বুদ্ধদেব বসুর জীবনে একটি দিন
রাতের শেষ প্রহর থেকে পরদিনের গভীর রাত্রি পর্যন্ত এক কবির জীবনযাপনকে যদি পাঠের বিষয় করা যায়, তবে তা হয়ে ওঠে সৃজনশীল মননের ছন্দপতন ও পুনরারম্ভের এক নিবিড় অনুষঙ্গ। বুদ্ধদেব বসু-র জীবনযাপনের এমনই এক দিন, ২০২ রাশবিহারী অ্যাভিনিউ-এর গৃহপরিসরে, আমাদের সামনে উন্মোচিত করে কবি-মানুষ, গৃহস্থ-মানুষ এবং সম্পাদক-মানুষের সমান্তরাল উপস্থিতি। এই একটি দিনের বিবরণে হঠাৎ করে ঢুঁকে পড়েন জীবনানন্দ দাশ। - রিটন খান
বুদ্ধদেব বসুর জীবনে একটি দিন
মীনাক্ষী দত্ত
গড়িয়াহাট ডিপোয় ট্রামগুলিতে বাতি জ্বলে উঠছে, একটু পরেই আধো অন্ধকারে ভোরের প্রথম ট্রাম পথে বেরুবে, হরিণঘাটার দুধের গাড়ি ঝনঝন শব্দে দুধের বোতলের ক্রেট নামাবে। তিনি টেবিলল্যাম্পের বাতি নিভিয়ে মরা কলমটি প্যাডের উপর শুইয়ে রাখলেন। পাশে রুপোর গ্লাশে (শাশুড়ি সরযুবালা সোমের দেওয়া উপহার) ঢাকা জল থেকে এক চুমুক খেয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। শুতে যাবেন এইবার। বুদ্ধদেব বসুর একটি দিন শেষ হল, কলকাতার যখন শুরু হচ্ছে আর একটি দিন। বালিশে মাথা ঠেকাতেই ঘুমিয়ে পড়লেন।
বহুদিনের বিশ্বস্ত পরিচারক গণেশ অঙ্কের মতো কাজ করে। সকাল ঠিক সাতটায় বিছানার পাশে ছোটো টেবিলে এক কাপ চা রেখে যায়। অনেকেই যেমন অ্যালার্মের ঘণ্টা বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে পড়েন বু. ব. ও তেমনি জেগেও ঘুমকে আবার প্রশ্রয় দিয়ে চা- টাকে ঠান্ডা হতে দেন। পনেরো মিনিট বাদে গণেশ আবার আসে দ্বিতীয় কাপ চা নিয়ে। এবারে নিঃশব্দে সরে না গিয়ে সে খুলে দেয় ঝুলবারান্দার দিকের দরজা, সরিয়ে দেয় পর্দা। দিনের আলো ফুটে ওঠে, রাস্তার শব্দ এসে আছড়ে পড়ে। আরও কিছুক্ষণ বিছানায় আধশোয়া হয়ে তিনি চা খান ও দিনের প্রথম সিগারেট ধরান। ততক্ষণে বাড়ির কলরোল শুরু হয়ে গেছে। ছোটো মেয়ের গানের শব্দ কানে এল, সারাক্ষণ গলায় গান লেগে থাকে তার। বড়ো মেয়ে বলছে, ‘মা, আমার সবুজ মাদ্রাজি শাড়িটা কোথায় গেল?’ ছেলে পড়তে বসেছে, তার পড়ার মৃদু গুঞ্জন কানে আসছে। রান্নাঘর থেকে আসছে টুংটাং শব্দ। নতুন দিন শুরু হল ২০২ রাসবিহারী এভিনিউতে।
সাড়ে সাতটার মধ্যে উঠে পড়লেন। দাড়ি কামানো, স্নান ইত্যাদি সেরে পাটভাঙা ধবধবে আদ্দির পাঞ্জাবি আর পাজামা পরে, পায়ে টুকটুকে লাল তালতলার চটি গলিয়ে তিনি দক্ষিণের বারারান্দায় পাতা খাবার টেবিলে এসে বসলেন। গণেশ খবরের কাগজ ভাঁজ করে প্লেটের পাশে রেখে দিয়েছে। বাড়ির অন্যদের জলখাবার হয়তো বদলায়, ছেলেমেয়েদের এক একদিন এক একটা বায়না, তাঁর বদলায় না। দুটি ডিমের পোচের উপর মাখনের কিউব, সঙ্গে একটি টোস্ট। দু কাপ চা। সপ্তাহে সপ্তাহে বাড়িতে এসে চা দিয়ে যান কলেজ স্ট্রিটের চায়ের দোকান সুবোধ ব্রাদার্সেৰ লোক। প্রাতরাশ ও নৈশভোজের টেবিল পরিবারের সবচেয়ে আনন্দের সময় কারণ তখন সবাই একত্র হন। যত আড্ডা, তর্ক, এবং ছেলেমেয়েদের চাহিদার কথা সেই সময়।
