
সাহিত্যচর্চার অঙ্গনে পা রাখিতে হইলে মন হইতে পাঠশালার অভ্যস্ত প্রাচীর ধ্বংস করা আবশ্যক। প্রাতিষ্ঠানিক প্রাঙ্গণ আমরা বহুকাল পূর্বে পরিত্যাগ করিলেও তাহার শ্রেণিকক্ষ, কৃষ্ণফলক, রক্তাক্ত শোধনের দাগ এবং নম্বরের মোহ আমাদের গদ্যে স্থায়ী ঠিকানা গড়িয়া লয়। তখন রচনা করিবার সময় মনে হয় এক কাল্পনিক শিক্ষক আমাদের বিচার করিতেছেন। তিনি দেখিবেন আমরা তথ্য সাজাইতে পারিলাম কি না, বিশিষ্ট জ্ঞানীদের বাণী উদ্ধৃত হইল কি না, কিংবা রচনার পাশে প্রশংসাসূচক মন্তব্য মিলিল কি না। অথচ এই ব্যবস্থার অন্তরালে সশ্রদ্ধ লেখকের নিজস্ব অস্তিত্ব যে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হইল, সে আলোচনা অগোচরেই রহিয়া যায়।
বিদ্যালয়ের পাঠশালায় পাঠককে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া রাখা সম্ভব। তথাকার শিক্ষক আপনার রচনাপাঠে বাধ্য থাকেন; কারণ তাঁহার পেশাগত কর্তব্য, নির্ধারিত দায়িত্ব ও পরীক্ষার বিধান তাঁহাকে শেষ পংক্তি অবধি অগ্রসর হইতে বাধ্য করে। সেখানে দুর্বল গঠন কিংবা ভাবনার দৈন্য আড়াল করিবার তরে সংগৃহীত উদ্ধৃতির আশ্রয় লইলেও গৃহশিক্ষক বিমুখ হইবেন না। অথচ সাহিত্যসাধনার জগৎ সেরূপ পরম সহিষ্ণু নহে। তথায় পাঠকের কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না। রচনার সূচনায় আপনার জীবনবোধ ও স্বকীয় কণ্ঠস্বর যদি তাঁহার অন্তঃকরণ স্পর্শ করিতে ব্যর্থ হয়, তবে পরবর্তী পৃষ্ঠায় তাঁহাকে ধরিয়া রাখা অসম্ভব হইয়া পড়ে। গ্রন্থখানি সরাইয়া রাখিবার অধিকার সর্বদাই তাঁহার নিজস্ব।
এখানেই লেখকের সঙ্গে ছাত্রের পার্থক্য ক্রমে প্রকাশ পায়। ছাত্র লেখে সে কী জানে তাহা প্রমাণ করিবার জন্য। লেখক লেখে পাঠকের ভিতরে একটি নতুন জানার জায়গা খুলিয়া দিতে। এই পার্থক্য অতি সূক্ষ্ম বলিয়া মনে হয়, অথচ লেখার সমস্ত শরীর ইহার উপর দাঁড়াইয়া থাকে।
অধ্যায়নের সুদীর্ঘ অভ্যাসে আমাদের চিন্তা সংগ্রাহকের ভাণ্ডারে রূপান্তরিত হইতে থাকে। তথায় প্রখ্যাত পণ্ডিদের অভিমত, দার্শনিকদের পারিভাষিক পরিভাষা কিংবা প্রথিতযশা সাহিত্যিকের সুচারু গদ্যখণ্ড পরম যত্নে সারিবদ্ধ হইয়া রয়। অতঃপর গ্রন্থনায় প্রবৃত্ত হইলে সেই সংরক্ষণাগারের তোরণ উন্মুক্ত হইয়া পড়ে। সূচনায় একটি উদ্ধৃতি উপস্থাপিত