থিও বেকারের How to Rule the World পড়ে শেষ করলাম। নন-ফিকশন হলেও যেকোন থ্রিলারের চেয়ে কম নয়। বেকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প করেছেন। সিলিকন ভ্যালির গল্প একসময় ছিল গ্যারেজের গল্প। অল্পবয়সী কিছু ছেলে-মেয়ে, সারারাত জেগে কোড লিখছে, সস্তা পিৎজার বাক্স জমে আছে টেবিলে, পৃথিবী বদলে দেওয়ার স্বপ্নে চোখ লাল হয়ে আছে। সেই গল্প আমেরিকান কল্পনার ভেতরে প্রায় পৌরাণিক জায়গা পেয়ে গিয়েছিল। যেমন আগে “ওয়াল স্ট্রিট” ছিল লোভ, কর্পোরেট ষড়যন্ত্র আর অর্থনৈতিক দানবের সংক্ষিপ্ত নাম, তেমনি গত এক দশকে “বিগ টেক” ধীরে ধীরে আরেক ধরনের ভয়ের নাম হয়ে উঠেছে। কারণ শুধু প্রযুক্তির বিস্তার নয়, ক্ষমতারও বিস্তার ঘটেছে। আর ক্ষমতা যখন এক জায়গায় জমতে থাকে, তখন তার চারপাশে সবসময়ই কিছু অন্ধকার অঞ্চল তৈরি হয়।
একসময় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সঙ্গে প্রযুক্তি জগতের এক ধরনের স্থিতিশীল সম্পর্ক ছিল। কিন্তু মহামারির পর দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করল। সিলিকন ভ্যালির প্রভাবশালী অংশের ভেতরে নতুন রাজনৈতিক প্রবাহ দেখা গেল। কেউ রাষ্ট্রকে ধীর, অকার্যকর এবং “পুরোনো সফটওয়্যার” ভাবতে শুরু করল, কেউ গণতন্ত্রকেই একটি অদক্ষ অপারেটিং সিস্টেমের মতো দেখতে লাগল। প্রযুক্তিগত সমাধানের ভাষা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ভাষাকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করল। “Move fast and break things” শুধু স্টার্টআপ নীতি হয়ে থাকল না, শাসনব্যবস্থার প্রতিও একধরনের মনোভাব হয়ে উঠল। এলন মাস্কের DOGE উদ্যোগ কিংবা রাষ্ট্রকে “ইঞ্জিনিয়ারিং সমস্যা” হিসেবে দেখার প্রবণতা সেই পরিবর্তনের লক্ষণ।
এই প্রেক্ষাপটে থিও বেকারের How to Rule the World এক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিবরণ, বিশ্ববিদ্যালয়-সংস্কৃতির নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ, এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা। তার মূল প্রশ্ন আসলে সরল: স্ট্যানফোর্ড কি শুধু মেধাবী মানুষ তৈরি করছে, নাকি এমন এক পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে মানুষ শিখছে কীভাবে সফল হওয়ার অভিনয় করতে হয়?
বেকারের যাত্রা শুরু হয় একেবারে ছাত্রজীবন থেকে। নতুন ক্যাম্পাস, ছাত্র পত্রিকা, সম্পর্ক, মৃত্যু, ব্যক্তিগত ক্ষতি, সবকিছু মিলিয়ে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের উপাদান আছে। কিন্তু তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন দ্রুত অন্য রকম হয়ে ওঠে। কারণ তিনি ঢুকে পড়েন স্ট্যানফোর্ডের প্রেসিডেন্ট মার্ক টেসিয়ার-লাভিনের গবেষণা জালিয়াতি তদন্তে।
গল্পের এই অংশটা প্রায় গোয়েন্দা কাহিনির মতো। বার্নার ফোন, গোপন যোগাযোগ, ভুয়া পরিচয়, ভার্চুয়াল মেশিন, সাদা বোর্ডে নোট, তারপর সেই নোট আবার ডেস্কের ড্রয়ারের ড্রাই-ইরেজ মার্কারের ভেতরে লুকিয়ে রাখা। এক পর্যায়ে টেসিয়ার-লাভিনের গাড়ি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, তখন বেকার দৌড়ে গাড়ির পেছনে ছুটছেন, আর তার সম্পাদক সাইকেলে পেছনে আসছেন। পুরো দৃশ্যটি যেন সাংবাদিকতা নয়, গুপ্তচরবৃত্তির সিনেমা।
কিন্তু বইয়ের আসল কেন্দ্রবিন্দু গবেষণা জালিয়াতি নয়। আসল বিষয় স্ট্যানফোর্ডের সংস্কৃতি।
বেকারের অভিযোগ হলো, এই প্রতিষ্ঠান ছাত্রদের একটি বিশেষ শিক্ষা দেয়। সরাসরি নয়, পরোক্ষভাবে। এখানে বলা হয় না “মিথ্যা বলো।” বরং শেখানো হয়, “আগে দাবি করো, পরে সত্যি করে ফেলো।” Fake it till you make it।
ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা অল্পবয়সী ছাত্রদের ওপর কোটি কোটি ডলার ঢালছে। কোনো দীর্ঘ যাচাই নেই, কোনো গভীর অনুসন্ধান নেই। ফলত ছাত্ররা শিখছে নিজেদের সক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করতে, নিজেদের বড় করে দেখাতে, এমনকি নিজেদের একটি বিকল্প সংস্করণ তৈরি করতে। যেন বাস্তব মানুষ নয়, নিজের স্টার্টআপ-উপযোগী সংস্করণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে তখন আরেক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে। কে বেশি সফল, কে বেশি প্রতিষ্ঠিত, কার স্টার্টআপে বেশি অর্থ এসেছে, কে কাকে চেনে। এই পরিবেশে অনেক ছাত্রই নিজেদের প্রকৃত অবস্থান লুকাতে শুরু করে। কেউ পরীক্ষায় প্রতারণা করছে, কেউ অন্যের কাজ নিজের বলে চালাচ্ছে, কেউ কৃতিত্বকে ফুলিয়ে তুলছে।
বেকারের যুক্তি হলো, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একটি সংস্কৃতি কাজ করছে। প্রেসিডেন্টের গবেষণায় প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষক শাস্তি পাচ্ছেন না, কোচের বিরুদ্ধে অভিযোগ চাপা পড়ছে, বিশ্ববিদ্যালয় নিজের ভাবমূর্তি বাঁচাতে ব্যস্ত।
এই কারণেই, বেকারের মতে, স্ট্যানফোর্ড থেকে অস্বাভাবিক সংখ্যক “খারাপ চরিত্র” বেরিয়ে আসে। এলিজাবেথ হোমস, ডু কওন, জুলের প্রতিষ্ঠাতারা, স্যাম ব্যাংকম্যান-ফ্রাইডের পারিবারিক সংযোগ, যেন একই ভূখণ্ড থেকে জন্ম নেওয়া আলাদা আলাদা কাহিনি।
তবে এখানেই বইয়ের সীমাবদ্ধতাও শুরু হয়।
বেকার যখন ক্ষমতাবানদের তদন্ত করেন, তখন তিনি সংযত, ধৈর্যশীল, সূক্ষ্ম। কিন্তু সহপাঠীদের ক্ষেত্রে তিনি প্রায় ব্যঙ্গাত্মক হয়ে ওঠেন।
একজন ছাত্র, যাকে তিনি জুলিয়ান নামে উল্লেখ করেন, ধনীদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে, নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, নানা ধরনের আত্মম্ভরিতা দেখায়। বেকার তাকে ধীরে ধীরে এমনভাবে নির্মাণ করেন যেন পাঠক শেষে হাসতে বাধ্য হয়। যেন পুরো মানুষটা কৌতুকের সেটআপ।
সমস্যা হলো, এই পদ্ধতি তার বৃহত্তর যুক্তিকেও দুর্বল করে।
কারণ যদি স্ট্যানফোর্ডই মানুষকে নষ্ট করে, তাহলে জুলিয়ানের মতো মানুষ কি আগেই এমন ছিল না? স্ট্যানফোর্ড কি সব কাজ করছে, নাকি মানুষও তার নিজস্ব চরিত্র নিয়ে সেখানে প্রবেশ করছে?
আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা রাজনৈতিক জায়গায়। বেকার দেখান প্রযুক্তি জগতের মানুষেরা অদ্ভুত রাজনৈতিক ধারণা পোষণ করছে, কিন্তু তিনি খুব কমই ব্যাখ্যা করেন সেই ধারণাগুলো কোথা থেকে এসেছে।
Effective Altruism-এর নাম আসে। কিন্তু Rationalism নেই। Longtermism নেই। Techno-accelerationism নেই। পিটার থিয়েলের চিন্তাজগত নেই। রেনে জিরার নেই। কার্টিস ইয়ারভিন নেই।
ফলে আমরা মানুষগুলোকে দেখি, কিন্তু তাদের চিন্তার ভেতরে ঢুকতে পারি না।
এখানে বইটি সিলিকন ভ্যালিকে একটি সামাজিক রোগ হিসেবে বর্ণনা করে, কিন্তু রোগতত্ত্ব পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত একটি পুরোনো গল্প ফিরে আসে। ম্যালকম হ্যারিস দেখিয়েছিলেন, স্ট্যানফোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা লিল্যান্ড স্ট্যানফোর্ড একসময় ঘোড়া পালনের একটি পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। অল্পবয়সী ঘোড়াদের খুব তাড়াতাড়ি দৌড় করানো হতো। এতে কেউ ভেঙে পড়ত, কেউ টিকে যেত। দুর্বলদের শুরুতেই আলাদা করা যেত।
পরে ঘোড়া বদলে গেল, জায়গায় এল মানুষ।
সম্ভবত এটাই স্ট্যানফোর্ডের সবচেয়ে পুরোনো নীল-নকশা। তরুণদের ওপর প্রচুর সম্পদ ছুঁড়ে দেওয়া, তারপর তাদের ছেড়ে দেওয়া। কে পড়ে যায়, কে টিকে থাকে, কে প্রতারণা করে, কে সফল হয়, সেটাই দেখা।
বইটি পড়ে মনে হলো, যদি পুরো ব্যবস্থাটাই এমন হয়, তাহলে সমস্যা কি কিছু খারাপ মানুষ?
নাকি সমস্যা সেই দৌড়ের, যেখানে সবাইকে খুব তাড়াতাড়ি দৌড়াতে বলা হয়?