সাড়ে নটায় লেখার টেবিলে। রোজ সকালে বড়ো মেয়ে তাঁর টেবিল গুছিয়ে দেয়। তাতে সুবিধে যেমন, অসুবিধেও কম হয় না। একসঙ্গে নানারকম কাজ করেন তিনি। প্রবন্ধের প্যাড সরিয়ে দিয়ে মেয়ে তাঁর ধারাবাহিক উপন্যাসের প্যাড একদম সামনে রেখে গেছে। কিস্তি শেষ করার জন্য তাড়া দেওয়া হয়েছে। শাস্তি হিসেবে তাকে ডেকে বললেন, ‘কলেজে যাবার সময় প্রুফ নিয়ে যাস’।
সে যাবে কলেজ স্ট্রিট, প্রেসিডেন্সি কলেজে। প্রুফ দিয়ে যেতে গেলে তার হিন্দ সিনেমা হলের সামনে নেমে একটু হেঁটে গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউতে ‘পূর্বাশা’ প্রেসে যেতে হবে।
টেবিলে বসে প্রুফের তাড়া খুললেন। এবং সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর এই অতি প্রিয় গতানুগতিক কাজে ডুবে গেলেন। সত্যপ্রসন্ন দত্ত নিজে ফার্স্ট প্রুফ দেখে পাঠিয়েছেন তবু বু. ব-র চোখে প্রচুর প্রমাদ ধরা পড়েছে। আরও অন্তত তিনটে প্রুফ নিতে হবে। বুদ্ধদেব জানেন, তাঁর দেখা প্রুফ কম্পজিটারের দুঃস্বপ্ন। একটিও মুদ্রণপ্রমাদ থাকে না তাঁর পত্রিকায়, নিজের সব বই-এর প্রফ তিনি নিজে দেখেন। বানান নিয়ে নানান পরীক্ষা ও বানানের আধুনিকীকরণ করেছেন তিনি।
দু’-একটা ঊর্ধ্বকমা নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। মেয়েকে দাঁড় করিয়ে সেগুলো ঠিক করলেন।
ক্লাশ’। ‘উঃ, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, বাবা। দাও, দাও, যা হয়েছে দাও। জি. এন. বি-র
‘দাঁড়া, একমিনিট’।
‘জি. এন. বি. তাড়াতাড়ি... তাড়াতাড়ি...’
মেয়ের তাড়ায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রুফের পাতা গুটিয়ে তার হাতে দিলেন। বললেন, ‘ফেরার পথে নিয়ে আসতে হবে কিন্তু’।
‘হুঁ’, বলে সম্মতি দিয়ে সে প্রুফের তাড়া কাঁধের ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল। প্রুফ ফেরত আনতে সে আপত্তি করে না, কারণ তাহলে কলেজ থেকে ফিরতে দেরি করার উপযুক্ত কৈফিয়ত পাওয়া যায়। কলেজের রুটিন মায়ের মুখস্থ। দশ মিনিট দেরি হলেই উদ্বিগ্নমুখে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