হয়, তৎপশ্চাৎ তাহার বিশ্লেষণ, পুনঃ অন্য লেখকের অভিমতের সহিত তুলনা, তাহারি অন্তরালে লেখকের নিজ দু-একটি মৃদু উচ্চারণ এবং সর্বশেষে পুনরায় উদ্ধৃতির সমাহার। সেই রচনায় বিবিধ বিদগ্ধ ভাবনার আলোক ও পরিচয়ের দ্যুতি প্রকটিত থাকিলেও, মূল স্রষ্টার নিজস্ব সত্তা সম্পূর্ণরূপে আত্মগোপন করিয়া থাকে।
বিদগ্ধ পাঠকমহলেই এই ব্যাধি অধিক প্রকট। পাঠের পরিসর যতই বিস্তৃত হইতে থাকে, পরকীয় গদ্যের সৌন্দর্য তত গভীরভাবে অন্তরে রেখাপাত করে। প্রথিতযশা সাহিত্যিকের একটি সুচারু চরণ আমাদের শত প্রয়াস অপেক্ষা অধিক নিপুণ প্রতিভাত হয়। তখন সেই বাক্যের শরণ লইবার এক তীব্র ব্যাকুলতা জন্মায়। নিজের মানসপটে কোনো ভাবনার অঙ্কুরোদ্গম হইতে না হইতেই মনে পড়ে, এ বিষয়ে নীৎশে কিংবা ভার্জিনিয়া উলফ কী অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন, রবীন্দ্রনাথের লেখনীতে ইহার রূপ কেমন ছিল, অথবা বোর্হেসের কল্পবিশ্বে ইহার সন্ধান মেলে কি না। আমরা স্বাধীন চিন্তাকে স্বতস্ফূর্তভাবে বিকাশ লাভ করিবার অবকাশ দিই না। সদ্যোজাত ভাবনার মুখে আত্মপ্রকাশের পূর্বেই পূর্বসূরিদের আদল চাপাইয়া দেওয়া হয়। ফলে রচনাটি বিদগ্ধ ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রতিভাত হইলেও, তাহার অভ্যন্তরে জীবনের স্পন্দন বজায় থাকে না। কেননা প্রতিটি চিন্তারই তো এক অনন্য উৎপত্তিস্থল বিদ্যমান।
কোনো এক অপরাহ্ণে নিঃসঙ্গ পদচারণাকালে আপনার মানসপটে একটি উপলব্ধির উদয় হইতে পারে—স্মরণক্রিয়া হয়তো গচ্ছিত অতীতকে কেবল অপরিবর্তিত রাখে না, পরন্তু প্রতিবার স্মরণের ক্ষণে পূর্বস্মৃতিকে পুনর্বার নবীন রূপে নির্মাণ করে। এই জাতীয় ভাবনাবোধ ত্রুটিপূর্ণ কিংবা অপরিপক্ব প্রতীয়মান হইতে পারে। ইতোপূর্বে সহস্রজন হয়তো সদৃশ ভাবনায় উপনীত হইয়াছেন। তাহাতে বিশেষ কিছু আসিয়া যায় না। কেননা উক্ত নির্দিষ্ট মুহূর্তে ভাবনাটি আপনার নিজস্ব জীবনোপলব্ধির গহিন হইতে রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। ইহার অভ্যন্তরে সঞ্চিত রহিয়াছে আপনার নিজস্ব যাপিত মুহূর্ত, পরিচিত রাজপথের দৃশ্যপট, বয়সের ছাপ এবং বিস্মৃত প্রিয়জনের মুখচ্ছবি। অতঃপর আপনি অধ্যয়নে ব্রতী হউন। মনোবিদ্যায় ইহার ব্যাখ্যার সন্ধান করুন, প্রুস্তের লেখনীতে স্মৃতির নিপুণ প্রয়োগ লক্ষ করুন, কিংবা স্নায়ুবিজ্ঞানের আধুনিক সিদ্ধান্তসমূহ আপনার এই ধারণার সহিত কতখানি মেলবন্ধন ঘটায় তাহা অনুধাবন করুন। সেই মুহূর্তে পূর্বসূরিদের উদ্ধারকৃত পংক্তিমালা আপনার স্বাধীন চিন্তার প্রকৃত সহায়ক হইয়া উঠিবে।
