কাস্ট
আমি ছোটবেলায় দেখেছি, বাড়ির বড়রা অনেক সময় মানুষের পরিচয় জানতে চাইতেন অদ্ভুত কায়দায়। নাম কী, বাড়ি কোথায়, বাবার নাম কী, এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল।
কাস্ট শব্দটা আমি প্রথম শুনে ভেবেছিলাম, এ আবার কোন সিনেমার কাস্টিং! নায়ক কে, ভিলেন কে, কমেডিয়ান কে, আর শেষে কার মাথায় লাঠি পড়বে। পরে বুঝলাম, ভারতীয় সমাজে এই কাস্টের নাটক বহু পুরনো। এখানে কেউ মঞ্চে ওঠার আগেই তার চরিত্র লিখে দেওয়া হয়েছে। কারো হাতে পৈতা, কারো হাতে তরবারি, কারো হাতে দাঁড়িপাল্লা, কারো হাতে ঝাঁটা। আর পরিচালক? পরিচালক হিসেবে সমাজ নিজেই বসে আছে, মুখে পান, হাতে বিধির খাতা।
আমি যত বুঝেছি, কাস্ট শব্দটা শুধু জাতি বোঝায় না, শুধু বর্ণও বোঝায় না। এই দুই জিনিস এমনভাবে একে অন্যের গায়ে লেগে গেছে যে আলাদা করতে গেলে মনে হয় পুরনো আলমারির তালা খুলছি। তাই সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে জাতি-বর্ণ বলাই ভালো। জন্মের পরিচয়, দেহের পরিচয়, গোষ্ঠীর পরিচয়, পেশার পরিচয়, বিয়ের নিয়ম, খাওয়া-দাওয়ার বিধি, কে কার পাশে বসবে, কে কার ঘরে ঢুকবে, কে কার হাতে জল নেবে, সব মিলিয়ে এক বিশাল সামাজিক যন্ত্র।
যেকোনো সমাজেই স্তর থাকে। কেউ ক্ষমতাবান, কেউ ক্ষমতাহীন। কেউ রাষ্ট্র চালায়, কেউ রাষ্ট্রের নিচে চাপা পড়ে। কেউ জ্ঞানের দাপটে মাথা তোলে, কেউ টাকার জোরে। কেউ নিজের প্রতিভায় উঠতে চায়, কেউ জন্মের সার্টিফিকেট দেখিয়ে চেয়ার দখল করে বসে। কিন্তু ভারতবর্ষে এই স্তরবিন্যাসের সঙ্গে আরেকটা ব্যাপার এমনভাবে জুড়ে গেল যে তা কেবল অর্থনীতি বা রাজনীতির প্রশ্ন থাকল না। তা হয়ে গেল জন্মের প্রশ্ন, দেহের প্রশ্ন, বংশের প্রশ্ন, এমনকি রান্নাঘরের প্রশ্ন।
আমি ছোটবেলায় দেখেছি, বাড়ির বড়রা অনেক সময় মানুষের পরিচয় জানতে চাইতেন অদ্ভুত কায়দায়। নাম কী, বাড়ি কোথায়, বাবার নাম কী, এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। তারপর হঠাৎ একসময় প্রশ্নটা এসে দাঁড়াত, “ওরা কী?” এই “কী” শব্দটার মধ্যে কত ইতিহাস, কত সন্দেহ, কত দূরত্ব, কত নীরব নিষেধ লুকিয়ে থাকে! মানুষ যেন মানুষ হিসেবে যথেষ্ট নয়। তার সঙ্গে একটা লেবেল চাই। লেবেল না থাকলে সমাজের ঘুম হয় না।
ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতে বর্ণ শব্দটা প্রথমে দেহবর্ণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এক বিশেষ মানবগোষ্ঠী নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য সামাজিক মেলামেশার চারপাশে এক ধরনের বেড়া তুলেছিল। বেড়া বলতে বাঁশের বেড়া নয়, তার চেয়েও শক্ত। বিয়ে কার সঙ্গে হবে, খাওয়া কার সঙ্গে হবে, স্পর্শ কার সঙ্গে চলবে, কার সঙ্গে চলবে না, এইসব নিয়মের বেড়া। এই বেড়ার নাম পরে বড় সুন্দর করে দেওয়া হল বর্ণাশ্রম। নাম শুনলে মনে হয় আশ্রমে সবাই শান্তিতে ধ্যান করছে। ভিতরে ঢুকলে দেখা যায়, কারও জন্য সিঁড়ি, কারও জন্য দেওয়াল।
জন্মসূত্র থেকেই জাত বা জাতি শব্দটার প্রতিষ্ঠা। বৈদিক সাহিত্যে আর্যজাতি ও দাসজাতির উল্লেখ আমরা পাই। আর্য বলতে নিত্যগমনশীল যাযাবর গোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে। তারা যখন অন্য গোষ্ঠীকে পরাস্ত করে ক্ষমতায় বসল, তখন বিজয়ী ও বিজিতের পার্থক্য চিহ্নিত করার জন্য জাতি শব্দের ব্যবহার শুরু হল। পশ্চিমি ভাষায় race শব্দের যে অর্থ, তার সঙ্গে এই জাতির ব্যবহার অনেকখানি মিলে যায়। তারপর দেহবর্ণ বা ethnic identity গুরুত্ব পেল। কে কেমন দেখতে, কার গাত্রবর্ণ কেমন, নাক কেমন, শরীরের গঠন কেমন, সেইসব দিয়ে সামাজিক দূরত্বকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক যুক্তি দেওয়া শুরু হল।
পর্তুগিজরা ভারতে এসে এই সমাজরূপকে caste নামে চিহ্নিত করল। শব্দটির পেছনে আছে casta, যার মূলে লাতিন castus, অর্থাৎ শুদ্ধ, pure। কী আশ্চর্য! আমাদের সমাজের যে জায়গায় মানুষকে ভাগ করা হল, সেখানে শুদ্ধতার ভাষা এসে বসে গেল। শুদ্ধ কে? অশুদ্ধ কে? এই বিচার করতে করতে মানুষের মনটাই কত অশুদ্ধ হয়ে গেল, সে হিসাব রাখার লোক কম।
কাস্টের সংজ্ঞায় দেখা যায়, এটি এমন এক বংশানুক্রমিক গোষ্ঠী, যারা নির্দিষ্ট পেশা বা জীবিকার সঙ্গে যুক্ত, নিজেদের মধ্যে বিয়ে করে, নির্দিষ্ট প্রথা ও আচারে অভ্যস্ত, এবং অনেক সময় প্রশ্ন না করেই সেই নিয়ম মানে। প্রশ্ন না করা এখানে বড় ব্যাপার। সমাজের বহু অন্যায় প্রশ্নকে ভয় পায়। কারণ প্রশ্ন একবার উঠলে ঘরের আড়ালে রাখা হাঁড়ির গন্ধ বেরোতে শুরু করে।
ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, এই চার শ্রেণির কথা আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি। বইয়ে এমনভাবে লেখা থাকে যেন পৃথিবী তৈরি হয়েছে, তারপর সঙ্গে সঙ্গে চারটা ফাইল খোলা হয়েছে। ব্রাহ্মণ জ্ঞান ও আচার দেখবেন, ক্ষত্রিয় যুদ্ধ ও শাসন করবেন, বৈশ্য বাণিজ্য ও উৎপাদন সামলাবেন, শূদ্র সেবা করবেন। এক অর্থে মানুষের চার ধরনের প্রবণতার একটা বর্গীকরণ এখানে আছে। কেউ ভাবুক, কেউ কর্মী, কেউ হিসাবি, কেউ শ্রমনির্ভর। মানবসমাজে এইসব প্রবণতা সত্যিই থাকে। কিন্তু বিপদ শুরু হল যখন প্রবণতাকে জন্মের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হল। কার সন্তান কার কাজ করবে, তা মানুষ নয়, বংশ ঠিক করবে। এখানেই ভারতীয় সমাজের বড় ক্ষত।