বুদ্ধদেব এবার অন্য কাজে মন দিলেন। ধারাবাহিক উপন্যাসের কিস্তি শেষ করতে হবে, ‘কবিতা’ পত্রিকার জন্য যে সব লেখা এসেছে পড়তে হবে, লিখতে হবে প্রবন্ধ ও পুস্তক সমালোচনা, একটা গল্প অর্ধেক হয়ে আছে, পড়ে আছে কবিতা সংকলনের কাজ, করছেন ‘লা ফ্লার, দ্যু মাল’, ও ‘মেঘদূতে’র অনুবাদ। একটা কবিতার লাইন গত রাত থেকেই মাথায় ঘুরছে, কিন্তু সেটা থাক। রাতটা তার জন্য।
ডাকে আসা নতুন লেখকদের কবিতার খামগুলি একসঙ্গে করে একটা ফাইলে রাখা আছে। ফাইল বার করে ভেতরের খামগুলি তিনি এক-এক করে খুলতে লাগলেন একটা হাতির দাঁতের কাগজ কাটার ছুরি দিয়ে। স্ত্রী প্রতিভা বসুর উপহার, দিল্লি থেকে কেনা।
অনেক চিঠি। বিদেশের নীল খাম, লম্বা মোটা সাদা খাম, স্পষ্টতই কবিতায় ঠাসা, তা সত্ত্বেও একটি খড় রঙের লেফাফার উপর তাঁর দৃষ্টি পড়ে। পকেট থেকে নাম লেখা রুপোর সিগারেট কেস (এটাও সরযুবালা সোমের উপহার, তখন ধূমপান সামাজিক ভাবে ব্রাত্য ছিল না। ছিল আক্ষরিক অর্থে, বরণীয়) থেকে সিগারেট বার করে ধরিয়ে তিনি প্রথমেই ঐ খামটি খুললেন। ডাকটিকিটে আরবি হরফ, বাঁয়ে উপরের দিকে প্রেরকের নাম ও ঠিকানা। ঢাকা থেকে এসেছে। কিছুকাল হল তিনি পূর্বপাকিস্তান থেকেও ডাকে লেখা পাচ্ছেন। আগে পশ্চিমবঙ্গের জেলের ডেটিনিউদের বই-এর ভাতা থেকে অনেকেই ‘কবিতা’র গ্রাহক হতেন। পূর্ব পাকিস্তানের চিঠি এখন বৈচিত্র্যের স্বাদ আনে। এর মধ্যে তিনি তাঁর কৈশোর ও প্রথম যৌবনের সুবাস পান। খামে একটি মাত্র কবিতা, সঙ্গে চিঠি। ‘কবিতা’ পত্রিকার জন্য কবিতা পাঠিয়েছেন তাঁর অচেনা এক কবি। কবিতার নাম ‘তার, মৃত্যু’। প্রথম লাইনটিই তাঁকে টানল - ‘ইজদানি মারা গেছে বিমান পতনে’। পয়ার পুরোনো, কিন্তু আওয়াজ নতুন। দুবার পড়লেন পরপর। মনোনীত অবশ্যই। আলাদা করে রাখলেন। আজই চিঠি লিখবেন কবি সৈয়দ শামসুল হককে।
দ্বিতীয় খামটি কলকাতার। হাতের লেখাটা চেনা চেনা। উত্তর-রাবীন্দ্রিক। কবির নাম দেখে সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল আগে একবার এর কবিতা ছাপা হয়েছে। কবিতার প্রথম লাইনও সম্পাদকের মনে পড়ল: ‘আমার যৌবনে তুমি স্পর্ধা এনে দিলে / তোমার দুচোখে তবু ভীরুতার হিম’। নতুন কবিতার প্রথম লাইন তাঁকে আকর্ষণ করে।
‘ঝড় দিসনে আকাশ, সেই সুন্দরীর ঘরে’ ছন্দের দোলা, আবেগের আঘাত। বুদ্ধদেব বসুর অ্যান্টেনা সচকিত হল। তিনি পড়ে চলেন:
‘থিরথিরিয়ে কাঁপতে থাকুক ভীরু দীপের শিখা আঁচল পেতে মাটিতে বুক চেপে থাক সে শুয়ে একা ঘরের প্রতীক্ষিতা, আকাশ-কনীনিকা...
আঙ্গিকে আঁটো, অথচ সংরক্ত ও হৃদয়বান।
দ্বিতীয়টি পড়লেন:
উনিশে বিধবা মেয়ে কায়ক্লেশে উনিতিরিশে এসে গর্ভবতী হল, তার মোমের আলোর মতো দেহ...
