I wish good essays could pay rent on their own. Until they learn how, paid subscriptions keep this publication alive.
এই প্রশ্নের উত্তরে খুব সহজে বলা যায়, পুঁজি দিয়ে যে ব্যবস্থা চলে সেটাই পুঁজিবাদ। উত্তরটি শুনে আমাদের জ্ঞান যতখানি বাড়ল, ‘হাতি কী?’ প্রশ্নের উত্তরে ‘যে জন্তুটা হাতি’ শুনলেও মোটামুটি ততখানিই বাড়ত।
বাংলায় পুঁজিবাদের আরেক নাম ধনতন্ত্র। ‘ধন’ মানে সম্পদ। এখানেই একটু বিপদ। কারণ মানুষ তো পুঁজিবাদ আবিষ্কারের বহু হাজার বছর আগেও সম্পদ তৈরি করেছে। ধান ফলিয়েছে, ছাগল পুষেছে, হাঁড়ি বানিয়েছে, কাপড় বুনেছে, বাড়ি তুলেছে। মহেঞ্জোদারোর লোকেরও সম্পত্তি ছিল, রোমান সাম্রাজ্যে ব্যবসা ছিল, মধ্যযুগের জমিদারের গোলাঘর ছিল। তাই সম্পদ থাকলেই পুঁজিবাদ এসে হাজির হয় না।
পুঁজির ব্যাপারটা একটু আলাদা।
যখন উৎপাদনের উপকরণ, অর্থাৎ জমি, যন্ত্র, কারখানা, কাঁচামাল, অর্থ এবং উৎপাদনের অন্যান্য প্রধান শক্তি সমাজের একটি তুলনামূলক ছোট শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, আর সেই মালিকানা ব্যবহার করে তারা অন্য মানুষের শ্রম কিনে উৎপাদন চালায় এবং উৎপন্ন উদ্বৃত্ত থেকে মুনাফা সঞ্চয় করে, তখন সেই সম্পদ পুঁজির চরিত্র পায়।
শোষণ অবশ্য পুঁজিবাদের পেটেন্ট করা আবিষ্কার নয়। মানুষের ইতিহাসে এই একটি জিনিসের কপিরাইট কেউ দাবি করলে বাকি সভ্যতাগুলি আদালতে ছুটবে। দাসব্যবস্থায় দাসমালিক মানুষকেই মালিকানার বস্তু বানিয়েছে। সামন্ততন্ত্রে জমির মালিকানা এবং কৃষকের বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে উদ্বৃত্ত আদায় হয়েছে। পুঁজিবাদেও শ্রেণিবিভাগ এবং শোষণ আছে, কিন্তু তার কলকবজা আলাদা। এই আলাদা কলকবজাটাই বোঝা দরকার।
কারণ ইতিহাসে শোষণ শুধু পোশাক পালটায় না, হিসাবের খাতাটাও পালটায়।
ধরা যাক, কয়েকশো বছর আগের একটি কৃষক পরিবার। তারা ধান ফলাল। সেই ধানের একটা বড় অংশ যাবে নিজেদের খাবারে। কিছু চাল হয়তো অন্য কারও সঙ্গে বিনিময় করে তেল, নুন, কাপড় বা অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া গেল। উৎপাদনের সঙ্গে পরিবারের প্রয়োজনের একটা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে।
পুঁজিবাদ এই সম্পর্কটাকে নাটকীয়ভাবে বদলে দেয়।
এখানে উৎপাদনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে বাজারে বিক্রি। আপনি এমন একটি জিনিস তৈরি করছেন, যার ক্রেতাকে আপনি হয়তো জীবনে কোনও দিন দেখবেন না। কোন শহরে থাকে জানেন না, তার নাম জানেন না, সে দুপুরে ভাত খায় না স্যালাড খায় তাও জানেন না। আপনার সঙ্গে তার সম্পর্ক ঘটাবে বাজার এবং টাকা।
অর্থাৎ উৎপাদক আর নির্দিষ্ট ভোক্তার মধ্যে পরিচয় জরুরি নয়। বাজারই মধ্যস্থতাকারী।
তার ফলে প্রশ্নটাও পালটে যায়। আগে প্রশ্ন ছিল, আমাদের কী দরকার? এখন প্রশ্ন, বাজারে কী বিকোবে?