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, যদি কোনো ব্রাহ্মণের ছেলে জন্মেই কব্জিতে ক্যালকুলেটর নিয়ে জন্মায়, সে বৈশ্য হবে না কেন? কোনো শূদ্রের ছেলে যদি জন্মের পর থেকেই আকাশ দেখে প্রশ্ন করে, “এই আলো কোথা থেকে?” সে ব্রাহ্মণ হবে না কেন? কিন্তু সমাজ বলল, না বাবা, তুমি জন্মেছ যেদিকে, হাঁটবে সেদিকেই। যেন জীবন একটা রেললাইন, একবার ট্র্যাক বসে গেলে আর মোড় নেই।
বর্ণের সঙ্গে সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ এই গুণত্রয়ের সম্পর্কও টানা হয়েছে। ব্রাহ্মণের বর্ণ সিত বা শ্বেত, ক্ষত্রিয়ের লোহিত, বৈশ্যের পীত বা পিঙ্গল, শূদ্রের কৃষ্ণ। শ্বেত রং পবিত্রতার সঙ্গে যুক্ত হল। ব্রাহ্মণের বস্ত্র শ্বেত, আহার্যেও শ্বেতবর্ণের গুরুত্ব। আজও আমরা সাদা কাপড়, সাদা ফুল, সাদা ভাতের মধ্যে পবিত্রতার ইঙ্গিত খুঁজি। ক্ষত্রিয় যুদ্ধজীবী, তার সঙ্গে রক্তের লাল। বৈশ্য মধ্যবর্তী, বাণিজ্য ও বিনিময়ের পীতাভ বাস্তবতা। আর ভারতবর্ষের অধিবাসী তাম্রবর্ণ, স্ফীতনাস মানবগোষ্ঠী বিজিত পরিচয়ে তমসিক বা কৃষ্ণবর্ণের ঘরে ঠেলে দেওয়া হল। এ এক নিষ্ঠুর সামাজিক রঙতুলি। ছবি আঁকল মানুষ দিয়ে, রং মাখাল ক্ষমতা দিয়ে।
এই দেহবর্ণের পরিচয় রক্ষার জন্য কঠোরভাবে অসবর্ণ বিয়ে নিষেধ স্থাপিত হল। মিশ্রণ আটকাতে হবে। রক্ত আলাদা রাখতে হবে। বংশকে “শুদ্ধ” রাখতে হবে। এই শুদ্ধতার চিন্তা বাড়ির রান্নাঘর থেকে কুলজির খাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল। কার সঙ্গে বিয়ে করা যায়, কার সঙ্গে যায় না, কার ঘরে খাওয়া যায়, কার হাতে জল নেওয়া যায়, এসব নিয়ে সমাজ এমন ব্যস্ত হয়ে পড়ল যে মানুষের দুঃখ, ক্ষুধা, প্রেম, প্রতিভা, এইসব বড় জিনিস অনেক সময় আড়ালে পড়ে গেল।
তবু মানুষকে আটকানো যায়নি। সমাজের ওপর যত বিধিনিষেধ চাপানো হয়েছে, জীবন তত ফাঁক খুঁজেছে। নদীকে বলুন, এই পথে যেও না। সে একটু দূরে গিয়ে বাঁক নেবে। মানুষও তাই করেছে। বর্ণসংকর নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কিন্তু ভারতবর্ষের মহাকাব্য নিজেই সেই নিষেধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল। মহাভারতকে আমি বহুবার এই চোখে দেখি। সেখানে জন্মের সরল গর্ব বারবার ভেঙে পড়ে। চরিত্ররা মিশে যায়, বংশরেখা ঘোলা হয়, নীতির ঘর কাঁপে, আর শেষ পর্যন্ত মানুষ তার জটিল রূপে সামনে দাঁড়ায়।