এই বিপরীত অভিমুখে অগ্রসর হইলে সংকটের উদ্ভব ঘটে। প্রুস্তের চমৎকার কোনো গদ্যখণ্ড পাঠ করিয়া মুগ্ধ হইবার পর, স্মৃতিকথা রচনার ইচ্ছায় হয়তো আরও কতিপয় মণীষীর পংক্তিমালা আহরণ করিলেন। তৎপশ্চাৎ তাহাদের অন্তর্বর্তী সংযোগ সাধনে দু-একটি নিজস্ব বাক্য সংযোজনপূর্বক রচনাটি সমাপ্ত হইল। কিন্তু সেই লেখনী কেবল ফরাসি সাহিত্যিকের ভাবনাকল্পনাকেই বিশ্লেষণ করিবে, আপনার নিজস্ব জীবনোপলব্ধিকে উদ্ভাসিত করিতে সমর্থ হইবে না। কেননা ধারণার পুনরুৎপাদন এবং পরকীয় সৃষ্টির অনুকরণ কখনই অভিন্ন বলিয়া গণ্য হইতে পারে না।
মানুষ যাহা পাঠ করে, দর্শন করে কিংবা শ্রবণ করে, তাহা অলক্ষ্যে তাহার অন্তঃকরণে প্রবিষ্ট হয়। ভাষার রূপ অতিশয় অলৌকিক, তাহার কোনো একক বা সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ সূচনা নাই। আমাদের নিত্য ব্যবহৃত প্রতিখানি শব্দই তো পূর্বসূরিদের গচ্ছিত আমানত; বাক্যের অন্তর্নিহিত ছন্দ, অলংকার, আখ্যানের কাঠামো ও চিন্তার ধারা—সমস্তই অগণিত মানুষের হস্তান্তর হইয়া আমাদের ধামে উপস্থিত হইয়াছে। এই ঐতিহ্যময় উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করিবার বা তাহা হইতে পলায়নের কোনো আবশ্যকতা নাই। পরন্তু সাহিত্যকে এক মহতী প্রবাহিণী বলিয়া অনুধাবন করা শ্রেয়, যেখানে অতীত ও বর্তমানের সকল লেখনী প্রবহমান জলধারার ন্যায় মিলিয়ামিশে একাকার হইয়া রহিয়াছে।
তথাপি প্রবাহিণীর জলে অবতরণের পর আপন দেহসৌষ্ঠবের তরঙ্গলীলা সম্পূর্ণ আপনার নিজস্ব। এই অন্তস্থ প্রাঙ্গণেই সুপ্ত থাকে প্রকৃত স্বকীয় সুর। লেখকস্বর কেবল কোনো দুর্লভ শব্দসমাহারের কৃত্রিম কুহক নহে; প্রাতিষ্ঠানিক অভিধানের অপ্রচলিত শব্দাবলি সাজাইয়া লইলেই অনবদ্য গদ্য জন্মলাভ করে না। খণ্ড বাক্যের বিন্যাসে আধুনিকতার স্পর্শ মিলে না, কিংবা সুদীর্ঘ জটিল বাক্যের সংযোগেই গদ্য গম্ভীর হইয়া উঠে না। লেখকস্বরের প্রকৃত ভিত্তি প্রোথিত থাকে ভূলোকের প্রতি আপনার নিজস্ব দৃষ্টিপাতের