বিশ শতকের বাংলা নিয়ে এত লেখা হয়েছে যে মাঝেমধ্যে মনে হতে পারে, বাংলার ইতিহাস নামক জমিটায় আর কোদাল চালানোর জায়গা নেই। বঙ্গভঙ্গ থেকে স্বদেশি, মুসলিম লীগ থেকে কংগ্রেস, রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল, কৃষক থেকে জমিদার, দাঙ্গা থেকে দেশভাগ, সবই যেন অন্তত সাতবার খুঁড়ে, ছেঁকে, পাদটীকা দিয়ে, আবার নতুন মলাটে ছাপা হয়ে গেছে। কিন্তু ইতিহাসের একটা বদভ্যাস হলো বাইরে থেকে তাকে বেশ ভদ্র, নিষ্পত্তি-হওয়া বিষয় বলে মনে হয়, একটু আঁচড়ালেই ভিতর থেকে আর-একটা প্রশ্ন বেরিয়ে আসে। বিশেষ করে মানুষের মনের ইতিহাস। সেখানে সরকারি নথির সিলমোহর কম, দ্বিধা বেশি; ঘোষণাপত্রের ভাষা কম, নিজের সঙ্গে নিজের ঝগড়া বেশি।
এই বইয়ের আলোচনার কেন্দ্রে সেই ঝগড়াটিই। বিশ শতকের প্রথম কয়েক দশকে বাংলার মুসলমান, বিশেষ করে ক্রমশ গড়ে ওঠা মুসলমান মধ্যবিত্ত, নিজেকে ঠিক কোথায় দাঁড় করাবে, এই প্রশ্ন নিয়ে এক দীর্ঘ অস্থিরতার মধ্যে ছিল। ধর্মের দিকে? ভাষার দিকে? বাংলার আঞ্চলিক সংস্কৃতির দিকে? সর্বভারতীয় মুসলিম পরিচয়ের দিকে? আধুনিক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দিকে? নাকি এগুলোর প্রত্যেকটির সঙ্গে খানিকটা হাত মিলিয়ে, খানিকটা কনুই ঠেকিয়ে, এমন একটি জায়গায় দাঁড়াবে যার নাম তখনও অভিধানে ওঠেনি?
১৯০৫ থেকে ১৯৪৭, মোটামুটি এই চার দশক এই দোটানাকে বিশেষ তীব্র করে তোলে। সময়টা নিজেই অবশ্য বেশ বেয়াড়া। ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গ হচ্ছে, ১৯১১-তে আবার তা রদ হচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আসছে। খিলাফত আন্দোলন হচ্ছে। অসহযোগ হচ্ছে। কৃষক রাজনীতি মাথা তুলছে। সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন গা গরম করছে। নতুন শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি হচ্ছে। সাহিত্যপত্র বেরোচ্ছে। শহর বাড়ছে। ছাপাখানা বাড়ছে। রাজনৈতিক ভাষা বদলাচ্ছে। শেষে চল্লিশের দশকে দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, পাকিস্তানের দাবি, দাঙ্গা, দেশভাগ। এমন সময়ে একজন বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আপনি কে?’, তিনি সম্ভবত উত্তর দেওয়ার আগে অন্তত তিনবার জল খাবেন।
কারণ ‘মুসলমান’ পরিচয়টি তাঁর আছে, সন্দেহ নেই। আবার তিনি বাংলায় কথা বলেন, বাংলা মাটিতে থাকেন, বাংলা লোকসংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, ঋতু, নদী, গান, প্রবাদ, হাসি, অপমান, উচ্চারণ, এমনকি গালাগালিও তাঁর পরিচয়ের অংশ। তাঁর পাশের বাড়ির হিন্দু প্রতিবেশীর সঙ্গে ধর্ম আলাদা হতে পারে, কিন্তু বর্ষার জল দুজনের উঠোনেই সমান ঢোকে। অথচ ঔপনিবেশিক রাজনীতি, প্রতিনিধি-ব্যবস্থা, শিক্ষা, চাকরি, সংখ্যাগরিষ্ঠতা-সংখ্যালঘুতা, ঐতিহাসিক স্মৃতি, এবং ক্ষমতার প্রশ্ন ক্রমশ তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, পরিচয় শুধু পান্তাভাত ও পয়লা বৈশাখের ব্যাপার নয়। পরিচয় দিয়ে চাকরি মিলতে পারে, ভোটের আসন ভাগ হতে পারে, রাজনৈতিক দল গড়া যায়, আবার দাঙ্গাও বাঁধানো যায়। অর্থাৎ ‘আমি কে’ প্রশ্নটি একসময় দর্শনের টেবিল ছেড়ে চাকরির আবেদনপত্র, নির্বাচনী সভা এবং থানার ডায়েরিতে এসে বসে পড়ল।