পয়েন্ট কাউন্টার পয়েন্ট।
যেন একই কবিতার অংশ, এক বোঁটায় দুটি রক্ত গোলাপ এ কবিতায় আছে নারীর প্রতি তীব্র অনুভূতি যেটা আধুনিকতার বুদ্ধিসর্বস্ব হিমতুষারের মধ্যে হঠাৎ হরিৎ ঝলকানি।
খনক যেমন পাথরের স্তরে স্তরে মণির সন্ধান করেন, বুদ্ধদেব বসুরও সেই কাজ প্রতিদিন। এত ভালো লাগল যে এর সৃজনে জড়িয়ে পড়লেন। তিনি কবিতা নির্মাণের চাঞ্চল্য অনুভব করছেন, দু’একটা শব্দ ইতস্তত খেলা করছে মাথায়। ভেবে আনন্দ হচ্ছে যে এই নবীন কবির দুটো কবিতাই একসঙ্গে ছাপতে পারবেন। কাগজ টেনে নিয়ে তিনি কবিকে চিঠি লিখতে শুরু করলেন: প্রিয় সুনীল,
কবিতা পড়তে পড়তেই শুনেছিলেন দরজায় মৃদু ও ভীরু টোকা। এখন আবার শব্দ পেলেন। ছেলেমেয়েরা বাড়িতে নেই, গণেশের কানে বোধহয় অত নিচু শব্দ যায়নি, এ- সময় তাঁকে নিজেই উঠে দরজা খুলতে হয়। চেয়ার ঠেলে উঠে যখন দরজা খুললেন তখনও হাতে কলম, ভ্রুকুঞ্চিত। দরজার ফাঁক দিয়ে একটি লাজুক মুখ। জীবনানন্দ দাশ। কাঁচুমাচু ভাবে জীবনানন্দ শুধোন, ‘আপনি একা তো?’
‘হ্যাঁ। আসুন, আসুন’।
জীবনানন্দ ধুতির কোঁচা সামলে ঘরে ঢুকলেন। অন্য কোনো উচ্চবাচ্য নেই। এত দূর পৌছোতে পারাটাই তাঁর পক্ষে এক যুদ্ধজয়। বুদ্ধদেব বসুর চোখে সাদর আমন্ত্রণ। পকেট থেকে কাগজ বার করে অনিশ্চয়ভাবে ‘কবিতা’ সম্পাদকের হাতে দিলেন। তাঁর দ্বিধা উপেক্ষা করে বুদ্ধদেব তাঁর হাত থেকে কাগজটা প্রায় ছিনিয়ে নিলেন।
‘বসুন না।’
এবারে সামান্য স্বস্তি বোধ করে জীবনানন্দ বসলেন, কিন্তু এমনভাবে সোফার প্রান্তে যে মনে হল এখনি পিছলে পড়ে যাবেন।
জীবনানন্দর কবিতা পেয়ে সম্পাদকের মুখে আলো জ্ব’লে উঠল। ‘কবিতা’-র প্রথম দিকে জীবনানন্দ পত্রিকার প্রায় প্রধান কবি ছিলেন, এখন তাঁর লেখা কমে এসেছে। বুদ্ধদেব তাই সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রিয় কবির কবিতা পড়তে শুরু করলেন। ‘কবিতা’ পত্রিকার একটা মুখ্য দায়িত্ব বলে তিনি মনে করেন জীবনানন্দর প্রচার।
জীবনানন্দ এবারে মৃদু কণ্ঠে প্রশ্ন করেন, ‘আমার নতুন বইটার রিভিউ কি এ সংখ্যায় যাচ্ছে’?
