প্রোপাগান্ডা, রাষ্ট্রদ্রোহ: এজরা পাউন্ডের মাইক্রোফোন-যুদ্ধ
ইহুদি-বিদ্বেষ পাউন্ডের রক্তে তখন ফুটন্ত চায়ের মতো টগবগ করছে। মুসোলিনির ফ্যাসিবাদে তিনি খুঁজে পেলেন রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা, অর্থনীতির ওষুধ, আর নিজের মহিমার মঞ্চ।
১৯৩৯ সালের বসন্তকালে ইউরোপে বসে এক ভদ্রলোক ভাবছেন; সভ্যতার ভবিষ্যৎ, কবিতার গতি, আর নিজের গুরুত্ব; তিনটেই তাঁর কাঁধে। নাম তাঁর এজরা পাউন্ড। বয়স তিপ্পান্ন। তিন দশক আগে আমেরিকা ছেড়েছেন। লন্ডন, প্যারিস পেরিয়ে শেষে ইতালির সমুদ্রতীরের ছোট্ট শহর রাপালো; সেখানেই আস্তানা। কবিতার দুনিয়ায় তিনি তখন মহারথী, কিন্তু রাজনীতির ময়দানে তিনি এমন এক দলে নাম লেখালেন, যাদের পতাকায় শিল্পের চেয়ে শাসন বেশি, আর মানবতার চেয়ে হুকুম।
ইহুদি-বিদ্বেষ তাঁর রক্তে তখন ফুটন্ত চায়ের মতো টগবগ করছে। মুসোলিনির ফ্যাসিবাদে তিনি খুঁজে পেলেন রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা, অর্থনীতির ওষুধ, আর নিজের মহিমার মঞ্চ। ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি ‘ইল দুচে’-র সঙ্গে সাক্ষাৎও সেরে ফেললেন। যেন কবি নন, রাজনৈতিক তীর্থযাত্রী। এদিকে আমেরিকায় রুজভেল্ট ক্ষমতায় এসে নিউ ডিল শুরু করেছেন; পাউন্ডের চোখে সেটা অর্থনীতির সংস্কার নয়, সভ্যতার সর্বনাশ। তাঁর কলম তখন তলোয়ারের মতো ধারাল, কিন্তু নিশানা কবিতা নয়, মতাদর্শ।
ইউরোপে যুদ্ধের গন্ধ ঘনিয়ে এলে পাউন্ড ভাবলেন; আমেরিকানদের বোঝাতে হবে, ইতালির বিরুদ্ধে যাওয়া মানে ইতিহাসের বিরুদ্ধে যাওয়া। ১৯৩৯ সালের এপ্রিলে তিনি আমেরিকা গেলেন ‘শিক্ষা’ দিতে। ফল? উদাসীনতা। কেউ তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীকে গুরুত্ব দিল না। কবির কাছে এটি ব্যক্তিগত অপমান। তিনি ইতালিতে ফিরে সরাসরি মুসোলিনির প্রচারযন্ত্রের দরজায় কড়া নাড়লেন; ইউরোপ, এশিয়া, আমেরিকায় ‘অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট প্রোপাগান্ডা’ ঠেকাতে তাঁর মহাপরিকল্পনা আছে।
ইতালির সরকার খানিক উচ্ছ্বসিত, খানিক সন্দিগ্ধ। বিশ্বখ্যাত কবি; কাজে লাগতে পারেন। কিন্তু যদি উনি আমেরিকার গুপ্তচর হন? ওয়াশিংটন থেকে খবর এলো; না, লোকটি সত্যিই ফ্যাসিবাদের প্রেমে পড়েছেন। সন্দেহ কেটে গেল। মাইক্রোফোন খুলে গেল।
১৯৪১ সালের ২৩ জানুয়ারি, রেডিও রোমা। “আমেরিকান আওয়ার।” পাউন্ড ইংরেজিতে ভাষণ দিচ্ছেন। পরের এগারো মাসে প্রায় দুইশো অনুষ্ঠান। মুসোলিনির সড়ক-রেল উন্নয়ন, অপরাধ দমন; সব প্রশস্তি পাচ্ছে। সঙ্গে ফ্যাসিবাদকে সামাজিক অবিচারের মহৌষধ হিসেবে প্রচার, আর আন্তর্জাতিক ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিষাক্ত বক্তৃতা। বিনিময়ে বেতন, সংবাদপত্রে লেখার সুযোগ, এমনকি ট্রেন-বাসে ভাড়া ছাড়। কবিতা যে পেট ভরায় না, প্রোপাগান্ডা ভরায়; এ তাঁর বাস্তব শিক্ষা।
এদিকে আমেরিকা চুপচাপ শুনছে। ১৯৪১ সালের অক্টোবরে ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন পাউন্ডের সম্প্রচার রেকর্ড করা শুরু করল। স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক কর্তা সতর্ক করলেন; লোকটি নিয়মিত আমেরিকার বিরুদ্ধে বলছে। ‘সুডো-আমেরিকান’ তালিকায় নাম তোলার প্রস্তাবও এল।