কেন্দ্রস্থলে—কোন তুচ্ছ ঘটনা আপনার চিত্তে ক্ষোভের সঞ্চার করে, কোন্ অকিঞ্চিৎকর দৃশ্যপট পরকীয় নেত্র অতিক্রম করিলেও আপনার মানসপটে রেখাপাত ঘটায়, সুদীর্ঘকাল যাবৎ কোন্ অমীমাংসিত জিজ্ঞাসার অনুধাবনে আপনি ব্যাকুল হইয়া ঘোরেন, মানবপ্রকৃতির কোন্ বৈপরীত্য আপনাকে আকর্ষিত করে, এবং সর্বজনগ্রাহ্য কোনো আপাত সত্য আপনার অন্তঃকরণে কী প্রকারে দ্বিধার প্রাচীর তুলিয়া ধরে।
দুইজন মানুষ একই বৃষ্টির দিকে তাকাইতে পারে। একজন দেখিবে আবহাওয়া। অন্যজন দেখিবে বাড়ি ফিরিবার বিলম্ব। আর একজন হঠাৎ স্মরণ করিবে মৃত বাবার ছাতা। এই তৃতীয় মানুষটির লেখার শুরু সম্ভবত সেখানেই।
দর্শন কেবল চক্ষুর ক্রিয়া নহে, বরঞ্চ সাহিত্যসাধনায় আপন নেত্রপাতকে নিঃসংশয়ে গ্রহণ করা অপরিহার্য কর্তব্য। জগতসংসারের অভিমুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করাই লেখকের সর্বপ্রধান ধর্ম, তদনন্তর পুস্তক উন্মোচন শ্রেয়। অথচ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সচরাচর এই অনুক্রম উল্টাইয়া দেয়। বিদগ্ধ মণীষীদের অভিমত অনুধাবনপূর্বক আমরা বাস্তবতাকে তথাকথিত ধারণার সহিত মিলাইবার ব্যর্থ প্রয়াস পাই। সাহিত্যচর্চায় এই ব্যাধি অতিশয় সংহারক। তথায় জীবন্ত অভিজ্ঞতার উপরিভাগে শুষ্ক তত্ত্বের রাজত্ব স্থাপিত হয়, মানুষের অন্তরঙ্গতার অন্তরালে মনোবিজ্ঞান প্রবেশ করে, দারিদ্র্যের ওপর সমাজতত্ত্ব চাপাইয়া দেওয়া হয়, এবং শোকের ব্যাকুলতায় স্থান পায় পূর্বসূরিদের উদ্ধারকৃত পংক্তিমালা। অথচ মানবজীবন তো স্বমহিমায় তথায় পূর্ব হইতেই বিরাজমান ছিল—তাহার নিজস্ব অগোছালো, অপ্রস্তুত ও অসংগত সত্তা লইয়া।
সাহিত্যিকের মূল ধর্ম হইল সেই বিশৃঙ্খল মুহূর্তের সমুখে নীরব নীরবতায় প্রহর যাপন করা; তড়িৎগতিতে উহার ওপর কোনো তাত্ত্বিক আখ্যা লেপন করা নহে। আপনি হয়তো একটি সম্পর্কের ক্ষীয়মাণ পরিণতি প্রত্যক্ষ করিলেন। সেই ক্ষণে তৎক্ষণাৎ আসক্তির মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব মানসপটে উদিত হইতে পারে—তাহা মন্দ নহে। তথাপি ক্ষণেক ধৈর্য ধারণপূর্বক লক্ষ্য করুন, উক্ত দুই মানব-মানবী কিরূপ ধারায় বাক্যালাপ করে। একজন জলপাত্র প্রক্ষালন করিয়া রাখে, অপরজন সামান্য কৃজ্ঞতা প্রকাশেও পরাঙ্মুখ। একজন দ্বার রুদ্ধ করে, অন্যজন