বুর্জোয়া সভ্যতার আসল জাদু
আমার ছোটফুফা ছিলেন বুয়েট-পাশ, এক বড় কোম্পানির চিফ ইঞ্জিনিয়ার। অর্থাৎ, আহা, কী কৃতী মানুষ, কী প্রতিষ্ঠা, কী সাফল্য। যেন বুয়েট থেকে পাশ করা মাত্র মানুষটি আর কেবল মানুষ থাকেন না, তিনি আধা-দেবতা, আধা-ড্রয়িংরুম। তাঁর বাড়িতে কাজের লোকেরও অভাব ছিল না। মালি আছে, বাবুর্চি আছে, ঘর পরিষ্কারের লোক আছে, জুতো এগিয়ে দেওয়ার লোক আছে, হয়তো নিঃশ্বাস নিতেও কেউ পাশে দাঁড়িয়ে বলত, স্যার, এবার নিতে পারেন। কিন্তু ছোটবেলায় আমরা অত কিছু বুঝতাম না। তখন তো ডিগ্রির ভিতর দিয়ে মানুষকে দেখি না। আমরা দেখি দৃশ্য। আর একটা দৃশ্য কখনো কখনো পুরো সমাজবিজ্ঞানের চেয়েও বড় বেশি নির্মম শিক্ষক ।
আমি তখন সাত কি আট। সেই বয়সে মানুষ নীতি-দর্শন জানে না, মার্ক্স পড়ে না, আম্বেদকর পড়ে না, ফুকো তো দূরের কথা, ‘ডিগনিটি’ শব্দটাও জানে না। কিন্তু অপমান দেখতে শব্দ লাগে না। অপমানের নিজস্ব আলো আছে। সে ঘরে ঢুকলে বাতাসও একটু বদলে যায়। আমি প্রথম সেই আলো দেখেছিলাম ছোটফুফার বাড়িতে।
ওই বাড়িতে কাজের লোকেরা কার্পেটের উপর হেঁটে উঠতে পারত না। তাদের জন্য নিয়ম ছিল, হাঁটুমুড়ে, পায়ের তলা উঁচু করে, একরকম শরীরকে প্রায় অপরাধীর মতো ভাঁজ করে কার্পেট পার হতে হবে। ভাবুন একবার। কার্পেটটা কী? কাপড়, সুতো, দাম, রুচি, শৌখিনতা। আর মানুষটা কী? শ্বাস নেয়, ক্লান্ত হয়, ক্ষুধা পায়, লজ্জা পায়, তারও মা আছে, হয়তো সন্তান আছে, হয়তো তারও জ্বর আসে। কিন্তু সেই ঘরের নীতিশাস্ত্র বলছে, না, কার্পেটের মর্যাদা তোমার চেয়ে বড়। তোমার পায়ের চেয়ে এই বোনা জিনিসটির সম্মান বেশি। তুমি মানুষ নও, তুমি সম্ভাব্য দাগ।
সভ্য সমাজে অপমান খুব কমই চাবুক মারে। সে অনেক সময় কার্পেট হয়ে আসে। কাঁটাচামচ হয়ে আসে। বসার দূরত্ব হয়ে আসে। সম্বোধনের ভঙ্গি নিয়ে আসে। কে সোফায় বসবে আর কে মেঝেতে, কে নাম ধরে ডাকবে আর কে ‘ওই’ বলে ডাকবে, কে গ্লাসে জল পাবে আর কে স্টিলের বাটিতে, এইসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যবস্থাপনার মধ্যেই আসলে সমাজ তার আসল সংবিধান লিখে রাখে। সংবিধান বইতে এক রকম, ড্রয়িংরুমে আরেক রকম।
আরও একটা দৃশ্য মনে আছে। আমার ফুফু ছিলেন ডাক্তার। আমার ফুফুকে এক মেয়ে জুতো পরতে সাহায্য করছে। জুতো পরা, আপনি বলবেন, এমন কী ব্যাপার? ব্যাপার আছে। কারণ এখানে সাহায্য শব্দটা খুব ভদ্র। আসল কথাটা হল, একজন আধশোয়া হয়ে আছেন এমন স্বাভাবিক অধিকারে, যেন অন্য একজন মানুষের কাজই হল তাঁর পায়ের কাছে নতজানু হওয়া। পা তো শরীরেরই অঙ্গ, কিন্তু ক্ষমতার পিরামিডে পা কখনো কখনো সিংহাসন হয়ে যায়। আর যিনি জুতো পরিয়ে দিচ্ছেন, তিনি শিখে নিচ্ছেন, এই সংসারে কার শরীরের কোন অংশটুকুরও আলাদা প্রভুত্ব আছে।
