আমার জীবনে অনেকরকম বই দেখেছি। ঢাকা সদরঘাটের টাঙাওয়ালার হাতে ছেঁড়া পঞ্জিকা দেখেছি, কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের গন্ধে মানুষকে পাগল হতে দেখেছি, অমৃতায়নের আড্ডায় এমন লোক দেখেছি যারা বই না পড়েও বইয়ের নামে বক্তৃতা দিতে পারে। কিন্তু বইয়ের মলাটে যদি লেখা থাকে “Library”, তখন আমার বুকের ভেতর থেকে ঢাকার এক গাড়োয়ান উঠে এসে বলে, “হালার বাবু, বইয়ের নাম যদি লাইব্রেরি হয়, তাইলে লাইব্রেরির নাম কী? বই?”
ঘটনাটা শুনুন।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট একখানা ছবি পোস্ট করলেন এক্সে। দিনটা বুধবার, ২ জুলাই ২০২৬। জায়গা নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান। বিমানটি নাকি কাতার সরকারের উপহার, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য। এখন উপহার কথাটা রাজনীতিতে খুব বিপজ্জনক শব্দ। শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইকে লুঙ্গি দিলে উপহার, বন্ধুর ছেলে পরীক্ষায় পাশ করলে কলম দিলে উপহার, কিন্তু বিদেশি সরকার যদি আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে উড়োজাহাজ দেয়, তখন বুড়িগঙ্গার মাঝিও দাঁড় টেনে থেমে জিজ্ঞেস করবে, “এইটা উপহার, না মালামাল?”
তার ওপর আছে ঘুষ-বিরোধী নিয়মকানুন। আমেরিকার সংবিধান, আইন, নীতি, সব মিলিয়ে প্রেসিডেন্টকে বিদেশি সরকারের কাছ থেকে এমন জিনিস নেওয়ার ব্যাপারে বহুদিনের সতর্কতা আছে। রাজনীতি মানে তো আর ঢাকার মেলা না যে একজন বলল, “মাসিমা মালপো খামু”, আরেকজন বলল, “আহা খাও বাবা, সঙ্গে সন্দেশও নাও।” রাষ্ট্রের হিসাব থাকে। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে হিসাবের খাতা অনেক সময় দোকানের পেছনে রাখা হয়, সামনে শুধু সোনালি ফ্রেম, লাল কার্পেট আর টেলিভিশনের আলো।
যাই হোক, লেভিট ছবির সঙ্গে লিখলেন, নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানের প্রথম ফ্লাইটে থাকা কী গর্বের ব্যাপার, কী স্মরণীয় দিন, কী সৌভাগ্য। ওসব ঠিক আছে। প্রেস সেক্রেটারির কাজই তো গর্বিত দেখানো। আমাদের পাড়ায় এক কাকা ছিলেন, মাসে তিনবার চাকরি বদলাতেন, কিন্তু প্রতিবারই বলতেন, “এইবার বুঝলি, ক্যারিয়ার সেট।” তাঁর গলায় সেই একই সরকারি আশাবাদ। কিন্তু মানুষ আজকাল শুধু সামনে দাঁড়ানো লোক দেখে না, পেছনের তাকও দেখে। ছবির পেছনে ছিল বইয়ের তাক। সেখানেই নাটক শুরু।



কেউ একজন ছবিটা বড় করে দেখল। তারপর আরেকজন দেখল। তারপর সামাজিক মাধ্যমের লোকজন চোখ কুঁচকে দেখল। দেখা গেল, তাকের বইগুলোর মলাটে লেখা “Library”। আরেক সারিতে “Arts”। আরেক পাশে “Architecture”। যেন বই নয়, বইয়ের ছদ্মবেশে আসবাব। বইয়ের আত্মা নেই, মলাট আছে। বংশপরিচয় নেই, পদবি আছে। এমন বই কলেজ স্ট্রিটে দিলে বইওয়ালা বলবে, “দাদা, এইটা বই না, ড্রয়িংরুমের লোকদেখানো সংস্কৃতি।”
