Intimate interrupter
মনোযোগ জিনিসটা এখন যেন একটা হারানো প্রযুক্তি। মানুষ ঘুম থেকে ওঠার আগেই ফোন হাতে নিচ্ছে, দাঁত ব্রাশ করার সময় ইউটিউব শর্টস, অফিসের মিটিংয়ের ফাঁকে মেসেঞ্জার, রাতে বিছানায় শোয়ার পরও স্ক্রল, স্ক্রল, স্ক্রল। সবাই জানে তারা ক্লান্ত, সবাই জানে তারা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ যেন ঠিক বুঝতে পারছে না এই ভাঙনটা কোথা থেকে শুরু হয়। আমরা সাধারণত দোষ দিই বাইরের পৃথিবীকে। সোশ্যাল মিডিয়া, নোটিফিকেশন, বাজার, কাজের চাপ, মানুষের অবিরাম উপস্থিতি। কিন্তু মেরি অলিভার যেটা বুঝেছিলেন, আর খুব অল্প কিছু শিল্পী যেটা এত নির্মম স্বচ্ছতায় বলতে পেরেছেন, তা হলো সৃষ্টিশীলতার সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু বাইরে না, ভেতরে। নিজের ভিতরের সেই কণ্ঠ, যে দরজায় ধাক্কা মারে, মনে করিয়ে দেয় দাঁতের ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, বাজারে সরিষা ফুরিয়ে গেছে, তিন সপ্তাহ পরে মামার জন্মদিন, ব্যাংকের বিল বাকি, ইমেইলের রিপ্লাই দেওয়া হয়নি। এইসব ছোট ছোট জরুরি ব্যাপার, যেগুলো আলাদা করে দেখলে নিরীহ, কিন্তু একসাথে তারা মানুষের মনকে টুকরো করে দেয়।
গভীর মনোযোগের মধ্যে এক ধরনের সামঞ্জস্য তৈরি হয়, যেখানে মানুষ আর পৃথিবী ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে যেতে থাকে। তখন অনুভবের ক্ষমতা বাড়ে, জানার ক্ষমতা বাড়ে, সৃষ্টির ক্ষমতা বাড়ে। কিন্তু বাস্তবে এই অবস্থায় পৌঁছানো এক ধরনের যুদ্ধ। কারণ মানুষ আসলে একক কোনো সত্তা না। একজন মানুষ একইসাথে সন্তান, কর্মচারী, বন্ধু, প্রেমিক, নাগরিক, করদাতা, ভাড়াটিয়া, রোগী, অভিভাবক, ঋণগ্রহীতা, এবং কোথাও গভীরে হয়তো একজন শিল্পীও। এই সব পরিচয় একে অপরের সঙ্গে প্রতিদিন ধাক্কা খায়। একজন কবি যখন কবিতা লিখতে বসে, তখন তার ভেতরের আরেকজন মানুষ উঠে বলে, “আগে গ্যাস বিলটা দাও।” একজন ঔপন্যাসিক যখন চরিত্রের ভিতরে ঢুকতে চায়, তখন মাথার ভেতর কেউ একজন ফিসফিস করে, “তুমি গতকাল বন্ধুর মেসেজের উত্তর দাওনি।”
মেরি অলিভার এই ভেতরের বিঘ্নকারীর নাম দিয়েছিলেন “intimate interrupter”। খুব সুন্দর নাম। কারণ এই বাধা দূরের না, শত্রুর মতোও না। এটা নিজেরই অংশ। নিজেরই আরেক সংস্করণ। তাই এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও কঠিন। বাইরের দরজা বন্ধ করা সহজ, ফোন সাইলেন্ট করা সহজ, কিন্তু নিজের মাথার ভিতরের কোলাহল থামানো প্রায় অসম্ভব।
