শেক্সপিয়র, ভাষা ও অনুবাদের অদৃশ্য কারিগররা
ভাষা নিয়ে যারা একটু বেশিই ভাবে, শব্দের গায়ে হাত বুলিয়ে দেখে কোথায় তার গিঁট, কোথায় তার শিরা-উপশিরা, আর শেক্সপিয়র নামটা শুনলেই যাদের ভেতরে একটু আলাদা কাঁপন ওঠে, তাদের জন্য এই বইটা একরকম আলমারির ভেতর লুকিয়ে রাখা পুরোনো চিঠির মতো; খুললেই ধুলো উড়বে, কিন্তু সেই ধুলোতেই ইতিহাসের গন্ধ, শ্রমের ঘাম, আর ভাষার ভেতরে ঢুকে পড়ার এক ধরনের জেদ লেগে থাকে।
স্যামুয়েল জনসন, আড়াইশো বছর আগে বসে, একটু বিরক্ত গলায় বলে গিয়েছিলেন; শেক্সপিয়রের ভাষা ঠিকঠাক না, ব্যাকরণ মানে না, গুলিয়ে ফেলে, অন্ধকার করে রাখে; এই অভিযোগ নতুন না, আজকের থিয়েটারের দর্শক, কলেজের ছাত্র, এমনকি যারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলছে, তাদেরও অনেকেরই মনে হয়েছে; এই লোকটা আসলে কী বলছে? কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, আমরা এই অভিযোগটা ধরে রাখি না, বরং উল্টোটা উদ্যাপন করি; তার ভাষার খেলা, নতুন শব্দ বানানোর নেশা, পুরোনো শব্দকে নতুন করে বাঁকিয়ে দেওয়ার সাহস, দ্ব্যর্থতা, ইচ্ছে করে অস্পষ্ট করে রাখা, যেন পাঠক বা দর্শক একটু কষ্ট করেই ভেতরে ঢোকে।
এইখানেই অনুবাদকের বিপদ, আবার আনন্দও; ড্যানিয়েল হান যাকে বলেন এক ধরনের অ্যালকেমি, সোনা থেকে সোনা বানানো, কিন্তু সেই সোনা একটু অন্যরকম আলো ফেলে। “If This Be Magic” বইতে হান বড় কোনো সার্ভে করেননি, তিনি বসে থাকেন কাজের ভেতরে, ছোট ছোট সমস্যার দিকে তাকান; একটা লাইন কীভাবে বদলায়, একটা শব্দ কোথায় গিয়ে আটকে যায়, একটা রসিকতা অন্য ভাষায় পৌঁছাতে গিয়ে কোথায় ভেঙে পড়ে। এইসব জায়গায় দাঁড়িয়েই তিনি দেখান, বাংলা, চীনা, জার্মান, কুর্দি; যে ভাষাতেই শেক্সপিয়র ঢুকুক, সে মরে না, বরং অন্যরকমভাবে বেঁচে ওঠে।
হান নিজেও অনুবাদক; স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ফরাসি থেকে; মানে তিনি জানেন বইয়ের ভেতরে ঢুকে থাকার মানে কী, মাসের পর মাস একটা বাক্যের ভেতরে ঘুরে বেড়ানো, চরিত্রের গলায় গিয়ে বসা, আর তারপর অন্য ভাষায় তাকে নতুন শরীর দেওয়া। তাই তিনি অন্য অনুবাদকদের সঙ্গে কথা বলেন, যেমন জ্যঁ-মিশেল দেপ্রারকে জিজ্ঞেস করেন; ওথেলোর ভাষার মহিমা আর ইয়াগোর নিচু, চোরা ইঙ্গিত; এই দুটোকে আলাদা করে দেখাবেন কীভাবে? অথবা শোইচিরো কাওয়াই যখন বলে, জাপানিতে ‘বার্তাবাহক’ আর ‘মৃতদেহ’ শব্দের উচ্চারণ একরকম শোনায়; সেখানে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনাটাকেই কীভাবে সামলাবে অনুবাদ?
আসলে ভালো অনুবাদ বলতে কী বোঝায়? সমালোচকেরা প্রায়ই বলে; অনুবাদ বিশ্বাসঘাতক, মূলের প্রতি বিশ্বস্ত না। কিন্তু বিশ্বস্ততা মানে কী? শুধু অর্থ ধরে রাখা? না কি টোন, ছন্দ, শব্দের ভেতরের সুর, পড়তে গেলে কেমন লাগে, মঞ্চে বলতে গেলে কেমন শোনায়; এসবও সমান জরুরি? নাটকের ক্ষেত্রে তো আরো জটিল; শুধু পড়া না, বলাও লাগবে, শরীরে নিতে হবে।
এডিথ গ্রসম্যান একবার বলেছিলেন; অনুবাদ ট্রেসিং পেপার দিয়ে হয় না, মানে সরাসরি কপি না, বরং ব্যাখ্যা, ব্যাখ্যার ভেতরে নিজের অবস্থান, নিজের সিদ্ধান্ত। হান এটাকেই বাড়িয়ে বলেন; এটা এক ধরনের বিশ্লেষণী কঠোরতা চায়, আবার একটা অনুভূতিও লাগে; একটা প্রভাব কীভাবে তৈরি হয়েছে, সেটা না বুঝলে তাকে অন্য ভাষায় তৈরি করা যায় না। তবু সবসময় ভদ্রতা কাজ করে না, কখনো একটু ধূর্ততা, একটু ইচ্ছাকৃত অবিশ্বাসও ভালো ফল দেয়।
অনুবাদ আসলে সিদ্ধান্তের পর সিদ্ধান্ত; কিছু বাধ্যতামূলক, কিছু নীতিগত, কিছু একেবারে নির্দিষ্ট পরিস্থিতির। আমরা বলি অনুবাদ সেতু, কিন্তু সেটা দূরত্বও দেখায়; একটা সংস্কৃতি কীভাবে সময় বোঝে, আবেগ বোঝে, কীসে মূল্য দেয়। যেমন; শেক্সপিয়রের আইঅ্যাম্বিক পেন্টামিটার রেখে দেওয়া হবে কি না, এটা নীতির প্রশ্ন। আবার “Twelfth Night”-এ যে ‘bed of Ware’-এর কথা আছে; সতেরো শতকের বিশাল খাট; এটা স্টকহোম বা বাংলাদেশের ঢাকায় বসে থাকা পাঠক চিনবে না, তখন কী করবে অনুবাদক?