এই দুই প্রশ্নের মধ্যে মানবসভ্যতার একটা বেশ মোটা ইতিহাস ঢুকে আছে।
ধরা যাক, একটি জমিতে চাল ফলালে বহু মানুষের খাদ্য হবে, কিন্তু অন্য একটি ফসল ফলালে বিদেশের বাজারে দাম বেশি পাওয়া যাবে। পুঁজির যুক্তি দ্বিতীয়টির দিকে ঝুঁকবে। কারণ বাজারের কাছে পেটের ক্ষুধা আর মুনাফার সুযোগ একই নৈতিক ওজন নিয়ে হাজির হয় না। বাজার দাম জানে। মানুষের প্রয়োজনের নৈতিক অগ্রাধিকার জানার চাকরি তাকে দেওয়া হয়নি।
ঔপনিবেশিক বাংলায় নীলচাষ তার কুখ্যাত উদাহরণ। খাদ্যশস্যের জমিতে নীল চাষ করিয়ে ইংরেজ বণিক ও পুঁজির মালিকেরা আন্তর্জাতিক বাজারের লাভ বাড়াতে চেয়েছে। কৃষকের পেট, জমির প্রকৃতি, স্থানীয় খাদ্যনিরাপত্তা তখন হিসাবের প্রধান ঘর নয়। এক্সেল শিট তখন ছিল না, মনোভাবটি বেশ দিব্যি ছিল।
এই বাজারমুখিতা পুঁজিবাদের প্রথম বড় বৈশিষ্ট্য।
দ্বিতীয় ব্যাপারটি আরও মজার।
পুঁজিবাদে উৎপাদিত বস্তু মূলত পণ্য বা commodity হিসেবে আবির্ভূত হয়।
পণ্য কী?
যে বস্তু বা পরিষেবা বাজারে বিক্রির জন্য তৈরি।
একটা আমগাছের আম আপনি বাড়ির ছেলেমেয়েদের খাওয়ালেন, ব্যাপারটির একটা চরিত্র। সেই আম প্যাকেট করে সুপারমার্কেটে পাঠালেন, তার চরিত্রে নতুন কিছু যোগ হল। এখন সে বাজারের বস্তু। তার ওজন আছে, দাম আছে, পরিবহণ খরচ আছে, মুনাফার হার আছে।
এখানে টাকা বিরাট ভূমিকা নেয়।
চাষি চাল বিক্রি করে টাকা পায়। তাঁতি কাপড় বেচে টাকা পায়। ডাক্তার তাঁর চিকিৎসার সময় বিক্রি করেন, শিক্ষক তাঁর জ্ঞান ও সময়, ইঞ্জিনিয়ার তাঁর প্রযুক্তিগত দক্ষতা, অভিনেতা অভিনয়, লেখক বই, আইনজীবী আইন জানা এবং যথাসময়ে এমন কিছু লাতিন শব্দ বলার ক্ষমতা বিক্রি করেন যাতে মক্কেলের মনে হয় সভ্যতা এখনও টিকে আছে।
সবকিছুর মধ্যে বিনিময়ের সাধারণ মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় টাকা।
এই জায়গাটায় পুঁজিবাদ এক আশ্চর্য অনুবাদক। চাল, জুতো, গান, অস্ত্রোপচার, সফটওয়্যার, বাড়ি, পরিবহণ, শিক্ষা, পরামর্শ, মানুষের সময়, সবকিছুকে সে একটি সাধারণ ভাষায় অনুবাদ করতে পারে।
সেই ভাষার নাম দাম।
এর পরে ব্যাপারটা একটু খ্যাপাটে।
কারণ বাজারে শুধু মানুষের তৈরি জিনিস ওঠে না। মানুষের শ্রমক্ষমতাও ওঠে।
একজন শ্রমিকের শরীরের শক্তি, একজন শিক্ষকের মেধা, একজন চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ, একজন প্রোগ্রামারের কোড লেখার ক্ষমতা, একজন লেখকের ভাষাজ্ঞান, একজন গায়কের গলা, সবই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাজারে বিক্রয়যোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণে একে বলা হয় শ্রমশক্তি বা labor power।
ধরা যাক একজন কৃষক চমৎকার চাষ করতে জানেন। কীভাবে জমি তৈরি করতে হয়, কখন বীজ ফেলতে হয়, কখন জল দিতে হয়, সব তাঁর নখদর্পণে। কিন্তু জমি নেই, লাঙল নেই, যন্ত্র নেই, বীজ কেনার অর্থ নেই।
তাঁর দক্ষতা আছে। উৎপাদনের উপায় নেই।
অন্যদিকে একজনের হাতে জমি, যন্ত্র, কাঁচামাল, অর্থ সব আছে।
তখন প্রথম ব্যক্তি তাঁর শ্রমক্ষমতা দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে বিক্রি করবেন।
এইখানেই পুঁজিপতি এবং মজুরের সম্পর্কটি তৈরি হয়।
মার্ক্সীয় ব্যাখ্যায় শ্রমিক তাঁর শ্রমশক্তি বিক্রি করে মজুরি পান, কিন্তু তাঁর শ্রম যে মোট মূল্য সৃষ্টি করে তার সমস্তটা তিনি মজুরি হিসেবে ফেরত পান না। শ্রমের সৃষ্টি করা মূল্য এবং শ্রমিককে দেওয়া মজুরির মধ্যবর্তী উদ্বৃত্ত অংশ পুঁজির মালিকের হাতে যায়। এই surplus value বা উদ্বৃত্ত মূল্য থেকেই মুনাফার মৌলিক ভিত্তি তৈরি হয়।
এই তত্ত্বটি মার্ক্সীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির কেন্দ্রে।
একটা কারখানায় সকাল আটটায় শ্রমিক ঢুকলেন, বিকেল পাঁচটায় বেরোলেন। তাঁর দিনটাকে ঘড়ি দিয়ে মাপা হচ্ছে, তাঁর উৎপাদনক্ষমতা হিসাব করা হচ্ছে, সেই সময়ের বিনিময়ে মজুরি দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক অফিসে কারখানার বাঁশি নেই। আছে লগইন, টাইমশিট, পারফরম্যান্স রিভিউ, ক্যালেন্ডারে এমন সব মিটিং যার উদ্দেশ্য মিটিং শেষ হওয়ার পরেও রহস্যময় থেকে যায়। অর্থনৈতিক সম্পর্কটির গোড়ার প্রশ্ন অবশ্য একই: কার শ্রম, কার নিয়ন্ত্রণ, উৎপন্ন মূল্যের কতখানি কার হাতে যাচ্ছে?