অলিভার বলছিলেন, তিনি ডেস্কে বসে লিখছেন, তখন ফোন বেজে উঠল, দরজায় কেউ কড়া নাড়ল, আর যে চিন্তাটা তিনি প্রায় ধরতে যাচ্ছিলেন, সেটা মিলিয়ে গেল। যারা কখনও গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করেছে তারা জানে এই অনুভূতি কতটা নির্মম। একটা বাক্য আসে, একটা দৃশ্য, একটা ধারণা, প্রায় হাতের নাগালে, তারপর হঠাৎ কোথাও উবে যায়। যেন কুয়াশার ভিতর একটা প্রাণী দেখা দিয়েছিল, আবার মিলিয়ে গেল। শিল্পীরা প্রায়ই এই ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলেন। ডেলাক্রোয়া সামাজিক আড্ডাকে ভয় পেতেন কারণ জানতেন মানুষের উপস্থিতি মনের ভিতরের সুর নষ্ট করে দেয়। অ্যাগনেস মার্টিন বলেছিলেন, শিল্পীকে বুঝতে হবে কোন বাধা গ্রহণ করা যায়, আর কোনটা আত্মাকে দূষিত করে। কারণ অনুপ্রেরণা খুব নাজুক জিনিস। এটা শব্দ পছন্দ করে না, নজরদারি পছন্দ করে না, তাড়াহুড়ো পছন্দ করে না।
অলিভারের সবচেয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ সম্ভবত তিনি মানুষের ভিতরে তিনটি আলাদা সত্তার কথা বলেন। প্রথমটা শিশুসত্তা। যে কখনও পুরোপুরি মরে না। মানুষ যতই বড় হোক, ভেতরে সেই ছোট্ট ভয় পাওয়া, কৌতূহলী, অপমান মনে রাখা, আনন্দে কেঁপে ওঠা শিশুটি রয়ে যায়। দ্বিতীয়টা সামাজিক সত্তা। যে সময় মেনে চলে, দায়িত্ব পালন করে, ফোন ধরে, সভায় যায়, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। সভ্যতা এই সত্তার উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই সত্তা ছাড়া পৃথিবী চলত না। পাইলট প্লেন উড়ায়, সার্জন অপারেশন করে, বাসচালক বাস চালায়। তাদের কাছে আমরা স্থিরতা চাই, স্বাভাবিকতা চাই। আমরা চাই না পাইলট হঠাৎ কবিতার লাইন ভাবতে শুরু করুক।
কিন্তু শিল্পীর ভিতরে তৃতীয় আরেকটি সত্তা আছে, যেটা সাধারণ সময়ের প্রেমে পড়ে না। যেটা চায় অন্য কিছু। যেটার ভিতরে এক ধরনের অনন্তের ক্ষুধা আছে। অলিভার বলছেন, এই সত্তা সময়ের দাস না। এটা দৈনন্দিনতার বাইরে যেতে চায়। এই সত্তাই শিল্প তৈরি করে। এই সত্তাই মানুষকে অজানার দিকে ঠেলে দেয়।
আর এখানেই শিল্পীর জীবন আর সাধারণ জীবনের মধ্যে ফাটল তৈরি হয়। কারণ সমাজ চায় মানুষ নির্ভরযোগ্য হোক, সময়মতো আসুক, দায়িত্ব পালন করুক, বাজার করুক, দাঁতের চিকিৎসা করাক, ট্যাক্স দিক। কিন্তু শিল্প চায় মানুষ হারিয়ে যাক। শিল্প চায় মানুষ কিছুক্ষণের জন্য পৃথিবীর নিয়ম ভুলে যাক। একটা কবিতা লেখার সময় কবি আসলে ভালো নাগরিক নন। একটা উপন্যাসের ভিতরে ডুবে থাকা লেখক ভালো কর্মচারী নন। কারণ সেই মুহূর্তে সে অন্য কোথাও ।