দেখুন পুঁজিবাদ কী চমৎকার জিনিস। একজন পা বাড়িয়ে শুয়ে আছেন, আরেকজন হাঁটু মুড়ে বসে সেই পুঁজিবাদের চূড়ান্ত দর্শনটি বেঁধে দিচ্ছে, স্ট্র্যাপ-ওয়ালা হাই হিল। অর্থাৎ, ইতিহাসের সারকথা: কারও অবসর যাতে নান্দনিক দেখায়, তার জন্য অন্য কারও মেরুদণ্ডকে সাময়িকভাবে ভাঁজ হতে হয়।
বুর্জোয়া সভ্যতার আসল জাদু এখানেই। সে শোষণকে চাবুকের মতো নয়, ভদ্রতার মতো সাজায়। বলে, এ তো স্নেহ। এ তো যত্ন। এ তো ঘরোয়া ভালোবাসা। যেন পায়ের কাছে বসে থাকার নামই আদর, আর সমান চোখে তাকানোর নাম বেয়াদবি। যেন শ্রেণিবিভেদকে একটু সিলভার গ্লিটার মেখে দিলেই তা আর বিভেদ থাকে না, হয়ে যায় সংস্কৃতি।
সেদিন আমি ছোট ছিলাম, কিন্তু একটা জিনিস বুঝেছিলাম। শোষণ সবসময় লাঠি হাতে আসে না। শোষণ অনেক সময় অত্যন্ত শিক্ষিত, অত্যন্ত সুসজ্জিত, অত্যন্ত সুগন্ধী। শোষণ ইংরেজি জানে, ভালো কলেজে পড়েছে, ফর্ক-নাইফ ব্যবহার করে, রবিবারে হয়তো পশ্চিমি ধ্রুপদী সঙ্গীত শোনে। শোষণ মাঝে মাঝে খুব cultured। এমনকি সে হয়তো দাতব্য কাজও করে। কিন্তু তাই বলে শোষণের চাকচিক্য কমে না। বরং বিপদ সেখানেই। যে নিষ্ঠুরতা প্রকাশ্যে দাঁত বের করে আসে, তাকে চেনা সহজ। যে নিষ্ঠুরতা পর্দা, কার্পেট, শালীনতা, মেপে কথা বলা, এবং ‘এটাই তো নিয়ম’ এই বাক্যের আড়ালে আসে, সে অনেক বেশি কার্যকর।
আমরা সাধারণত ভাবি, অবমাননা মানে গালাগাল, মারধর, খিস্তি, চড়-থাপ্পড়। না। অবমাননার আরেকটি উন্নত সংস্করণ আছে। সেখানে কাউকে কখনো সরাসরি বলা হয় না যে তুমি ছোট। শুধু ঘরের ভিতরের সব ব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো থাকে যে সে নিজেই বুঝে যায়, সে ছোট। তাকে আলাদা করে অপমান করতে হয় না। তাকে শুধু বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, এই ঘরে তোমার হাঁটারও নিজস্ব অধিকার নেই। তুমি ঢুকবে, কিন্তু নত হয়ে। তুমি থাকবে, কিন্তু তোমার ভঙ্গি হবে ক্ষমা চাওয়ার মতো। তুমি কাজ করবে, কিন্তু অস্তিত্ব নিয়ে নয়।
এখন বড় হয়ে ভাবি, ওই কার্পেট-নিয়মটা আসলে ছিল এক সমাজের ক্ষুদ্র মডেল। আমাদের চারপাশে কত কার্পেট আছে। কোথাও জাতের কার্পেট, কোথাও টাকার কার্পেট, কোথাও ইংরেজি উচ্চারণের কার্পেট, কোথাও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির কার্পেট, কোথাও ঢাকার বনাম গ্রামের কার্পেট, কোথাও ফর্সা বনাম কালোর কার্পেট। নিয়ম একটাই, কার্পেট যেন নোংরা না হয়। মানুষ? মানুষ একটু বেঁকে গেলে ক্ষতি কী।