এ বার চতুর্থ বৈশিষ্ট্য।
পুঁজিবাদে যাঁর হাতে উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা, উৎপাদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান ক্ষমতাও সাধারণত তাঁর হাতেই থাকে। কোন পণ্য তৈরি হবে? কত তৈরি হবে? কোন প্রযুক্তিতে তৈরি হবে? কতজন শ্রমিক লাগবে? কার চাকরি থাকবে? কার চাকরি মঙ্গলবার দুপুর তিনটে সতেরো মিনিটে একটি ‘organizational restructuring’ ই-মেলের মধ্যে বাষ্প হয়ে যাবে? পণ্যের দাম কী হবে? কোন বাজারে বিক্রি হবে? বিজ্ঞাপনে কী বলা হবে?
সব সিদ্ধান্তে শ্রমদানকারী মানুষের সমান অধিকার থাকে না। পুঁজির মালিক, পরিচালকমণ্ডলী এবং ব্যবস্থাপকেরা উৎপাদনের গোটা প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন।
আধুনিক কিছু দেশে শ্রমিক প্রতিনিধি বোর্ডে থাকতে পারেন, ট্রেড ইউনিয়ন আলোচনায় অংশ নিতে পারে, কিছু প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের মতামত নেওয়া হয়। কিন্তু মূলধন কোথায় যাবে, কোন কারখানা বন্ধ হবে, উৎপাদন কোথায় সরবে, কোন কোম্পানি কেনা হবে, কোন ব্যবসা বিক্রি হবে, এসব প্রধান আর্থিক সিদ্ধান্তের ক্ষমতা সাধারণত শ্রমিকদের হাতে থাকে না।
কোম্পানি ভুল সিদ্ধান্ত নিলে অবশ্য তার ফল কর্মচারীদের শরীরে বেশ দ্রুত পৌঁছয়।
CEO ভুল acquisition করলেন, বাজারে পণ্য চলল না, ঋণ বেড়ে গেল। পরের দৃশ্যে দেখা গেল হাজার কর্মী ‘দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ’-এর কারণে চাকরি হারিয়েছেন। ভাষাও পুঁজিবাদের চমৎকার আবিষ্কার। ‘লোক ছাঁটাই’ শুনলে মন খারাপ হয়। ‘workforce optimization’ শুনলে মনে হয় কেউ সম্ভবত অঙ্কে ৮৭ পেয়েছে।
পঞ্চম বৈশিষ্ট্য বিনিয়োগ।
পুঁজি শুধু এক জায়গায় পড়ে থাকে না। তাকে সংগ্রহ করা হয়, ধার করা হয়, ঋণ নেওয়া হয়, বিনিয়োগ করা হয়, আবার সেই বিনিয়োগ থেকে পাওয়া মুনাফা নতুন করে বিনিয়োগ করা হয়।
Capital accumulation।
Loan capital।
Investment।
এই শব্দগুলো নিরীহ । কিন্তু এগুলো ঠিক করে কোনও শহরে নতুন কারখানা হবে কি না, কোনও খনি খুলবে কি না, কোন শিল্পে হাজার হাজার চাকরি তৈরি হবে, কোন শিল্প শুকিয়ে যাবে।
যাঁরা সরাসরি উৎপাদন করছেন, তাঁদের হাতে এই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত সচরাচর থাকে না।
অর্থাৎ আপনি কোনও প্রতিষ্ঠানে তিরিশ বছর কাজ করলেন। এক সকালে মালিক সিদ্ধান্ত নিলেন উৎপাদন অন্য দেশে সরানো হবে। আপনার তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতা সিদ্ধান্তের টেবিলে ভোট পাবে, এমন কোনও নিয়ম নেই।
পুঁজিবাদের ক্ষমতার একটি বড় উৎস তাই সম্পদের মালিকানা ছাড়াও পুঁজি কোথায় যাবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
আধুনিক পুঁজিবাদ এসে আরেকটি সুন্দর জট পাকিয়েছে।
শেয়ার বাজার।
একটি বড় কোম্পানির লক্ষ লক্ষ শেয়ার থাকতে পারে। আপনি তার দশটি শেয়ার কিনলেন। অভিনন্দন, আপনি এখন কোম্পানিটির অতি ক্ষুদ্র মালিক।
এর পর অফিসে ঢুকে CEO-র চেয়ারে বসার চেষ্টা করবেন না। কারণ মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এখানে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। শেয়ারহোল্ডাররা কোম্পানির অংশের মালিক, ডিভিডেন্ড পেতে পারেন, শেয়ারের দাম বাড়লে লাভবান হন। কিন্তু প্রতিদিনের উৎপাদন, কর্মী নিয়োগ, প্রযুক্তি, বিপণন, বিনিয়োগ ইত্যাদি সিদ্ধান্ত নেয় পরিচালন কাঠামো। Joint stock company-র বিকাশ আধুনিক পুঁজিবাদে এই বিচ্ছেদটাকে সম্ভব করেছে। হাজার হাজার মানুষ মালিকানার অংশীদার হতে পারেন, অথচ কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কয়েকজন পরিচালক এবং বৃহৎ বিনিয়োগকারীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকতে পারে।