বিশ্বামিত্রের কথা ভাবুন। সাধনা করে ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করলেন। এই কাহিনি সমাজের জমাট ধারণায় হাতুড়ির আঘাত। যদি ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করা যায়, তবে তা জন্মের একচেটিয়া সম্পত্তি হয় কী করে? যদি তপস্যা, জ্ঞান, চরিত্র, অনুশীলন মানুষকে বদলে দিতে পারে, তবে বংশের দরজায় তালা লাগিয়ে লাভ কী? তালা যত বড়, চাবির গল্প তত মজার।
লোককথায় মূর্খ ব্রাহ্মণের গল্পের শেষ নেই। বাংলার গ্রামে গ্রামে, ভারতের নানা প্রদেশে, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের বদলে ব্রাহ্মণ ভোঁতা, ব্রাহ্মণ লোভী, ব্রাহ্মণ বিভ্রান্ত, ব্রাহ্মণ বিপদে পড়া, এইসব চরিত্র ঘুরে বেড়ায়। লোকসমাজ কখনও সরাসরি বিপ্লব করে, কখনও গল্প বানায়। গল্পের মধ্যে সে বলে, পৈতা থাকলেই মগজ জ্বলে না। মন্ত্র জানলেই বিচারশক্তি জন্মায় না। আর গলায় জপমালা থাকলেই লোভের দাঁত পড়ে যায় না।
স্মার্ত রঘুনন্দনের কথাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিজিত ভারতবর্ষের পটভূমিতে তিনি বাংলায় ক্ষত্রিয় পরিচয়ের স্বীকৃতি অস্বীকার বা সীমিত করেছিলেন। এই অস্বীকারও জাতপাতের পাথরচাপা বরাতের বিরুদ্ধে এক ধরনের সামাজিক দলিল। সমাজ যখন বাস্তবে বদলে যায়, শাস্ত্র তখন পুরনো মানচিত্র নিয়ে বসে থাকে। কিন্তু মানচিত্রে নদী শুকিয়ে গেলেও মাঠে নদী চলতেই পারে।
আমি কাস্ট নিয়ে ভাবলে দেখি, এর ভিতরে তিনটি স্তর একসঙ্গে কাজ করে। প্রথম স্তর ক্ষমতার। কে শাসন করবে, কে মানবে। দ্বিতীয় স্তর শরীরের। কার দেহকে কেমন দেখা হবে। তৃতীয় স্তর স্মৃতির। কোন পরিবার নিজেকে কী ভাবে মনে রাখবে। এই তিন স্তর মিলে কাস্ট এমন এক যন্ত্র বানিয়েছে, যার চাকা শুধু মন্দিরে ঘোরেনি, ঘুরেছে বিয়ের আসরে, পুকুরঘাটে, রান্নাঘরে, শ্মশানে, জমির খতিয়ানে, স্কুলের বেঞ্চে, এমনকি ভাষার ভেতরেও।
আমাদের সমাজে মেধা ও অর্থের সম্পর্কও এই ব্যবস্থার সঙ্গে জটিলভাবে জড়িয়ে গেছে। সভ্যতার অগ্রগতিতে মেধা ও সম্পদের ওপর ভিত্তি করে সামাজিক গতিশীলতা তৈরি হয়েছে। কেউ শিক্ষায় উঠেছে, কেউ বাণিজ্যে, কেউ প্রশাসনে, কেউ শিল্পে। কিন্তু জাতিবর্ণ জন্মলব্ধ পরিচয়ের জমিতে দাঁড়িয়ে থাকায় মানুষ যতই উঠুক, সমাজ অনেক সময় তাকে পুরনো নাম ধরে ডাকতে চেয়েছে। যেন মানুষকে তার বর্তমান দিয়ে নয়, পূর্বপুরুষের পেশা দিয়ে চেনা হবে। এ এক আশ্চর্য অলসতা। সমাজের স্মৃতি শক্তিশালী, কিন্তু অনেক সময় তার কল্পনা দুর্বল।