তখন আমার শৈশব প্রথম একটা ভয়ানক জিনিস শিখেছিল। মানুষে মানুষে ভেদরেখা শুধু বাইরে টানা হয় না, ঘরের ভেতরেও টানা হয়। এবং যে শিশু একদিন দেখে, কারও পায়ের ধুলোও কার্পেটের পক্ষে অসহনীয়, সে খুব তাড়াতাড়ি শিখে ফেলে এই সমাজে সব পা সমান নয়। কেউ হাঁটে, কেউ হামাগুড়ি দেয়। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ আদেশ করে, কেউ আদেশকে নিয়ম বলে মেনে নেয়। তারপর বড়রা বলেন, এটাই তো ভদ্রতা, এটাই তো শৃঙ্খলা, এটাই তো অভ্যাস। যেন অত্যাচার একটু পুরোনো হলেই তার নাম বদলে যায়।
আমার মনে হয়, মানুষের অবমাননা আমি প্রথম সেদিনই দেখিনি, প্রথম চিনেছিলাম। তার আগে হয়তো অনেক অন্যায় চোখের সামনে গেছে, কিন্তু সেদিন বুঝেছিলাম, অপমানেরও আর্কিটেকচার আছে। তারও ইন্টেরিয়র ডিজাইন আছে। তারও হাউস-রুল আছে। এমনকি তারও কার্পেট আছে, যার সম্মান রক্ষার জন্য মানুষের মেরুদণ্ড ভাঁজ করে দেওয়া যায়।
এবং মজার কথা, এইসব বাড়ির মানুষজন নিজেদের খুব অসভ্য ভাবেন না। বরং তাঁরা ভাবেন, তাঁরা refined। শোষণের ইতিহাসে refinement এক বিচিত্র বস্তু। যে লোক জনসমক্ষে কাউকে থাপ্পড় মারে, তাকে সমাজ অসভ্য বলে। যে লোক কাউকে হাঁটুমুড়ে কার্পেট পার করায়, তাকে সমাজ বলে রুচিবান, অভিজাত। যেন অত্যাচারেরও dress code আছে। টাই পরে অত্যাচার করলে তার সামাজিক মর্যাদা বেড়ে যায়।
সেদিনের সেই শিশুটি হয়তো ভাষা খুঁজে পায়নি, কিন্তু তার ভেতরে একটা বাক্য জন্মেছিল। খুব সরল বাক্য। কার্পেট বড় না মানুষ বড়? আজও দেখি, আমাদের সমাজের বড় অংশ নির্দ্বিধায় উত্তর দেয়, কার্পেট। কখনো সে কার্পেট সত্যিকারের কার্পেট, কখনো পদমর্যাদা, কখনো পদবি, কখনো সম্পত্তি, কখনো সংস্কৃতি, কখনো ভদ্রতার কেতা। আর মানুষ? সে তো বদলানো যায়, সরানো যায়, নোয়ানো যায়, জুতো পরাতে ডাকা যায়।
সেদিন দেখেছিলাম আমাদের শ্রেণিসমাজের ড্রয়িংরুম। সেখানে মানুষ ঢোকে, কিন্তু সমান হয়ে নয়। সেখানে সম্মানও আছে, কিন্তু নির্বাচিতদের জন্য। সেখানে সৌন্দর্যও আছে, কিন্তু তা মানুষের নয়, আসবাবের। আর সেখানে শিশুমন প্রথম টের পায়, শোষণ সবসময় কারখানার চিমনি থেকে নয়, কখনো সে নরম কার্পেটের উপর নিঃশব্দে বিছিয়ে থাকে।
বিপ্লব কখনো ফ্যাক্টরির গেটে শুরু হয় না। শুরু হয় ড্রইংরুমে, যেখানে একজন মানুষ প্রথম বুঝতে শেখে, সে মানুষ, ফুটস্টুল নয়।