এই আত্মপরিচয়ের খোঁজ অবশ্য বিশ শতকের একেবারে গোড়ায় হঠাৎ জন্মায়নি। উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকেই বাংলার মুসলমান সমাজে ধর্মীয় পুনর্জাগরণ, শিক্ষার প্রসার, সামাজিক সংস্কার, আধুনিকতার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা, সবই চলছিল। মুসলমান সমাজের পিছিয়ে থাকা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। আধুনিক শিক্ষায় প্রবেশের প্রশ্ন ছিল। ধর্মীয় শুদ্ধতা নিয়ে তর্ক ছিল। ইসলামের অতীত গৌরবের স্মৃতি ছিল। ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে নিজের বর্তমান অবস্থান নিয়ে অস্বস্তিও ছিল। আত্মপরিচয়ের কারখানায় তখনই মেশিন বসানো হয়ে গেছে, বিশ শতক এসে শুধু বিদ্যুতের সুইচটা অন করে দিল।
আর এই সময়েই একটি নতুন চরিত্র মঞ্চে উঠল, মধ্যবিত্ত।
ইতিহাসে মধ্যবিত্তের ভূমিকা ভারী মজার। তাদের হাতে সাধারণত জমিদারের মতো জমি নেই, কৃষকের মতো মাটি নেই, শ্রমিকের মতো কারখানা নেই, কিন্তু মতামত আছে প্রচুর। তারা স্কুলে পড়ে, কলেজে যায়, সংবাদপত্র পড়ে, সম্পাদককে চিঠি লেখে, সভা করে, সংগঠন বানায়, সাহিত্য রচনা করে, বক্তৃতা দেয়, এবং সুযোগ পেলে গোটা জাতি কোন পথে যাবে সে-বিষয়ে সাত দফা প্রস্তাব লিখে ফেলে। বাংলার মুসলমান সমাজেও এই নবগঠিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি যখন সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশ হাতে নিতে শুরু করল, আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি আর নিছক ধর্মীয় পুনর্জাগরণের মধ্যে আটকে থাকল না। তা ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির প্রশ্ন হয়ে উঠল।
সেখানেই জটিলতা।
কারণ ধর্মীয় পরিচয় অনেক দূর পর্যন্ত উত্তর দিতে পারে, কিন্তু সব প্রশ্নের নয়। একজন মানুষ নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন, ইসলামের ইতিহাসকে নিজের ঐতিহ্যের অংশ বলে মনে করেন। বেশ। কিন্তু তিনি কোন ভাষায় কবিতা লিখবেন? বাংলা ভাষার যে বিশাল সাহিত্যিক ঐতিহ্য ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, তাকে কতখানি নিজের বলে নেবেন? সেই ঐতিহ্যের প্রধান মুখগুলোর বড় অংশ হিন্দু হলে তার মানে কী? সংস্কৃতঘেঁষা বাংলা কি তাঁর? আরবি-ফারসি শব্দে সমৃদ্ধ বাংলা কি আলাদা করে তাঁর? বঙ্কিমকে কীভাবে পড়বেন? রবীন্দ্রনাথকে কোথায় রাখবেন? নজরুলকে কেন এত দ্রুত প্রতীকে পরিণত হতে হল? বাঙালিত্বের মধ্যে ইসলাম কতখানি জায়গা পাবে, আবার মুসলমান পরিচয়ের মধ্যে বাংলা ভাষা কতখানি ঘর পাবে?