‘অবশ্যই। চা খাবেন? গণেশ-’
কিন্তু গণেশ ডাকে সাড়া দেবার আগেই পর্দা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন কলহাস্যময়ী উমা দত্ত, বুদ্ধদেবের কৈশোরের বন্ধু ও বর্তমানে ২০২-এরই তিনতলার প্রতিবেশী কবি অজিত দত্ত-র স্ত্রী, প্রতিভা বসুর প্রিয় বান্ধবী। জীবনানন্দকে দেখে মৃদুহাস্যে বললেন, ‘কেমন আছেন?’ কিন্তু তাঁকে দেখামাত্র নির্জনতম কবি ত্রস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁর সম্ভাষণের জবাব না দিয়ে ‘আচ্ছা আসি’ বলে ধুতিতে প্রায় হোঁচট খেতে খেতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
এগারোটা বেজে গেছে। ২০২-এ এই সময়ে আর-একবার চা হয়। গণেশ চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকল। বুদ্ধদেব লক্ষ করলেন ট্রেতে তিনটি কাপ, অর্থাৎ জীবনানন্দ যে চায়ের জন্য থাকবেন না সেটা গণেশ বুঝে গেছে।
উমা দত্ত সংসারের কাজ সেরে রোজই এই সময় দোতলায় নামেন, প্রতিভা বসুও লেখা থেকে ছুটি নেন। স্বামীর মতো তাঁর লেখার বাঁধাধরা সময় নেই। জায়গাও নেই এমনকি। তাঁর তবু আছে একটা ভাঁজ করা ছোটো ডেস্ক, যেখানে যখন সুবিধে, পেতে নিয়ে তিনি তরতর করে লিখে যান। তাঁর জীবনে সবই অনায়াস, যেমন লেখা, তেমন গান, তেমনি সংসার রচনা ও সন্তান প্রতিপালন, অতিথি আপ্যায়ন ও বন্ধু বাৎসল্য। স্বামীর কোনো কাজে ব্যাঘাত হয় তা তিনি চান না। অথচ কখনও তাঁকে ব্যস্ত মনে হয় না, অনন্ত সময় যেন আছে তাঁর হাতে। বুদ্ধদেব ভয়ানক অ্যাডমায়ার করেন স্ত্রীকে, দুই বন্ধুর অশোককুমার ও প্রমথেশ বড়ুয়ার তুলনামূলক আলোচনা শুনতে শুনতে তিনি ভাবলেন, ‘রানু কী ক’রে পারে’?
তাঁরা দুজন চা নিয়ে অন্য ঘরে চলে গেলেন। বু. ব. আবার টেবিলে বসলেন।
সোয়া একটা নাগাদ মাথা চুলকোতে চুলকোতে কার্তিক এসে টেবিলের পাশে দাঁড়াল। গণেশের শ্যালক কার্তিক, এগারো বছর বয়সেই গণেশ তাকে নিজের সহকারী করে নিয়ে এসেছে। বুদ্ধদেবের ছেলের সে সমবয়সী এবং দুজনে খুব ভাব। কার্তিক তার কাছে লেখাপড়া শিখছে। কার্তিক মুখ ফুটে কিছু বলে না, খুব লাজুক সে, তাকে দেখেই বু. ব. বোঝেন যে গণেশ খাবার জন্য তাড়া দিচ্ছে।
এখন বাড়িতে তাঁরা দুজন। প্রায়ই এমনটা হয় না। তাঁদের আত্মীয়সংখ্যা কম, কিন্তু যাঁরা ঘনিষ্ঠ তাঁদের জন্য এ বাড়ি অবারিত দ্বার। কেউ না কেউ দুপরে উপস্থিত থাকেন।
আজ গণেশ কাঁচা কুমড়ো দিয়ে ইলিশ মাছ রেঁধেছে, ইলিশের মাথা দিয়ে মুসুরির ডাল। এটা প্র. ব-র পিত্রালয়, হাঁসাড়া গ্রাম, বিক্রমপুবের নিজস্ব রান্না।
‘বাঃ গণেশ, চমৎখার রান্না করেছো।’
প্রশস্তিবাক্য শুনে অভ্যস্ত হলেও গণেশ খুশি হয়, বলে, ‘কিছুই খেলেন না। আর একটা মাছ দি?’
খাদ্যবিতরণ ও সংরক্ষণ ব্যাপারে গণেশ সর্বময় কর্তা। ছেলেমেয়েরা দুপুরে খেল না ব’লে তাদের ভাগ গণেশ আলাদা আলাদা বাটিতে তুলে রাখছে।
প্র. ব. বলেন, ‘কার্তিককে খেতে দিয়েছো!’