এ যেন একটা বিশাল বিয়েবাড়ি। খরচে অবদান অনেকের, কিন্তু মেনু কে ঠিক করেছে কেউ জানে না।
সপ্তম বৈশিষ্ট্যটিই সম্ভবত পুঁজিবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক অভ্যাস।
পুঁজি বাড়তে চায়।
একজন পুঁজিপতি এক কোটি টাকা লাভ করলেন। তিনি চাইলে পুরোটা দিয়ে কাশ্মীর ঘুরে, সাতটা গাড়ি কিনে, বাকি টাকা দিয়ে বিরিয়ানি খেয়ে শেষ করতে পারেন। কিন্তু পুঁজিপতি হিসেবে সফল হতে গেলে তিনি সাধারণত তা করবেন না।
মুনাফার একটি অংশ নতুন করে বিনিয়োগ করবেন। নতুন যন্ত্র কিনবেন। উৎপাদন বাড়াবেন। অন্য কোম্পানি কিনবেন। নতুন বাজারে ঢুকবেন। তারপর আরও মুনাফা। তারপর আরও বিনিয়োগ। এই হল capital accumulation-এর চক্র।
মার্ক্সের বিখ্যাত বিশ্লেষণে পুঁজির মূল চালিকাশক্তি এই স্ববৃদ্ধি। টাকা পণ্য উৎপাদনের মধ্যে দিয়ে আরও বেশি টাকায় ফিরে আসতে চায়। আজ একশো। কাল একশো দশ। পরশু একশো কুড়ি। তারপর বোর্ড মিটিংয়ে কেউ বললেন, growth মাত্র ৮ শতাংশ কেন? গত বছর তো ১২ ছিল। পুঁজিবাদের মধ্যে ‘যথেষ্ট হয়েছে’ কথাটা তাই একটি বিপজ্জনক বাক্য। কোম্পানি লাভ করছে, কিন্তু গত বছরের তুলনায় কম হারে লাভ করছে। শেয়ারবাজার হতাশ। অর্থাৎ আপনি দৌড়ে প্রথম হলেন, কিন্তু গতবারের চেয়ে তিন সেকেন্ড বেশি লাগল। সবাই মুখ গোমড়া করে বসে আছে।
পুঁজির গতিশীলতা এইখানে। সে স্থির থাকলে তার চরিত্রের সঙ্গে গোলমাল হয়।
অষ্টম বৈশিষ্ট্যটি একটু সূক্ষ্ম। আধুনিক পুঁজিবাদী উৎপাদন বিপুলভাবে সামাজিক।
একটা স্মার্টফোনের কথা ভাবুন।
তার নকশা এক দেশে হতে পারে, চিপ অন্য দেশে, বিরল খনিজ আরেক মহাদেশ থেকে এসেছে, স্ক্রিন অন্য কোম্পানি বানিয়েছে, সফটওয়্যার হাজার প্রকৌশলীর যৌথ শ্রমে তৈরি, assembly আরেক দেশে, পরিবহণ অন্য সংস্থা করেছে, দোকানে আরেক প্রতিষ্ঠান বিক্রি করছে।
একটি পণ্যের পেছনে হাজার হাজার অচেনা মানুষের শ্রম জড়িয়ে আছে। এই অর্থে উৎপাদন সামাজিক। কিন্তু কোম্পানিগুলো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে পৃথকভাবে এবং নিজেদের মুনাফার ভিত্তিতে। কোম্পানি A জানে না কোম্পানি B কত উৎপাদন করবে। দুজনেই বাজারের ভবিষ্যৎ চাহিদা আন্দাজ করছে। দুজনেই বেশি বিক্রি করতে চায়। দুজনেই বাজার দখল করতে চায়।
তারপর কখনও দেখা গেল অতিরিক্ত উৎপাদন হয়েছে। পণ্য পড়ে আছে, ক্রেতা নেই। দাম পড়ছে। কারখানা বন্ধ। শ্রমিক ছাঁটাই।
অর্থাৎ সমগ্র ব্যবস্থা বিশাল সামাজিক উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে, কিন্তু বিনিয়োগের সিদ্ধান্তগুলি বহু পৃথক মালিকের ব্যক্তিগত লাভের হিসাব অনুসারে নেওয়া হচ্ছে।
মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণে এই বিরোধ পুঁজিবাদী অর্থনীতির অন্তর্নিহিত অরাজকতার একটি উৎস। কেউ কেন্দ্র থেকে বসে বলেনি, মানবসমাজের আগামী বছরে ঠিক ১৭ কোটি জোড়া জুতো দরকার, ১৮ কোটি বানিও না। সবাই অনুমান করছে।
সুতরাং বাজার কিছুটা বিশাল পরীক্ষার হল। প্রশ্নপত্র আগে কেউ দেখেনি, সবাই উত্তর লিখছে, ফল বেরোলে জানা যাবে কে পাস করল।
এই পর্যন্ত শুনে মনে হতে পারে, ব্যবস্থাটার মধ্যে শুধু সমস্যা। ইতিহাস এত সরল হলে ইতিহাসের বই অনেক পাতলা হত। প্রাক-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার তুলনায় পুঁজিবাদ উৎপাদনের ক্ষমতা বিপুলভাবে বাড়িয়েছে। এখানে মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণ নিজেও পুঁজিবাদের এই বিপ্লবী ভূমিকাকে অস্বীকার করে না। প্রতিযোগিতা পুঁজিপতিকে বাধ্য করে উৎপাদন বাড়াতে, নতুন প্রযুক্তি আনতে, খরচ কমাতে, দ্রুত পরিবহণ তৈরি করতে, নতুন বাজার খুঁজতে।
