মেক্সিকোর সেই স্কুলটায় দুই হাজার ছাত্র, তাদের ভেতরে মাত্র পঁয়ত্রিশটা মেয়ে, সেই সংখ্যার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা শরীর, একটা কণ্ঠ, একটা চোখ, যাকে তখনও কেউ ইতিহাস বলে ডাকে নি—ফ্রিদা কাহলো। পনেরো বছর বয়সে যখন আলেহান্দ্রো গোমেস আরিয়াসের সঙ্গে প্রথম দেখা, তখন প্রেম বলে যে জিনিসটা আছে, সেটা যেন বইয়ের ভেতর থেকে একটু একটু করে উঠে এসে হাত ছুঁয়ে দেখা যাচ্ছে, তারা দুজনেই পড়ুয়া, দুজনেই একটু বেশি জানে, একটু বেশি ভাবে, আর মাথায় সেই তীক্ষ্ণ কাপড়ের টুপি—Los Cachuchas—যেন একরকম বিদ্রোহ, নিজের শরীরকে নিজের মতো করে পরা, নিজের মতো করে বাঁচা।
তারপর সেই বাসটা, গরমের শেষ দিক, জন্মদিনের ঠিক পরে, একটা ট্রাম এসে ধাক্কা মারল, মানুষ মারা গেল, আর যে মেয়েটা বেঁচে রইল, সে আর আগের মতো থাকল না। পেলভিস ভাঙা, পেট আর জরায়ু ছিঁড়ে রেল ঢুকে গেছে, মেরুদণ্ড তিন জায়গায় ভাঙা, পা এগারো জায়গায়, ডাক্তাররা বলছে বাঁচবে না, আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছেলেটা, আলেহান্দ্রো, বারবার বলছে; না, চেষ্টা করো, আবার চেষ্টা করো, যেন প্রেম তখন শুধু “ভালোবাসি” নয় বরং একধরনের জেদ, কাউকে না ছাড়ার সিদ্ধান্ত।
ফ্রিদা বেঁচে গেল, কিন্তু তার শরীর আর জীবন দুইটাই অন্য এক রাস্তায় চলে গেল; যে যন্ত্রণা মানুষকে শেষ করে দেয়, সেইটাই আবার তাকে অন্যরকম করে গড়ে তোলে, আর ফ্রিদার ক্ষেত্রে সেই রূপান্তরটা সরাসরি ছবিতে, রঙে, নিজের মুখে, নিজের শরীরের ভিতরে।
চিঠিগুলো পড়লে বোঝা যায়; সে শুধু প্রেমে পড়েনি, সে প্রেমকে একটা কাজের মতো নিয়েছে, একটা দায়িত্বের মতো, আবার খেলার মতোও। একটা চিঠিতে বলছে, লিখো, অনেক লিখো, যত বড় হয় তত ভালো; আরেকটায় বলছে, তোমার সোয়েটার, তোমার বই, আর অনেকগুলো বেগুনি ফুল নিয়ে আসব। এই যে দৈনন্দিন জিনিসের ভেতরে প্রেম ঢুকে পড়ছে, এইটাই আসল, বড় বড় কথা না, ছোট ছোট জিনিসের ভেতরে থাকা।
আবার একই সঙ্গে সে জানে; প্রেম যদি শুধু গম্ভীর হয়, সেটা টেকে না; তাই নিজেই লিখছে, “আমি বারবার ‘ভালোবাসি’ বলছি, একটু বোকা লাগছে”। নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করছে, আবার একই সঙ্গে পাঁচবার “love you much” লিখে দিচ্ছে, যেন শব্দগুলো শেষ হতে চায় না।
এইসব চিঠির ভেতরে একটা কাঁপুনি থাকে। আমি তোমার কাছে কে? তুমি আমাকে কী মনে করো? আমি কি তোমার মেয়ে, না বন্ধু, না স্ত্রী? এই প্রশ্নটা খুব তাড়াতাড়ি চলে আসে, খুব অল্প বয়সেই, বোঝা যায়, প্রেম আসলে একটা একটা ঝুঁকি। নিজেকে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার।
তারপর সেই দিনগুলো; বাড়ির নিষেধ, দেখা করার পরিকল্পনা, বই পড়া। তারপর বাইবেল, তারপর “বড় বড় বৈজ্ঞানিক সমস্যা” নিয়ে ভাবা। এই যে একটা কিশোরী, প্রেমের চিঠির ভেতরেও নিজের মাথার জায়গাটা ছাড়ছে না, ভাবছে, পড়ছে, আবার শেষে লিখছে; আমরা যেন একে অপরকে অনেক অনেক ভালোবাসি, “m” দিয়ে—music, mundo—এই শব্দের খেলাটা, এই ছেলেমানুষি, এইসবই একসঙ্গে।