উদাস ভঙ্গী দেখিয়ে গণেশ বলে, ‘খাবে অখন’।
‘ওকে দিও ভালো করে’।
‘হুঃ’ ব’লে কার্তিকের প্রতি গণেশ তার অবহেলা প্রদর্শন করে।
খেয়ে উঠে বসবার ঘরে নিজস্ব চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে সিগারেট ধরালেন। এতক্ষণে কেসের সারবদ্ধ সিগারেটের বেশ কয়েকটা উধাও। প্র. ব. র দুপুরে খেয়ে উঠে চাই মিষ্টি পান। তাঁর পান সাজার বাটা আছে, তাতে পাতলা ভেজা ন্যাকড়ায় জড়ানো মিষ্টি পানের পাতা আর তার উপরে ডিবেতে ডিবেতে নানান রকম মশলা। স্বামীকে আগে দিতেন একটি করে ছোট্ট খিলি লবঙ্গ বিঁধিয়ে, এখন বু. ব. আহারান্তে সিগারেটেই বেশি আগ্রহী। তাঁর বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই অবশ্য পান খান, বিশেষত বিষ্ণু দে। পকেটে রুপোর কৌটোয় ছোটো ছোটো পানের খিলি সর্বদাই থাকে তাঁর।
সিগারেট অ্যাশট্রেতে গুঁজে বু. ব. ফিরে গেলেন তাঁর টেবিলে, প্র. ব গেলেন খাটে ডেস্ক পেতে ব’সে লিখতে। ছেলেমেয়েরা বাড়ি ফেরার আগে যতটা কাজ করা যায়।
ইংরিজি শব্দের পারিভাষিক তালিকা করেছেন অনেক আগেই। তাতে কয়েকটি নতুন শব্দ যোগ করার ইচ্ছে হচ্ছে। Divine discontent শব্দটির পাশে লিখলেন ঐশাতৃপ্তি। Cynic-এর বাংলা শুভনাস্তিক করলে কেমন হয়? রাজশেখর বসু করেছেন অসূয়ক। পারিভাষিক শব্দ নিয়ে তাঁর সঙ্গে বুদ্ধদেবের নিত্য পত্রবিনিময় হয়। অন্যান্য চিঠির সঙ্গে রাজশেখর বসুকে লেখা চিঠিও একসঙ্গে রাখলেন। ডাকের সময় সাড়ে চারটে। ঠিক সোয়া চারটের সময় তিনি নিজে গিয়ে হিন্দুস্থান পার্কের মোড়ে কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় লাল টকটকে ডাকবাক্সে চিঠি ফেলে আসবেন। সোয়া চারটে। ঘড়ির কাঁটা মেলানো যায়। সারাদিনের কাজের মধ্যে পনেরো মিনিটের ছুটি।
সাড়ে চারটে থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত টানা উপন্যাসের কিস্তি লিখলেন এক ঘণ্টা। সাড়ে পাঁচটায় উঠে বিছানায় টানটান হলেন একটু। গণেশ বোধহয় ফুলকপির সিঙ্গাড়া ভাজছে, চায়ের সঙ্গে দেবে। সেই সুবাস নিতে নিতে তাঁর চোখে তন্দ্রা নেমে এল।
চা পানান্তে আরও একবার স্নান করে, ধোপের পাঞ্জাবি পাজামা পরে, তিনি বসার ঘরে এসে বসলেন। সন্ধেটা আড্ডার জন্য। বুদ্ধদেব বসু জনারণ্যে স্বস্তি পান না, সভাসমিতিতে তাঁকে কদাচিৎ দেখা যায়, জনতা যা নিয়ে মাতামাতি করে তার বিরুদ্ধে তিনি অটল নীরবতা অবলম্বন করেন। জগৎ আসে তাঁর বসবার ঘরে।
দক্ষিণের বারান্দায় ছেলেমেয়ের বন্ধুরা ইতিমধ্যেই আড্ডা জমিয়েছে। তাদের কলহাস্য মাঝে মাঝে ভেসে আসছে। ওদের মধ্যে কেউ কেউ অভিনয় করে নাটক দলে, কেউ গান করে, কেউ বা প্রেসিডেন্সি কলেজের উজ্জ্বল ছাত্র। কবিযশ প্রার্থীও আছে কয়েকজন। তাদের দু’একজনের লেখা ইতিমধ্যেই কবিতায় ছাপা হয়েছে এবং সেই সুবাদে তারা মাঝে মাঝে তাঁর বৈঠকখানায় ঢুকে পড়ে।
এই সান্ধ্য আড্ডাই তাঁর প্রধান অবসর বিনোদন। তাই তাঁর ‘কবিতা ভবন’ বারো মাসের ‘ওপেন হাউস’। ফোন করে, দিনক্ষণ ঠিক করে আসার দরকার হয় না, প্রতি সন্ধ্যাতেই অতিথি স্বাগত। বহু রাত অবধি চলে হাসি-গান-গল্প-আলোচনা-তর্ক। মতানৈক্য তিনি শুধু সহ্যই করেন না, সেটা তাঁর কাছে উত্তেজক টনিক, মননের প্রয়োজনীয় ব্যায়াম। সম্প্রতি ‘কৃত্তিবাস’ নামে পত্রিকা ঘিরে এক তরুণ তুর্কিদলের আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের কেউ কেউ বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে ছন্দ নিয়ে তর্ক করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। তিনি তাতে খুশি, বিদ্রোহ না করলে, স্পর্ধা না দেখালে আবার কবি কী!