আপনি যদি পুরনো প্রযুক্তিতে দশ টাকায় একটি পণ্য তৈরি করেন আর পাশের কোম্পানি নতুন যন্ত্রে সেটি ছয় টাকায় তৈরি করে, আপনার দর্শনচর্চার সময় খুব বেশি নেই। আপনাকেও যন্ত্র বদলাতে হবে। এই চাপ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে উৎপাদনের সঙ্গে ক্রমশ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে।
বাষ্পশক্তি। কারখানা। রেল। বিদ্যুৎ। রসায়ন। টেলিগ্রাফ। মোটরগাড়ি। কম্পিউটার। অটোমেশন। প্রতিটি নতুন প্রযুক্তিই উৎপাদনক্ষমতাকে নতুন স্তরে তুলেছে। পুঁজিবাদের ইতিহাস তাই শুধু লোভের ইতিহাস লিখে শেষ করা যায় না। এর ইতিহাসে আছে প্রযুক্তিগত বিস্ফোরণ, উৎপাদন বৃদ্ধির অভূতপূর্ব গতি এবং পৃথিবীর বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলিকে একটি বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করার প্রক্রিয়া।
সমস্যা শুরু হয় সেই শক্তিশালী ইঞ্জিনটি কী যুক্তিতে চালিত হচ্ছে, সেই প্রশ্নে।
মার্ক্সের আপত্তি কোথায়? মার্ক্সীয় বিশ্লেষণ বলে, পুঁজিবাদ যত সফলভাবে বিকশিত হয়, তার ভিতরের দ্বন্দ্বও তত স্পষ্ট হয়। বড় কারখানা তৈরি হলে হাজার হাজার শ্রমিক একই জায়গায় কাজ করে। তারা একই ধরনের সমস্যা দেখে। মজুরি। কাজের সময়। কাজের পরিবেশ। ছাঁটাই। মালিকের লাভ। নিজেদের সম্মিলিত শক্তিও তারা টের পায়। ফলে শ্রেণিচেতনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। একজন শ্রমিক একা প্রতিবাদ করলে চাকরি যেতে পারে। দশ হাজার শ্রমিক একসঙ্গে কাজ বন্ধ করলে কারখানাও একটু দার্শনিক হয়ে যায়।
মার্ক্সবাদীরা মনে করেছেন, এই সামাজিক উৎপাদন এবং ব্যক্তিগত মালিকানার দ্বন্দ্ব থেকেই একসময় প্রলেতারিয়েতের বিপ্লবী চেতনা তৈরি হবে এবং পুঁজিবাদ নিজের উত্তরসূরি ব্যবস্থার পথ তৈরি করবে।
এই ভাবনাটাই পরে বিখ্যাত বাক্যে রূপ পেয়েছে, পুঁজিবাদ নিজের কবর খোঁড়ার লোক নিজেই তৈরি করে।
মার্ক্সের সময়ে পুঁজিবাদের বিশ্লেষণের প্রধান ক্ষেত্র ছিল শিল্পোন্নত ইউরোপ। লেনিন আরও পরের পর্যায়ে প্রশ্ন তুললেন, যখন পুঁজি জাতীয় সীমান্ত ছাড়িয়ে গোটা পৃথিবীতে বাজার, কাঁচামাল এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্র খুঁজতে বেরোয়, তখন কী ঘটে? তাঁর ব্যাখ্যায় একচেটিয়া পুঁজি, ব্যাংক পুঁজি এবং শিল্পপুঁজির মেলবন্ধন থেকে finance capital-এর বিপুল শক্তি তৈরি হয়।
তারপর পৃথিবীর বাজার ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির প্রতিযোগিতা বাড়ে। এই প্রতিযোগিতা সাম্রাজ্যবাদী সংঘর্ষে গিয়ে পৌঁছতে পারে।
মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী ব্যাখ্যা তাই বিশ শতকের দুই বিশ্বযুদ্ধকেও বৃহৎ শক্তিগুলির সাম্রাজ্যবাদী এবং পুঁজিবাদী প্রতিযোগিতার কাঠামোর মধ্যে বিশ্লেষণ করেছে।
ইতিহাসবিদেরা বিশ্বযুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যা করতে জাতীয়তাবাদ, সামরিক জোট, ভূরাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং বিশেষ রাজনৈতিক ঘটনাসহ আরও বহু কারণ নিয়ে আলোচনা করেন। মূল লেখাটি এখানে বিশেষভাবে মার্ক্সবাদী ব্যাখ্যাটি অনুসরণ করছে।