কিন্তু জীবন তো থামে না। কাজের কথা আসে, shorthand শেখা, typing শেখা, যাতে টেলিগ্রাফে টাকা খরচ না করতে হয়, লাইব্রেরিতে চাকরির চেষ্টা। চার পেসো ঘণ্টায়। এই যে প্রেমের ভেতরেও টাকার হিসাব, সংসারের চাপ, এগুলো কখনো আলাদা থাকে না।
তারপর অসুখ, অপেক্ষা, “তুমি ভালো হয়ে ওঠো”; সবকিছু পেছনে, প্রথম চারটা জায়গা শুধু এই একটা জিনিস; তুমি ভালো হও, আর আমাকে ভালোবাসো; এখানে প্রেম একধরনের অগ্রাধিকার তালিকা হয়ে যায়।
তারপর দুর্ঘটনা। হাসপাতাল, তিন মাস বিছানায়, মা দুবার এসেছে, বাবা একবার, বাকিটা একা, আর চিঠিতে লেখা; আমি সারাজীবন একটা ছুটে বেড়ানো বিড়াল ছিলাম, এখন এইভাবে শুয়ে থাকা। এই পরিবর্তনটা কেউ বোঝে না। এখানে একটা নিঃসঙ্গতা আছে, যেটা প্রেমও পুরো ভরাট করতে পারে না, কিন্তু তবু সে লিখছে; তোমাকে দেখলে আমি চুমু খাব, আর এখন আগের চেয়ে বেশি বুঝি আমি তোমাকে কত ভালোবাসি।
এইসব চিঠির মধ্যে একটা জিনিস বারবার ফিরে আসে; ব্যথা আছে, কিন্তু ব্যথা তাকে থামায় না; কান্না আছে, কিন্তু কান্না তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় না; সে সবকিছু লেখে, কিন্তু তার ইচ্ছেটা, বেঁচে থাকার জেদটা, সেটা আলাদা করে দাঁড়িয়ে থাকে।
আলেহান্দ্রো পাশে ছিল এক বছর, তারপর ইউরোপ চলে গেল। এই দূরত্বের মধ্যে একটা নতুন ভয় ঢুকে পড়ে। তুমি কি আমাকে ভুলে যাচ্ছ? এই প্রশ্নটা, যেটা সব প্রেমের ভেতরেই থাকে, এমনকি কাছাকাছি থাকলেও। কারণ দুইজন মানুষের মধ্যে সবসময় একটা সমুদ্র থাকে, যেখানে হয় দেখা হয়, না হয় ডুবে যাওয়া।
ফ্রিদা লিখছে—রাতগুলো সুন্দর, সমুদ্র একটা প্রতীক, আমার জীবনের; এই প্রতীক, এই ছবি ভাবা, এইগুলোই পরে তার পেইন্টিংয়ে যাবে, কিন্তু তখনও সেটা চিঠির মধ্যে, কথার মধ্যে।
শেষ পর্যন্ত সে যেটা ভয় করছিল, সেটাই। আলেহান্দ্রো ফিরে এসে সম্পর্ক ভেঙে দিল। এই আঘাতের জন্য মানুষ কখনোই পুরো প্রস্তুত থাকে না, যতই আগাম আন্দাজ করুক।
তারপর একটা প্রশ্ন থাকে—ভালোবাসা কোথায় যায়?
ফ্রিদার ক্ষেত্রে সেটা কোথাও নয়—ওটা তার ভেতরেই থাকে, তার সবকিছুর মধ্যে ঢুকে যায়; তার শরীর, তার ব্যথা, তার রঙ, তার ছবির চোখের দিকে তাকানো সেই অদ্ভুত দৃঢ়তা; সবকিছুর ভেতরে।
সে আলেহান্দ্রোর একটা প্রতিকৃতি আঁকে। নরম, একটু ভাঙা, একটু অপেক্ষার মতো। আর লিখে দেয়, “ত্রিশ বছর পরে”। কিন্তু সে নিজে সেই ত্রিশ বছর বাঁচেনি।
তবু ওই প্রথম প্রেমটা, ওই দুর্ঘটনার দিন, ওই চিঠিগুলো; সবকিছু তার প্রতিটা ছবির নিচে থেকে যায়, যেন প্রতিটা ব্রাশস্ট্রোকে একটা প্রশ্ন; বেঁচে থাকা মানে কী, ব্যথা নিয়ে বাঁচা মানে কী, ভালোবাসা দিয়ে কী করা যায়।
আমরা যাদের ভালোবাসি, যাদের হারাই, যেসব ব্যথা পার করি; সবকিছু মিলেই আমরা; আলাদা করে কিছুই থাকে না; আমরা যা দিই, যেমন ভালোবাসি, যেমন সহ্য করি; ওটাই আসলে আমরা।





