আমার একটা ধারণা আছে: যদি দেখেন কোনো গদ্য জলের মতো স্বচ্ছ, তবে নিশ্চিত থাকুন তার পেছনের কারিগরকে যথেষ্ট ঘাম ঝরিয়ে সেই স্বচ্ছতাটুকু আনতে হয়েছে।
সহজ গদ্যের নেপথ্যে আসলে এক পটু জাদুকরের কারসাজি থাকে। মঞ্চের বক্তা যখন অবলীলায় কয়েক মিনিট কথা বলে হাততালি কুড়ান, আমরা তার সহজাত প্রতিভায় মুগ্ধ হই। কিন্তু সেই সহজটুকু ফুটিয়ে তুলতেই হয়তো তাকে গত তিন দিন ঘরে একা পায়চারি করতে হয়েছে। সাতবার পাল্টাতে হয়েছে গৌরচন্দ্রিকা, অকারণে মায়া বাড়িয়ে রাখা কয়েকটা চমৎকার রসিকতাকে গলা টিপে মারতে হয়েছে, আর যে বাক্যগুলোকে একসময় খুব বুদ্ধিদীপ্ত মনে হয়েছিল, দলের স্বার্থে তাদেরও মাঠের বাইরে পাঠাতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যা পাঠকের কানে পৌঁছল, তা আসলে এক বিরাট মেদযুক্ত খসড়াকে কেটেকুটে তন্বী করার ফসল।
যেকোনো ঋজু গদ্যের নেপথ্যে থাকে এক বিশাল বর্জ্যভূমি।
সেই চত্বরে পাঠকদের প্রবেশাধিকার নেই, থাকা বাঞ্ছনীয়ও নয়। সেখানে স্তূপ হয়ে পড়ে থাকে অপরিপক্ক খসড়া, অকারণে আবেগতাড়িত হয়ে লেখা সেইসব অনুচ্ছেদ যা ভোরের আলোয় বিষাদ হয়ে ধরা দেয়, আর সেইসব চটকদার বাক্য যাদের আসলে কোনো সারবত্তা নেই। সেখানে হয়তো এমন তিন পৃষ্ঠার বর্ণনাও থাকে যা অনায়াসে এক ছত্রে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল, এমনকি পরে জানা যায় সেই ছত্রটিও আদতে বাহুল্যমাত্র।
একটি পরিচ্ছন্ন বাক্যের জন্মের জন্য দশটি মেদযুক্ত বাক্যের বলিদান দিতে হয়।
অবশ্য লেখক যদি সেইসব মৃতদেহের হিসাব মেলাতে বসেন, তবে তার কলম থামবে আর তাকে ফরেনসিক গবেষণাগার নিয়ে বসতে হবে।
পাঠক যখন মুগ্ধ হয়ে বলেন, “কী চমৎকার ঝরঝরে লেখা!”, তখন লেখক যদি আড়ালে একটু মুচকি হাসেন, তবে তাকে দোষ দেওয়া চলে না। কারণ ওই এক চিলতে স্বচ্ছতাটুকু ফুটিয়ে তুলতেই হয়তো গত বিকেল থেকে তিনি যুৎসই একটি শব্দের তালাশে জান লড়িয়ে দিয়েছেন। শব্দটা কি “অস্বস্তি” হলে ভালো লাগত, নাকি “অস্বচ্ছন্দ”, “কুণ্ঠা” কিংবা “ধন্দ” লাগসই হত—নাকি গোটা বাক্যটাকেই আসলে যমঘরে পাঠানো উচিত ছিল, এই অঙ্ক মেলাতে গিয়ে মানুষের আয়ুর যে বিপুল অপচয় হয়, তার খবর পেলে সরকার হয়তো লেখকদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করত।
পাথর তোলা বা ঘাম ঝরানোর মতো দৃশ্যমান মেহনত দেখলে আমরা সাধারণত শ্রদ্ধায় মাথা নোয়াই। কিন্তু গদ্যের রাজ্যে ব্যাকরণটা ঠিক উল্টো। এখানে আপনার কলমের যাবতীয় ঘাম আর হাঁপানির শেষ সার্থকতা হলো সেই পরিশ্রমের দাগটুকুকেই বেমালুম মুছে ফেলা।