আমি ভাবলাম, কী চমৎকার! “Arts” নামে বই। আহা, কী উপন্যাস হতে পারে! প্রথম অধ্যায়: চিত্রকলা। দ্বিতীয় অধ্যায়: একটু সঙ্গীত। তৃতীয় অধ্যায়: যা বুঝিনি তা আধুনিক শিল্প। “Architecture” নামের বই একখানা নয়, কয়েকখানা। যেন কেউ ভাবল, বিমানে যদি স্থাপত্যের বই থাকে, তাহলে বিমানটা আরও প্রতিষ্ঠিত দেখাবে। আর “Library” নামের বই দেখে মনে হল, কেউ হয়তো বইয়ের দোকানে গিয়ে বলেছে, “ভাই, এমন বই দেন যাতে বই মনে হয়।” দোকানি বলেছে, “নাম কী লাগবে?” উত্তর এসেছে, “বইয়ের মতো কিছু। Library লিখে দেন।”
আমাদের ঢাকার কুট্টি হলে বলত, “বাবু, বই পড়েন নাই, বইয়ের লগে ফটো তুলেন। তয় বইয়ের নাম অন্তত বই না রাখলেই পারতেন।”
এখন অনেকে সন্দেহ করল ছবিটা কি এআই দিয়ে বানানো? সন্দেহটা অমূলক নয়। এই যুগে ছবি দেখে বিশ্বাস করা যায় না। আগে নাটকে পরচুলা খুলে গেলে দর্শক হাসত, এখন ছবিতে ঈগল ঝুললে মানুষ বলে, “জেমিনি দিয়ে চেক করো।” গিজমোডো ছবিটা গুগলের জেমিনি দিয়ে পরীক্ষা করল, SynthID ওয়াটারমার্ক আছে কি না। SynthID হলো গুগলের এআই ছবি তৈরির অদৃশ্য চিহ্ন। চোখে দেখা যায় না, কিন্তু থাকে। এই ছবিতে সেটি পাওয়া যায়নি। তার মানে ছবিটি গুগলের এআই টুলে তৈরি নয়। কিন্তু অন্য কোনো এআই টুলে তৈরি কি না, সে কথা এই পরীক্ষায় বলা যায় না। প্রযুক্তিরও সীমা আছে। যেমন ডাক্তার পেট দেখে বলতে পারেন বদহজম, কিন্তু শ্বশুরমশাই কেন রেগে আছেন সেটা আলাদা রোগ।
গিজমোডোর অনুমান, ছবিটা সম্ভবত এআই নয়। কারণ এমন ছবি বানানোর বিশেষ দরকার নেই। আরও সহজ ব্যাখ্যা আছে: নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে সত্যিই এমন নকল বই রাখা হয়েছে। সাজসজ্জার জন্য। দেখাবার জন্য। একধরনের সাংস্কৃতিক প্রপ। বইয়ের চেহারা আছে, বইয়ের বিবেক নেই।
এই জায়গায় আমার একটু ব্যক্তিগত কষ্ট আছে। বই নিয়ে আমার দুর্বলতা। বইকে আমি শুধু কাগজের প্যাকেট ভাবি না। বইয়ের মলাটে ভুল নাম দেখলে আমার মনে হয় কেউ যেন রবীন্দ্রনাথের গলায় টাই পরিয়ে বলছে, “এবার কর্পোরেট লুকে দাঁড়ান।” বইয়েরও চরিত্র আছে। বইয়ের ঘ্রাণ আছে। বইয়ের পাতা ওল্টালে মানুষের অহংকার একটু চুপ করে। কিন্তু এখানে বই দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় বিমানের তাকের ওপর, অথচ তাদের নাম “Library”। এ যেন পুকুরের নাম “জল”, ভাতের নাম “খাবার”, মানুষের নাম “ব্যক্তি”।