এই প্রশ্নগুলোকে সাহিত্য-সেমিনারের বিষয় বলে মনে হতে পারে। বাস্তবে এগুলো ক্ষমতার প্রশ্নও।
ভাষা মানে শুধু কবিতা নয়। ভাষা মানে স্কুলের পাঠ্যবই, আদালত, চাকরি, সংবাদপত্র, প্রশাসন, জনসভা, রাজনৈতিক স্লোগান। কোন ভাষাকে নিজের বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে কোন সমাজকে নিজের বলা হচ্ছে, সেটাও জড়িত। ফলে বিশ শতকের প্রথম চার দশকে বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক অবস্থান নিয়ে যে দ্বিধা তৈরি হল, তাকে ‘ওরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না’ বলে পাশ কাটালে চলবে না। এ ছিল একই সঙ্গে বহু টান সামলানোর চেষ্টা।
একদিকে ইসলামি উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্যের ধারণা। ভারতবর্ষের বাইরের মুসলিম বিশ্বের ঘটনাও তাই বাংলার মুসলমানের কল্পনায় ঢুকে পড়ছে। তুরস্কে কী হল, খিলাফতের কী হল, মধ্যপ্রাচ্যে কী হচ্ছে, এগুলো হঠাৎ ফরিদপুর বা মুর্শিদাবাদের আলোচনায় এসে বসছে। অন্যদিকে রয়েছে স্থানীয় ইতিহাস। বাংলার নদী, কৃষি, লোকাচার, ভাষা, আঞ্চলিক স্মৃতি। মানুষ মক্কার দিকে মুখ করে প্রার্থনা করছেন, কিন্তু তাঁর ভিটেটা তো পদ্মার ধারেই। এই দুই ভূগোলকে একই মাথার ভিতর রাখতে গেলে কিছুটা ঠেলাঠেলি হবেই।
তার সঙ্গে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র। ব্রিটিশ শাসন শুধু শাসন করছে না, জনগণকে শ্রেণিবদ্ধও করছে। জনগণনা হচ্ছে। সংখ্যা গোনা হচ্ছে। কে হিন্দু, কে মুসলমান, কত শতাংশ, কোথায় সংখ্যাগরিষ্ঠ, কোথায় সংখ্যালঘু, কার জন্য কত আসন, কার কত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, এসব হিসাব ক্রমশ পরিচয়কে শক্ত খোপে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। যে পরিচয় আগে দৈনন্দিন জীবনে অনেক বেশি প্রবাহমান হতে পারত, রাষ্ট্র তাকে টেবিলে বসিয়ে কলম ধরিয়ে বলছে, ‘এখানে টিক দিন।’
মানুষ টিক দিল। তারপর সেই টিকচিহ্নই একসময় পতাকা হতে শুরু করল।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এই প্রক্রিয়ার একটি বড় বাঁক। পূর্ববাংলার বহু মুসলমান বঙ্গভঙ্গকে নতুন প্রশাসনিক সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তের আধিপত্য থেকে বেরিয়ে পূর্ববাংলায় নতুন শিক্ষা, চাকরি, প্রশাসনিক গুরুত্ব তৈরি হতে পারে, এমন আশা ছিল। আবার বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের ভাষা অনেক মুসলমানের কাছে সর্বজনীন জাতীয়তার ভাষা বলে প্রতিভাত হয়নি। ফলে ‘বাংলা’ বলতে কার বাংলা বোঝানো হচ্ছে, এই প্রশ্নও তীব্র হল।
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হল, কিন্তু যে সন্দেহ জন্মেছিল তা তো সরকারি বিজ্ঞপ্তি দেখে ব্যাগ গুছিয়ে চলে যায় না।