বাক্য যদি হাঁপাতে থাকে, পাঠকও হাঁপায়।
লেখক সযতনে সাজিয়েছিলেন:
“মানবজীবনের বহুমাত্রিক জটিলতার প্রেক্ষিতে স্মৃতির অন্তঃসলিলা প্রবাহ আমাদের ব্যক্তিসত্তার নানাবিধ স্তরকে ক্রমাগত পুনর্নির্মাণ করে।”
পাঠক হয়তো দুবার পড়ে সশ্রদ্ধ বিস্ময়ে ভাববেন, আড়ালে নিশ্চয়ই কোনো অতল জ্ঞান লুকিয়ে আছে। অথচ লেখক স্রেফ এইটুকুই বলতে চেয়েছিলেন, “স্মৃতিদের জমিয়ে রেখেই আমরা দিনশেষে নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলি।”
এই পরের সহজ বাক্যটি সাজাতে লেখকের আয়ু বেশি খরচ হয়। প্রথমটায় তিনি তার পাণ্ডিত্যের সব আসবাব অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঘরে ঠাসাঠাসি করে রেখেছিলেন; কিন্তু দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে তাকে যুঁঝতে হয়েছে—কোন চেয়ারটি সত্যিই বসার যোগ্য আর কোনটি কেবল জঞ্জাল, সেই অঙ্ক মেলাতে।
গদ্যের আসল মুন্সিয়ানা তো বাড়ানোর মধ্যে নেই, আছে অপ্রয়োজনীয় অংশটুকু ছেঁটে ফেলার সাহসে।
কলম ধরার সময় এক ধরনের দ্বিধা আমাদের পেয়ে বসে। ভাবি—এত পড়াশোনা, এত তিলে তিলে জমানো ভাবনা আর ওই চমৎকার অলঙ্কারগুলো যদি ডালি সাজিয়ে না দিই, তবে পাঠক আমার পাণ্ডিত্যের বহর টের পাবেন কী করে?
আসলে পাঠকের দায় ঠেকেছে আপনার বাগানের ফলটুকু আস্বাদন করায়, আপনার জমির খতিয়ান বা চাষবাসের ইতিহাস ঘাঁটতে তিনি মোটেই উৎসুক নন।
ঠিক এই বিন্দুতেই লেখকের নিজের বিদ্যা জাহির করার বাসনার সঙ্গে ঝরঝরে গদ্যের একটা চিরকালীন বিরোধ বেধে যায়।
একটা বাক্য আপনি ভালোবেসে লিখেছেন। ভারী সুন্দর। পড়লে আপনার নিজেরই বুক কেঁপে ওঠে। কিন্তু অনুচ্ছেদে তার কোনও কাজ নেই। তখন সেটাকে কাটতে হয়।
এই ছেঁটে ফেলার বেদনা অনেকটা নিজের সেই আপনজনের মতো, যার ব্যক্তিগত কারিকুরি মুগ্ধ করার মতো হলেও মাঠের লড়াইয়ে সে স্রেফ এক বাড়তি বোঝা।
মায়ার টান উপেক্ষা করা কঠিন।
তবুও বৃহত্তর স্বার্থে তাকে বিদায় জানানোই হলো প্রকৃত মুন্সিয়ানা।
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সেই বিখ্যাত “আইসবার্গ” তত্ত্বের কথাই ধরুন। সমুদ্রের ওপর যা চিলতে বরফ হয়ে ভাসে, তার গভীরে লুকিয়ে থাকে এক বিশাল পাহাড়। পাঠক কেবল দৃশ্যমান অংশটুকুই দেখেন, কিন্তু নিচের সেই অদৃশ্য অস্তিত্বই উপরের টুকরোটিকে ভার দেয়। আপনি হয়তো দশটি বই পড়ার পর একটি বাক্য সাজালেন; এখন সেই সব বইয়ের পাণ্ডিত্য যদি জোর করে একটি বাক্যে গুঁজে দিতে চান, তবে সেটি আর ঋজু গদ্য থাকে না, স্রেফ ভারবাহী এক মালগাড়ি হয়ে ওঠে।