লেনিনের বিখ্যাত তত্ত্ব অনুযায়ী সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের উচ্চতর পর্যায়। কারণ পুঁজি তখন নিজের দেশের বাজারে সন্তুষ্ট থাকতে পারছে না। তার কাঁচামাল দরকার। বাজার দরকার। বিনিয়োগের ক্ষেত্র দরকার। সস্তা শ্রম দরকার। বন্দর দরকার। রেলপথ দরকার। খনি দরকার। মানচিত্রের রং তখন শুধু স্কুলের ভূগোলের ব্যাপার থাকে না।
পুঁজিবাদের বর্তমান রূপ আকাশ থেকে কোনও মঙ্গলবার বিকেলে পড়েনি। এর কয়েকটি ঐতিহাসিক পর্যায় আছে। প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় বাণিজ্যিক পুঁজিবাদ।
ষোড়শ শতাব্দী থেকে ইউরোপে দূরপাল্লার বাণিজ্য, সমুদ্রযাত্রা, উপনিবেশ, বাণিজ্য কোম্পানি, দাসবাণিজ্য এবং বিপুল বাণিজ্যিক সম্পদ সঞ্চয়ের মাধ্যমে merchant capital-এর শক্তি বাড়তে থাকে।
বণিকেরা সম্পদের নতুন উৎস তৈরি করল। পুরনো কৃষিভিত্তিক সামন্তব্যবস্থার পাশে আরেকটি অর্থনৈতিক শক্তি জন্ম নিল।
জাহাজে মশলা যাচ্ছে। রুপো আসছে। বস্ত্র যাচ্ছে। দাস মানুষকে পণ্য করে মহাসাগর পেরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় বাজার ফুলে উঠছে। এই বাণিজ্যিক পুঁজি পরে শিল্পপুঁজির জন্য ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি করে।
অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে এল শিল্পবিপ্লব। বাষ্পশক্তি। যন্ত্রচালিত উৎপাদন। বৃহৎ কারখানা। পরবর্তীকালে বিদ্যুৎ। উৎপাদনের মাত্রা একেবারে বদলে গেল। আগে একজন তাঁতি যত কাপড় তৈরি করতেন, যন্ত্রচালিত কারখানা তার বহু গুণ তৈরি করতে পারে।
আগে একটি দ্রব্য স্থানীয় বাজারে তৈরি হত। এখন হাজার হাজার একই ধরনের পণ্য তৈরি করে বহু দূরের বাজারে পাঠানো সম্ভব। শিল্পপুঁজি তখন পুঁজিবাদের কেন্দ্র হয়ে উঠল। এর সঙ্গে বিশাল শ্রমিকশ্রেণিও জন্ম নিল। গ্রাম থেকে মানুষ শহরে এল। কারখানার পাশে শ্রমিকবসতি তৈরি হল। সময়ের ধারণাও বদলাল।
কৃষকের কাজ সূর্য, ঋতু ও ফসলের ছন্দের সঙ্গে জড়ানো ছিল। কারখানার শ্রমিকের জীবন বাঁধা হল ঘড়ির সঙ্গে। সকাল আটটা। বাঁশি। কাজ। দুপুর। কাজ। বিকেল। বাঁশি। আধুনিকতার সবচেয়ে শক্তিশালী দেবতাদের একজনের নাম সম্ভবত ঘড়ি।
শিল্পপুঁজিবাদের প্রথম পর্যায়ে laissez-faire ধারণা শক্তিশালী হয়ে উঠল। ফরাসি কথাটার মোটামুটি অর্থ, ছেড়ে দাও, চলতে দাও। রাষ্ট্র ব্যবসার মধ্যে কম ঢুকবে। ব্যক্তি নিজের সম্পত্তি ব্যবহার করবে। বাজারে প্রতিযোগিতা হবে। চাহিদা ও জোগান দাম নির্ধারণ করবে। এই পরিবেশেই classical liberalism এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের রাজনৈতিক তত্ত্ব শক্তি পায়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা সীমিত হওয়া উচিত। ব্যক্তির সম্পত্তির অধিকার থাকতে হবে। চুক্তির স্বাধীনতা থাকতে হবে। ব্যবসার স্বাধীনতা থাকতে হবে।
এই আদর্শগুলি সামন্ততান্ত্রিক বাধা ভাঙার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু অবাধ প্রতিযোগিতার মধ্যে একটি মজার ব্যাপার ঘটল। সবাই প্রতিযোগিতা করতে করতে সবাই সমান শক্তিশালী থাকল না। কেউ জিতল। কেউ হারল। বড় কোম্পানি ছোট কোম্পানিকে কিনল। কেউ দেউলিয়া হল।
কেউ বাজারের এত বড় অংশ দখল করল যে প্রতিযোগীর সংখ্যাই কমে গেল। অর্থাৎ প্রতিযোগিতার দৌড় থেকে বেরিয়ে এল একচেটিয়া পুঁজির সম্ভাবনা।
উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের শুরুতে বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকে।
Monopoly capital।
Finance capital।