আজ সন্ধ্যায়, অবশ্য টেলিফোন করেই আসছেন, ‘পোয়েট্রি’ পত্রিকার সম্পাদক কার্ল শাপিরো। পোয়েট্রিতে বুদ্ধদেবের বেশ কয়েকটি কবিতা বেরিয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকেই ‘কবিতা’ ও ‘পোয়েট্রি’র নিয়মিত বিনিময়ের ফলে পোয়েট্রি তাঁর কাছে আসে। যামিনী রায়ের বাড়ি হয়ে ইউ এস আই এসের মিস এ্যাটারটনের সঙ্গে শাপিরো এলেন। দার্শনিক আবু সয়ীদ আইয়ুব, অজিত দত্ত ও সমর সেনকে আসতে বলেছেন বু. ব.। নরেশ গুহও এসেছেন। এঁদের প্রত্যেকেই কখনও না কখনও বুদ্ধদেবের সঙ্গে সম্পাদনার কাজ করেছেন। কবিজীবনের একেবারে শুরুতে অজিতকুমার দত্তর সঙ্গে ‘প্রগতি’ বার করেছেন; ‘কবিতা’ পত্রিকার শৈশবে সঙ্গে ছিলেন সমর সেন আর এখন নরেশ গুহ; বুদ্ধদেব প্রস্তাবিত এম. সি. সরকার প্রকাশিত প্রথম আধুনিক বাংলা কবিতার সংকলনের যুগ্ম সম্পাদকের একজন ছিলেন আবু সয়ীদ আইয়ুব। সুতরাং অনেকটা সময় ব্যয়িত হল নতুন কবিতা আবিষ্কারের রহস্য ও রোমাঞ্চ নিয়ে। কবিতাভবনে চায়ের সংস্কৃতি, সুন্দর পেয়ালায় সুগন্ধি দার্জিলিং চা। অন্যেরা চলে যাবার পরও নরেশ গুহ কিছুক্ষণ রইলেন। ক্রমে দোকানপাট বন্ধ হল, উলটোদিকের শালকরের দোকানের রেডিও আর বাজছে না। গণেশ পর্দার ফাঁক দিয়ে জ্বলন্ত দৃষ্টি হানছে শেষ অতিথির দিকে। বহু চেষ্টায় সে মার সঙ্গে চোখাচোখি করল।
প্রতিভা বসু বললেন, ‘খাবার দাও গণেশ, নরেশ, তুমি একেবারে খেয়ে যাও’। গণেশের মুখ সরে গেল।
প্রায়ই সন্ধ্যায় আড্ডার আগে বা রাত্রে খাওয়ার পর বু. ব. মেয়েদের নিয়ে হাঁটতে বেরোন। তাদের ‘শিক্ষিত’ করার সময় সেটা। আজ আর ইচ্ছে করল না। ২৪ নম্বর ট্রামে উঠে টুক করে বাড়ি চলে গেলেন নরেশ। নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে সিগারেটে টান দিয়ে বু. ব বললেন, ‘আয়, একটু পরচর্চা করা যাক’।
ছোটো মেয়ে স্কুল থেকে ফিরেই টেলিফোন নিয়ে তাঁর টেবিলের তলায় চলে গিয়েছিল। অন্যের কান বাঁচিয়ে তার প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে যে-সব আলোচনা করছিল তার কিছু কিছু তাঁর কান আসছিল। বাক্যবন্ধগুলি মনে মনে জমিয়ে রেখেছেন ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য।
‘আভাস কে রে রুমি’?