এই কারণেই ঝরঝরে গদ্যের পেছনে থাকে এক অদ্ভুত লুকোচুরি।
আপনি পাঠককে বিশ্বাস করান যেন কথাগুলো এইমাত্র আপনার মগজে দানা বাঁধল।
অথচ বাস্তব হলো, সেই ভাবনা নিয়ে আপনি গত তিন দিন ধরে অবিরাম পায়চারি করেছেন।
এমন এক মায়া তৈরি করেন যেন বাক্যটি সহজাত ভঙ্গিতেই তার আসনে বসেছে।
অথচ যুৎসই ঠাঁই খুঁজে দিতে তাকে অন্তত চারবার এক ঘর থেকে অন্য ঘরে পাঠাতে হয়েছে।
বাইরে থেকে দেখে মনে হয় কী মসৃণ তার চলন।
কিন্তু নেপথ্যে আপনি সজাগ ট্রাফিক পুলিশের মতো প্রতিটি মোড় নিয়ন্ত্রণ করছেন।
এই কারসাজি আসলে এক শৈল্পিক ছলনা। মঞ্চের জাদুকর যখন টুপি থেকে পায়রা উড়িয়ে হাততালি কুড়ান, তখন সেই পাখিটি আগে কোথায় গোঁজা ছিল তা দর্শকের না জানলেও চলে। তিনি যদি মাঝপথে নিজের কৌশলের ফিরিস্তি দিতে বসেন, তবে সেই রহস্যের যবনিকাপাত ঘটে আর জাদুটিও তার প্রাণ হারায়।
গদ্যের ব্যাকরণও ঠিক তা-ই।
পাঠকের আগ্রহ কেবল ছাদ থেকে মনোরম দৃশ্যটি দেখার প্রতি, সেখানে ওঠার জন্য আপনি কতটা নড়বড়ে মই ব্যবহার করেছেন, তা নিয়ে তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। তিনি কেবল পৌঁছে যাওয়ার সার্থকতাটুকু পেতে চান।
তাই যদি দেখেন আপনার নিজের লেখায় কারিগরি মেহনতের ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে, তবে মুষড়ে পড়ার কোনো কারণ নেই। তার অর্থ হলো, নির্মাণ শেষে জঞ্জাল সাফ করার কাজটি এখনও বাকি রয়ে গেছে। অনেকটা রাজমিস্ত্রি বিদায় নেওয়ার পর ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা পলেস্তারা, জানালার গায়ে লেপ্টে থাকা প্লাস্টিক কিংবা দেয়ালে রয়ে যাওয়া কাটাকুটির হিসাবের মতো—যা আপনার শ্রমের সাক্ষী দিলেও ঘরের শ্রী নষ্ট করে।
আবারও কলম নিয়ে বসুন।
খুঁজে দেখুন, কোথায় আপনি সহজ কথাকে অকারণে পাণ্ডিত্যের মোড়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে খেই হারিয়েছেন?
কোথায় চর্বিত চর্বণ করে একই ভাবনার পুনরাবৃত্তি করেছেন?
কোথায় একটি বাক্য শৈল্পিক হওয়ার তাগিদে এতটাই সচেতন যে মনে হচ্ছে সে দর্পণ হাতে নিজের রূপ নিয়ে বিভোর?
কোথায় পাঠকের বোধশক্তির ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে বাক্যকে ভারাক্রান্ত করেছেন?
কোথায় আপনার নিজস্ব বিদ্যা জাহির করার বাসনাটি শিল্পের কাঁধ ছাপিয়ে উদ্ধত হয়ে দাঁড়িয়েছে?