সেই নির্ঘোষ শুনিয়াও মস্তক উত্তোলন করে না। তাহারা অভিন্ন শয্যায় শয়ান থাকে সত্য, তথাপি উভয়ের মধ্যবর্তী পরিধিটুকু যেন ক্রমেই সুদূর এক মহাদেশের ন্যায় দুস্তর হইয়া উঠে। এই সামান্য ব্যবধানের অন্তরালেই হয়তো আপন লেখনীর প্রকৃত সত্য প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে। শুষ্ক তত্ত্বের অবতারণা পশ্চাতে হইলেও চলিবে, যদি তাহা আদৌ আবশ্যক মনে হয়। কেননা সাহিত্যসাধনার প্রমিধা সর্বদা সেই নিভৃত প্রান্তেই নিহিত থাকে, যাহা এযাবৎ কোনো সংজ্ঞায় আবদ্ধ হয় নাই।
স্বকীয় ভাবনাবোধের উন্মেষ ঘটাইতে তত্ত্বের অভূতপূর্ব রূপায়ণ অপরিহার্য নহে। এই অমূলক আশঙ্কার বশে অগণিত ভাবনার অঙ্কুর আত্মপ্রকাশের পূর্বেই বিনষ্ট হইয়া যায়। আমরা ভাবিয়া লই—অনুরূপ উপলব্ধি ইতোপূর্বে হয়তো প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গ প্রকাশ করিয়া গিয়াছেন। সত্য বটে, তাহা ব্যক্ত হইয়াছে। অনুরাগ, প্রয়াণ, প্রভূত্ব, মাৎসর্য, স্মৃতি, নির্জনতা, স্বজন, ঈশ্বর, রাজনীতি, বার্ধক্য, অর্থসম্পদ, কায়া ও ভাষা—মানবস্তার প্রতিটি নিভৃত প্রাঙ্গণ লইয়াই যুগ যুগ ধরিয়া অগণিত আলোচনা প্রবহমান রহিয়াছে। কোনো অভূতপূর্ব বিষয় উদ্ভাবনের গুরুভার আপনার স্কন্ধে ন্যস্ত নহে; আপনার মূল সাধনা কেবল আপন দৃষ্টির কেন্দ্রস্থল দিয়া তাহাকে নবীন রূপে অনুধাবন করা।
একটি জ্যামিতিক ক্ষেত্রও কেবল সাধারণ রূপ পরিগ্রহ করিয়া অবস্থান করিতে পারে, আবার শব্দ ও অনুভূতির গহিনে প্রবিষ্ট হইয়া নবীন এক ভাবনার উন্মেষ ঘটাইতে সমর্থ হয়। স্রষ্টার মানসপটেও আতিশেয়্যহীন বস্তু আপন যাপিত অভিজ্ঞতার স্পর্শে ভিন্ন অর্থবহ হইয়া উঠে। জননীকে লইয়া অগণিত রচনা রচিত হইয়াছে সত্য; তথাপি রন্ধনশালায় মৎস্য কর্তনকালে তাঁহার বেতারবার্তা শ্রবণ করিবার সেই নির্দিষ্ট দৃশ্যপট আর দ্বিতীয় কাহারো নহে। প্রয়াণ লইয়া মানবজাতির সমস্ত তত্ত্বচিন্তা ইতোপূর্বে লিপিবদ্ধ হইয়া গিয়াছে; কিন্তু চিকিৎসালয়ের নির্জন বারান্দায় দণ্ডায়মান অবস্থায় আপনার হস্তধৃত অর্ধ-শীতল পানীয়ের পাত্রটির সহিত প্রয়াণচেতনার যে প্রচ্ছন্ন সংযোগ স্থাপিত হইয়াছিল, কোনো বিদগ্ধ দর্শনগ্রন্থে তাহার সন্ধান পূর্বে মিলিয়া যায় নাই। তথায় নিহিত রহিয়াছে আপনার প্রকৃত আমানত। এই সঞ্চয়কে লেখনীতে প্রযুক্ত করিবার তরে আত্মপ্রত্যয়ের প্রয়োজন পড়ে; কেননা আপন স্বাধীন ভাবনাকে সচরাচর পূর্বসূরিদের উদ্ধৃতির সমুখে অতিশয় দুর্বল প্রতিভাত হয়।