৭ ডিসেম্বর, পার্ল হারবারে জাপানি হামলা। আমেরিকা স্তম্ভিত। আর সেই বিকেলে পাউন্ড রেডিওতে ফ্যাসিবাদের গুণগান করছেন; অনুষ্ঠানটি আগে রেকর্ড করা ছিল, তাই হামলার উল্লেখ নেই। শোনায় নির্মম, প্রায় অসংবেদনশীল। খবর শুনে পাউন্ড ব্যক্তিগতভাবে বিচলিত হলেও তাঁর প্রতিজ্ঞা; আর সম্প্রচার করবেন না; টিকল সাত সপ্তাহ। ১৯৪২ সালের জানুয়ারিতে আবার মাইক্রোফোনে। এবার আমেরিকার চোখে তিনি আর উদ্ভট কবি নন, সম্ভাব্য রাষ্ট্রদ্রোহী।
অক্টোবর ১৯৪২। রুজভেল্ট নিজে অ্যাটর্নি জেনারেলকে নোট পাঠালেন; ইউরোপে বসে যারা শত্রুপক্ষের রেডিওতে আমেরিকার বিরুদ্ধে বলছে, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা কেন নয়? নামের তালিকায় এজরা পাউন্ডও আছেন। এরপর বিচার বিভাগের ক্রিমিনাল ডিভিশন এফবিআইকে বলল; সম্প্রচারের ট্রান্সক্রিপ্ট জোগাড় করুন।
এফবিআই ইতিমধ্যে ফাইল বানিয়েই রেখেছে। পাউন্ডের জীবন, মতাদর্শ, রেডিও বক্তৃতা; সব নথিভুক্ত। ইতালির কনস্যুলেট রিপোর্ট করছে; লোকটি প্রকাশ্যে ফ্যাসিস্ট স্যালুট দেয়। নভেম্বর-ডিসেম্বরে ট্রান্সক্রিপ্টের পাহাড় জমল। জানুয়ারি ১৯৪৩ সালে বিচার বিভাগ রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনার সুপারিশ করল।
এরপর তদন্ত নতুন মোড় নিল। রুজভেল্ট এফবিআইকে ইউরোপে কাজের অনুমতি দিয়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি তদন্ত; নজিরবিহীন। পাউন্ড হলেন প্রথম টার্গেট। দায়িত্ব পেলেন ইতালীয় বংশোদ্ভূত এক দক্ষ এজেন্ট; ফ্র্যাঙ্ক লরেন্স অ্যামপ্রিম।
১৯৪৫ সালের মে। ইতালিতে পাউন্ড ধরা পড়লেন। প্রথমে তিনি ভাবলেন, জিজ্ঞাসাবাদকারী সেনা-গোয়েন্দা। পরে জানলেন; এফবিআই। তাঁর অনুরোধ দুটো; প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে জাপানের সঙ্গে ‘ন্যায়সঙ্গত শান্তি’ স্থাপনে সাহায্য করবেন; আর একবার রেডিওতে ভাষণ দিয়ে আমেরিকাকে ‘মহৎ বিজয়ী’ হওয়ার আহ্বান জানাবেন। এজেন্ট নাকচ করলেন। কবি বিস্মিত; নিজের গুরুত্বে তাঁর আস্থা তখনও অটুট।
দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর পাউন্ড স্বীকারোক্তি দিলেন। নিজের নামে ও ছদ্মনামে সম্প্রচার করেছেন, অর্থ নিয়েছেন, মুসোলিনি-সমর্থক ছিলেন। এমনকি ফ্যাসিস্ট শাসন ভেঙে যাওয়ার পরও সালো প্রজাতন্ত্রের কাছে সম্প্রচারের প্রস্তাব দিয়েছেন। লিখিত বিবৃতিতে তিনি দাবি করলেন; রেডিও ব্যবহার কখন অপরাধ হলো, জানতেন না; কাউকে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। আবার লিখলেন; তিনি ইহুদি-বিরোধী নন, কেবল সুদখোরদের বিরোধী। তারপর সেই কুখ্যাত বাক্য; হিটলার নাকি সাধু, ব্যক্তিগত স্বার্থহীন।
এজেন্ট অ্যামপ্রিম ভদ্রতা বজায় রাখলেও ভিতরে বিরক্ত। পাউন্ড মাঝেমধ্যে সাক্ষাৎকক্ষে ঢুকেই ফ্যাসিস্ট স্যালুট দেন। কবি পরে ভেবেছিলেন; এজেন্ট তাঁর সততায় মুগ্ধ। বাস্তবে সেটা ছিল পেশাদারি ধৈর্য।
শেষ পর্যন্ত পাউন্ডের রাষ্ট্রদ্রোহের বিচার হয়নি। তাঁকে মানসিকভাবে বিচার-অযোগ্য ঘোষণা করে ওয়াশিংটনের সেন্ট এলিজাবেথস হাসপাতালে পাঠানো হলো। তেরো বছর সেখানে। ১৯৫৮ সালে মুক্তি পেয়ে ভেনিসে ফিরে গেলেন, সঙ্গী হলেন ওলগা রুজ। ১৯৭২ সালে পাউন্ডের মৃত্যু, ১৯৯৬ সালে রুজের।
একজন কবি; যিনি ভাষাকে ভেঙে নতুন সুর বানিয়েছিলেন; শেষমেশ নিজেই ইতিহাসের কোর্টে দাঁড়িয়ে গেলেন। কবিতার মহিমা আর রাজনীতির মোহ; এই দুইয়ের টানাপোড়েনে তাঁর জীবন হয়ে রইল এক অন্ধকারময় উপাখ্যান। শিল্পী যখন রাষ্ট্রের মাইক্রোফোন হয়ে ওঠেন, তখন শব্দ ছন্দ নয়, দায়।
রিটন খান



