবন যখন একবার তাকে অবাক করেছে, তখন আবারও করতে পারে—ভালো কিংবা মন্দ যেকোনোভাবে। আমরা চমক বলতে উপহারের বাক্স ভাবলেও জীবন সব সময় অত দয়ালু নয়। তবে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই হয়তো জীবনের আসল করুণা লুকিয়ে আছে ।
ভবিষ্যৎ অনির্ধারিত বলেই আশা, অনুশোচনা, পরিবর্তন ও ಕ್ಷমার সুযোগ বেঁচে থাকে। উদ্বেগের বিনিময়েই আমরা এই সমস্ত সম্ভাবনা লাভ করি ।
ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত নিশ্চিত মানুষদের নিয়ে আমি সতর্ক থাকি। আশাবাদী বা হতাশাবাদী—দুজনেরই সমস্যা এক। একজন ভাবে সব ভালো হবে, অন্যজন ভাবে সব শেষ। তারা এত তথ্য কোথা থেকে পান তা আমার জানা নেই, কারণ সেই দপ্তরের কোনো নম্বর আমার কাছে নেই。
তাই ভবিষ্যতের চিন্তা ছেড়ে বর্তমানকে জানার চেষ্টা করি। যোগ্যতা সীমিত, তাই আগামী সপ্তাহের চিন্তায় আজও চা জুড়িয়ে যায়。
তবুও ভবিষ্যৎ জানার আগে নিজের ভেতরকে জানা বেশি জরুরি। পাখির উড়ান, ট্যারো, প্রার্থনা বা মুদ্রার টস—এসব আগামী দিন জানাতে না পারলেও নিজের অনুভূতির মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ করে দেয়। আমি ভবিষ্যৎ জানি না, এবং এই অজ্ঞতাকে আর অপমানজনক লাগে না। বরং ভালোই লাগে যে সামনে এখনও নতুন কয়েকটি পথ খোলা আছে।