উদ্ধৃত পংক্তি বা অভিমতের অন্তরালে প্রচ্ছন্ন থাকে এক দুর্ভেদ্য কর্তৃত্বের ছায়া। যখনই লেখনীতে ফ্রাঙ্ক কাফকার অভিমত স্থান পায়, তৎক্ষণাৎ উক্ত বাক্যের সমুখে প্রথিতযশা সাহিত্যিকের ঋজু উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং পাঠকও চকিতে অধিকতর সজাগ হইয়া উঠেন। অথচ আপনি যদি স্বকীয় ভাবনার গহিন হইতে ব্যক্ত করেন যে, মানুষ ততখানিই স্বাধীনতা অন্বেষণ করে যতখানি তাহার প্রত্যাশিত ফলাফলের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেই মুহূর্তে উক্ত অনুভূতির সমুখে আপনি সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ। সেই ক্ষণে সমগ্র ভাবমূর্তির ভার কেবল আপনার একার স্কন্ধেই ন্যস্ত হয়। এই নিভৃত একাকিত্বের মধ্যবর্তী প্রাঙ্গণেই সুপ্ত থাকে একজন স্রষ্টার প্রকৃত আশ্রয়স্থল। অতএব সাহিত্যসাধনার প্রথম খসড়া নির্মাণের ক্ষণে, সম্ভব হইলে পূর্বসূরিদের নামমালা ও স্মৃতি সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করাই শ্রেয়।
আগে নিজের বক্তব্য লিখুন। আপনি কী মনে করেন? কেন মনে করেন? কোন অভিজ্ঞতা এই চিন্তা তৈরি করেছে? কোথায় এই চিন্তার বিরুদ্ধে আপত্তি উঠতে পারে? আপনি নিজেই কোথায় সন্দেহ করেন? এই প্রশ্নগুলির ভিতর দিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পরে গবেষণা শুরু করুন। তখন অন্য লেখকরা বিচারক হিসেবে আসবেন না, সহযাত্রী হিসেবে আসবেন। কেউ আপনার বক্তব্যকে সমর্থন করবেন, কেউ ভাঙবেন, কেউ এমন একটি পথ দেখাবেন যাহা আপনি ভাবেন নাই।
তৎপশ্চাৎ পরকীয় উদ্ধারকৃত পংক্তিমালার যথার্থ তাৎপর্য উদ্ভাসিত হয়। কোনো সুচারু উদ্ধৃতি প্রাচীরে সংরক্ষিত প্রশংসাপত্র নহে, বরঞ্চ তাহা এক উন্মুক্ত গবাক্ষতুল্য। পাঠকের নেত্রপাত ক্ষণেকের তরে অন্য এক দৃশ্যপটে বিচরণ পূর্বক পুনশ্চ আপনার নিভৃত আলয়ে প্রত্যাবর্তন করে। তথাপি আপনি যদি নিরন্তর অপর ব্যক্তিমনোরচিত গবাক্ষের সহায়তায় দৃশ্য দর্শনে বাধ্য করেন, তবে এক ক্ষণে পাঠক প্রশ্ন উত্থাপন করিবেন—আপনার নিজ সোপানখানি কোথায় গচ্ছিত রহিয়াছে?