অলিভারের ভাষায়, সৃষ্টিশীল কাজের জন্য যে ধরনের একাগ্রতা দরকার, সেটা প্রায় ধর্মীয় ধরনের আনুগত্য। তিনি বলছেন, শিল্পীর দায়িত্ব সরিষা কেনা না, দাঁতের ব্যথা সামলানো না, রান্নাঘরের মটরশুঁটি দেখা না। তার দায়িত্ব তার ভিতরের দর্শনের প্রতি। “The poem gets written.” বাকিটা পরে। এই কথার মধ্যে ভয়ঙ্কর এক নিষ্ঠুরতা আছে, আবার মুক্তিও আছে। কারণ শিল্প কখনও অর্ধেক মনোযোগে হয় না।
আজকের পৃথিবীতে এই কথাগুলো আরও বেশি নির্মম শোনায়। কারণ এখন শুধু বাইরের বিঘ্ন না, মানুষ নিজেই নিজেকে ভাঙছে। একইসাথে পাঁচটা ট্যাব খোলা, একটা ভিডিও চলতে চলতে আরেকটা ভিডিও দেখা, বই পড়তে পড়তে নোটিফিকেশন চেক করা। মানুষ এখন আর গভীর মনোযোগের অভ্যাসই জানে না। মন যেন সবসময় পৃষ্ঠে ভাসছে। কোথাও ডুব দিচ্ছে না। অথচ শিল্প, চিন্তা, ভালোবাসা, এমনকি প্রকৃত আনন্দও গভীরতা ছাড়া সম্ভব না।
মেরি অলিভার একটা জায়গায় বলছেন, extraordinary জিনিস ভিড় পছন্দ করে না। এটা নির্জনতা পছন্দ করে, মনোযোগ পছন্দ করে, ঝুঁকি নেওয়া মানুষ পছন্দ করে। এই কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সৃষ্টিশীলতা মূলত অজানার ভিতরে হাঁটা। কেউ জানে না একটা কবিতা কোথায় যাবে, একটা উপন্যাস শেষ হবে কিনা, একটা চিত্রকর্ম আদৌ দাঁড়াবে কিনা। শিল্পী প্রতিবারই এক ধরনের অনিশ্চয়তার ভিতরে প্রবেশ করে। কিটস যাকে negative capability বলেছিলেন, সেই ক্ষমতা, যেখানে মানুষ উত্তর ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে।
অলিভারের কাছে শিল্প কোনো পেশা না, কোনো শখও না। এটা এক ধরনের জীবনপদ্ধতি। মধ্যযুগের নাইটদের মতো মানুষকে নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। শরীর, মন, আত্মা সবকিছু দিয়ে। কারণ কাজটাই আসলে অভিযান। আর এই অভিযানের জন্য যে শক্তি লাগে, তা সাধারণ জীবনের শক্তি না।
সবশেষে তিনি যে কথাটা বলেন, সেটা হয়তো সবচেয়ে বেদনাদায়ক। পৃথিবীর সবচেয়ে অনুতপ্ত মানুষ তারা, যারা অনুভব করেছিল তাদের ভিতরে সৃষ্টির ক্ষমতা আছে, একটা ডাক আছে, কিন্তু তারা সেই ডাককে সময় দেয়নি, শক্তি দেয়নি। তারা অন্যসব জরুরি কাজের ভিতরে জীবন পার করে দিয়েছে। ফোন ধরেছে, বাজার করেছে, সভায় গেছে, সময়মতো পৌঁছেছে, সব দায়িত্ব পালন করেছে, কিন্তু ভিতরের সেই তৃতীয় সত্তাটাকে ক্ষুধার্ত রেখেছে।
এবং হয়তো এই কারণেই মনোযোগ শুধু উৎপাদনশীলতার ব্যাপার নয়। এটা নৈতিক ব্যাপারও নয়। এটা আসলে অস্তিত্বের প্রশ্ন। তুমি কোন জীবনের প্রতি loyal থাকবে। সেই জীবনের প্রতি, যেখানে সবকিছু সময়মতো হয়, নাকি সেই জীবনের প্রতি, যেখানে কখনও কখনও মানুষ দেরি করে, ভুলে যায়, অগোছালো হয়ে যায়, কিন্তু হঠাৎ এক সকালে ছয়টায় বসে এমন একটা বাক্য লিখে ফেলে, যেটা তার নিজের জীবনও বদলে দেয়।
রিটন খান