রুমি গাল ফুলিয়ে বলে, ‘বাবা! তুমি শোনো!’ খুব রাগ করে সে। ছেলে পাপ্পা রসকিতায় পারঙ্গম। মা বাবা দিদিদের সে ক্যারিকেচার দেখিয়ে মাতিয়ে রাখে। আজ সে একটা জনপ্রিয় গানের প্যারডি শোনাল নৃত্যসহ : তোমার বাবাকে তুমি বুঝিয়ে বলো / বেকার হলেও আমি ছেলে তো তো ভালো / প্রেম ক’রে কোনোদিন কেটে পড়িনি / শুনি আমি শুনি, সেইদিন শুনি / হবে কবে তুমি মোর সহধর্মিণী’। মালার্মে কি র্যাঁবো নয়, কিন্তু এই প্যারডি সহজ মানুষের মতোই তিনি উপভোগ করেন। তাঁর অট্টহাস্য প্রতিবেশীদের কৌতুকের কারণ হয়। সবাই শুতে চলে যাবার পর চেয়ারে বসে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমের দোষ নেই কারণ তিনি পড়ছিলেন সাঁর্ত-এর Being and Nothingness – একেবারে কংক্রিটের চাঁই।
ঘুম ভাঙতে প্রথম ইচ্ছে হল বিছানায় যাবার। কিন্তু নতুন কবিতাটা নিয়ে কিছুক্ষণ খেলা করতে লোভ হল তাঁর। তিনি উঠে টেবিলে বসলেন।
ইংরেজ কবি জন কিটস নাকি কবিতা লেখার আগে বিশেষ ভাবে সাজতেন।
প্রাত্যহিক পোশাকের বদলে পরনে থাকত কবিতার জন্য আলাদা পোশাক। বুদ্ধদেবের কবিতা লেখার আলাদা কলম, সরু নিব, কুচকুচে কালো পার্কার কালি (পার্কার তাঁর ও মাণিক বন্দোপাধ্যায়ের ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন করেছে), ও বাঁধানো খাতা। কোনোটা প্রতিভা বসুর নিজের হাতে সিল্কের টুকরো দিয়ে বাঁধানো, কোনোটা ডায়রি যাতে একটি করে বড়ো পাতা থাকে। এখন লিখছেন এম. সি. সরকারের দেওয়া ডায়রিতে। টেবিলের সব কাগজ ঠেলে সরিয়ে ডায়রিটি টেনে নিয়ে তিনটি লাইন লিখে ফেললেন।
‘শুধু তাই পবিত্র, যা ব্যক্তিগত। গভীর সন্ধ্যায় নরম, আচ্ছন্ন আলো; হলদে-ম্লান বইয়ের পাতার লুকোনো নক্ষত্র ঘিরে আকাশের মতো অন্ধকার;’
খাতায় অনেক কাটাকুটি হল তারপর। যখন কবিতা লেখেন তখন একটাই শুধু ছবি আঁকেন, একটি মানুষকে সাপে জড়িয়ে ধরেছে। কেন যে এই ছবি তার অর্থ খুব সম্ভব তিনি নিজেও জানেন না। তাঁর হাতের লেখা যেন কালো মুক্তোর মালা। তার মধ্যে থেকে পংক্তিগুলি বেরিয়ে আসে।
ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলে। সেকেন্ড পরিণত হয় মিনিটে, মিনিট ঘণ্টায়। সমস্ত সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান বুদ্ধদেব কবিতার কোরকে।
শুধু তাই পবিত্র, যা ব্যক্তিগত। গভীর সন্ধ্যায়
নরম, আচ্ছন্ন আলো; হলদে-ম্লান বইয়ের পাতার
লুকোনো নক্ষত্র ঘিরে আকাশের মতো অন্ধকার;
অথবা অত্বর চিঠি, মধ্যরাতে লাজুক তন্দ্রায়
দূরের বন্ধুকে লেখা। যীশু কি পরোপকারী ছিলেন, তোমরা ভাবো, না কি বুদ্ধ কোনো সমিতির মাননীয়, বাচাল, পরিশ্রমী, অশীতির মোহগ্রস্ত সভাপতি? উদ্ধারের স্বত্বাধিকারী ব্যতিব্যস্ত পাণ্ডাদের জগঝম্প, চামর, পাহারা এড়িয়ে আছেন তাঁরা উদাসীন, শান্ত, ছন্নছাড়া।
তাই বলি, জগতেরে ছেড়ে দাও, যাক সে যেথায় যাবে;
হও ক্ষীণ, অলঙ্ঘ্য, দুর্গম, আর পুলকে বধির।
যে-সব খবর নিয়ে সেবকেরা উৎসাহে অধীর,
আধ ঘণ্টা নারীর আলস্যে তার ঢের বেশি পাবে।
(রাত তিনটের সনেট)