আরেকটা ভুল ধারণা আছে; শেক্সপিয়র মানেই বড় বড় শব্দ, “multitudinous seas incarnadine” টাইপ। কিন্তু আসল সমস্যাটা অনেক সময় উল্টো; তার সংক্ষিপ্ততা। “Thus with a kiss I die”; এই লাইনটা যত ছোট, তার ভেতরে তত চাপা শক্তি। অথবা লিয়ারের “She’s dead as earth”; এই ধরনের এক অক্ষরের শব্দে ভরা বাক্য অন্য ভাষায় নিয়ে গেলে ফুলে ওঠে, ভারী হয়ে যায়, সেই তীক্ষ্ণতা হারায়।
হান একটা ছোট পরীক্ষা করেন; বাচ্চাদের বই “My First Hundred Words” বিভিন্ন ভাষায় দেখেন। ইংরেজিতে ১০০টির মধ্যে ৭৫টাই এক অক্ষরের শব্দ। ইতালিয়ান বা গ্রিকে প্রায় সবগুলোই দুই অক্ষর বা তার বেশি। মানে, ইংরেজির যে গতি, যে সংকোচন, সেটা অন্য ভাষায় স্বাভাবিকভাবেই কঠিন।
তারপর আসে চরিত্রের সমস্যা; কিং লিয়ারের ‘ফুল’, যে একধরনের বাঁকা ভাষায় কথা বলে, অর্থহীন মনে হলেও নিজের লজিক আছে; বা মারকিউশিও, যার কথা বলা যেন একধরনের অ্যাক্রোবেটিকস, আগুন ছোড়া; এগুলো অন্য ভাষায় আনতে গেলে শুধু শব্দ না, চরিত্রের ছন্দটাও ধরতে হয়।
আবার কিছু দৃশ্য আলাদা ঝামেলা তৈরি করে; “Henry V”-তে প্রিন্সেস ক্যাথরিনের ইংরেজি শেখার দৃশ্য, যেখানে ফরাসি আর ইংরেজি মিশে আছে; বা ওয়েলশ, স্কটিশ, আইরিশ চরিত্রদের আলাদা উচ্চারণ; এগুলো অনুবাদে কীভাবে বাঁচবে?
বিখ্যাত লাইনও রেহাই পায় না; “rough winds do shake the darling buds of May”; এটা পৃথিবীর অনেক জায়গায় পরিচিত, কিন্তু নিউজিল্যান্ডে মে মাসে কুঁড়ি ফোটে না, সেখানে সরাসরি অনুবাদ করলে দর্শক অবাক হবে। তখন কি স্থানীয় ঋতু ঢুকবে, না মূলটাকে রেখে দেওয়া হবে?
হান এইসব প্রশ্নের ভেতর দিয়ে হাঁটেন, একটু হাসেন, আবার সহানুভূতিও দেখান; কারণ তিনি জানেন, এই কাজটা একা বসে করা হয়, লাইন ধরে ধরে, শব্দ ধরে ধরে। তার বইটা শুধুমাত্র অনুবাদকদের গল্প না, শেক্সপিয়রকে নতুন করে পড়া; একজন লেখক, যে ইংরেজি ভাষাকে এমন জায়গায় ঠেলে দিয়েছে, যেখানে ইংরেজি নিজেই আগে কখনো যায়নি।
আর বইটা পড়তে পড়তে হঠাৎ দেখা যায়; এক পাতার ভেতরেই হাঙ্গেরিয়ান, রাশিয়ান, ইয়িদ্দিশ, এমনকি ক্লিঙ্গনও এসে পড়ে; এস্পেরান্তো থেকে তুর্কি, হিন্দি; এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় লাফাতে লাফাতে মনে হয়, শেক্সপিয়র আসলে একটা নির্দিষ্ট ভাষার মধ্যে আটকে নেই, বরং ভাষাগুলোর মাঝখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অনুবাদকদের হাত ধরে।
শেষে একটা কথা না বলে পারছি না; অনুবাদ মানে শুধু পৌঁছে দেওয়া না, বরং বারবার নতুন করে তৈরি করা, আর সেই তৈরির ভেতরেই বোঝা যায়, ভাষা আসলে কতটা ভাঙে, কতটা জোড়া লাগে, আর কতটা আমাদের হাতের বাইরে গিয়ে নিজে নিজে বাঁচে।
লেখাটি বাংলা ট্রিবিউনে পূর্বপ্রকাশিত।