লেখকস্বরের এই আপন আলয় নির্মাণের কার্য অতিশয় দীর্ঘ ও নিবিড়। অদ্য এক পংক্তি সূচনা, পরদিন এক ব্যর্থ গদ্যখণ্ড, তদনন্তর কোনো অর্ধসমাপ্ত আখ্যানের অবশেষ। বহু লেখনী প্রতিনিয়ত পরিত্যাগ করিতে হয়। সুদীর্ঘকাল পরে পূর্বতন কতিপয় ধারণাকে বালসুলভ প্রতিভাত হইতে পারে। কালক্রমে নিজের অভিমত নিজ মানসপটে ভ্রান্ত প্রতিপন্ন হইলেও তাহাতে বিন্দুমাত্র হানি নাই। কেননা আপন স্মৃতির পঙ্কিলতার অভ্যন্তরেও এক অনন্য বংশপরিচয় প্রচ্ছন্ন রয়। অপর ব্যক্তির নিকট হইতে আহৃত সঠিক ধারণার অপেক্ষা আপন স্বকীয় ভ্রান্ত ভাবনাবোধ স্রষ্টাকে অধিকতর প্রজ্ঞা প্রদান করে; কারণ সেই ব্যর্থতার কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রমকালেই প্রজ্ঞা ও চিন্তার প্রকৃত পেশি গঠিত হইয়া উঠে।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রাঙ্গণ কেবল নির্দিষ্ট উত্তরের সন্ধান দেয়; অথচ সাহিত্যসাধনা শেখায় গভীর ও জটিল জিজ্ঞাসার সমুখে নীরবে প্রহর যাপন করিতে। এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর অতিশয় দুরূহ, কেননা ছাত্রজীবনের সুদীর্ঘ অভ্যাস ও অর্জিত সংস্কার অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত থাকে। গদ্য সমাপ্ত করিবার পশ্চাতেও আমাদের চিত্তে সংশয় জাগে—উপযুক্ত তথ্যাবলি সংগৃহীত হইল কি না, নির্ঘণ্টের প্রাচুর্য বজায় রহিল কি না, কিংবা বিদগ্ধ মণীষীদের নামাবলি অধিক সংখ্যায় যুক্ত করা আবশ্যক ছিল কি না। অথচ এক সাক্ষাৎ স্রষ্টার অন্বেষণ অন্যরূপ হওয়া সমীচীন: উক্ত রচনায় এমন কোন্ নিভৃত সত্য প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে যাহা অপর কোনো ব্যক্তিসত্তা অভিন্নরূপে প্রকাশে অসমর্থ হইত? আপনার নিজস্ব নেত্রপাত, গভীর দ্বিধাবোধ ও যাপিত জীবনের অভিঘাত কোথায় রেখাপাত ঘটাইয়াছে? রচনার কোন্ নির্দিষ্ট পংক্তির সম্পূর্ণ দায়ভার আপনি একা নিজ স্কন্ধে বহন করিবার আত্মপ্রত্যয় অর্জন করিয়াছেন?
বাস্তবিকপক্ষে, স্বকীয় সুর কেবল শব্দচয়ন কিংবা গদ্যরীতির কৌশলমাত্র নহে; ইহা এক পরম আত্মিক ও নৈতিক অনুশীলনের নামান্তর। আপন অভিজ্ঞতার নির্যাস প্রকাশে নিরঙ্কুশ সততা বজায় রাখা, নিজের সীমাবদ্ধতা ও অজ্ঞতাকে দ্বিধাহীনভাবে স্বীকার করিয়া লওয়া এবং অন্তরের নিভৃত সংশয়কে প্রকাশ করিবার অবকাশ প্রদান করাই ইহার মূল সাধনা। লোকমুখে প্রচলিত কিংবা সর্বজনগ্রাহ্য ভাবনাবোধকে কেবল জনপ্রিয়তার খাতিরে পুনর্বার উচ্চারণ করা হইতে বিরত থাকিতে হইবে। তদ্ব্যতীত, প্রথিতযশা কোনো প্রিয় সাহিত্যিকের রচনার প্রতি গভীর অনুরাগ থাকিলেও, তাঁহার সেই ঋদ্ধ লেখনীসৌন্দর্যকে আপন স্বকীয় ভাষাশৈলী ভাবিয়া আত্মপ্রবঞ্চনা করা সমীচীন নহে।
অতঃপর কদাচিৎ আপন অপরিপক্ব, ট্রুটিপূর্ণ ও অসমাপ্ত ভাবনার সমীপে দণ্ডায়মান হইয়া অন্তরে বলিয়া উঠা—হ্যাঁ, এই প্রাঙ্গণে বহু সাধনা অবশিষ্ট রহিয়াছে সত্য, তথাপি ধারণাগুচ্ছ সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব। সেই নিভৃত মুহূর্ত হইতেই সাহিত্যযাত্রার প্রকৃত সূচনা। সর্বপ্রথমে আপন অন্তঃকরণ হইতে একটি স্বাধীন পংক্তি রচনা করুন; তদনন্তর বিশ্বের নিখিল গ্রন্থাগারের দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দিন।