এরপর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামো, পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা, মুসলিম লীগের উত্থান, কৃষক সমাজের প্রশ্ন, জমিদারি ও শ্রেণিস্বার্থ, সব মিলিয়ে মুসলমান রাজনীতি নিজস্ব পথ নিতে শুরু করল। কিন্তু এখানেও ‘মুসলমান সমাজ’ বলে একটি অভিন্ন, একই রকম দল ছিল না। জমিদারের মুসলমান পরিচয় আর দরিদ্র কৃষকের মুসলমান পরিচয়ের সামাজিক অর্থ এক নয়। কলকাতার শিক্ষিত পেশাজীবী, জেলা শহরের শিক্ষক, পূর্ববঙ্গের কৃষক, আশরাফ সামাজিক গোষ্ঠী, স্থানীয় ধর্মীয় নেতৃত্ব, আধুনিক শিক্ষিত তরুণ, সকলের স্বার্থ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ভাষা এক ছিল না।
ফলে মুসলমান মানসও একবচনে ধরলে বিপদ।
তবু একটি সাধারণ বিষয় দেখা যায়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ক্রমাগত এমন এক সাংস্কৃতিক রূপ খুঁজছিল, যেখানে আধুনিকতা গ্রহণ করা যাবে, আবার মুসলিম ঐতিহ্য হারাবে না; বাংলা ভাষায় পূর্ণ অংশীদার হওয়া যাবে, আবার বৃহত্তর ইসলামি পরিচয়ও অস্বীকার করতে হবে না; উপনিবেশবিরোধী রাজনীতিতে থাকা যাবে, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু রাজনীতিতে বিলীন হয়ে যাওয়া এড়াতে চেয়েছিল।
সমস্যা হল, ইতিহাস সাধারণত এতগুলো শর্ত একসঙ্গে মেনে চুক্তিপত্রে সই করে না।
সাহিত্য ও সংবাদপত্র তাই এই আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠল। কারণ রাজনৈতিক দল পাঁচ বছরে একবার ভোট চাইতে পারে, সাহিত্য প্রতিদিন মাথার ভিতর কাজ করে। নতুন পত্রিকা, প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, বিতর্ক, ভাষা নিয়ে ঝগড়া, ঐতিহ্যের পুনর্ব্যাখ্যা, সবের ভিতর দিয়ে মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের ইতিহাস লিখতে শুরু করলেন। কে আমাদের পূর্বপুরুষ? কোন সাহিত্য আমাদের? বাংলা ভাষা কোন শব্দ নেবে? ইসলামি বিষয় বাংলায় কীভাবে লেখা হবে? বাঙালি মুসলমানের অতীত কি মধ্যযুগীয় সুলতানি ইতিহাসে, না গ্রামীণ বাংলার লোকজীবনে, না আরব-ফারসি বৃহৎ সভ্যতার ধারায়?
উত্তর অনেক।
এবং উত্তরগুলোর মধ্যে মারামারিও যথেষ্ট।
কেউ সংস্কৃতনির্ভর বাংলা ভাষাকে হিন্দু সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অংশ হিসেবে দেখলেন। কেউ বাংলা ভাষাকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করাকেই বিপজ্জনক মনে করলেন। কেউ আরবি-ফারসি শব্দের সচেতন ব্যবহারকে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যের চিহ্ন করলেন। কেউ বললেন, ভাষার বাপ-মা ধর্ম নয়, ব্যবহার। সাহিত্যিক পরিসরে এই দ্বন্দ্ব যতই বানান, শব্দ, ছন্দ, নামকরণ নিয়ে চলুক, ভিতরে আসল প্রশ্ন একটাই: আমরা নিজেদের কোন সভ্যতার গল্পের ভিতরে বসাব?