বাজারের বড় অংশ অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যেতে পারে। ব্যাংক শুধু টাকা জমা রাখছে না, বিশাল শিল্প বিনিয়োগের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠছে। শিল্পপুঁজি এবং আর্থিক পুঁজির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। পুঁজির আকার এত বড় হচ্ছে যে তার কার্যক্রম জাতীয় সীমান্ত পেরোচ্ছে। খনি আফ্রিকায়। রাবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। কারখানা ইউরোপে। বাজার আরেক মহাদেশে। লাভ ফিরে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীর কাছে। পুঁজির ভূগোল তখন রাজনৈতিক ভূগোলকে ধাক্কা দিতে শুরু করে।
Laissez-faire-এর আদর্শে রাষ্ট্রকে বলা হয়েছিল, ব্যবসার ঘরে বেশি ঢুকো না। কিন্তু বৃহৎ পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র আবার প্রবলভাবে ফিরে এল। কারণ বড় শিল্পের জন্য দরকার অবকাঠামো। আইন। মুদ্রাব্যবস্থা। ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ। বৈদেশিক বাণিজ্য নীতি। সামরিক নিরাপত্তা। বিদেশে বাজারে প্রবেশ। কখনও শুল্ক। কখনও ভর্তুকি। কখনও রাষ্ট্র নিজেই বিশাল ক্রেতা। বিশেষত বিশ শতকে রাষ্ট্র ও বৃহৎ পুঁজির সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে। মার্ক্সবাদী ভাষায় এখানে state monopoly capitalism ধারণাটি আসে। বড় কোম্পানি এবং রাষ্ট্র যেন পাশাপাশি হাঁটছে, মাঝে মাঝে কার হাত কার পকেটে বোঝা কঠিন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পৃথিবীর অর্থনীতি আবার নতুন করে সাজানো হল। ইউরোপ বিধ্বস্ত। এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসছে। নতুন রাষ্ট্রগুলির শিল্প দরকার। বিদ্যুৎ দরকার। রাস্তা দরকার। কারখানা দরকার। প্রযুক্তি দরকার। কর্মসংস্থান দরকার।
কিন্তু অনেক দেশের হাতে পর্যাপ্ত দেশীয় পুঁজি এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা নেই। এই পরিবেশ বহুজাতিক কর্পোরেশনের জন্য বিরাট সুযোগ তৈরি করল। Multinational corporation বা MNC এমন প্রতিষ্ঠান, যার ব্যবসা একাধিক দেশে ছড়িয়ে থাকে। Head office এক দেশে। কারখানা দ্বিতীয় দেশে। কাঁচামাল তৃতীয় দেশ থেকে। কর্মী চতুর্থ দেশে। বাজার সারা পৃথিবী। কর কোথায় দেবে সেই প্রশ্নের উত্তর মাঝে মাঝে অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছাড়া ঈশ্বরও নিশ্চিত নন।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পরিবহণ যত উন্নত হল, বহুজাতিক কোম্পানির কাজ তত সহজ হল। কনটেইনার জাহাজ। বিমান পরিবহণ। টেলিযোগাযোগ। কম্পিউটার। ইন্টারনেট। বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং। একটি কোম্পানি এখন পুরো পৃথিবীকে একসঙ্গে উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে পারে।
পুরনো ঔপনিবেশিকতার দৃশ্যটা পরিষ্কার ছিল। বিদেশি পতাকা। বিদেশি গভর্নর। বিদেশি সৈন্য। প্রশাসনের মাথায় বিদেশি শক্তি। আধুনিক বিশ্বে কোনও দেশের সংসদ থাকতে পারে, পতাকা থাকতে পারে, জাতীয় সঙ্গীত থাকতে পারে, নির্বাচনও হতে পারে, অথচ তার অর্থনীতির বড় অংশ বিদেশি পুঁজি, ঋণ, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল হতে পারে।
মার্ক্সবাদী ও নির্ভরতা-তত্ত্বের আলোচনায় এই সম্পর্ককে অনেক সময় অর্থনৈতিক নয়া-ঔপনিবেশিকতা হিসেবে দেখা হয়েছে। এখানে কাউকে লালকেল্লায় অন্য দেশের পতাকা তুলতে হয় না। চুক্তিপত্রই অনেক কাজ করে দিতে পারে। খনির মালিকানা। তেলের অধিকার। ঋণের শর্ত। বৌদ্ধিক সম্পত্তি। প্রযুক্তি নির্ভরতা। সরবরাহ শৃঙ্খল। বাজার নিয়ন্ত্রণ।এর মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়েও অর্থনৈতিকভাবে প্রবল বহির্ভরতার মধ্যে থাকতে পারে।
