সময় কি সত্যিই বয়ে যায়—নাকি আমাদের মস্তিষ্কই সময় তৈরি করে?
সময়ের কথা ভাবলে আমার ছোটবেলার একটি অদ্ভুত স্মৃতি মনে পড়ে। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে, উঠোনে ছায়া লম্বা হচ্ছে, আর আমি বসে আছি বই নিয়ে। তখন মনে হতো বিকেলটা যেন সত্যিই কোথাও সরে যাচ্ছে। যেন এক অদৃশ্য নদী বয়ে চলেছে, আর আমরা সবাই তার ভেতরে ভেসে আছি। কিন্তু পরে বুঝেছি, সময় কি সত্যিই বয়ে যায়? নাকি আমরা নিজেরাই ভেসে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি করি?
আজকের পদার্থবিদরা অনেকেই এখন মনে করেন, সময়ের প্রবাহ হয়তো প্রকৃতির কোনো মৌলিক বৈশিষ্ট্য নয়; বরং মানুষের মানসিক অভিজ্ঞতার একটি ফল। তাঁদের কল্পনায় মহাবিশ্বকে দেখা হয় এক বিশাল চার-মাত্রিক কাঠামো হিসেবে; এক ধরনের স্থির ব্লক। সেই ব্লকের এক প্রান্তে আছে মহাবিস্ফোরণ, আর অন্য প্রান্তে এমন এক ভবিষ্যৎ, যা ইতিমধ্যেই সেখানে উপস্থিত। আমরা যাকে বর্তমান বলে অনুভব করি, তা আসলে এই স্থির মহাবিশ্বের ভেতর দিয়ে আমাদের সচেতনতার একেকটি কাটা স্তর মাত্র। আমরা যেন একটি বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে চলেছি, অথচ বইটি সম্পূর্ণ লেখা হয়ে গেছে অনেক আগেই।
এই ধারণাকে বোঝার জন্য সাংবাদিক জো মার্চ্যান্ট তাঁর লেখায় কয়েকটি আশ্চর্য উদাহরণ তুলে ধরেছেন। তিনি এমন এক রোগীর কথা বলেন, যার নাম তিনি ছদ্মনামে দিয়েছেন লারা। লারা স্ট্রোকের পর একটি বিরল স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত হন; অ্যাকিনেটপসিয়া। এই অবস্থায় মানুষ চলমান বস্তুকে চলমান হিসেবে দেখতে পারে না।
চা ঢালতে গিয়ে লারা দেখেন, কেটলি থেকে বের হওয়া চা যেন এক স্থির স্তম্ভ হয়ে আছে। যেন সময় থেমে গেছে, আর তরলটি মাঝ আকাশে ঝুলে আছে। মানুষের চলাফেরা তাঁর কাছে আরও বিভ্রান্তিকর। কেউ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, হঠাৎই অন্য জায়গায় দেখা যাচ্ছে; কিন্তু মাঝের চলাচলটি নেই। যেন পৃথিবীটা ভেঙে গেছে অসংখ্য স্থির ছবিতে।
লারা সময়ের অস্তিত্ব পুরোপুরি হারাননি। তিনি জানেন যে সময় আছে। কিন্তু তাঁর মস্তিষ্ক আর মুহূর্তগুলোকে ধারাবাহিকভাবে জুড়ে দিতে পারে না। ফলে বাস্তবতা তাঁর কাছে হয়ে ওঠে বিচ্ছিন্ন ফ্রেমের এক অদ্ভুত চলচ্চিত্র।
মার্চ্যান্ট আরেকজন মানুষের কথা বলেন; অ্যান্টন, যিনি সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছেন। তিনি নিজেকে বলেন “সময়ের প্রতি অন্ধ।” তাঁর অনুভূতি, যেন তিনি নিজের শরীরের ভেতর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন এবং বাইরে থেকে সেটিকে পরিচালনা করছেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, অন্য মানুষের তুলনায় অ্যান্টনের ভবিষ্যৎ অনুমান করার ক্ষমতা কম।
এই ধরনের ঘটনা আমাদের মস্তিষ্ক সম্পর্কে গভীর ইঙ্গিত দেয়। আমরা সচেতনভাবে বুঝতে না পারলেও প্রতি মুহূর্তে আমাদের মস্তিষ্ক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান করছে। কী ঘটতে যাচ্ছে, কোথায় কিছু নড়বে, কীভাবে একটি শব্দ শেষ হবে; এই সবকিছুরই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পূর্বাভাস তৈরি হয়। বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের অনুভূতি আসলে এই পূর্বাভাস, সংশোধন এবং সমন্বয়ের এক অবিরাম প্রক্রিয়া।
অর্থাৎ আমরা পৃথিবীকে সরাসরি না দেখে, দেখি মস্তিষ্কের তৈরি এক ব্যাখ্যা। আমাদের ইন্দ্রিয় যে সংকেত পাঠায়, তার সম্ভাব্য কারণ কী হতে পারে; মস্তিষ্ক সেই অনুমান করে এবং সেটিকেই আমরা বাস্তব বলে মনে করি।
শিশুরা জন্মের পর ধীরে ধীরে এই মডেল তৈরি করতে শেখে। প্রথমে তারা খুব স্বল্প সময়ের ঘটনাকে বুঝতে পারে, তারপর ধীরে ধীরে দীর্ঘতর সময়ের ধারাবাহিকতা ধরতে শেখে। এই ক্ষমতা বিবর্তনের পথে আমাদের টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কারণ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান করতে পারা মানেই বিপদ এড়ানো, খাদ্য খুঁজে পাওয়া, সমাজ গড়ে তোলা।