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ছবি নিয়ে সন্দেহের কারণ আগেও তৈরি হয়েছে। ২৯ জুন ২০২৬ তারিখে ট্রাম্প নিজের Truth Social-এ এক ছবি পোস্ট করেছিলেন। ছবিতে দেখা গেল, হোয়াইট হাউসের গায়ে এক বিশাল সোনালি ঈগল বাঁধা আছে। ক্যাপশনও বেশ জাঁকজমকপূর্ণ: আমেরিকার ২৫০তম জন্মবর্ষে হোয়াইট হাউসের জন্য সোনালি উপহার। শুনতে এমন যেন কোনো রাজা দুর্গের মাথায় সোনার ময়ূর বসিয়েছেন। কিন্তু জেমিনিতে পরীক্ষা করলে ছবিটি এআই-জেনারেটেড বলে ধরা পড়ে। CNN জানায়, সেদিন এক ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হোয়াইট হাউসের ছবি তুলেছিলেন, সেখানে ঈগল নেই। অর্থাৎ ঈগল কাগজে আছে, বাস্তবে নেই। আমাদের পাড়ার ভাষায়, “ঈগলটা উড়েও নাই, বসেও নাই, শুধু পোস্ট হইছে।”
এরপর ট্রাম্প নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে নর্থ ডাকোটায় গেলেন। উপলক্ষ ছিল নতুন থিওডোর রুজভেল্ট প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরির উদ্বোধন। তিনি ফিতা কাটলেন, বক্তৃতা দিলেন, আর এক এআই-রুজভেল্টের সঙ্গে কথাও বললেন। ভাবুন দৃশ্যটা। এক বর্তমান প্রেসিডেন্ট, যার নিজের চারপাশে সোনা, সাজ, ছবি, দাবি আর নাটক, তিনি কথা বলছেন এক কৃত্রিম টেডি রুজভেল্টের সঙ্গে। ইতিহাসের ভূত এখন এআই সাবস্ক্রিপশনে পাওয়া যায়। আগে প্ল্যানচেট করতে গোল টেবিল লাগত, এখন স্ক্রিন আর ভয়েস মডেল।
ট্রাম্প রুজভেল্টকে পানামা খাল নিয়ে প্রশ্ন করলেন। ট্রাম্পের বিশেষ আগ্রহের বিষয়। রুজভেল্টেরও সাম্রাজ্যবাদী দিক ছিল, সে কথা ইতিহাস জানে। এআই-রুজভেল্ট স্বীকার করল, পানামা খাল নির্মাণ বড় অর্জন। তবে সে নাকি ঘরোয়া কাজ, দেশের ভেতরের অর্জন নিয়ে বেশি গর্বিত। শুনে আমার মনে হল, মৃত মানুষকে এআই বানালে তারাও মাঝে মাঝে জীবিতদের চেয়ে বেশি সংযত কথা বলে।
পুরো ঘটনাটা যেন এক অদ্ভুত যুগের ছবি। প্রেসিডেন্ট বিদেশি সরকারের উপহার পাওয়া বিমানে উঠছেন। বিমানের ভেতরে বই আছে, কিন্তু বইগুলো নকল। অন্য ছবিতে ঈগল আছে, কিন্তু ঈগল নেই। প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিতে রুজভেল্ট আছেন, কিন্তু রুজভেল্ট নেই। বক্তৃতা আছে, সত্য কম। সাজ আছে, অন্তর ফাঁকা। চারদিকে এমন এক বাস্তবতা, যেখানে সবকিছু উপস্থিত, অথচ অনেক কিছু অনুপস্থিত।
আমাদের সময়ে নাটকে নকল গোঁফ লাগত। কিন্তু দর্শক জানত সেটা নকল। নকল তলোয়ার দিয়ে লড়াই হতো, কিন্তু কেউ বলত না যে এই তলোয়ার দিয়ে পলাশীর যুদ্ধ জেতা হয়েছে। এখন নকল জিনিসের সমস্যা এই যে, সে নিজেকে নকল বলে পরিচয় দেয় না। নকল বই বইয়ের মতো দাঁড়ায়। নকল ঈগল রাষ্ট্রীয় গর্বের মতো উড়ে। নকল রুজভেল্ট ইতিহাসের মতো কথা বলে। আর আমরা দর্শক হয়ে বসে ভাবি, আসল কোথায় গেল?