পুঁজিবাদকে শুধু ‘ধনীদের ব্যবস্থা’ বললে ব্যাপারটা ধরা পড়ে না। এটি একটি বিশেষ উৎপাদনব্যবস্থা। এর মধ্যে বাজার কেন্দ্রীয়। বস্তু পণ্যে পরিণত হয়। শ্রমশক্তি বাজারে বিক্রি হয়। উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতে থাকে। মালিকানা উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণ দেয়। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পুঁজির মালিকেরা নেয়। মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা আধুনিক কর্পোরেশনে আলাদা হতে পারে। মুনাফা আবার বিনিয়োগ হয়ে পুঁজিকে বাড়ায়।
উৎপাদন সামাজিক হলেও সিদ্ধান্তগুলি বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের লাভের হিসাব অনুসারে চলে। প্রতিযোগিতা প্রযুক্তি ও উৎপাদনক্ষমতাকে দ্রুত বাড়ায়। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতা কেন্দ্রীকরণ, একচেটিয়া শক্তি এবং সংকটের সম্ভাবনাও তৈরি করে।
পুঁজির বিস্তার জাতীয় সীমান্ত অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক বাজার, সাম্রাজ্যবাদ, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং নতুন ধরনের অর্থনৈতিক নির্ভরতার দিকে যায়। এই গোটা ব্যবস্থা বুঝতে একটি অস্বস্তিকর সত্য মাথায় রাখা দরকার। পুঁজিবাদ কোনও লোক নয়। তার গোঁফ নেই। সকালে উঠে সে বলে না, আজ তিনজনকে শোষণ করে তারপর চা খাব।
এটি সম্পর্কের একটি ব্যবস্থা। আপনি একই সঙ্গে তার শ্রমিক, ক্রেতা, সঞ্চয়কারী, বিনিয়োগকারী এবং সুবিধাভোগীও হতে পারেন। আপনার পেনশনের টাকা যে কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ হয়েছে, সেই কোম্পানি হয়তো খরচ কমাতে অন্য একজনের চাকরি বাদ দিচ্ছে। আপনি দোকানে কমদামের জামা চান, সেই কম দাম সম্ভব হয়েছে কোথাও খুব সস্তা শ্রমের কারণে। আপনি নিজের বেতন বাড়াতে চান, আবার যে কোম্পানির শেয়ার কিনেছেন তার মুনাফাও বাড়ুক চান।
অর্থাৎ পুঁজিবাদ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনও দৈত্যের নাম নয়। আমরা তার অসংখ্য সম্পর্কের ভিতরেই বাস করি। মার্ক্সের বড় কৃতিত্ব ছিল এই দৈনন্দিন স্বাভাবিকতার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সম্পর্কগুলিকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করানো।
একটি জিনিসের দাম কত, সেই প্রশ্ন সহজ। কিন্তু জিনিসটি কে তৈরি করল? কী শর্তে তৈরি করল? উৎপাদনের উপকরণের মালিক কে? সিদ্ধান্ত নিল কে? লাভ গেল কোথায়? ক্ষতি হলে কে বহন করল? কোন জিনিসটি তৈরি হবে তা মানুষের প্রয়োজন ঠিক করল, না বাজারে বেশি মুনাফার সম্ভাবনা? আর যে বিপুল সামাজিক শ্রমে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ তৈরি হয়, সেই সম্পদের ওপর সামাজিক মানুষের অধিকার কতখানি? এই প্রশ্নগুলিই পুঁজিবাদ নিয়ে আলোচনাকে শুধু অর্থনীতির বইয়ের মধ্যে আটকে থাকতে দেয় না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা গিয়ে দাঁড়ায় আমরা কী ধরনের সমাজে থাকতে চাই, উৎপাদনের উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত, মানুষের শ্রমের মূল্য কে ঠিক করবে, সম্পদের ওপর অধিকার কীভাবে বণ্টিত হবে এবং বাজার নামের অসাধারণ শক্তিশালী যন্ত্রটির হাতে আমরা ঠিক কতখানি ক্ষমতা তুলে দিতে রাজি। বাজার অসাধারণ চাকর হতে পারে। তার হাতে চাবির গোছা, বাড়ির দলিল এবং উইল তিনটেই একসঙ্গে দিয়ে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমোনো যায় কি না, সেই প্রশ্নটি অবশ্য এখনও আলোচনা চলছে।