আজও দেখবেন, কাস্ট শুধু গ্রামবাংলার বা প্রাচীন ভারতের বিষয় নয়। শহরের ফ্ল্যাটে, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে, চাকরির বাজারে, বিয়ের ওয়েবসাইটে, রাজনীতির মঞ্চে, সামাজিক সম্মানের অদৃশ্য আসনে তার ছায়া থাকে। কেউ প্রকাশ্যে বলে, কেউ আড়ালে ভাবে। কেউ ঘৃণা লুকিয়ে রাখে সৌজন্যের কাগজে। কেউ আবার ইতিহাসের অন্যায়কে সংস্কৃতি বলে সাজিয়ে রাখে। সংস্কৃতি খুব ভালো জিনিস, কিন্তু অন্যায়কে সংস্কৃতি বানালে তা আর সুর থাকে না, শেকল হয়ে যায়।
আমার কাছে জাতিবর্ণের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো এটি মানুষকে জন্মের কারাগারে আটকে রাখে। অথচ মানুষ জন্মের চেয়ে বড়। মানুষ তার ভাষায় বড় হয়, শ্রমে বড় হয়, প্রেমে বড় হয়, পড়াশোনায় বড় হয়, ভুল করে বড় হয়, সংশোধনে বড় হয়। যে সমাজ মানুষকে বদলানোর অধিকার দেয় না, সেই সমাজ নিজের ভবিষ্যৎও ছোট করে ফেলে।
তবু ভারতবর্ষের সাহিত্য, পুরাণ, লোককথা, প্রতিবাদ, প্রেম, বিয়ে, পালিয়ে যাওয়া, ধর্মান্তর, সাধনা, শিক্ষা, শ্রম, এসব মিলে বারবার বলেছে, বংশানুক্রমিক অনড়তা মানুষের প্রকৃতি মানে না। Gene থাকতে পারে, কিন্তু variation-ও আছে। শাস্ত্রকাররা বংশের ধারাবাহিকতা বুঝেছিলেন, পরিবর্তনের স্বাধীনতাকে যথেষ্ট জায়গা দেননি। জীবন সেই জায়গা নিজে বানিয়েছে।
আমি তাই কাস্টকে শুধু সমাজব্যবস্থার অধ্যায় হিসেবে দেখি না। এটি ভারতীয় মানুষের আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ অসুখ, আবার সেই অসুখের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাসও। একদিকে শুদ্ধতার নামে বিভাজন, অন্যদিকে মিশ্রণের ভেতর দিয়ে নতুন সমাজের জন্ম। একদিকে পৈতার গর্ব, অন্যদিকে মূর্খ ব্রাহ্মণের গল্প। একদিকে জন্মের অহংকার, অন্যদিকে বিশ্বামিত্রের সাধনা। একদিকে বর্ণসংকরের ভয়, অন্যদিকে ব্যাসদেবের মহাকাব্য।
শেষে এসে আমার মনে হয়, ভারতবর্ষ আসলে বহুদিন ধরে নিজের সঙ্গে তর্ক করছে। এক মুখে বলছে, “তোমার জন্মই তোমার পরিচয়।” আরেক মুখে বলছে, “দেখি তো, তুমি নিজে কী হতে পারো।” এই দ্বিতীয় কথাটাই আমাকে বেশি আশাবাদী করে। কারণ মানুষের ইতিহাসে জন্ম একদিনের ঘটনা, কিন্তু হওয়া আজীবনের কাজ। আর যে সমাজ হওয়ার অধিকার কেড়ে নেয়, সে সমাজ যতই শুদ্ধতার কথা বলুক, তার হাতের সাবান শেষ পর্যন্ত নিজের ময়লা ধুতে পারে না।


