অ্যারিস্টটল অনুবাদে ভুল
সাহিত্যসমালোচনার ইতিহাসে এমন কিছু ভুল আছে, যেগুলি নিছক অনুবাদগত ত্রুটি নয়, বরং একটি দীর্ঘ বৌদ্ধিক ভ্রান্তির সূচনা।
সাহিত্যসমালোচনার ইতিহাসে এমন কিছু ভুল আছে, যেগুলি নিছক অনুবাদগত ত্রুটি নয়, বরং একটি দীর্ঘ বৌদ্ধিক ভ্রান্তির সূচনা। সেই রকমই এক ভুলের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে একটি গ্রিক শব্দ ἁμαρτίαν (hamartia)। Aristotle-এর Poetics-এ ব্যবহৃত এই শব্দটিকে আমরা আজ প্রায় যান্ত্রিকভাবে tragic flaw বলে অনুবাদ করি। পাঠ্যপুস্তক, শ্রেণিকক্ষ, সহায়িকা; সবখানেই এই অনুবাদ প্রতিষ্ঠিত। এবং এই একমাত্র অনুবাদের উপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে ট্র্যাজেডি পাঠের একটি সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, যেখানে নায়কের পতনকে তার চরিত্রগত ত্রুটি, মানবিক দুর্বলতা, বা মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতির ফল হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু যদি আমরা অ্যারিস্টটলের মূল গ্রিক ভাষায় ফিরে যাই, এবং শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত ও ঐতিহাসিক যাত্রাপথ অনুসরণ করি, তাহলে ছবিটি সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে ওঠে। দেখা যায়, “tragic flaw” আসলে একটি ধীর সাংস্কৃতিক স্খলন, যেখানে “ভুল” বা “মিস” অর্থবাহী একটি শব্দ ক্রমশ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবিক দোষের এক প্রায় ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদে। এখানে ভাষা অর্থ-সৃষ্টি এবং অর্থ-বিকৃতির সক্রিয় ক্ষেত্র।
প্রাচীন গ্রিক ব্যবহারে hamartia কর্মের ভাষা। এর মূল অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট ও গতিশীল: লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া; যেমন একজন ধনুর্ধর তীর ছুড়ে লক্ষ্য মিস করে। এই চিত্রকল্পটি শব্দটির অন্তঃস্থ গতি বোঝার জন্য অপরিহার্য। সেখান থেকে এর বিস্তৃত অর্থ দাঁড়ায়; ভুল সিদ্ধান্ত, ভ্রান্ত বিচার, একটি ভুল পদক্ষেপ; এবং প্রায়শই এমন এক ভুল, যা ঘটে অজ্ঞতাবশত, কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য না জানার কারণে।
অ্যারিস্টটল তাঁর নীতিশাস্ত্র হোক বা কাব্যতত্ত্ব; সবখানেই এই অর্থেই শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যখন তিনি বলেন, ট্র্যাজিক নায়ক “hamartia”-র কারণে পতিত হয়, তখন তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে দুটি সম্ভাবনাকে বাদ দেন। প্রথমত, নায়ক পাপী বা দুষ্ট বলেই পতিত নয়। দ্বিতীয়ত, সে অতিমাত্রায় সৎ বা গুণবান বলেও নয়। অর্থাৎ ট্র্যাজেডি বিচারালয় নয়, যেখানে দোষী শাস্তি পায় আর গুণী পুরস্কৃত হয়।
অ্যারিস্টটলের ট্র্যাজেডি মানবকর্মের ভঙ্গুরতাকে তুলে ধরে; একটি বোধগম্য, কিন্তু স্থিতিশীল নয় এমন জগতে, যেখানে যুক্তি আছে, কারণ আছে, আবার অনিশ্চয়তাও আছে। নায়কের পতন ঘটে δι’ ἁμαρτίαν; একটি ভুলের কারণে; কোনও আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক “flaw” বা অন্তর্নিহিত চরিত্রগত বিকৃতির কারণে নয়। এখানে “error” শব্দটিও দোষ নয়; এটি মানবীয় সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি।
এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি হারিয়ে গেলে ট্র্যাজেডির পাঠও বদলে যায়। তখন আমরা নায়কের মধ্যে ত্রুটি খুঁজতে ব্যস্ত হই, যেন সে এক ভালো শিক্ষার উদাহরণ। অথচ অ্যারিস্টটলের কাছে ট্র্যাজেডি ছিল মানবকর্মের অনিশ্চয়তা, জ্ঞানের সীমা, এবং সিদ্ধান্তের ঝুঁকির নাট্যায়ন। নায়ক আমাদের মতোই; ভুল করতে সক্ষম, অজ্ঞতায় আক্রান্ত, কিন্তু নৈতিকভাবে অপরাধী নয়।
শব্দের এই স্খলন আমাদের শিখিয়ে দেয়, সাহিত্যতত্ত্বে অনুবাদ শুধু ভাষান্তর নয়; এটি দৃষ্টিভঙ্গির পুনর্গঠন। “Hamartia” যদি “ভুল” হয়, তবে ট্র্যাজেডি মানবীয় দুর্বলতার স্বীকারোক্তি। আর যদি “tragic flaw” হয়, তবে ট্র্যাজেডি নৈতিক শাস্তির কাহিনি। এই দুই পাঠের মধ্যে ব্যবধান মানব-সম্বন্ধীয় আমাদের ধারণার গভীরে প্রভাব ফেলে।
আমরা মানুষের পতনকে কীভাবে বুঝতে চাই; নৈতিক বিচ্যুতি হিসেবে, নাকি অস্তিত্বের অনিবার্য ভঙ্গুরতা হিসেবে? অ্যারিস্টটলের সূক্ষ্মতা আমাদের দ্বিতীয় পথের দিকে আহ্বান জানায়। কিন্তু ইতিহাসের অনুবাদ আমাদের প্রথমটির দিকে ঠেলে দিয়েছে। সেই টানাপোড়েনের মধ্যেই আজও ট্র্যাজেডি পড়ার রাজনীতি লুকিয়ে আছে।
Poetics
By Aristotle
Written 350 B.C.E
দুটি বাংলা অনুবাদের ডাউনলোড লিঙ্কঃ