নির্দয় হাতে সেইসব বাহুল্যকে বিদায় দিন।
সুযোগ থাকলে রাতটুকু পার করে ভোরের স্বচ্ছ আলোয় নিজের খসড়াটি একবার ঝালিয়ে নিন। রাতের নিভৃত আঁধারে যে ছত্রগুলোকে কালজয়ী বা মহাকাব্যিক ভেবে বিভোর ছিলেন, সকালের নির্মোহ আলো হয়তো জানিয়ে দেবে সেগুলি আসলে অনিদ্রা আর অতিরিক্ত ক্যাফেইনের এক মেদবহুল প্রলাপ মাত্র।
মূলত এই ক্লান্তিহীন কাটাকুটি আর মার্জনাটুকুই হলো প্রকৃত সৃজনের রহস্য।
কোনো এক স্বর্গীয় অনুপ্রেরণা এসে মাথায় হাত রাখল আর তিন হাজার শব্দ অবলীলায় ঝরে পড়ল—এমন দৃশ্য সাহিত্যিকের আত্মজীবনীতে শুনতে মন্দ লাগে না। কিন্তু রূঢ় বাস্তব হলো, অনুপ্রেরণা এলে তাকে সযত্নে বসিয়ে তার আলাপ থেকে সবটুকু জঞ্জাল ছেঁটে ফেলতে হয়।
সবশেষে যখন লেখার শরীর থেকে লেখকের ব্যক্তিগত সংগ্রামের শেষ চিহ্নটুকু মুছে যায়, তখনই তা সার্থকতা খুঁজে পায়।
সেই অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার নামই মুন্সিয়ানা।
মুন্সিয়ানার চূড়ান্ত সার্থকতা তো সেখানেই, যেখানে কারিগরের হাতের ছাপটুকু আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
সুরের মূর্ছনায় অবগাহন করার সময় গায়কের ফুসফুসের কসরত নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা থাকে না। চলচ্চিত্রের দৃশ্যায়নে মুগ্ধ হওয়ার মুহূর্তে ক্যামেরার নেপথ্য কারিগরি আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। জুতসই ব্যঞ্জনের আস্বাদ নিতে গিয়ে রাঁধুনির লবণের পরিমাপ গোনার বাসনা জাগে না কারোরই। ঠিক তেমনই, বলিষ্ঠ গদ্যের শরীরে আপনি বাক্য নির্মাণের সেই কঙ্কালসার পরিকাঠামো দেখতে পাবেন না। আপনার মগজে কেবল একটাই সুর বাজবে: বাহ্, এই কথাটা তো ঠিক এভাবেই বলা সাজত!
সেই যথাযথ বিন্দুটুকু স্পর্শ করতে লেখককে আগে কয়েক ডজন ভুল অলিগলি পেরিয়ে আসতে হয়।
তাই নিজের খসড়াটি যদি বড় বেশি কৃত্রিম, মেদবহুল কিংবা শৈল্পিক সচেতনতায় ভারাক্রান্ত মনে হয়, তবে এখনই বিচলিত হওয়ার কারণ নেই।
ধরে নিন, পরিচ্ছন্নতার কাজটুকু সাঙ্গ হওয়া এখনও বাকি।
অকারণে জমে থাকা শব্দগুলো আর একবার ছাঁটুন।
বাক্যের বিন্যাসগুলো আরেকবার অদলবদল করে দেখুন।
আপনার পাণ্ডিত্যের সেই উচ্চকিত সরবতাকে কিছুটা প্রশমিত করুন।
প্রতীক্ষা করুন সেই ক্ষণের জন্য, যখন আপনার কলমের যাবতীয় ঘাম আর আঙুলের ছাপ বেমালুম মুছে গিয়ে গদ্যটি স্বচ্ছ হয়ে উঠবে।
নির্মাণ শেষে মইটিকে এবার সযতনে আড়ালে সরিয়ে ফেলুন।
পাঠককে শুধু চূড়ার মনোরম দৃশ্যটুকুই উপভোগ করতে দিন।