ট্রাম্পকে অনেকেই আমেরিকার সবচেয়ে কৃত্রিম প্রেসিডেন্ট বলেন। কারণ তাঁর রাজনীতির ভঙ্গি অনেক সময় হোটেলের লবির মতো: ঝকমকে, সোনালি, ভারী, আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু কোথাও যেন প্লাস্টিকের ফুল। ওভাল অফিসে ট্যাকি সাজ, প্রতিদিনের অদ্ভুত দাবি, অবিরাম মিথ্যা, নিজের ছবিকে নিজের মূর্তি বানানোর প্রবণতা। এই সবের মধ্যে Air Force One-এর তাকের ওপর “Library” লেখা নকল বই যেন ছোট্ট জিনিস হয়েও বড় প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
আমি বলছি না এই ছবিটি এআই। এখন পর্যন্ত তার প্রমাণ নেই। বরং প্রমাণের অভাবে সবচেয়ে সাধারণ ব্যাখ্যাই ধরতে হয়: বইগুলো বাস্তব জগতে আছে। তবে বই হিসেবে নয়, সাজ হিসেবে। অর্থাৎ নকল বই, কিন্তু সত্যি নকল বই। এই বাক্যটা শুনে ঢাকা সদরঘাটের টাঙাওয়ালা নিশ্চয় বলত, “বাবু, মিথ্যা যদি সত্যি হয়, তাইলে সত্যির ভাড়া কত?”
আমেরিকার রাষ্ট্রীয় বিমানে নকল বই থাকা অপরাধের তালিকায় হয়তো বড় কিছু নয়। কিন্তু প্রতীকের রাজনীতিতে ছোট জিনিসও কথা বলে। রাজনীতি যখন চরিত্র হারায়, তখন সাজসজ্জা চরিত্রের বদলি হয়ে দাঁড়ায়। বই না পড়েও বইয়ের তাক বানানো যায়। ইতিহাস না জেনেও প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি উদ্বোধন করা যায়। ঈগল না বসিয়েও ঈগলের ছবি পোস্ট করা যায়। সততা না থাকলেও দেশপ্রেমের রঙ মাখা যায়। আর জনগণ? জনগণ ছবির পেছনের তাক বড় করে দেখে। এইটুকুই আশার জায়গা।
কারণ মানুষ এখনও দেখে। কেউ না কেউ জুম করে। কেউ না কেউ পড়ে। কেউ না কেউ মলাটের নাম দেখে হেসে ওঠে। সেই হাসির মধ্যেই বিচার আছে।
শেষে আমার মনে পড়ল ঢাকার এক কুট্টির কথা। এক ভদ্রলোক নাকি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমার ঘোড়া এত সাজানো, কিন্তু চলে না কেন?” কুট্টি উত্তর দিয়েছিল, “চলব কেমনে বাবু, সাজাইতে সাজাইতে ঘোড়ার জানই শেষ।”
নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানের তাকের বইগুলো দেখে আমারও সেই কথাই মনে হল। সভ্যতা খুব সাজানো। বইয়ের মলাট চকচকে। ঈগল সোনালি। বক্তৃতা প্রবল। কিন্তু পাতাগুলো খুললে দেখা যায়, ভেতরে লেখা নেই।
আর বইয়ের নাম?
“Library.”
বাহ!
এই বই পড়তে না-পারার জন্য পাঠককে দোষ দেওয়া যায় না।




😅😅😅😅 এদের (ক্ষমতাবান সহ পুঁজিপতিদেরও যেমন এলন মাস্ক ) একটা মজার ব্যাপার হলো, টাকা আছে প্রশাসন আছে শুধু মগজটাই নেই। ক'দিন আগে এপস্টিন ফাইলসগুলো এডিট করে বের করছিল, তো না না কারণে যখন বিশেষ মুখগুলো ঢেকে দেওয়া হয়, তখন তা দেখে আমাদেরই হাসি পেয়ে গিয়েছিল— তওবা তওবা, এমন এডিট করেছে যেসব ভদ্রলোকের পরিচয় তারা গোপন করতে চেয়েছিল— তা সবই বোঝা গেছে। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করি কী হলো এত বস্তা বস্তা টাকা দিয়ে?— কিছু মগজহীন ব্যক্তির সঙ্গ জুটেছে। মনে পড়ছে সেই গল্পটি— রাজা ন্যাংটো আর সবাই হাততালি দিচ্ছে কারণ— রাজবস্ত্র অতীব সূক্ষ্ম— ওরা ভাবে তো তা-ই।