এইখানে কাজী নজরুল ইসলামের মতো ব্যক্তিত্বের গুরুত্ব বোঝা যায়। তাঁর লেখায় ইসলামি ঐতিহ্য যেমন এসেছে, তেমনি শ্যামাসংগীতও। কারবালা আছে, কালীও আছেন। তিনি যেন পরিচয়ের পরীক্ষাগারে বারবার প্রমাণ করছেন, একই মানুষকে একটিমাত্র ড্রয়ারে ঢোকানোর চেষ্টা করলে ড্রয়ারটাই আগে ভাঙবে। কিন্তু সমাজের রাজনৈতিক গতিবিধি তখন ক্রমশ ড্রয়ার বানাতে ব্যস্ত।
ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে এসে এই দ্বিধা আরও রাজনৈতিক রূপ পেল। পাকিস্তানের ধারণা সামনে এল। মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা দ্রুত জনপ্রিয় হল। কিন্তু ‘পাকিস্তান’ও প্রথম দিকে সবার কাছে একই মানে বহন করত না। কারও কাছে তা রাজনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার, কারও কাছে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি, কারও কাছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন, কারও কাছে একটি পৃথক রাষ্ট্রের স্বপ্ন। বাংলার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও ঘোরালো, কারণ এখানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু ভাষা ও আঞ্চলিক সংস্কৃতি ভাগাভাগি।
একজন বাঙালি মুসলমানকে তখন বলা হচ্ছে, তোমার মুসলমান পরিচয় তোমাকে এক রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে ডাকছে। একই সঙ্গে তাঁর বাংলা ভাষা তাঁকে আরেক বৃহৎ সাংস্কৃতিক সংসারের মধ্যে রাখছে।
দুই ডাকই সত্যি।
দুই ডাক সবসময় একই ঠিকানায় পৌঁছয় না।
এই দ্বৈততার সবচেয়ে নাটকীয় পরিণতি ১৯৪৭। দেশ ভাগ হল ধর্মের ভিত্তিতে, কিন্তু পূর্ববাংলার মানুষ কয়েক বছরের মধ্যেই দেখতে পেলেন, মুসলমান হওয়া রাজনৈতিক রাষ্ট্র নির্মাণে যথেষ্ট শক্তিশালী পরিচয় হলেও, দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক জীবনকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করতে পারে না। ভাষা আবার দরজায় এসে দাঁড়াল। বাংলা বনাম উর্দুর প্রশ্নে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের অল্পদিনের মধ্যেই যে সংঘাত তৈরি হল, তার বীজ ১৯৫২ সালে হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি। বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলমান যে পরিচয়-তর্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, ভাষা আন্দোলন সেই দীর্ঘ তর্কের পরবর্তী অধ্যায়।
তাই ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭-কে শুধু পাকিস্তান সৃষ্টির প্রস্তুতিকাল হিসেবে পড়লে ভুল হবে। সময়টাকে দেখতে হবে এক বৃহৎ আত্মপরিচয় নির্মাণের যুগ হিসেবে। এখানে ধর্ম আছে, শ্রেণি আছে, ভাষা আছে, শিক্ষা আছে, ঔপনিবেশিক নীতি আছে, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব আছে, সাহিত্য আছে, ভয় আছে, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, অতীতের স্মৃতি আছে, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আছে।
এবং আছে মধ্যবিত্তের চিরন্তন রোগ, নিজের অস্তিত্ব নিয়ে অনবরত প্রবন্ধ লেখা।
এই গবেষণার আসল আগ্রহ সেই জায়গায়। কোন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানকে চালিত করেছিল? ধর্মীয় পুনর্জাগরণ কীভাবে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নের সঙ্গে মিশল? নবগঠিত মধ্যবিত্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব হাতে পাওয়ার পর পরিচয় নির্মাণে কী ভূমিকা নিল? বাংলা ভাষা, ইসলামি ঐতিহ্য, ঔপনিবেশিক রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্ব পরস্পরের সঙ্গে কোথায় মিলল, কোথায় ধাক্কা খেল? কেন একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বিন্যাস ধীরে ধীরে গড়ে উঠল?
এখানে ‘মুসলিম মানস’ বলতে কোনও চিরস্থায়ী, জন্মগত, বাক্সবন্দি মন বোঝানো যায় না। ইতিহাসে মানুষের মনও ইতিহাসের মতোই বদলায়। নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন শিক্ষা, নতুন রাজনৈতিক সুযোগ, নতুন অপমান, নতুন ভয়, নতুন সাহিত্য, নতুন শ্রেণিস্বার্থ তাকে তৈরি করে। মানুষ প্রথমে নিজের পরিচয় নিয়ে ভাবে, তারপর সেই ভাবনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান বানায়, তারপর সেই প্রতিষ্ঠান পরবর্তী প্রজন্মকে শেখায় তাদের পরিচয় কী। শেষে সবাই ভুলে যায় যে পরিচয়টি একদিন তৈরি হয়েছিল। মনে হয়, এ তো চিরকালই ছিল।
ইতিহাস তখন কোণে বসে একটু হাসে।
কারণ সে জানে, ‘চিরকাল’ কথাটা মানুষের খুব প্রিয়, অথচ ইতিহাসের কাছে তার আয়ু বেশ কম।