তবে এর একটি বিপরীত দিকও আছে। একবার যখন মস্তিষ্ক স্থিতিশীল মডেল তৈরি করে ফেলে, তখন তা তুলনামূলকভাবে কম নমনীয় হয়ে পড়ে। আমরা বাস্তবতাকে নতুন করে দেখতে কম আগ্রহী হই। অনেক সময় আমরা আসলে আমাদের পুরোনো অনুমানকেই সত্য বলে ধরে নিই।
মাদকদ্রব্যের প্রভাবে এই পূর্বাভাস-ব্যবস্থাটি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সাইলোসাইবিন বা এলএসডি-র মতো সাইকেডেলিক পদার্থ মানুষের উপলব্ধিকে অদ্ভুতভাবে পরিবর্তন করে। লেখক অ্যালডাস হাক্সলি একবার বলেছিলেন, এই অভিজ্ঞতা যেন “শৈশবের উপলব্ধির নিষ্কলুষতায় ফিরে যাওয়া।”
১৯৩০-এর দশকে লন্ডনের মডসলি হাসপাতালে মেসকালিন নিয়ে করা পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, মানুষের সময়বোধ নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। আরেকটি গবেষণায় সঙ্গীতশিল্পীরা সাইলোসাইবিন গ্রহণের পর বলেছিলেন, সঙ্গীত যেন তার অর্থ হারিয়ে ফেলেছে। একটি নোট থেকে আরেকটি নোটে যাওয়ার যে ধারাবাহিকতা; সেটিই যেন ভেঙে গেছে।
এই ধারণাগুলোকে বোঝাতে কিছু স্নায়ুবিজ্ঞানী কম্পিউটার বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে রাজেশ রাও এবং ডানা বলার্ড প্রস্তাব করেন, মস্তিষ্কের পূর্বাভাস ব্যবস্থা হয়তো “বায়েসীয় অনুমান” নামের একটি গণিতীয় পদ্ধতির মতো কাজ করে। এখানে অসম্পূর্ণ তথ্য থেকে সম্ভাব্য ফলাফল অনুমান করা হয়।
আমরা খাবারের স্বাদ চিনতে পারি, একটি টেনিস শট ঠিকমতো মারতে পারি; এসবই সম্ভব হয় কারণ আমাদের নিউরনগুলো এক ধরনের সম্ভাব্যতা গণনা করে। সংবেদন, প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফলের মধ্য দিয়ে মস্তিষ্ক ক্রমাগত নিজের মডেলকে আপডেট করে।
মস্তিষ্কের আচরণ অনেকটা শেয়ারবাজারের মতো মনে হয়। অসংখ্য উপাদান, অসংখ্য প্রভাব। কখনো সবকিছু স্থিতিশীল ও পূর্বানুমেয়, আবার কখনো সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল। বিজ্ঞানীরা বলেন, শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলার মাঝখানে একটি সূক্ষ্ম সীমা আছে; যাকে বলা হয় “ক্রিটিক্যালিটি।” এই অবস্থায় ক্ষুদ্র পরিবর্তনও বড় ফলাফল তৈরি করতে পারে, যেমন শেয়ারবাজারের ধস।
মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের স্ক্যান থেকে বোঝা যায়, অধিকাংশ মানুষের মস্তিষ্ক এই সীমার অনেক নিচে কাজ করে। কিন্তু এলএসডি গ্রহণকারী মানুষের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাদের মস্তিষ্ক এই সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। যেন তাদের স্নায়বিক কাঠামো সাময়িকভাবে মুক্ত হয়ে যায়।
আমরা কি শুধু বাস্তবতার মডেল তৈরি করি? নাকি আমাদের মানসিক মডেলই বাস্তবতা? এই প্রশ্নটি আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় পদার্থবিজ্ঞানের সেই বিখ্যাত ধাঁধায়—শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল। একটি বাক্সে একটি বিড়াল এবং একটি তেজস্ক্রিয় নমুনা রাখা হয়েছে। তত্ত্ব অনুযায়ী, বাক্স খোলা না হওয়া পর্যন্ত বিড়ালটি একই সঙ্গে জীবিত ও মৃত দুই সম্ভাবনার মিশ্র অবস্থায় থাকে। কিন্তু যদি ল্যাবরেটরির বাইরে আরেকজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে? তার দৃষ্টিতে কী ঘটছে? সে কি ভাববে, ভেতরে একজন গবেষক আছে যিনি একই সঙ্গে আনন্দিত এবং শোকাহত?
এই প্রশ্নের একটি উত্তর এসেছে “কিউবিজম” বা কোয়ান্টাম বায়েসিয়ানিজম থেকে। এখানে বলা হয়, মহাবিশ্বের ঘটনাগুলোও হয়তো সম্ভাবনার দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝা উচিত। বাস্তবতা একেবারে নিরপেক্ষ নয়; তা পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও জড়িত। এই ধারণাটি ব্লক ইউনিভার্স তত্ত্বের একটি বিকল্প পথ । যদি বাস্তবতা সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে, তাহলে ভবিষ্যৎ হয়তো সম্পূর্ণ পূর্বনির্ধারিত নয়। তাহলে হয়তো প্রতিটি মুহূর্তই সত্যিকারভাবে নতুন। হয়তো সময় শুধু এগিয়ে যায় না; সময় নিজেই প্রতিটি মুহূর্তে তৈরি হয়।
In Search of Now: The Science of the Present Moment By Jo Marchant - অবলম্বনে




Thanks bhaia